মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

‘রাস্তা কারো বাপের সম্পত্তি নয়!’

ট্র‍্যাফিক নিয়ম না মেনেই রাস্তায় চলছে গাড়ি। হেলমেট মাথায় না পরেই নিয়মের অতিরিক্ত যাত্রী পেছনে তুলে কেউ চালাচ্ছেন মোটরসাইকেল, কোথাওবা ড্রাইভারের সিটবেল্ট নেই, আবার কোথাও হয়তো চালক জেনে-বুঝেই গাড়ি ঢুকিয়ে দিয়েছেন উল্টো পথে, যাতে অসৎ উপায়ে হলেও একটু তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। এসবে যে নিজের বা অন্যের বিপদ ঘটতে পারে, সেটা জানলেও তোয়াক্কা করছেন না কেউ, কখনও করেনও না।

তবে দায়িত্ব পালনের জন্যে ট্রাফিক পুলিশ তো আছেন, তাকে দেখে ঠিকই সমীহ করতে হয়। তেলতেলে একটা হাসি দিয়ে তিনি এগিয়ে আসেন সেই ট্রাফিক সার্জেন্ট, জানতে চান রাস্তায় ট্রাফিক আইন অমান্যকারীর বাবার পরিচয়। হাসিঠাট্টার ফাঁকে তাকে মনে করিয়ে দেন, রাস্তা কারো বাপ-দাদার সম্পত্তি নয় যে যার যেমন খুশী সেভাবে চলতে পারবে। সাদা ইউনিফর্ম পরিহিত এই ট্রাফিক পুলিশের পরিচয়, তিনি বলিউড সুপারস্টার অক্ষয় কুমার! 

অক্ষয় কুমার, নিরাপদ সড়ক চাই, ছাত্র আন্দোলন, ট্রাফিক পুলিশ

ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে ট্রাফিক সচেতনতা বাড়ানোর জন্যে বানানো তিনটি বিজ্ঞাপনে এভাবেই রাস্তায় নেমে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে অক্ষয়কে। নিজের ফেসবুক পেজ আর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে থেকে এই তিনটি ভিডিও শেয়ার দিয়েছেন অক্ষয় কুমার। সেসব ভিডিওতে আর তার দেয়া ‘রোড কিসি কি বাপ কা নেহি’ সংলাপটা তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

প্রথমটিতে দেখা যাচ্ছে, ‘নো এন্ট্রি’ লেন লেখা রাস্তায় ঢুকে পড়েছে একটা প্রাইভেট কার। অক্ষয় সেটি থামিয়ে চালককে কিছু কথা বলে সবশেষে শুনিয়ে দিচ্ছেন, ‘এটা ‘আপনার বাবার রাস্তা নয়!’ আরেক ভিডিওতে হেলমেট ছাড়া দুই তরুণীকে নিয়ে মোটরসাইকেল চালাতে থাকা এক তরুণকে থামিয়েছেন অক্ষয়। ভিডিও তিনটি ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করে ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘পুরোপুরি না হওয়ার চেয়ে দেরিতে হওয়া অনেক ভালো। সরি বলার চেয়ে নিরাপদে থাকাই শ্রেয়। নিজের ও অন্যের নিরাপত্তার জন্য ট্রাফিক আইন মেনে চলুন। কারণ সড়কটা কারও বাবার নয়।’

মূলত ভারতের নিরাপদ সড়ক প্রচারণার অংশ হিসেবে তৈরি হয়েছে এই বিজ্ঞাপনগুলো। ‘সড়ক সুরক্ষা জীবন রক্ষা’- এই স্লোগানকে সামনে রেখে দেশটির নিরাপদ সড়ক সপ্তাহের প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন ৫০ বছর বয়সী এই অভিনেতা। এমনিতেই বলিউড অভিনেতাদের মধ্যে সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে অক্ষয়ের অংশগ্রহণ অন্যান্যদের চেয়ে অনেক বেশি। নিজ উদ্যোগে অজস্র মেয়েকে সেলফ ডিফেন্স শিখিয়েছেন তিনি, সীমান্তে জঙ্গী হামলায় নিহত বা আহত সেনাদের জন্যেও কাজ করছেন অক্ষয়। ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে এবার তিনি নেমে এসেছেন রাস্তায়, তৈরি করেছেন সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন, আর নিজেও ট্রাফিক সার্জেন্টের পোষাক পরে কয়েক ঘন্টা একটানা দায়িত্ব পালন করেছেন মু্ম্বাইয়ের রাস্তায়। 

অক্ষয় কুমার, নিরাপদ সড়ক চাই, ছাত্র আন্দোলন, ট্রাফিক পুলিশ

কাজটা ভীষণ উপভোগ করেছেন অক্ষয় কুমার, টুইটারে তিনি লিখেছেন- ‘সড়ক নিরাপত্তা প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে ভীষণ সম্মানিত বোধ করছি। সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এ আন্দোলনে আমিও যোগ দিয়েছি। আশা করি, এ উদ্যোগ মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনবে। তাছাড়া আমরা আশা করি, এটা সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে আর মূল্যবান অনেক জীবন রক্ষা করতে সাহায্য করবে।’

মুম্বাই থেকে এবার একটু বাংলাদেশে ফিরি। কয়েকদিন আগেও নিরাপদ সড়কের দাবীতে আন্দোলন করেছিল ঢাকা শহরের কলেজপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা। রাজপথের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ্যব্যবস্থার ভার নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিল বাংলাদেশের সতেরো-আঠারো বছরের ছেলেমেয়েরা। রাজধানীর কূর্মিটোলায় জাবালে নূর পরিবহনের একটা বাসের চাপায় কলেজপড়ুয়া দুই ছাত্র-ছাত্রী রাজীব আর মীম নিহত হয়েছিলেন গতমাসে। সেই ঘটনার পরপরই ক্ষুব্ধ সহপাঠীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল নিরাপদ সড়কের দাবীতে, বাংলাদেশ দেখেছিল একদমই অন্যরকম একটা গণ আন্দোলন। 

ছাত্রদের আন্দোলন শেষ হয়েছে, তারা ফিরে গেছে ঘরে। কিন্ত একটা বড়সড় ধাক্কা তারা দিয়ে গেছে আমাদের। প্রশ্ন হচ্ছে, সর্বমহলে প্রশংসিত হওয়া ছাত্রদের এই দাবী বা আন্দোলনের ফলে কতটুকু পরিবর্তন এসেছে আমাদের মধ্যে? ট্রাফিক সপ্তাহ পালিত হয়েছে, ট্রাফিক পুলিশ কাউকে রাস্তায় আইন অমান্য করতে দেখলেই মামলা দিয়েছে। মামলার সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। মোটরসাইকেলগুলোতে এখন চালক আর আরোহী, দুজনের মাথায়ই হেলমেটের দেখা মেলে। বেশিরভাগ ড্রাইভারও নিয়ম মেনে সঠিক কাগজপত্র সঙ্গে রেখেই গাড়ি চালাচ্ছেন, বিআরটিএ’র সামনে লাইসেন্স নবায়নের জন্যে দীর্ঘ লাইনের খবর তো পত্রিকাতেই এসেছে। কিন্ত সবার মধ্যে কি সচেতনতাটা এসেছে ঠিকমতো? 

অক্ষয় কুমার, নিরাপদ সড়ক চাই, ছাত্র আন্দোলন, ট্রাফিক পুলিশ

এখনও অনেকে সুযোগ পেলেই রং লাইনে গাড়ি ঢুকিয়ে দিচ্ছে, ফুটপাতের ওপর উঠিয়ে দিচ্ছে মোটরসাইকেল। এখনও কোথাও কোথাও লেনদেনের বিনিময়ে ফিটনেসবিহীন বাস ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ আসছে, লেন মেনে চলছে না রিক্সাও। সময় বাঁচানোর জন্যে ফুট ওভারব্রীজে না উঠে রাস্তার ওপর দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে অজস্র মানুষ। এজন্যেই কি ছোট ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নেমে এসেছিল? তাদের এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে যদি আইন মেনে চলা না হয়, তাহলে সেই সমর্থনের মূল্য কি রইলো? 

দিন দুয়েক আগে রাজধানীতে ট্রাফিক আইন মানার ব্যাপারে ট্রাফিক পুলিশদের সাহায্য করছিল স্কাউট সদস্যেরা। সাধারণ মানুষকে ফুট ওভারব্রীজ ব্যবহারের অনুরোধ জানাচ্ছিলেন তারা, নিষেধ করছিলেন রাস্তার মাঝখান দিয়ে পার হতে। কিন্ত কে শোনে কার কথা! এদেশের প্রায় সবাই তো নবাবের বংশধর, স্কাউট সদস্যদের পাত্তা দেয়ার সময় কি আছে কারো কাছে? কয়েকজনকে রাস্তার মাঝখান থেকে ফিরিয়ে আনতে তো প্রায় ধস্তাধস্তি করতে হয়েছে স্কাউটের সদস্যদের, সেগুলোর ছবি এসেছে পত্রপত্রিকায়। আইন অমান্যকারী মানুষগুলোর মুখের ভাব দেখলে মনে হয়- আমার খুশী আমি রাস্তার মাঝখান দিয়ে যাবো, তাতে কার বাপের কি? তাদের জন্যেই অক্ষয় কুমার বলে গেছেন সচেতনতামূলক ভিডিওতে- ‘রাস্তা কারো বাপের সম্পত্তি নয়!’ 

আইন আছে আমাদের দেশে, আইনের প্রয়োগ নেই। অনুরোধ করে, বুঝিয়ে শুনিয়ে আমাদের আইন মানানো যায় না, সেটার যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে সবাইকে। অক্ষয় কুমার প্রতিদিন রাস্তায় নামবেন না, ছাত্ররা প্রতিমাসে আন্দোলন করবেন না, স্কাউট সদস্যরাও প্রতিদিন কাউকে বোঝাবেন না। আজ ফুট ওভারব্রীব ব্যবহার না করলে জরিমানার ব্যবস্থা করা হোক, কাল বাদে পরশু ঠিকই সবাই লাইন ধরে ওভারব্রীজে উঠে যাবে। এটাই নিয়ম, এমনটাই হয়। আর সেকারণেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ থাকাটা খুব জরুরী, জরুরী মানুষের মধ্যে সচেতনতাবোধ জাগ্রত হওয়াটাও। এই দুটো মিলেই বদলে দিতে পারে পরিচিত দৃশ্যটা। 

ছবি কৃতজ্ঞতা- বিডিনিউজ২৪ ডটকম।

অক্ষয় কুমারের ট্রাফিক সচেতনতামূলক ভিডিওগুলোর একটি দেখুন এখানে- 

Traffic Safety : Ad 3

Follow traffic rules for your own and others safety kyunki road kisi ke baap ki nahi hai. #SadakSurakshaJeevanRaksha

Posted by Akshay Kumar on Monday, August 13, 2018

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button