সিনেমা হলের গলি

অক্ষয় কুমার: একজন সত্যিকারের সুপারস্টারের গল্প!

“আমি অমিতাভ নই, দিলীপ কুমার নই, নই কোনো স্টারের সন্তান। আমি স্রেফ অক্ষয় কুমার।”

বলিউডের একমাত্র সুপারস্টার যার নামের টাইটেলের দুইটি গান রয়েছে। প্রথম উল্লেখিত গানেই অক্ষয় সরাসরি বলেই দিয়েছেন যে তিনি অমিতাভ বচ্চন, কিংবা দিলীপ কুমার নন, অথবা নন কোন স্টারকিড, তিনি হলেন অক্ষয় কুমার। এ গানটি “খিলাড়িওন কা খিলাড়ি”-তে ব্যবহার হয়েছে। আর পরের গানটি “চাঁদনী চক টু চায়না” এর র‍্যাপ “This is Akshay kumar” যেখানে তার বড় হয়ে ওঠা চাঁদনী চক এরিয়ার কথা বলা হয়েছে, সাথে তার পুরানো বাড়ির ঠিকানা যোগ করা আছে এই গানে।

কোন ধরনের থিয়েটার অভিনয় কিংবা ফিল্মি ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই এসেছেন রুপালী জগতে। নামের শেষে কুমার থাকলেও কোনোভাবেই দিলীপ কুমার, উত্তম কুমার বা ইন্ডাস্ট্রির কোন কুমারের সাথে আত্মীয়তায় নেই তার। অক্ষয় কুমারের আসল নাম রাজীব হরি ওম ভাটিয়া। ১৯৬৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবের অমৃতসর এলাকায় জন্ম নেন তিনি। পারিবারিক ডাকনাম রাজু। মা অরুনা ভাটিয়া। পিতা হরি ওম ভাটিয়া যিনি একজন মিলিটারি অফিসার ছিলেন। অক্ষয়ও ছোট বেলা চাইতো বড় হয়ে মিলিটারিতে যোগ দিতে। অমৃতসরে জন্ম নিলেও, বেড়ে উঠেছেন পুরানো দিল্লীতে। এখানেই তিনি তার শৈশব পার করেন ।

এরপর তিনি পরিবারসহ মুম্বাইয়ের কোলিবারায় আসেন। এখানেই তার স্কুলিং হয় “ডন বস্কো” স্কুল থেকে। তারপর মুম্বাইয়ের গুরু নানক খালসা কলেজে এডমিশন নেন। এক বছর যেতে না যেতেই তার মার্শাল আর্ট শেখার আগ্রহ হয়। অক্ষয়ের ভাষ্যমতে মেয়েদের ইম্প্রেস করার লক্ষ্যেই প্রথম মার্শাল আর্ট শেখা শুরু করেন। মার্শাল আর্ট শিখতে তিনি সিংগাপুর পাড়ি জমান। অর্থাৎ শিক্ষাগত দিক দিয়ে তিনিও একজন ড্রপ আউট। 

যদিও পরবর্তীতে তিনি ভারতে থাকা অবস্থায় তায়কান্ডোতে ব্লাক বেল্ট অর্জন করেন। সিংগাপুরে তিনি মার্শাল আর্ট ক্লাসের পাশাপাশি ব্যাংককে জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি রেস্টুরেন্টে শেফ হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের হোটেল পূর্বাণীতেও কিছু দিন কাজ করেছেন। 

পুনরায় ফিরে আসার পর তিনি মার্শাল আর্ট ক্লাস নেওয়ার মাধ্যমে জীবিকানির্বাহ করতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারই এক সৌখিন ফটোগ্রাফার ছাত্র তার ফটো তুলেন ও মডেলিংয়ের জন্য ছাত্র তার নিজের উদ্যোগেই আবেদন করেন। অক্ষয় টানা ১৮ মাস ফটোগ্রাফার জয়স শেঠের স্টুডিওতে বিনা বেতনে কাজ করেছেন শুধুমাত্র নিজের পোর্টফোলিও তৈরী করতে! এরকম ডেডিকেশন ও কষ্ট সহ্য করে উঠে আসা অভিনেতা ইন্ডাস্ট্রিতে খুব কমই আছেন।

অক্ষয়ের একসময় ডাক পড়ে মডেলিংয়ের জন্য। মাত্র দুই দিন মডেলিং করেই তিনি যা টাকা উপার্জন করলেন যা তিনি সেসময় সারা মাসেও আয় করতে পারতেন না। তাই মডেলিংকেই গুরুত্বের সাথে নিলেন এবং মডেলিংয়ে নিয়মিত হলেন। বিভিন্ন টিভি ও ম্যাগাজিন বিজ্ঞাপনে অক্ষয় এ সময় অভিনয় করেছেন। এমনকি বিভিন্ন বলিউড ফিল্মে ব্যাকগ্রাউন্ড স্টেজ ড্যান্সার হিসাবে বেশ কয়েকটি ফিল্মে পারফর্ম করেন।

অক্ষয় সিনেমায় নামার জন্য উঠে পরে লাগলেন মডেলিংয়ের সময় হতেই। বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন স্পট বা ইউনিটে বিভিন্ন ছোট খাট কাজ করেছেন। সাউথের কিছু ফিল্মের সেটের ফটোগুলোতে তাকে দেখা গেছে। কিন্ত কোন কিছুতেই যেন ভাগ্য খুলছিলো না। লিক হওয়া নিউজ এমনও আছে যে, ফারাহ খানের “জো জিতা ওহি সিকান্দার”-এর সেকেন্ড রোলের জন্য অক্ষয় তার কাছে আবেদন করেছিলেন স্ট্রাগলিং টাইমে। কিন্ত ফারাহ খান তাকে রিজেক্ট করেছিলেন। আসলেই হঠাৎ করে এসে ইন্ডাস্ট্রি তে ঢোকা এতটা সহজ ছিল না এই মানুষটার জন্য!

একদিন একটি কোম্পানি তার জন্যে বেঙ্গালোরের একটি বিমান টিকিট বুক করেছিল তাদের একটি বিজ্ঞাপন শুট করার জন্য। সৌভাগ্যবশত অক্ষয় ফ্লাইটটি মিস করেন। সৌভাগ্য বলছি এই কারনে কেননা সন্ধায় তিনি খুব বিষন্ন মনে তার পোর্টফলিওটি নিয়ে প্রডিউসার প্রমোদ চক্রবর্তীর স্টুডিওতে যান। তিনি তাকে পছন্দ করেন এবং “দিদার” ফিল্মে সাইন করান। কে জানতো যদি সেদিন অক্ষয় বিমানটি পেত, তবে কি হতো? অক্ষয় আদৌ ইন্ডাস্ট্রি তে আসতে পারতো কিনা!

যদিও তার প্রথম সাইনিং ফিল্ম “দিদার”, কিন্ত তাকে প্রথম বড় স্ক্রিনে দেখা যায় “সৌগন্ধ” ফিল্মের মাধ্যমে। অভিষেক ১৯৯১-এ হলেও অক্ষয়কে প্রথম ছোট্ট একটি চরিত্রে দেখা যায় ১৯৮৭ সালের মহেশ ভাট এর ফিল্ম “আজ”-এ, যা অনেকের ই অজানা। এই ফিল্মেও অক্ষয়কে একজন মার্শাল আর্ট ইনস্ট্রাক্টর হিসাবে দেখানো হয়। এই ফিল্মে তার চরিত্রের নাম দেওয়া হয়েছিল অক্ষয়। মূলত এই ফিল্মের পরই অক্ষয় নিজের নাম রাজীব থেকে অক্ষয়-এ পরিবর্তিত করেন।

অক্ষয়ের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে, সবাই তার লুক, একশন, স্ট্যান্ট আর ড্যান্সের সুনাম করলেও তার অভিনয় যোগ্যতা নিয়ে অনেকের অতৃপ্তি ছিল। শাহরুখ খান যেমন আব্বাস মাস্তান সাহেব পরিচালিত বাজিগর এর মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের পায়ের মাটি প্রথম শক্তভাবে স্থাপন করেছিলেন, ঠিক তেমনি অক্ষয় কুমার ও আব্বাস মাস্তান পরিচালিত “খিলাড়ী”-এর মাধ্যমে নিজের স্থান বলিউডে শক্ত করে নেন। “খিলাড়ি” ওই বছরের অন্যতম বিগ হিট ফিল্ম ছিল, এরপর অক্ষয় পুরো ক্যারিয়ারে খিলাড়ি মুভির টাইটেল সিক্যুয়েলে মোট ৮টি ফিল্ম করেছেন। তার অনেক ডাকনামই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রচলিত। যেমন খিলাড়ী কুমার, আক্কি, রাজু, ম্যাক ইত্যাদি।

খিলাড়ি ফিল্মের পর অক্ষয় ব্যাক টু ব্যাক সফলতার সাথে খিলাড়ি সিরিজের অন্যান্য ফিল্ম দিয়ে গেছেন। এসময় তার বেশিরভাগ ফিল্মই একশননির্ভর ছিল। যেমন “মোহরা”, “ওয়াকত হামারা হ্যায়”, “এলান”, “সুহাগ”, “সাপুত”, “জানোয়ার” ইত্যাদি। তাই স্বভাবতই অক্ষয়কেকে সবাই একশন ড্যান্সিং ক্যাপাবল এক্টর হিসাবেই দেখত। অতঃপর বিখ্যাত রোমান্টিক ফিল্মের সম্রাট প্রয়াত যশ চোপড়া সাহেবের “দিল তো পাগল হ্যায়” ফিল্মে ছোট একটি সেক্রিফাইসিং প্রেমিকের রোল পালন করেন। এছাড়াও যশ চোপড়া সাহেবের “ইয়ে দিল্লাগি” ফিল্মেও তাকে রোমান্টিক হিরো হিসাবে দেখা গিয়েছে। কিন্ত তাকে একদম ভিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন ডিরেক্টর প্রিয়দর্শন সাহেব। তার ক্লাসিক কমেডি ফিল্ম “হেরা ফেরি”-তে সুনীল শেঠী ও পরেশ রাওয়ালের সাথে জুটি বেধে নিজের কমেডি রোলের যে সুপ্ত ইমেজ ছিল তা প্রকাশ করার সুযোগ পান। তার এই ফিল্ম শুধু ব্যাপক আকারে প্রশংসিত নয়, ব্যবসাসফলও হয়েছিল বটে। এরপর “ধাড়কান” ফিল্মে যে ইমোশনাল ক্যারেক্টার প্লে করেছিলেন, সেটিও ছিল কিছুটা ভিন্নমাত্রার। তারপর আর তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি।

আসুন জেনে নেই অক্ষয়ের পারসোনাল লাইফ ও ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কিত কিছু অজানা তথ্যঃ

★ রাত দশটার ভিতরে তিনি যেভাবেই হোক বিছানায় যান এবং ভোর চারটার ভিতর ঘুম থেকে উঠেন। ভোর চারটা থেকে জগিং করেন। তার পারসোনাল ট্রেইনিং রুমে তেমন বড় বা উন্নত ইকুয়েপমেন্ট নেই। তার ফিটনেস ঠিক রয়েছে তার মার্শাল আর্ট কাজে লাগিয়ে। খাবারের বেলায় খুবই সচেতন তিনি। কাজে ব্যস্ত থাকেন সকাল থেকে রাত অব্দি। এ কারনে অনেকে তাকে Workoholic বলেন কেননা প্রতি বছর অক্ষয় যত ফিল্ম উপহার দেন, তা বর্তমানের অন্য প্রথম সারির স্টারদের থেকে অনেক বেশি। সারা সপ্তাহ পর শুধু রবিবার সম্পূর্ণ ছুটি নেন এবং পরিবারের সাথে সময় কাটান।

★ অক্ষয় সারাজীবন স্ক্রিনে যতই মদ্যপান বা ধুমপান করুক না কেন। যতই গলা চড়া করে গান গাক “হা মে এলকোহলিক হু”, তিনি কখনো ধুমপান বা মদ্যপান করেন না। এজন্য হয়তো তাকে বলিউডের নাইট পার্টিতে দেখা যায় না।

★ তার শখ পুরোনো মুভির পোস্টার কালেকশন, ভলিবল ও ক্রিকেট খেলা ও রান্না করা।

★ অক্ষয় পুরোনো অভিনেতা-অভিনেত্রীর মধ্যে শ্বশুর রাজেশ খান্না, কমল হাসান ও শ্রীদেবীর ফ্যান। বর্তমান জেনারেশনে রণবীর সিং-কে তার খুব পছন্দ।

★ অক্ষয় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এফেয়ারে জড়িয়েছেন, তার মধ্যে অভিনেত্রী পূজা ভাট, রাভিনা টেন্ডন, শিল্পা শেঠী ও সর্বশেষ স্ত্রী টুইংকেল খান্না। টুইংকেল খান্নার সাথে বিয়ে নিয়েও একটি মজার কাহিনী আছে। বিয়ের আগে এ জুটি বাজি রাখেন সে সময় আমির খান-টুইংকেল খান্নার আপকামিং ফিল্ম ছিল “মেলা”, ফিল্ম ফ্লপ হলে তারা বিয়ে করবেন নতুবা আরো অপেক্ষা করবেন। মজার ব্যাপার হলো ফিল্মটি ফ্লপ হয় এবং ওই বছরই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

★ তার দুই সন্তান রয়েছে। পুত্র আরাভ ও কন্যা নিতারা। বাচ্চাদের শৈশবকালে তিনি ফিল্মে অতিরিক্ত রিস্ক নেওয়া স্ট্যান্টগুলো করা বন্ধ করেন, পাছে সন্তানেরা বাবার অনুকরণ করে বিপদে না পড়ে। সন্তান বড় হবার পর তিনি পুনরায় খুবই রিস্কি স্ট্যান্ট নেওয়া শুরু করেন।

★ অভিনেতা ছাড়াও অক্ষয় একজন প্রোডিউসার। ২০০৯ সালে তিনি তার প্রথম প্রোডাকশন কোম্পানি “হরি ওম এন্টারটেইনমেন্ট ” প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১২ সালে তিনি তার দ্বিতীয় প্রোডাকশন কম্পানি “Grazing Goat Pictures” প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কাবাডি টিম “খালসা ওয়ারিয়র” এর মালিকও বটে।

★ ২০১৫ সালে Forbes এর ওয়ার্ল্ড হাইস্ট পেইড এক্টরের তালিকায় তিনি নবম স্থানে আসেন।

★ “ফুল অর কাটে” এবং “ওয়াটার” যা কিনা পর্যায়ক্রমে অজয় দেবগণ ও জন আব্রাহাম এর ডেবু ফিল্ম, এর জন্য প্রথম অক্ষয়কে ভাবা হয়। কিন্ত তিনি রিজেক্ট করার পর অফারগুলো তাদের কাছে যায়।

★ অক্ষয়ের ভয়ংকর স্ট্যান্টের অনেক উদাহরণ আছে। যেমন গাড়ির ডেডলি স্ট্যান্ট, ছাদ দিয়ে লাফিয়ে পড়া। তবে এমন কিছু স্ট্যান্ট তিনি করেছেন যা আপনি হয়তো কল্পনাও করতে পারবেন না। “খিলাড়ি ৪২০” ফিল্মের জন্য তিনি চলন্ত প্লেনে বেয়ে উঠেছেন। ১০০০ ফুট উঁচুতে চড়া প্লেনের মাথার উপরে উঠেছেন। এবং ওখান থেকে জাম্প করেছেন এয়ার বেলুনের সাপোর্টে। এছাড়া নিজেকে নিয়ে গাড়ি বিধস্ত করতেও দেখা গিয়েছে তাকে। ফিল্ম ‘খিলাড়িওন কা খিলাড়ি’তে তাকে ডব্লুডব্লুই সুপারস্টার দ্য আন্ডারটেকারকে উঁচু করে ছুঁড়ে ফেলার একটি দৃশ্য ছিল। ৩৫০ পাউন্ড ওজনের আন্ডারটেকারকে ঘাড়ে তুলতে তিনি খুবই মারাত্মকভাবে ঘাড়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন। তাকে আমেরিকায় অনেকদিন ধরে উচ্চমানের চিকিৎসা করানোর পর তিনি সুস্থ হন।

★ তিনি কানাডিয়ান সিটিজেনশিপ প্রাপ্ত। কানাডা থেকে ডক্টরেট উপাধি পাওয়ার পর তিনি কানাডার অনুরোধে কানাডিয়ান সিটিজেনশিপ নিয়েছেন।

★ তিনি সালমান খানের “Being Human” দাতব্য প্রতিষ্ঠানে ৫০ লক্ষ রুপি ডোনেট করেছেন, মহারাষ্ট্রে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থদের ৫০ লক্ষ এবং ৯০ লক্ষ দান করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের। ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত অক্ষয় ভারতের একজন Highest Tax paying Person.

★ অক্ষয় সবচেয়ে বেশি আটবার বিজয় নাম ভুমিকায় ও ছয়বার রাজ মালহোত্রা নামে অভিনয় করেছেন।

অক্ষয়ের ফিল্মি ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে তাকে এভাবে ভাগ করা যায়ঃ

? ১৯৯১-২০০০ আগমন ও একশন জনরায় সাফল্যঃ

১৯৯১ এ অভিষেকের পরপর ফিল্ম করলেও খিলাড়ি সিরিজে অক্ষয় এসময় বেশি সফলতা লাভ করেছে। এছাড়া এ সময় “ওয়াকত হামারা হেই”, “মোহরা”, “এলান”, “সুহাগ”, “সাপুট”, “জানোয়ার” ফিল্মগুলোও বক্স অফিসে ভাল ইনকাম করেছিলো। ১৯৯৪ সালে তার অভিনীত টানা ১১ টি ফিল্ম রিলিজ হয়। এছাড়া নিজ কমফোর্ট জোনের বাইরে গিয়ে কিছু ফিল্ম করেছেন, এছাড়া কিছু ক্যামিও বা পার্শ্ব চরিত্রেও তিনি এসময় অভিনয় করেন। নিজের মার্শাল আর্ট জানার সুবিধার্থে একশন ফিল্ম করতে তার খুব বেশি ঝামেলা হতো না। এমন কি অক্ষয় সর্বদাই নিজের স্ট্যান্ট নিজেই করেন। অনেকেই তাকে ইন্ডিয়ার জ্যাকি চ্যান বলে ডাকতে থাকেন তখন থেকেই।

? ২০০০-২০০৬ মাল্টিজনরা কমার্শিয়াল জনরায় আগমনঃ

শুরুটা হয় কেরালা তথা সারা ভারতের অন্যতম সেরা ডিরেক্টর প্রিয়দর্শনের ক্লাসিকাল কমেডি ফিল্ম “হেরা ফেরি” এর মাধ্যমে। এছাড়া রোমান্টিক ড্রামা “ধাড়কান”। এছাড়া একশন স্ট্যান্ট সমৃদ্ধ “খিলাড়ি ৪২০”; রোমান্টিক “এক রিস্তা”; নেগেটিভ ক্যারেক্টারে আব্বাস মাস্তানের “আজনাবি” যা ওইসময় অক্ষয়ের ভারসেটালিটির বড় প্রমাণ দিয়েছিল। ২০০২ এর সালে অক্ষয় অভিনয় করেছেন ”আঁখে” সিনেমাতে, যেখানে একজন অন্ধ ব্যক্তির রোলে তাকে দেখা যায়। এই মুভিটিতেওও তার অভিনয় প্রশংসা কুড়িয়েছে। এছাড়াও মাল্টিস্টার কমেডি ফিল্ম “আওয়ারা পাগল দিওয়ানা”, হরর ফিল্ম “জানি দুশমন”, “আন্দাজ”, “বেওয়াফা”, “ওয়াক্ত”, “দিওয়ানি হু পাগাল”, “হামকো দিওয়ানা কার গায়ে” মাল্টিস্টার একশন থ্রিলার “খাকি”, সালমান খানের সাথে ডেভিড ধাওয়ানের রোমান্টিক কমেডি ফিল্ম “মুজসে শাদি করোগী”-তেও অভিনয় করেন তিনি। এছাড়া অক্ষয়ের ক্যারিয়ারের বড় চমক আব্বাস মাস্তানের ফিল্ম “এইতরাজ”। এই ফিল্মে নেগেটিভ ক্যারেক্টারে প্রিয়াঙ্কা এবং Sexually Harassed হিসাবে অক্ষয় অভিনয় করেন। এছাড়া প্রিয়দর্শনের “গরাম মাসালা”, “ফির হেরা ফেরি”, “ভাগাম ভাগ” প্রতিটি ওই সময়ের উল্লেখযোগ্য মুভি।

২০০৭-২০১১: সুপারস্টারডম প্রাপ্তিকালঃ

২০০৭ সালে প্রথম অক্ষয় এক বছরে ব্যাক টু ব্যাক ৫ টি হিট ফিল্ম দিয়ে ইতিহাস গড়েন। মুভিগুলো হল “নমস্তে লন্ডন”, “হেই বেবি”, “ওয়েলকাম”, পার্শ্ব চরিত্রে “ওম শান্তি ওম” এবং প্রিয়দর্শন-অক্ষয় জুটির “ভুল ভুলাইয়া”। ২০০৮ সালে “তাশান”, এনিমেটেড ফিল্ম “জাম্বো”, এবং “সিং ইজ কিং” এ তাকে দেখা যায়। সিং ইজ কিং বিগেস্ট হিট ছিল এবং এটি ফার্স্ট উইক ওয়ার্ল্ড ওয়াইড হাইস্ট কালেকশন এর রেকর্ড ব্রেক করেছিলো। ২০০৯ সালে পিওর কমেডি একশন “চাদনী চক টু চায়না”, এবং প্রিয়দর্শন-অক্ষয় জুটির “দে দানা দান” রিলিজ হয়। ২০১০ সালে “হাউসফুল”, প্রিয়দর্শনের “খাট্টা মিটঠা”, “একশন রিপ্লে” “তিস মার খান” রিলিজ হয়। এ বছরটি তার খুব বেশি ভাল না গেলেও হাউসফুল বিগ হিট ছিল। ২০১১ সালে “পাটিয়ালা হাউজ”, “থ্যাংক ইউ”, “দেসি বয়েজ” করেন।

২০১২-বর্তমান সুপারস্টাডম+এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মসঃ

২০১২-তে “হাউসফুল২”, “রাউড়ি রাথোর” ব্যাক টু ব্যাক ১০০ কোটি গ্রোসিং ফিল্ম ও ব্লকবাস্টার। এরপর বড় বাজেটের ফিল্ম “জোকার” দুর্ভাগ্যবশত ফ্লপ হয়। এছাড়া ক্রিটিকালি এক্লেইমড “Oh My God”-এ তিনি শ্রী কৃষ্ণের রোলে ছিলেন এবং বছরের শেষে রিলিজপ্রাপ্ত খিলাড়ি সিরিজের অষ্টম ফিল্ম “খিলাড়ি 786” রিলিজ হয়।

২০১৩ সালে অক্ষয়ের রিলিজ প্রাপ্ত হিট ও ক্রিটিক্স প্রশংসামুখর ফিল্ম হল “Special 26″। তারপর আবার টানা দুইটি ফ্লপ ফিল্ম “Once Upon A Time In Mumbai Dobara”, “Boss”. ২০১৪ সালে গজনি খ্যাত তামিল ডিরেক্টর এ আর মুরুগাডস এর সাথে জুটিবদ্ধ হয়ে ব্লকবাস্টার তামিল ফিল্ম ঠুপাক্কির অফিসিয়াল রিমেক “হলিডে” করেন। এরপর “Its Entertainment” এবং “The Shaukeens” করেন। ২০১৫ সালে রিলিজ পায় “বেবি”, “গাব্বার ইজ ব্যাক” এবং “সিং ইজ ব্লিং”। তিনটি হিট ফিল্ম এর মধ্যে ‘বেবি ও গাব্বার’-এ তার পারফর্ম প্রশংসিত হয় ক্রিটিক্সদের কাছে।

২০১৬ সালে “এয়ারলিফট” “হাউসফুল 3”, “রুস্তম” রিলিজ পায়। তিনটি ব্যাক টু ব্যাক ব্লকবাস্টার/সুপার হিট। রুস্তম আর এয়ারলিফটের জন্য অক্ষয় জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন। অভিনয় ও স্ক্রিপ্ট চয়েজ ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। ২০১৭ সালে এখন পর্যন্ত “জলি এল এল বি 2” এবং “নাম শাবানা” তে সাপোরটিং রোলে তাকে দেখা গিয়েছে। মুক্তি পেয়েছে “টয়লেট এক প্রেম কথা”। সামনে মুক্তি পেতে যাচ্ছে “প্যাডম্যান” ,গোল্ড” এবং ভারতের সবচেয়ে বেশি বাজেটেড ফিল্ম শংকরের রোবট ফিল্মের সিকুয়েল “2.0”। “2.0” তে নেগেটিভ চরিত্রের জন্য সিলেক্টেড হয়েছেন। এই ফিল্মে অক্ষয় ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নিয়েছেন বলে জানা যায়।

?এওয়ার্ডের দিকে বলিউডপাড়ায় অন্যান্য সুপারস্টার থেকে পিছিয়ে থাকলেও অক্ষয় জাতীয় পুরষ্কার প্রাপ্তির দিক থেকে ভালোই এগিয়ে। ২০০৯ সালে তিনি ভারতীয় সরকার দ্বারা পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। ২০০৪ সালে রাজীব গান্ধী পুরষ্কার পান। এছাড়া রুস্তম-এয়ারলিফট এর জন্য ২০১৭ সালে জাতীয় পুরষ্কার পান। কানাডার University Of Windsor তাকে ডক্টরেট উপাধিতে সম্মানিত করেন। তিনি জাপানের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় সম্মান “কাটানা” পেয়েছেন।

বলিউড ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন ২ বার। ২০০২ এ আজনাবি ফিল্মের জন্য বেস্ট ভিলেন এবং ২০০৬ এ গরম মাসালা ফিল্মে বেস্ট কমেডিয়ান ক্যাটাগরিতে। ২০০৯ সালে তিনি সিং ইজ কিং এর জন্য বেস্ট স্ক্রিন এওয়ার্ড পান, কিন্ত তিনি এটি নিতে অগ্রাহ্য করেন। এবং স্পিচ দেওয়ার সময় বলেন যে অবশ্যই এই এওয়ার্ডের যোগ্য দাবীদার আমির খান। এওয়ার্ড হাতে নিয়ে অন্য কাউকে এটার যোগ্য বলার মতো উদার মন কয়জনের হয়! এছাড়া ২০১৩ সালে দাদাসাহেব ফালকে একাডেমী এওয়ার্ড পেয়েছেন “রাউডি রাথোর” এর জন্য। মোট ৬ টি স্টারডাস্ট এওয়ার্ড, ৩ টি IIFA এওয়ার্ড ইত্যাদি ছোট বড় আরো এওয়ার্ড আছে তার ঝুলিতে।

অক্ষয় কুমার নিঃসন্দেহে পরিশ্রমী ব্যক্তি। আলিয়া ভাটের মতে সবচেয়ে জেনুইন এক্টর। রনবীর সিং এর মতে সবচেয়ে এনারজেটিক স্টার। কংগনা রানৌতের কাছে মোস্ট হার্ড ওয়ার্কিং এক্টর। সালমান খানের মতে মোস্ট ট্যালেন্টেড ও ফিনোমেনাল এক্টর। বি টাউনে পরিশ্রমের উদাহরণ অক্ষয়। আপনি হয়তো তার এক্টিং এবিলিটি বা বেশি ফিল্ম করা বা বক্স অফিস রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্ত এই ব্যক্তি পরিশ্রমের দ্বারা হার মানিয়েছেন প্রতিভাকে। প্রমান করেছেন পরিশ্রমই সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। অনেক ট্যালেন্টেড এক্টরের চেয়েও তিনি পপুলারিটি ও স্টারডমে এগিয়ে। জয় করেছেন কোটি কোটি মানুষের হৃদয়।

কৃতজ্ঞতা- ফেসবুক গ্রুপ ‘জাস্ট বলিউড’, লিখেছেন Musfirat Hasan Farazy

  

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button