ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ধানের শীষে ভোট দেয়ার শাস্তি কি গণধর্ষণ?

চার সন্তানের জননী এই নারী। যার বাড়ি নোয়াখালির সুবর্ণচরে। ৩৫ বছর বয়স্ক এই নারীর নতুন বছর শুরু হয়েছে হাসপাতালে। কারণ ১০-১২ জনের একটা দল এসে তাকে রাতভর ধর্ষণ নির্যাতন করেছে। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে এই নারী অভিযোগ ভীষণ গুরুতর। ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেয়ার কারণেই তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন! বলেন, “তারা বারবার আমাকে জোরজবস্তি করছিল এবং বলছিল যে, নৌকায় ভোট দেয়া আমার উচিত ছিল, কিন্তু আমি কেন ধানের শীষে ভোট দিয়েছি..।”

গত রোববার সারাদেশে জাতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়েছে। সেদিন রাতেই এই ঘটনা ঘটে। উপজেলার মধ্য বাগ্যার ৮ নং কলোনিতে রাতে ১০/১২ জন লাঠি, স্টিক নিয়ে আসে এবং ঘরে ঢুকে সেই নারীর স্বামী ও চারসন্তানকে দড়ি দিয়ে বেঁধে তাকে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। সেখানে রাতভর চলে ধর্ষণ! গণধর্ষণের পাশাপাশি মহিলাকে ভীষণভাবে মারধোরও করা হয়। মারের চোটে সারাদেহ আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। ভোরের দিকে ধর্ষকের দলটি ধর্ষিতাকে বাড়ির পুকুরঘাটে ফেলে রেখে যায়। সকালে তাকে উদ্ধার করে নোয়াখালি সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হয়।

ধর্ষিতার স্বামী সিএনজি অটোরিকশাচালক। তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেন, রবিবার রাত ১০টার দিকে স্থানীয় একই এলাকার সোহেল, আলাউদ্দিন, স্বপন, আনিস, আনোয়ার, আবু মাঝি, হেদু মাঝি আরো দুই-তিনজনকে নিয়ে তার বাড়িতে এসে পুলিশ পরিচয়ে দরজা খুলতে বলে। তিনি দরজা খুললে তারা তার ঘরে ঢুকে তার হাত-পা-মুখ বেঁধে তার স্ত্রীকে ঘরের বাইরে নিয়ে ধর্ষণ করে। ধর্ষিতার স্বামী অভিযুক্তদের সবাইকে আওয়ামীলীগের কর্মী বলে চিহ্নিত করেন। তারও ধারণা, ধানের শীষে ভোট দেয়ার অপরাধে ওরা ক্ষীপ্ত হয়ে এমন নির্মমতা দেখিয়েছে!

ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ড, দিনাজপুর, পুলিশ, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস

এমন একটি নির্বাচনের পর ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেয়ার কারণে ধর্ষণের অভিযোগ আসা কিরকম নির্লজ্জজনক এটা কি আওয়ামী লীগের সমর্থকরা বুঝবেন? নব্বুই, পঁচানব্বই ভাগ আপনাদের পক্ষে দেখা গেছে ভোটের ফলাফলে, তারপরেও কেন এমন অভিযোগ আসবে আপনাদের উপর যে বিপক্ষ প্রতীকে ভোট দেয়ার অপরাধে ধর্ষণ হয়েছে? এই লজ্জা কোথায় রাখবেন?

ধর্ষণের খবর তো বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অনেকটা সহনীয় স্বাভাবিক হয়ে গেছে, শুনতে শুনতে তাই অভ্যাস হয়ে গেছে সবার। পৃথিবীর কারোই কিছু এসে যায় না, শুধু যে ধর্ষিতা সে-ই সারাজনম এই নরকযন্ত্রণার ঘানি টানে, বেঁচে থাকে জীবন্মৃত হয়ে। এই নারীও তার ব্যাতিক্রম নন। যেমন ব্যাতিক্রম ছিল না পূর্ণিমা রানী শীল। ২০০১ সালে পূর্ণিমা এক কিশোরী মেয়ে। সেবছর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের পর বিএনপি জামায়াত সমর্থকরা তার উপর পাশবিক নির্যাতন, ধর্ষণ চালিয়েছিল। সংখ্যালঘুদের ভোট আওয়ামীলীগের পক্ষে গিয়েছিল বলে, তখন সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল অনেক বেশি। তার সবচেয়ে করুণ উদাহরণ পূর্ণিমা রানী শীল।

পূর্ণিমা আর তার মা’কে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাড়ি থেকে, একটু দূরের একটা ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে প্রায় পনেরো থেকে বিশজন ধর্ষকামী যুবক ধর্ষণ করেছিল কিশোরী পূর্ণিমাকে। মায়ের সামনেই মেয়ের ছোট্ট শরীরটার ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল এই নরপিশাচের দল। পূর্ণিমার মায়ের ক্ষমতা ছিল না এই পশুগুলোকে বাধা দেয়ার, তিনি শুধু মিনতি করে বলেছিলেন- “বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট তোমরা একজন একজন করে এসো, নইলে ও মরে যাবে।”

এই ঘটনায় বিচার পাওয়ার জন্য পূর্ণিমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দশ বছর। কিন্তু এই ঘটনা ভুলতে পূর্ণিমার লেগে যাবে একটা গোটা মানবজন্ম। সেই দুঃসহ স্মৃতি কি সে কখনো ভুলতে পারবে? যেমন পারবে না সুবর্ণচরের সদ্য ধর্ষিতা নারীটি! আওয়ামীলীগ সমর্থকরা পূর্নিমার ধর্ষণকে বার বার পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট হিসেবে, অনলাইন এক্টিভিস্টরা এই ধর্ষণকে বিএনপির জামায়াতের দুঃশাসনের উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছে। সুবর্ণচরের এই নারীর ঘটনাকে তারা কিভাবে দেখবে? এই ঘটনার বিচারেরও কি তাদের তরফ থেকেই আশা উচিত নয়?

আওয়ামীলীগের কট্টর উগ্রপন্থী সমর্থকরা আজকাল সবকিছু ব্যালেন্স করার জন্য বিএনপি আমলের খারাপ দৃষ্টান্তগুলো টেনে আনে। অন্যায়কে ঢাকার জন্য আরেকটা অন্যায়ের উদাহরণ দিয়ে এরা যে সংস্কৃতি শুরু করেছে তার পরিণতিই আসলে বিচারহীনতাকে বেশি করে উশকে দেয়, এসব ধর্ষণের ঘটনাকে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়।

তাই সব ঘটনাতে দালালী করে হালালীকরণ না করে প্রতিবাদ করুন। সুবর্ণচরের ধর্ষিতাকে সারাজীবন গেলেও আপনি এই দুঃসহ কালো রাতের স্মৃতি ভুলিয়ে দিতে পারবেন না, কিন্তু এই ঘটনাকেও ডিফেন্ড করে ধর্ষণের মতো অপরাধকে হালকা করে ফেলবেন না। কারণ, সবসময়ই ধর্ষিতা দ্বিতীয়বার ধর্ষিত হয়, মানসিকভাবে। যেটার জন্য দায়ী আপনি, আমি, আমরা, আমাদের জাতি-গোত্র-ধর্ম এবং বিভিন্ন প্রতীকেরা…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button