অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্য

সরকারী চাকরির পরীক্ষা নিয়ে ভীতি? তবে এই মানুষটাকে দেখুন!

আখন্দ স্বরুপ, যিনি একবাক্যে শুরুতেই স্বীকার করে নিয়েছেন, পড়ালেখায় কখনোই তার মন বসেনি। কিন্তু, এক বিশেষ ঘটনা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই ঘটনায় তিনি এতোটাই বদলে গেলেন যে, প্রায় সবগুলো সরকারি চাকুরির পরীক্ষায় তিনি উর্ত্তীণ হয়ে দেখিয়েছেন। ভারতবর্ষের সবচেয়ে জটিল, কঠিন এবং প্রেস্টিজিয়াস পাবলিক চাকরির পরীক্ষা ইউপিএসসি (ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন) যেটা কিনা আমাদের দেশের বিসিএস পরীক্ষার মতো সেটাতে উতরে গেছেন, এর সাথে সাথে পাস করেছেন আরো আটটি সরকারি চাকুরির পরীক্ষাও!

যেখানে, আজকাল দেখা যায় ছেলেমেয়েরা একাডেমিক পড়ালেখাকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দিয়ে চাকরির পড়ালেখার প্রস্তুতি শুরু করে অনেক আগে থেকে, তবুও নিশ্চয়তা থাকে না চাকরি হবে কি হবে না, সেখানে আখন্দ স্বরুপ কোন জাদুবলে এতোগুলো সরকারি চাকরির পরীক্ষায় টিকে গেলেন?

আখন্দ স্বরুপ ছিলেন এভারেজ মানের ছাত্র। পড়ালেখা পছন্দ করার কোনো কারণ খুঁজে পেতেন না। বরং ঘৃণাই করতেন একপ্রকার৷ পড়ালেখাতে কখনো আনন্দ খুঁজে পাননি। যদিও অন্য সবার মতো তারও আকাশকুসুম স্বপ্ন ছিল। তিনি বলেন, “আমরা অনেক কিছুই কল্পনা করতে ভালবাসি। এটা করব, ওটা করব। আমাদের সবারই আইডিয়া আছে। কিন্তু, যখন বাস্তবায়নের ব্যাপারটা সামনে চলে আসে, তখন ঠিকই বোঝা যায় চিন্তা করা আর চিন্তা বাস্তবায়নের মধ্যে অনেক তফাত।”

 

আখন্দ স্বরুপ, Akhand Swaroop Pandit, চাকুরী পরীক্ষা

চিন্তাগুলোকে কখনোই তার বাস্তবে রুপ দেয়া হতো না যদি না এই ঘটনাটি ঘটত। তখন তিনি পড়তেন কলেজে। একদিন তার বন্ধুদের সাথে কলেজে বসে আড্ডা মারছিলেন। এমনই সময় একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে আখন্দের কাছে একটা ফোনকল আসলো। ওপাশে যিনি কথা বলছিলেন তিনি বললেন, “স্যার আপনার নাম্বারটা আমি একজনের ফোনের কললিস্ট থেকে পেয়েছি। যার ফোন থেকে আপনার নাম্বার পেয়েছি তিনি একটা এক্সিডেন্ট করেছেন! তার অবস্থা গুরুতর এবং সাথে যে ড্রাইভার ছিল সে মারা গেছে অলরেডি। আপনি যেখানেই থাকুন, দ্রুত আসুন।”

এই আচমকা ফোন কলে আখন্দ মারাত্মক শকড হলেন। তিনি বুঝতে পারছেন না কিভাবে কি হয়ে গেল। কিন্তু, সেই অপরিচিত নাম্বারের ওপাশে থাকা লোকটার কথা শুনে বুঝতে পারলেন, যার কথা বলা হচ্ছে সে তার বাবা। আখন্দের বাবাই এক্সিডেন্ট করে গুরুতর অবস্থায় পড়ে আছে। আখন্দের অবস্থায় তখন পাগলপ্রায়! কি করবেন এই পরিস্থিতিতে কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। কারণ, তার বাবা যেখানে এক্সিডেন্ট করেছে সেটা এখান থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে। এতো দূরে কিভাবে পৌঁছাবেন? এখন না পাওয়া যাবে বাস, না ট্রেইন। আখন্দ দৌড়ালেন৷ যা সামনে পাচ্ছেন তাতেই উঠে পড়ছেন। বাস, অটো যা কিছু পাওয়া যাচ্ছে তাতে করেই বাবার কাছে ছুটে চললেন।

এই জার্নিটা আখন্দের জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ জার্নি। কারণ, এই পুরো সময়টায় আখন্দ তার বাবার সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি। কি আপডেট কিছুই জানতে পারছিলেন না। ভয়াবহ দুশ্চিন্তার মধ্যে তাকে থাকতে হয়েছে। যখন তিনি এই দূর্গম যাত্রার শেষে পৌঁছালেন তিনি তখনও অসহায়। জীবন এমনভাবে কাটিয়েছেন যে এসব মুহুর্তে কি করতে হয়, কার কাছে সাহায্য চাইতে হয় কিছুই জানতেন না তিনি। এতোটা হেল্পলেস লাগছিল তার তখন। হাসপাতালের খরচ জমে গিয়েছিল অনেক। এই খরচটাও কোনোরকমে সামাল দিতে হয়েছে, ভুলভাল বলে।

যাইহোক, এই অবস্থার উন্নতি হয়, আখন্দের বাবা সুস্থ হন ধীরে ধীরে। কিন্তু, আখন্দকে এই পুরো ব্যাপারটা নাড়া দেয়। তিনি তার যাপিত জীবন সম্পর্কে ভাবতে শুরু করেন। নিজেকে বদলানোর কথা ভাবেন। তিনি এমন জীবন চান, যখন এরকম অবস্থায় আবার পড়লে তাকে এতোটা হেল্পলেস না হতে হয়। এমন জীবন তিনি চান, যে বাবা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে এই দুশ্চিন্তা নিয়ে তাকে এরকম খারাপ জার্নি আরেকটা না করতে হয়। বাবার টেককেয়ার করার জন্য কি কি করতে হবে সেটা নিয়েও যেন এরকম অসহায় অবস্থায় পড়তে না হয়। বুঝতে পারলেন, জীবন বদলানো দরকার। তবে এটাও উপলব্ধি করলেন, শুধু উপলব্ধি করলেই জীবন বদলায় না। তিনি বুঝলেন, চাওয়া পাওয়ার মাঝখানে তফাত অনেক। চিন্তাভাবনাকে বাস্তবায়ন করাটা মূল চ্যালেঞ্জ।

আখন্দ স্বরুপ, Akhand Swaroop Pandit, চাকুরী পরীক্ষা

তখন তার মনে হলো, পড়ালেখা করবেন এখন থেকে। পড়া শুরুও করলেন এবং এরপর তিনি ইউপিএসসি পরীক্ষা সম্পর্কে জানতে পারলেন। জানলেন, এটাতে উর্ত্তীণ হলে ক্ষমতা, সম্মান সব কিছুই পাওয়া যায়। তিনি তাই পড়া শুরু করলেন কিন্তু সেটা গোছানো কিছু না। তিনি জানতেন না কোন জায়গা থেকে পড়বেন, কি পড়বেন। তার উপর প্রায়ই এমন আচমকা বিপদ এসে পড়ে যে জীবনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়, হতাশা এসে পড়ে। জিম ট্রেইনার হিসেবে একটা চাকরি ছিল তার। পড়ালেখার জন্য এই চাকরিটাও ছেড়ে দিলেন। তার বদলে টিউশন নিলেন। তার মনে হলো, কাউকে পড়ালে নিজের পড়াও হবে, পড়াগুলো রিভিশনও হয়ে যাবে। পরিবারকেও কিছু সাহায্য করা হবে। প্রত্যেক সপ্তাহে নিজ শহরের বাইরে গিয়ে তিনি কোচিং করাতেন। কিন্তু হোটেল রুমে থাকার পয়সা থাকত না বলে থাকতেন স্টেশনে।

এইভাবে চলছিল রুটিন। পড়া, টিউশন। একঘেয়েমি জীবন৷ কখনো অতিষ্ঠ লাগত। মনে হতো আর পারবেন না এভাবে চালিয়ে যেতে। কিন্তু তারপরই নিজেকে বোঝাতেন, “যদি আমি আজকের এই হতাশার সাথে জিততে না পারি, এই সমস্যা, হতাশাকে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে দেই, তাহলে এই হতাশা কাল আমাকে হারিয়ে দেবে।” তিনি নিজেকে বোঝান এবং আবার পড়তে শুরু করেন, তার চোখের সামনে নিজের পরিবারের অসহায় অবস্থার সেই পুরাতন দৃশ্য ভাসে। ওমনটা আবারও হোক, চান না তিনি। এবার তাদের স্বস্তি দিতে চান৷

এখন তার মনে হয় ব্যর্থতা, হতাশা এগুলো জীবনে থাকবেই। এগুলো ছাড়া সাফল্য পানশে, এগুলো না থাকলে আনন্দগুলোকে ভালভাবে উপভোগ করা যায় না। এগুলো না থাকলে সেই বোধটাই হয় না যে আমরা কিছু অর্জন করতে যাচ্ছি। তাই জীবনের একটা লক্ষ্যে যেতে হলে এই ইমোশনাল স্টেটগুলোর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এগুলোর সাথে লড়াই করতে হয়।

তার মতে, বড় বড় লক্ষ্য ঠিক না করে প্রত্যেকদিনের ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করা উচিত। সারা বই পড়ে ফেলবেন এই ব্যাপারটা ভাবতে ভাল লাগে কিন্তু পড়া শুরু করলে দুই পাতা পড়েই মনে হবে ওরে খোদা, এখনো কত পড়া। না হবে না পড়ালেখা। কারণ, তখন মাথায় ঘুরে এটার শেষ পাতা পর্যন্ত আপনাকে যেতে হবে। এটাই ভুল। মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিন, শেষ কি হবে। আজকের জন্য দুই পাতা পড়াই লক্ষ্য ঠিক রাখুন। সেটাই ভাল ভাবে শেষ করুন। ছোট ছোট লক্ষ্য পূরণ আমাদের আত্মবিশ্বাস যোগায়, আর বড় লক্ষ্যে ছোট হোঁচট খেলেই আমরা ছোট হোঁচটে বড় আঘাত পাই।

আরেকটি ব্যাপার তিনি উল্লেখ করেছেন, আপনি যা কিছুই অর্জন করতে চান তার পেছনের কারণ খুঁজে বের করুন। একেকজন একেকটা কারণে নির্দিষ্ট কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয়। অন্যরাও সরকারি চাকরি করছে বলেই আপনার মনে হয়েছে আপনারও করতে হবে, তা নয়। আপনি আপনার মোটিভেশনের পেছনে কারণটা খুঁজে বের করুন। যদি কারণটা আপনাকে নাড়া না দেয়, তাহলে যেই মোটিভেশন নিয়ে কাজ শুরু করবেন সেই উদ্যম ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।

আখন্দ স্বরুপ, Akhand Swaroop Pandit, চাকুরী পরীক্ষা

আখন্দ স্বরুপ যে কটি সরকারি পরীক্ষা দিয়েছেন দুইটাতে তিনি প্রথম র‍্যাংক পেয়েছেন, বাকিগুলোতে তিনি প্রথম দশজনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন। সবশেষে তিনি ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় সরকারি চাকরির পরীক্ষা ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনেও র‍্যাংক পেয়েছেন ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে। তার গল্প আসলে সফলভাবে সরকারি চাকরিতে বাজিমাত করার রেসিপি না, এই গল্পটা চিন্তা বদলের গল্প। একজন খারাপ ছাত্রও ভাল কিছু করতে পারে, যদি ভিতর থেকে তাগিদ অনুভব করে। তারজন্য নিজের চিন্তা বদলাতে হয়। সেটা নিজের জীবনের সাথেই নিজের বর্তমান অবস্থা দিয়ে বিচার করে ঠিক করতে হয়। চিন্তা বদলে ফেলে কাজেও সেই ছাপ রাখতে হয়৷ তবেই না কিছু পাওয়ার আশা। আখন্দ স্বরুপ আসলে নিজেকেই খুঁজে পেয়েছেন তার সেই দুঃসহ যাত্রা অতিক্রম করে।

তার নিজের একটা ভাবনা দিয়েই শেষ করছি লেখাটি-

“And one thing that I’ve always felt that nothing can ever fail you, unless and until you fixate yourself on failure you declare to yourself, that you have failed.
You have to work hard continuously anytime, anywhere you might face failure, you will feel embarrassed, you will feel broken. But just accept that failure and rebound quickly, you will be at the top finally.”

আরও পড়ুন-

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button