মতামত

আজকের ডিল, একটি শাওয়ার ও ১৮৯০ টাকার বিশাল একটা ফুটো!

অনলাইনে ‘আজকের ডিল ডটকম’ থেকে একটা গরম পানির শাওয়ার কিনেছি। আসলে অর্ডার দিয়েছিলাম তীব্র শীতের মধ্যেই, কিন্তু জিনিসটা আমার কাছে পৌছাতে পৌছাতে গরমের দিন এসে পড়েছে। কিন্তু কিনেছিই যখন, ফিটিং তো করতেই হবে। ডাক দিলাম এলাকার এক এক্সপার্ট আংকেলকে। তিনি অনেকক্ষণ গম্ভীর মুখে জিনিসপত্র নেড়েচেড়ে বললেন, “কোন ঘরে লাগাইবা”?

বিরক্ত হয়ে বললাম, বাথরুমে। গোসলের জন্য। তো তিনি বাথরুমে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিলেন। আমি তো অবাক! পরে বুঝলাম তার ছোটটা…

এখানে বলে রাখি, অর্ডার করার সময় জিনিসটার দাম ছিলো ১৩৯৫ টাকা। কিন্তু রিসিভ করার সময় ডেলিভারি ম্যান বললো এটার দাম ১৪০৫ টাকা, আর ৫৫ টাকা ডেলিভারি চার্জ। অর্থাৎ মোট খরচ হলো ১৪০৫+৫৫=১৪৬০ টাকা।

তারপর কানেকশনের জন্য কারেন্টের তার কিনলাম ১০০ টাকার। খরচ হল ১৪৬০+১০০=১৫৬০ টাকা। যেই বিক্রেতা থেকে কিনেছি, সে ভালোভাবেই বলে দিয়েছিল, ৭০/৪২ তার দিয়ে সংযোগ দিবেন, আর্থিং কানেকশন অবশ্যই লাগাবেন, আর লাইন নিবেন একেবারে মেইন সুইচ থেকে। কারণ এটা ৫৩০০ ওয়াটের প্রোডাক্ট।

যেখানে একটা দেড় টনের এসি খায় ১৫৫০ ওয়াটের মত বিদ্যুৎ, সেখানে এই ছোটখাটো শাওয়ার কঞ্জুম করে ৫৩০০ ওয়াট। ভাবতে পারছেন? কিন্তু গিজার কেনার টাকা নাই, তাই এটাই নিলাম। আর বিদ্যুৎ বিল তো আর আমি দেই না, দেয় আমার বাবা। তাই টেনশন কী? খরচ কিছু কমাতে আমি বাজারের সবচেয়ে কম দামী তারগুলার একটা কিনে আনলাম। আর্থিং তার বা হেভি সুইচ কোনটাই কিনলাম না। ভাবলাম এগুলো দিয়ে আর কি হবে?

মেইন সুইচ থেকে লাইন নেওয়ার কথা থাকলেও আমি আংকেলকে লাইন দিতে বললাম বাথরুমের লাইটের বোর্ড থেকে। লাইন দেওয়া হলো। পুরাতন লোহার শাওয়ার খুলে এটা যখন লাগাতে যাবে, তখন দেখি লোহার পাইপের মাপ আর শাওয়ারের পাইপের মাপ এক্কেবারে সেম টু সেম। অর্থাৎ একটা মধ্যে আরেকটা কোনভাবেই ঢুকবে না। আংকেল বললেন একটা সিপিভিসি জয়েনার কিনে নিয়ে আসো।

আমি পাইপের ছবি টবি তুলে ভালোমত প্রিপারেশন নিয়েই গেলাম। কিন্তু দোকানে গিয়ে দেখি জয়েনার আছে দুইটা, একটা ১ ইঞ্চি, আরেকটা হাফ ইঞ্চি। কনফিউশনে পড়ে গেলাম- কোনটা নিব। দোকানদার আমার তোলা ছবি দেখে বললো এক ইঞ্চিরটাই নেন, এটাই ঠিক আছে। নিয়ে আসলাম ১ ইঞ্চির সিপিভিসি পাইপ জয়েনার। দাম নিলো ৪৫ টাকা। অর্থাৎ মোট খরচ দাঁড়ালো ১৫৬০+৪৫=১৬০৫ টাকা।

কিন্তু বাসায় আসার পর তো আমার আক্কেলগুড়ুম। লোহার পাইপ সোজা সিপিভিসি পাইপের ভেতর দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে। বুঝলাম ভুল জিনিস কিনেছি, হাফ ইঞ্চিরটা লাগবে। আবার গেলাম দোকানে। হাফ ইঞ্চিরটা নেওয়ার পর দোকানদার ১০ টাকা ফেরত দিয়ে দিলো। অর্থাৎ সর্বমোট খরচ গিয়ে দাঁড়ালো ১৬০৫-১০=১৫৯৫ টাকা।

তারপর লাগানো হলো হট শাওয়ার। ফেজ আর নিউট্রালের কানেকশন দেওয়া হলো। পানি ছাড়া হলো। কিন্তু শাওয়ারের ফুটা দিয়ে পানি কোনভাবেই বের হয় না। ফোঁটা ফোঁটা করে পড়ে। এবার ছোটবোনের কাছ থেকে খাতা সেলানোর যন্ত্রটা নিয়ে প্লাস্টিকের শাওয়ারের ফুটাগুলো বড় করার চেষ্টা করলাম। দীর্ঘ আধাঘণ্টার চেষ্টায় ৫টা ফুটা সফলভাবে পানি ঝরার মত করে বড় করতে সমর্থ হলাম। হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি আসলো, খাতা সেলানোর ভোড়টা আগুনে গরম করে নিলে কেমন হয়?

যেই ভাবা সেই কাজ। করলাম গরম, এবার খুব সহজেই ৫ মিনিটের মধ্যে বাকি ফুটাগুলো বড় হয়ে গেলো। আবার লাগানো হলো শাওয়ার। কিন্তু দেখা গেলো সব পানি হ্যান্ড শাওয়ারের ফুটা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। ফুটার মধ্যে একটা কাপড় গুঁজে দিলাম। তাতে কাজ হলো। কিন্তু পানি বের হলো একেবারে বরফশীতল।

শাওয়ারটা খুলে কাছের একটা ইলেকট্রিক দোকানে নিয়ে গেলাম। ম্যাকানিক দেখে বললো সুইচে গণ্ডগোল আছে। কালকে এসে নিয়ে যাইয়েন। সুইচ ঠিক করতে খরচ গেলো ১০০ টাকা। নতুন জিনিস হওয়ার পরেও রিটার্ন দিলাম না। রিটার্ন করতে সেই ১০০ টাকা কুরিয়ার খরচ তো যাবেই, তার উপর ১ মাসেও আমি টাকা ফেরত পাবো নাকি সন্দেহ আছে। তো সুইচ ঠিক করে মোট খরচ দাঁড়ালো ১৫৯৫+১০০=১৬৯৫ টাকা।

দোকান থেকে শাওয়ার নিয়ে এসে এক্সপার্ট আংকেলকে কয়েকবার ফোন দিলাম। তিনি ফোন ধরলেন না। বুঝলাম ঘাপলা আছে, মাগনা কাজ করতে চাচ্ছেন না হয়তও। অগত্যা আমি নিজেই কানেকশন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যেহেতু ছোটবেলা থেকে কারেন্টের সুইচ পালটানো থেকে শুরু করে বাসার ছোটখাটো কাজ নিজেই করে আসছি, তাই সামান্য একটা শাওয়ার কানেকশন দিতে পারবো না, এটা কেমন কথা?

ঠিক করলাম আর্থিং লাইনসহই কানেকশন দিবো। নাহলে কোনদিন কারেন্ট লিক করে পানির সাথে আটকে ঝুলে থাকি কে জানে? যেহেতু আর্থিং জাস্ট লিক হওয়া ইলেক্ট্রিসিটি মাটিতে পৌঁছে দেয়, তাই একটা তারই যথেষ্ট। কিন্তু সুইচ বোর্ড খুলে কোথাও আর্থিং তারের কোন গন্ধই পেলাম না। অথচ আমি স্পষ্ট দেখেছি মেইন সুইচের বোর্ডে সবুজ রঙের আর্থিং তার কানেকশন দেওয়া আছে। অর্থাৎ বাসার কোথাও না কোথাও আর্থিং সংযোগ থাকতেই হবে। তো একটা একটা করে সব বোর্ড খোলা শুরু করলাম, কোথাও কোন আর্থিং তার পেলাম না।

অবশেষে দীর্ঘ এক দিন পর এক বারান্দার চিপার মধ্যে এক থ্রিপিন বোর্ডে আর্থিং সংযোগ খুঁজে পেলাম। কোন ইঞ্জিনিয়ার বিল্ডিংয়ের ওয়ারিং প্ল্যান করেছেন, সেটাই ভাবলাম কিছুক্ষণ। এবার পালা প্রায় ৩০ ফুট দূর থেকে এই সংযোগ বাথরুমে নিয়ে আসার। তার কেনার ঝামেলায় গেলাম না। বাসায় যত খোলা তার আছে, সব স্কচটেপ দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে ৩০ ফুট লম্বা বানালাম। কিন্তু সারা বাসায় তার তো এভাবে ঝুলিয়ে রাখা যাবে না।

আবার গেলাম দোকানে, ওয়ালের সাথে তার লাগানোর পিন কিনলাম ১৫ টাকার। খরচ এই পর্যায়ে এসে দাঁড়ালো ১৬৯৫+১৫=১৭১০ টাকায়। বিসমিল্লাহ্ বলে দিলাম কানেকশন। ঝিরঝির করে গরম পানি পড়তে শুরু করলো। আমি তো মহাখুশি। গামছা আনতে গেলাম গোসল করার জন্য। কিন্তু যেই বাথরুমে ঢুকবো, ফুস করে বাথরুমের ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলো। অথচ ঘরে তখনও লাইট জ্বলতেসে।

মেইন সুইচের ঢাকনা খুলে দেখি সার্কিট ব্রেকার পড়ে গেছে। দিলাম তুলে। আবার চালু করলাম শাওয়ার। ঠিক ৩০ সেকেন্ড পর আবারও সার্কিট ব্রেকার পড়ে গেলো। এই পর্যায়ে এসে আমার মত ধৈর্যশীল মানুষেরও হাল ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম হলো । মনে মনে ভাবলাম, তবে কি এই জন্মে আর গোসল করতে পারবো না?

শরণাপন্ন হলাম গুগল আর ফেসবুকের। ফেসবুকে এক গ্রুপ থেকে ভালোই সাহায্য পেলাম। একজন ক্যালকুলেট করে জানালেন ৫৩০০ ওয়াটের জন্য আমার নূন্যতম ৩০ এম্পিয়ারের সার্কিট ব্রেকার ইউজ করতে হবে। তো আবার বাজারে গিয়ে ১৮০ টাকা দিয়ে এনার্জিপ্যাক ব্রান্ডের ৩২ এম্পিয়ার সার্কিট ব্রেকার কিনে আনলাম। (৩০ এম্পিয়ার পাওয়া যায় না)। খরচ গিয়ে দাঁড়ালো ১৭১০+১৮০=১৮৯০ টাকায়।

ইউটিউবের ভিডিও দেখে নিজেই সেট করে ফেললাম নতুন ব্রেকার। কাজ হলো। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে আমি ৫৩০০ ওয়াটের ইলেকট্রিক হট ওয়াটার শাওয়ার দিয়ে গোসল করতে সমর্থ হলাম। বিশ্বাস করেন আর না-ই করেন, আম্মু জানালো আমি নাকি দীর্ঘ ১ মাস ১৪ দিন পর গোসল করেছি।

পরিশিষ্টঃ এই শাওয়ারটার দাম দেওয়ার কথা ছিল আম্মুর। কিন্তু আম্মুর কাছে এই মুহূর্তে টাকা না থাকায় পুরো ব্যয়ভার আমাকেই বহন করতে হয়েছে। এটা দিয়ে গোসল করে শরীরের ময়লা হয়ত কিছুটা দূর হয়েছে। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা অনলাইন শপিংয়ের ব্যাপারে ধারণা কিছুটা হলেও পালটে দিয়েছে। আর রেখে গেছে বুক পকেটে ১৮৯০ টাকার বিশাল একটা ফুটো। সবাইকে বাসায় এসে গরম পানি দিয়ে গোসল করার দাওয়াত রইলো। ভয় নেই। আমাদের বাসায় কোথাও কোন হিডেন ক্যামেরা নাই।

ভুক্তভোগী লেখক- মুহাম্মদ ইশরাক

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button