রিডিং রুমলেখালেখি

আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি…

আখতারুজ্জামান আজাদ, স্রোতের বিপরীতে হেঁটে চলা এক মানুষ। বাংলা সাহিত্যে তরুণ কথাশিল্পীদের মতো তাকে ভীষণরকম সব্যসাচী লেখক মনে হয়। একাধারে তিনি কবিতা লিখেন, রাজনৈতিক স্যাটায়ার লিখেন, প্রবন্ধ লিখেন, ছড়া এবং গদ্যতেও তার মুন্সিয়ানা। তবে তাকে সবচেয়ে ভালভাবে ব্যখ্যা করতে হলে বলতে হয়, তিনি সময়ের সাহসী একজন লেখক যিনি অবলীলায় কলম ধরতে পারেন কাউকে তোয়াজ না করে৷ তিনি শৃঙ্খলে আবদ্ধ পরাধীনতায় নিজেকে বন্দী করে রাখতে চাননি কখনো, লেখকদের বিবিধ দলাদলি, বই বিক্রি নিয়ে মিথ্যা বলাবলিতেও তাকে শামিল হতে দেখা যায় না। তার মধ্যে গদগদ ভাবটা একেবারেই নেই, বিনয়ের অপ্রয়োজনীয় বাহুল্যে তিনি নিজের মুখোশ ঝুলিয়ে চলেন না।

তিনি নিজের বিশ্বাসের কথা, নিজের পর্যবেক্ষণ খোলামেলা ভাবে প্রকাশ করতে পছন্দ করেন। ফলে, অনেকেই তার উপর বিরক্ত, অনেকেই তার বক্তব্যে বিমর্ষ হয় স্বাভাবিকভাবেই। একারণে হয়ত, তিনি কোনো পক্ষের মিত্র হতে পারেননি সেই অর্থে৷ প্রিয় হতে পারেননি, কারণ প্রিয় হওয়ার জন্য যে চলমান তোষামোদ জারি রাখতে হয় সেই বলয়ে তিনি থাকেন না। একজন আখতারুজ্জামান আজাদ কারো আনুকল্য ছাড়াই শুধুর লেখার শক্তির উপর ভর করে যে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, এই বাংলাদেশে তার কতটুকু মূল্যায়ন হচ্ছে, হবে জানি না। তবে এই লোকটি নিশ্চিতভাবে আরো বেশি আলোচনায় এবং পাঠকের বই কেনার বাকেট লিস্টে আসবার দাবিদার।

আখতারুজ্জামান আজাদ

বয়সে তরুণ হলেও লেখক হিসেবে আখতারুজ্জামান আজাদকে প্রায়ই বিভিন্ন মতালম্বীদের আক্রোশের শিকার হতে হয়, নিজের মত প্রকাশের জন্যে। তার বাংলা নামের পরিচিত ফেসবুক আইডিটি প্রায়ই অসহিষ্ণু মানুষদের রিপোর্টের মুখে দীর্ঘদিনের জন্য অচল করে দেয় ফেসবুক কতৃপক্ষ। তবুও আখতারুজ্জামান আজাদ লিখে যান সময়ের দলিল৷ লেখক হিসেবে চামড়া যদি আরেকটু মোটা থাকত তার, চোখ যদি আরেকটু বন্ধ রাখতে পারতেন, দেশ নিয়ে যদি একটু কম ভাবতেন, রাজনৈতিক সচেতনতার নামে অচেতন হয়ে পড়ে না থাকতেন তাহলে হয়ত সকলের চোখেই প্রিয় হতেন তিনি৷

কিন্তু, লেখার নেশা আর বিবেকের তাড়না খুব ভয়ংকর। তিনি একবার স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, “লেখার নেশা যাদেরকে একবার ধরেছে, শব্দের চোরাবালিতে যারা একবার ডুবেছে, ছন্দের আগুনে যারা একবার পুড়েছে, জীবন আর জীবিকাকে তুচ্ছ করে পাখির পুচ্ছে যারা একবার সৌন্দর্য দেখেছে; ঐ ঘোর থেকে তারা আর মুক্তি পায়নি, ঐ দোর ভেঙে তারা আর বেরোতে পারেনি, ঐ গোর থেকে তারা আর ফিরতে পারেনি। ধান্দাবাজের ধিক্কার, চামচিকার চিৎকার আর শুয়োরের শীৎকারকে উপেক্ষা তারা আমৃত্যু লিখতে থাকেন নির্লজ্জের মতো।”

আমৃত্যুই লিখবেন তিনি সেই আশা রাখি। কিন্তু, এখন যে হারে কথিত লেখকদের বই প্রকাশ বাড়ছে, তাতে আখতারুজ্জামান আজাদের মতো লেখকদেরকে আলাদা করে কিভাবে চেনানো সম্ভব? বই প্রকাশ আজকাল সোশ্যাল স্ট্যাটাসের বিষয়। এই শখের লেখকদের ভীড়ে মেধাবী লেখকদের বইগুলো ন্যায্য এটেনশন থেকে বঞ্চিত থাকে৷ আখতারুজ্জামান আজাদও খানিকটা বিরক্ত এই ধরণের সংস্কৃতির উপর। তার বক্তব্য এই প্রসঙ্গে, “বই প্রকাশ এখন এক প্রকারের প্রেস্টিজ ইশু হয়ে দাঁড়িয়েছে। অমুকে বই লিখেছে, অতএব আমারও একখানা লিখতে হবে! আমার একটি বাড়ি আছে, দেড়টি গাড়ি আছে, আড়াইটি নারী আছে, অতএব আমারও একটি বই থাকতে হবে — হোক সেটা রান্নাবিষয়ক বা কান্নাবিষয়ক বই, প্রাথমিক বা মাধ্যমিক চিকিত্সার বই, নিদেনপক্ষে ‘কী করিলে কী হয়’-টাইপের বই!”

আখতারুজ্জামান আজাদকে সবচেয়ে বেশি মানুষ চেনে কবি হিসেবে। এই বছরও ‘এই যে আমায় আগুন দ্যাখো’ নামক একটি কবিতার বই এসেছে তার। তিনি কবিতায় প্রেমের কথা, দ্রোহের কথা বলেন আবার ব্যঙ্গ বিদ্রুপও এসেছে তার কবিতায়। সহজবোধ্য অথচ শক্তিশালী ভাষা কিংবা বিষয়ের কারণেই হয়ত তার কবিতা এতখানি জনপ্রিয়৷ যদিও কবিদের তিনি কখনো পছন্দ করতেন না। ভাবতেন কবিরাই সবচেয়ে কম উৎপাদনশীল প্রাণী, যারা অলস কিংবা খেয়ে দেয়ে যাদের কাজ নেই৷ কিন্তু, প্রথম প্রেমে দুঃখ পেয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন কবিতা, গানে এমন কিছু আছে যা মানুষের ক্লান্তি দূর করে দিতে পারে, অবসাদে বিলীন হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে, নিঃসঙ্গ মনের শূন্যস্থানগুলো পূরণ করে কবিতা৷

আখতারুজ্জামান আজাদ

প্রেমিক একজন নারীকে ভালবাসতে পারে, ঘৃণা করতে পারে অথবা তাকে উপজীব্য করে শিল্প চর্চা করতে পারে এরকম একটি কথা শুনেছিলেন আখতারুজ্জামান আজাদ। সেইসময় তিনি হেলাল হাফিজ পড়তেন, রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ পড়তেন, সঞ্জীব চৌধুরীর গান শুনতেন। তার মনে হতো, তিনি তাদের মতো না হোক কাছাকাছি মানেরও কিছু রচনা করে দেখবেন। এর আগে তিনি রাজনৈতিক স্যাটায়ার লিখেছেন, গল্প লিখেছেন। সুতরাং, তার লেখার ক্ষমতা তো আছেই। তিনি লিখতে শুরু করলেন কবিতা, সেই কবিতাই তার সঙ্গী হলো যাকে তিনি একদিন খারিজ করে দিতে চেয়েছিলেন আঁতলামো বলে।

যাইহোক, ২০১০ সালের দিকে নিজেই কবিতার বই প্রকাশ করেন। সেটা এক অদ্ভুত ঘটনা। বই কিভাবে প্রকাশ করতে হয়, প্রকাশকদের কিভাবে ধরতে হয়, কি চুক্তি কিভাবে করতে হয় কিছুই জানতেন না তিনি। তখন কেউ তাকে চেনে না, কে প্রকাশ করবে বই এমন আশঙ্কা তো ছিলই। নীলক্ষেত থেকে নিজেই বই ২০০ কপি ফটোকপি করলেন, বাঁধাই করলেন, মলাটবন্দি করলেন৷ সেবছর মেলায় পাঁচ টাকা কমিশন দেয়ার বিনিময়ে এক স্টলে বইগুলো তিনি রাখেন। বইয়ের মূল্য ছিল ৫০ টাকা৷ একদিন ছড়াকার, মেধাবী মানুষ অনিক খানের সাথে বইমেলায় পরিচয় হলো তার।

অনিক খান তখন রেডিও শো করতেন। তিনি আজাদকে সেই শো’তে ডাকলেন এবং আখতারুজ্জামান আজাদের কবিতা পাঠ করে সবাইকে বললেন, আমার বই আপনারা কিনেন না কিনেন, এই তরুণ ছেলেটির বই অবশ্যই কিনবেন! অনিক খান অতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন এক ‘অখ্যাত’ অচেনা তরুণ কবি আখতারুজ্জামান আজাদের কবিতায়৷ তারপর আখতারুজ্জামান আজাদের বই বেশ ভাল চললো বলে স্টলের কর্তৃপক্ষ আজাদকে না জানিয়ে বই ৫৫/৬০ টাকায় বিক্রি করতে থাকলো। আখতারুজ্জামান আজাদ এই বিষয়ে প্রতিবাদ জানালে সেই স্টলে আর বই রাখা গেল না। তাকে প্রত্যাহার করে নিতে হলো বই৷

এই যে বই নিয়ে শুরুতেই এমন নাটকীয়তা, এই সংগ্রাম এখনো চলমান। পেজ, আইডি সব মিলিয়ে লক্ষাধিক ফলোয়ার থাকা সত্ত্বেও বই বিক্রির খতিয়ান এখনো সন্তোষজনক নয়। অথচ ফেসবুকের পাঠকদের ‘লুতুপুতু’ ভাব কম থাকে না। বই নিয়ে হাজারো প্রশ্ন, কিন্তু কেনার বেলায় তাদের কাউকেই দেখা যায় না। কোনো কোনো লেখকরা বিক্রি, মুদ্রণ এসব নিয়ে লুকাছাপা করলেও আখতারুজ্জামান আজাদ এটিও খোলামেলাভাবেই প্রকাশ করে দিয়েছেন সবার সামনে, “আমার বইপ্রকাশের এক দশকের ইতিহাসে এক মেলায় আমার বই সর্বাধিক বিক্রি হয়েছে ২০১৮ সালে— নয়শো কপি। দ্বিতীয় সর্বাধিক ২০১৭ সালে— সাড়ে ছয়শো কপি। কুরিয়ার মিলিয়ে ২০১৮ সালে আমার বইয়ের বিক্রি ১২০০ ছাড়িয়েছিল। এক লাখের একশো ভাগের এক ভাগ হচ্ছে এক হাজার। অদ্যাবধি কোনো মেলায়ই আমার বই এক হাজার কপি বিক্রি হয়নি (কুরিয়ার বাদ দিলে)। অর্থাৎ অর্ধেক বা পঞ্চাশ শতাংশ দূরে থাক, এক শতাংশ ফ্রেন্ড-ফলোয়ারও বই কেনেন না!”

আখতারুজ্জামান আজাদ

অথচ, আশানুরূপ যদি বই বিক্রি হতো, বইয়ের মান অনুযায়ী প্রত্যাশার পারদ ছোঁয়া আলোচনায় থাকত বইগুলো তাহলে একজন আখতারুজ্জামান আজাদ শুধু নিশ্চিন্তে লিখে যেতে পারতেন অন্য কোনো চিন্তা না করেই। পরিবারের কাছেও সম্মানজনক অবস্থান বজায় থাকত। আমাদের সমাজ বাস্তবতা মৃত জীবনানন্দ যতটা পছন্দ করে, জীবিত কবিদের ঠিক ততটাই এড়িয়ে যায়। দরকার পড়লে ভিন্ন কথা।

কবিকে দিয়ে মাগনা দুই লাইন লিখিয়ে নিতে পারলেই হলো, কবি বাঁচলো কি মরলো সেটা পরের হিসাব। মরে গেলে ইন্না-লিল্লাহ পড়ে ‘কবিদের মরণ নেই’, কিংবা ‘ওপারে ভাল থাকবেন কবি’ বললেই সম্মান দেখানো হয়ে যায়৷ আখতারুজ্জামান আজাদ অল্প কিছু লাইনে এই সমাজ বাস্তবতাকে এঁকেছেন তার ‘লক্ষ্য আমার পক্ষ নেয়া’ বইতে, “মানুষ মৃত কবিকে মরণোত্তর দেবতা করে রাখলেও জীবিত কবিকে বরদাশত করা দুঃসাধ্যই বটে। মেলায় কবির অটোগ্রাফ-ফটোগ্রাফ নেওয়া আনন্দের, কবির সাথে ঘর করা নিরানন্দের। স্বামী হিশেবে কবি অথর্ব, পুত্র হিশেবে কবি অধম, ভাই হিশেবে কবি অপাঙক্তেয়। সাময়িক সঙ্গী হিশেবে উপভোগ্য হলেও জীবনসঙ্গী হিশেবে তথা বিয়ের হাটে কবি নিতান্তই অচল মাল। কোনো মা-ও চান না— তার গর্ভে কবি নামক কোনো প্রাণী জন্ম নিক।”

আখতারুজ্জামান আজাদ পত্রিকায় লেখা দিতে চান না কারণ, পত্রিকার সম্পাদকরা লেখার সম্পাদনার নামে লেখার চেহারাই বদলে দেন। তিনি প্রকাশকের মাধ্যমে বই প্রকাশ করে প্রতারিত হয়েছেন বলে নিজে নিজে বই প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন সময়। এমনও হয়েছে নিজের ঘাড়ে করে বইয়ের স্তুপ বয়ে নিয়ে গেছেন স্টলে৷ লেখক হিসেবে তার এই সংগ্রামের জায়গাকে সম্মান জানাই৷ তিনি কারো প্রিয় হতেন পারেননি, ঠিক তার লেখা কবিতাটির মতো। কবিতায় লিখেছেন,

“…আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি!
তোষামুদে-জন প্রিয় হয় সবার, পৃথিবীর পরিহাসে;
তোষামোদ নেই রন্ধ্রে আমার— লিখে রেখো ইতিহাসে!”

সবার প্রিয় হতে হবে না। তোষামোদকারীরা বর্তমানে প্রিয় হয়, এই সাময়িক প্রিয় প্রিয় খেলায় আখতারুজ্জামান আজাদকে না থাকলেও চলবে। পৃথিবীর পরিহাস হয়ে বেঁচে থাকতে চায় যারা, থাকুক তারা। আখতারুজ্জামান আজাদ যে পথের পথিক, সেই পথে তিনি পরিহাস নয়, একদিন ইতিহাস গড়বেন সেই প্রত্যাশা।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button