রিডিং রুমলেখালেখি

একটি কান্নার শেষ কিংবা ব্যাখ্যাতীত কিছুর শুরু…

মার্চের দশ তারিখে রহস্যময় চিঠি আসল। দূরের চিঠি। খামে পোস্ট অফিসের সিল নেই। চিঠি এসেছে হাতেহাতে। হাতেহাতে আসার কারণ হতে পারে, প্রেরক চান নি আমি তার পরিচয় জেনে যাই অথবা চিঠির গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য হাতেহাতে আনা হয়েছে। চিঠির কথা মোটামুটি এরকম-

প্রীতিনিলয়েষু প্রফেসর,
স্নেহাষ্পদ ভালবাসা নিও। সমাচার- কেমন আছ?
আমাকে চিনিবে না। আমি একজন নগন্য স্কুল শিক্ষক। নিতান্ত বাধ্য হইয়া এতটুকু পরিচয় প্রদান করিলাম। আমার ব্যাপারে বিচলিত হইবার প্রয়োজন নাই। বরং আমি যাহা আলোকপাত করিব, তাহাতে বিচলিত হইলে আমি মর্মশূল বেদনা হইতে কিঞ্চিত মুক্তি লাভ করিব।
বিচলিত হইবার কারণ উন্মুক্ত করি।

আজিজুল ইসলামের বাড়িতে প্রতি সোমবার একজন মধ্যবয়স্ক লোককে প্রবেশ করিতে দেখি। তিনি হতদরিদ্র। ছিন্ন বসন। তাহার কাঁধভর্তি নারকেলের ঝাঁকি। তিনি বেশ আগ্রহ লইয়া এবং আনন্দচিত্তে বাড়িতে প্রবেশ করিলেও বের হইবার সময় নিম্নস্বরে ক্রন্দন করেন। ব্যাপারটি আমার চক্ষু এড়ায় না। তাহাকে ভারাক্রান্ত মনে হয়। হন্টনের সময় উদভ্রান্ত হইয়া যান। পায়ের সহিত পা লাগিয়া হোঁচট খান। আমি দুঃখিত নয়নে তাহার প্রস্থান অবলোকন করি।

আজিজুল ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত বলিবার মত কিছু নাই। উনি বিশাল বাড়িতে একাকী কালাতিপাত করিতেছেন। তাহাকে তেমন একটা বের হইতে দেখা যায় না। শেষবার বের হইবার পর তিনি প্রতিটা বাড়িতে একবার করিয়া প্রবেশ করিয়াছেন। বিদায় লইলাম বলিয়া সবার কাছে দোয়া প্রার্থণা করিয়াছেন। আমার দৃঢ় ধারণা তিনি বিদেশে পলাইয়া যাইতেছেন। ইহাতে সমস্যা হইল, একজন অপরাধী পলাইবেন কিন্তু অপরাধের সুরাহা হইবে না তাহা নিয়া আমি বিচলিত।

আমি নিতান্তই মূর্খ মানব। তোমার মত বিস্তর ব্যাখ্যা করিয়া হেতু উদঘাটন করিতে পারিব না। আমার মস্তিষ্কে যুক্তির অংশটুকু কাজ না করিলেও অযৌক্তিক অংশ বেশ কাজ করে। আমার ধারণা এই কান্নারত দরিদ্র মানুষটি বেশ বড় ধরনের বিপদে পড়িয়াছেন। আজিজুল ইসলাম তাহাকে বিপদ দ্বারা আষ্টেপৃষ্টে জড়াইয়া ফেলিয়াছেন।

বিনীত নিবেদন এই যে, হতদরিদ্র লোকটিকে বিপদ হইতে উদ্ধার করিবার সকল ব্যবস্থা তোমাকেই করিতে হইবে। কি বিপদ ও কেন বিপদে পড়িয়াছেন তাহার কোন কূলকিনারা করিতে পারিলে আমি আনন্দিত হইব। প্রতি সোমবার দুপুর আমি দরিদ্র মানুষটিকে দেখিয়া কিঞ্চিত কান্নাকাটি করি। মঙ্গলময় ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা করি- ঈশ্বর তাহাকে বিপদমুক্ত করুন। আজকের কথাবার্তার সমাপ্তি টানা হইল। যথাসময়ে দ্বিতীয় পত্রখানি দিয়া যোগাযোগ রক্ষা করিব।

ইতি,
আশির্বাদক
‘বেনামী’

পুনশ্চঃ ‘বেনামী’ শব্দখানা ব্যবহার করিয়া ব্যাপক আনন্দ পাইয়াছি। আমি নিজের নাম কখনো মিথ্যা বলি না। আবার সত্য বলিলে ব্যাপারটিতে উলটপালট ঘটিয়া যাইতে পারে। তাই সত্য নামটিও গোপন করিলাম।

পুনঃপুনশ্চঃ আজিজুল ইসলাম নামটিও মিথ্যা। অন্যের সত্য নাম বলিতে অবশ্য বাঁধা নাই। তবে মিথ্যা বলিবার পেছনে উদ্দেশ্য সৎ। আমি আপনাকে কোন ধরনের ‘সুরুক’ দিতে চাই না। আপনি অধ্যাপক মানুষ। জ্ঞানবানও বটে। নিজ প্রচেষ্ঠায় খোঁজ করুন।

পুনঃপুনঃপুনশ্চঃ সুরুক শব্দের অর্থ ‘রহস্যের সূত্র’। আজিজুল হক মিথ্যা নামধারী মানুষটির বাড়ি শিমুলবাগ, রংপুর।
প্রথম ও শেষ সুরুক উন্মুক্ত করিলাম।

নাতিক্ষুদ্র চিঠি। চিঠিতে কালো ছোপছোপ ময়লা। ময়লার উৎস কী? কলমের কালি নয়, অন্য কিছু। দানা দানা হয়ে আছে। এই ছোপ কীভাবে আসল বোঝা যাচ্ছে না। চিঠির বক্তব্য দূর্বল বাক্যে লেখা। রহস্য ধরে রেখে লেখার চেষ্টা করা হয়েছে। চিঠি পড়ার পর আমার প্রাথমিক দায়িত্ব হল ছিড়ে কুটিকুটি করে ঝুঁড়িতে ফেলা। এই পৃথিবী বিস্তর সমস্যায় জর্জরিত। একজন নগন্য মানুষের কান্নার রহস্য উদঘাটন করার মত সময় আমার হাতে নেই।

রহস্য উদঘাটনের পক্ষে কিছু যৌক্তিকতা থাকতে হয়, যা দেখে ছুটে গিয়ে সমাধান করে অসীম আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়। এই চিঠিকে সেই শ্রেণিতে ফেলানো যাচ্ছে না। প্রেরক নাম উল্লেখ করেন নি। কেন ও কী জন্য রহস্য উদঘাটন করতে হবে এর পেছনে কোন যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারেন নি। আমি চিঠি মুড়ে ঝুড়িতে ফেললাম।

রাতে কাঁঠাল পাকা গরম পড়ল। ইলেকট্রিসিটি নেই। ড্রয়ারে মোমবাতি ছিল। নতুন প্যাকেট। দুদিন আগে কেনা। অন্ধকারে হাতড়েও কোন মোমবাতি পাওয়া গেল না। গরমের কারণে ঘুমানো যাচ্ছে না। সারারাত এপিঠ-ওপিঠ করে শেষরাতে চোখভরে ঘুম নামল। ক্লান্তিময় শুরীরে স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্ন যুক্তির ব্যাপার কিন্তু স্বপ্নের বিষয়বস্তু যুক্তিহীন, উদ্ভট। আগা নেই, গোড়া নেই। বিষয়বস্তু ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাচ্ছে। প্রথমে শুনতে পেলাম চাপা কান্নার শব্দ। পুরুষের গলা। কিছুক্ষনপর গলার স্বর বদলে গেল। ছোট মেয়ের গলার মত। সোফির গলার সাথে বেশ মিল আছে। এরপর স্বপ্নক্ষেত্রে সোফি প্রবেশ করল। সোফির বর্তমান বয়স সতের। তরুনী। তাকে সতের বছরের মত লাগছে না। চার বছর বয়সের খুকির মত লাগছে। চুল দুদিকে বেনী করা। মাঝঝানে সিঁথিকাটা। খালি পা। একটা হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,

‘কেমন আছ সোফি?’
‘ভাল আছি বাবা।’
‘ভাল থাকলে কাঁদছ কেন গো মা?’
‘আমি কাঁদছি না বাবা।’
‘তাহলে কে কাঁদছে?’
‘ঐ লোকটা।’
‘ঐ লোকটা কোথায়?’
‘জানি না বাবা।’
‘ঐ লোক দেখতে কেমন?’
‘সে দেখতে ভালো। মাথায় নারকেল।’
‘তার মাথায় নারকেল কেন?’
‘জানি না বাবা।’
সোফি কথা বলা বন্ধ করল। এখন পা দুলিয়ে গুনগুন করে গান ভাঁজছে। আমি তার দুটো হাত ধরলাম। সে বলল,‘ঠাণ্ডা লাগছে বাবা।’
‘কাঁথা আছে। গায়ে দিয়ে দিই?’
‘দাও।’

আমি কাঁথা খুঁজছি। পাচ্ছি না। বাক্স খুললাম, ড্রয়ার খুঁজলাম। কোথাও নেই। স্বপ্নক্ষেত্র ঘনঘন বদলে যাচ্ছে। বসার ঘরে চেয়ারে সোফি বসে ছিল। সে এখন সেখানে নেই। আমি দরজা খুলে বারান্দায় বের হলাম। স্বপ্নক্ষেত্রে আকস্মিক পটপরিবর্তন ঘটল। আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি বালুচরে। চারদিকে বিশাল নারকেল গাছ। গাছভর্তি নারকেল। প্রচণ্ড বাতাস উঠল। নারকেল দুলছে। নারকেল গাছের পাতা দুলছে। পাতায় হাওয়া কেটে শিরশির করে বাজনা বাজছে। চাপা কান্নার মত বাজনা। কান্না ছাপিয়ে ঝড় উঠল। সাথে শীতল বাতাস। আমি জেগে গেলাম।

বৃষ্টি নেমেছে। গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টি। এরা একা আসে না। সাথে তুলকালাম ঝড় নিয়ে আসে। তখন এদের নাম কালবৈশাখী। জানালা খোলা ছিল। পাল্লা দড়াম দড়াম করে আওয়াজ করছে। বাতাসের ঝাঁপটায় ভেতরে জল ঢুকছে। আমি জানালা বন্ধ করলাম। মোমবাতি খুঁজতে গিয়ে সিগারেট পাওয়া গেল। বেনসন এণ্ড হেজেস। ভরা প্যাকেট। প্যাকেটের পাশে দেশলাই।
সিগারেট পানসে লাগছে। চা করতে পারলে ভাল হত। চা পাতা আছে কিন্তু চিনি নেই। চিনি থাকলেও চা করা যেত না। কারেন্ট চলে গেছে। ঝড়ের রাতে চুলা ধরানোর মত শক্তি অবশিষ্ট নেই।

বৃষ্টি খানিকটা বাড়ল। চেয়ার টেনে বারান্দায় বসলাম। ঝড় রুদ্রমূর্তি। পানির ঝাপটা এসে পা ভেজাচ্ছে। বড় আনন্দময় পরিবেশ। আনন্দময় পরিবেশে নিজেকে কর্মহীন লাগছে। খনায় আছে, ‘বসিয়া থাকিও না, বেগারে খাটিও।’ আমি বেগার খাটার জন্য ময়লার ঝুড়ি থেকে প্রেরকবিহীন চিঠি তুলে নিলাম।

চিঠির বিশেষত্ত্ব হালকা। হালকা বিশেষত্ত্বের চিঠিতে প্রথম পাঠে কোন তথ্য পাওয়া যাবে না। শুধু সারমর্ম পরিষ্কার হবে। দ্বিতীয়বার পড়লে লুকোনো তথ্য চোখে পড়তে পারে। দু’বার পড়লাম। তেমন গুরুত্বপূর্ন কিছু পেলাম না। প্রেরক বড় যত্ন নিয়ে লিখতে চেষ্টা করছে। এক কলমে না লিখে চিঠিতে দুটো কলম ব্যবহার করা। কালো ও লাল। মূল চিঠি লেখা কালো কালিতে। ‘পুনশ্চ’ শব্দগুলো লাল কালি। চিঠির পাতা বেশ দামী। এক ধরণের সুগন্ধি মাখানো। শুকলে মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়। চিঠির উপরের কোনায় বলপয়েন্টে একটা চোখের ছবি আঁকা। চমৎকার শিল্পকর্ম। চোখভরা বিষাদ। মাত্রাতিরিক্ত বিষাদে চোখ জলে ছলছল করছে কিন্তু গড়িয়ে পড়ছে না। পড়বে পড়বে অবস্থা। অতিমাত্রায় নিখুঁত ছবি।

চিঠিতে বিশেষ কোন তথ্য স্পষ্ট করে বলা নেই। শেষদিকে শুধু একবার বলা হয়েছে- শিমুলবাগ, রংপুর। সুবিশাল সাগরে খড়কুটো ধরে বাঁচার মত তথ্যহীন চিঠিতে এই তথ্যকে সত্য হিসেবে ধরা হল। শিমুলবাগ, রংপুর হল তথ্যবিহীন চিঠির খড়কুটো। চিঠির দিকে তাকালে বেশ কিছু ব্যাপার খটকা লাগে। বড় যত্ন করে লেখা হয়েছে প্রত্যেকটা শব্দ। প্রতিটা বর্ণের উপর মাত্রা ঠিকঠাক বসানো। স্কেল টেনে বাক্য সোজা রাখা হয়েছে। আলোর দিকে তীর্যকভাবে চিঠিটা ধরলে কাগজে বেশ কিছু সরলরেখার মত ভাজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত সাদা চিঠিতে স্কেল রেখে নখ দিয়ে দাগ দিয়ে সেই বরাবর বাক্যগুলো লেখা। ‘পুনশ্চ’ শব্দগুলো লাল রঙে লেখা। চিঠির কোনায় চোখের ছবি। ধারালো চোখ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মেয়ের চোখ। ফরেনসিক গ্রাফোলজি অনুযায়ী চিঠিকে ব্যবচ্ছেদ করলে কিছু তথ্য বের করা সম্ভব। একটা নোটখাতা নিয়ে লিখলামঃ

কেইস নম্বরঃ ৫৭

প্রাথমিক আলামতঃ চিঠি
মাধ্যমঃ কাগজ (হস্তলিখন)
যোগাযোগঃ হাতে হাতে

১। প্রেরকের নামঃ চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা নেই। নামের ব্যাপারে প্রেরক কোন ধরণের সুত্র দেবার চেষ্টা করেননি।
২। লিঙ্গঃ স্ত্রী।
যুক্তিঃ সুগন্ধিযুক্ত দামী পাতা, দুই কালিতে লেখা, লেখায় মাত্রাতিরিক্ত যত্ন, বাক্যগুলোকে স্কেল টেনে সোজা করা। এসকল কাজ একজন পুরুষের ক্ষেত্রে অসম্ভব। তাদের চিঠি হবে ব্যাড়াছ্যাড়া টাইপ। কোনমতে লিখতে পারলে হল। স্কেল টেনে লাইন সোজা করার সময় তারা পাবে না। পুনশ্চতে প্রেরক বেশ কৌশলে নাম না বলার কারণটি বলেছে। নাম উল্লেখ করলে অনেককিছু উলটপালট হতে পারে। অনুমান করা যায়, নাম বললে স্পষ্ট হত সেটি কোন পুরুষ স্কুল শিক্ষকের নাম নয়, একজন মহিলার নাম।

৩। বয়সঃ বিশ থেকে ছাব্বিশের মাঝে।
যুক্তিঃ বিশ থেকে ছাব্বিশের মধ্যে আবেগ প্রকট থাকে। যুক্তিহীন আবেগ। একজন হতদরিদ্র লোক আজিজুল ইসলাম সাহেবের বাসা থেকে বের হয়ে কাঁদছে, তা একজন পুর্ণবয়স্ক মানুষের বিচলিত করবার মত যথেষ্ট শক্তিশালী কারণ নয়। রাস্তার মানুষের কান্না দেখে বিচলিত হবে অল্পবয়স্ক তরুনীরা। সুসজ্জিত চিঠি, ভিন্ন রঙের কালি, চিঠির কোনায় সৌন্দর্যবর্ধন টাইপের চোখের ছবি দেখে সহজেই অনুমান করা যায় তা একজন অল্পবয়স্ক সৌখিন তরুনীর কাজ। ছাব্বিশ পেরোনো নারীরা বাস্ত্বববাদী হয়। চিঠি লিখেই কাজ শেষ। বর্ণ সাজানো বা কোনায় ছবি আঁকার মত যথেষ্ট সময় তাদের হাতে নেই। তবে অবিবাহিত হলে ভিন্ন কথা। অল্পবয়সী তরুনীদের মধ্যে মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেবার প্রবণতা থাকে। চিঠিতে ‘তুমি’ সম্বোধন করে সে আমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।

৪। পেশাঃ বেকার। পড়াশোনা করছে না। স্থায়ীভাবে বাড়িতে অবস্থান করছে। কোন অবস্থাতেই স্কুল শিক্ষকতা নয়।
যুক্তিঃ একজন স্কুল শিক্ষক অফিশিয়াল সময় দশটা থেকে দুটো। এসময় তিনি স্কুলে থাকেন। সোমবার সরকারী ছুটি নেই। কর্মব্যস্ত দিন। প্রতি সোমবার দুপুরে একজন হতদরিদ্র মানুষের কান্না অবলোকন করতে হলে স্কুলে নয়, থাকতে হবে বাড়িতে। নিজের ব্যালকনিতে।

৫। শারীরিক বর্ণনাঃ শারীরিক ভাবে মারাত্মক কোন ত্রুটি আছে।
যুক্তিঃ একজন তরুনী পড়ালেখার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে না। প্রতি সোমবার বাড়িতে থাকছে। একটি বিশেষ মুহুর্ত অবলোকন করছে। আন্দাজে বলা যায়, সে শারীরিকভাবে মারাত্মক ত্রুটিসম্পন্ন। পঙ্গু টাইপের কিছু একটা। সে ব্যালকনীতে বসে থাকে। তার হাতে অফুরন্ত সময়। সে অবলোকন করে, হতদরিদ্রের কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, দীর্ঘ সময় নিয়ে চিঠি লেখে।

৬। আজিজুল ইসলামঃ আজিজুল ইসলাম সম্পর্কে স্বেচ্ছায় অস্পষ্টতা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে যে তথ্যগুলোকে সঠিক ধরা যায় তা হলঃ আজিজুল ইসলাম জীবিত। একা মানুষ। বড় বাসায় থাকেন। আজিজুল ইসলাম সাহেব বলেছেন- ‘বিদায় লইলাম’। এই দুই শব্দে তিনি কি বুঝিয়েছেন? যে ব্যক্তি অপরাধ করে পালিয়ে যাবেন, তিনি জনে জনে বলে বেড়াবেন না। দুই শব্দের আক্ষরিক অর্থ কী হতে পারে? (বড় রহস্য। লাল কালিতে মার্কিং করা হল)

৭। চিঠিতে কালো ছোপ ছোপ ময়লার রহস্যঃ চিঠি নাকে শুকলে মৃদ্যু সুগন্ধ নাকে আসে। সুগন্ধ আসছে কাগজ থেকে ময়লা থেকে নয়। গন্ধহীন ময়লা কী হতে পারে? আপাতত ব্যাপারটা অস্পষ্ট থাকুক।

মানবজীবন বিচিত্র। একটি দীর্ঘসময় কেটে যায় অর্থহীন কাজকর্মের পেছনে। শিশুবয়সে খেলনা নিয়ে নাড়াচাড়া করা, কৈশোরে স্বপ্ন দেখা, যৌবনে বিপরীত লিঙ্গের ব্যাপারে অস্থিরতা ও বার্ধক্যে মৃত্যুচিন্তা হল অর্থহীন কাজকর্মের উদাহরণ। মার্চের দশ তারিখের চিঠি নিয়ে বিচলিত হবার ব্যাপারটিও আমার কাছে অর্থহীন। আমি অর্থহীন ব্যাপারটিকে বেশ গুরুত্বের সাথে নিলাম। এগারো তারিখ সন্ধ্যায় বিস্মিত হয়ে লক্ষ করলাম, আমি রংপুর শিমুলবাগের এক নির্জন গলিতে দাঁড়িয়ে আছি।
আমার বর্তমান লক্ষ আজিজুল সাহেবের বাসা খুঁজে বের করা। ব্যাপারটি খুব একটা কঠিন নয়। রহস্য উদঘাটন করতে হলে প্রতিটা তথ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে সবকিছু যেন গোছানো হয়। একটার পর আরেকটা আসে।
আমার প্রথম কাজ পত্রপ্রেরকের বাসা সনাক্ত করা।

পত্রপ্রেরক তরুণী গৃহবন্দী। তার দিনের একটি দীর্ঘ সময় ব্যালকনীতে কাটে। সেখানে বসে সবকিছু পর্যবেক্ষন করে। যেহেতু তার চিঠি সাজানোগোছানো, তার ব্যালকনীও হবে সাজানোগোছানো। দুয়েকটা লতানো ফুলগাছ থাকবে, বসার জন্য বেতের চেয়ার টাইপের কিছু থাকবে। ব্যালকনী হবে রাস্তার দিকে। ব্যালকনী খুব উঁচু হবে না। একতলাও হবে না, তিনতলার বেশীও হবে না। যৌক্তিক কারণ হল, উঁচু দালানের একতলা অধিকাংশ সময় পাঁচিল ঘেরা থাকে। পাঁচিলের জন্য বাইরে দেখা অসম্ভব। চারতলা বেশি উঁচু হয়ে যায়। সেখান থেকে গলিতে হেটে যাওয়া কোন মানুষের কান্নাভেজা চোখ বা চাপা কান্না বোঝা দুষ্কর। ব্যালকনী হবে দুই বা তিন তলা। শিমুলবাগের গলি ধরে এমন বৈশিষ্ট্যের পাঁচটা সাজানো ব্যালকনী পাওয়া গেল।

এবার সুনির্দিষ্ট একটাকে আলাদা করতে হবে। ব্যালকনী থেকে পত্রপ্রেরক তরুণী আজিজুল সাহেবের বাড়ির গেট পর্যবেক্ষন করে। বাড়িটা হবে ব্যালকনীর বিপরীতে। আজিজুল হক বাড়িতে একা থাকেন। বিশাল বাড়ি। একা মানুষের বিশাল বাড়ি।

বাড়ি পাওয়া গেল। পত্রপ্রেরক তরুনী পুনঃপুনশ্চতে বলেছিল, আজিজুল ইসলাম নামটি মিথ্যা। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল, পুনঃপুনশ্চটিও মিথ্যা ছিল। পত্রপ্রেরক সজ্ঞানে একটি প্যারাডক্স তৈরি করবার চেষ্টা করেছে। মিথ্যায় মিথ্যা কাটা। বাড়ির গেটে আক্ষরিক শব্দে লেখা- Aziz’s Territory. মাপা দশহাত দূরে থাকুন।

একতলা বাড়ি। ব্রিটিশ চুনসুড়কির পাঁচিল। পাঁচিলে বড়বড় কয়েকটা ফাটল। ফাটলে বটগাছের চারা গঁজিয়েছে। ধারণা করা যায়, প্রাচীন হিন্দু জমিদারের কাছ থেকে কেনা বাড়ি। আজিজ সাহেব পেয়েছেন উত্তরধিকারসূত্রে। পাঁচিলের উপর দিয়ে প্রাচীন তুলসী গাছের পাতার ঝাড় দেখা যাচ্ছে। দেয়ালে কলিং বেল। সুইচ ঝুলে আছে। বেল চাপার দশ মিনিটের মাথায় একজন অল্পবয়স্ক যুবক বের হল। অতিকায় দর্শন। ছয়ফুটের মত লম্বা। কাঁধ পর্যন্ত চুল। মুখে চাপদাড়ি। দাড়িতে চপচপ করে তেল দেওয়া। ঘন করে তেল দেওয়া দাড়ি এইপ্রথম দেখা গেল। যুবকের চোখে সুরমা। সুরমা চমৎকার মানিয়েছে। যুবক আমাকে দেখে হেসে বলল,

‘আপনি প্রফেসর নাজিব?’
‘জ্বী।’
‘ভেতরে আসুন। স্যার আপনার অপেক্ষায় বসে আছেন।’
‘উনি জানতেন আমি আসব?’
‘আমি জানি না। স্যার আমাকে কিছুই বলেন না।’
আমি যুবককে হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করলাম,
‘আপনার নাম কি?
ছয়ফুটি মুখভর্তি হাসি নিয়ে বলল,
‘আমার নাম মুকুন্দ। আমি স্যারের মালসামান দেখাশোনা করি।’
‘মুকুন্দ তুমি কেমন আছ?’
‘আমি ভাল আছি স্যার।’

মুকুন্দ ভাল নেই। সে আমার সামনে সামনে হাঁটছে। আমি তাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করছি। মুকুন্দের হাঁটার ভঙ্গিমা অস্বাভাবিক। সেখানে কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা আনন্দ, কিছুটা ভয়। ত্রিমুখী অনুভূতির সহাবস্থানের কারণ বোঝা যাচ্ছে না। আজিজ সাহেব আমার অপেক্ষায় বসে আছেন, কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। তিনি ব্যস্ত ভঙ্গীতে বারান্দায় শুঁকোতে দেওয়া কাপড় তুলছেন। আমাকে দেখে চমৎকার করে হাসলেন।

‘প্রফেসর সাহেব, শরীর কেমন?’ গলার স্বর শুনে চমকে উঠলাম। ভয়াবহরকম কর্কশ। কাক যখন প্রচণ্ড অস্থির অবস্থায় কর্কশ স্বরে কা কা করে তেমন স্বর। আমি মুখভঙ্গি স্বাভাবিক রেখে বললাম, ‘এখন ভাল যাচ্ছে।’ আজিজ সাহেব বললেন, ‘আপনি বসুন। আয়েশ করুন। এরপর কথা বলা যাবে।’ আজিজ সাহেব হাতে একঝাঁক কাপড় নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।

মনুষ্য শরীর প্রচুর তথ্য দেয়। মনস্তাত্বিক রহস্য সমাধানের প্রধান গেটওয়ে হল, শারিরীক অবস্থার পর্যবেক্ষণ। শারিরীক অবস্থা থেকে মানসিক অবস্থার মোটামুটি ধারণা পেলে রহস্যের ভেতরে প্রবেশ করা সহজ হয়ে যায়। আজিজ সাহেবের শারিরীক পর্যবেক্ষন তেমন তথ্য পাওয়া গেল না। তবুও আমি মনে মনে লিখে ফেললাম,

শারিরীক অবস্থাঃ রোগাটে। বয়সকালে সুদর্শন ছিলেন। এখন স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছে।
গলার স্বরঃ অতিমাত্রায় কর্কশ
বাচনভঙ্গীঃ স্বাভাবিক।

আজিজ সাহেবের পাশের ঘরে আমাকে থাকতে দেওয়া হল। বিশাল হলরুমের মত। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,
‘এখানে কে থাকত?’ মুকুন্দ বলল, ‘আমি থাকতাম। এখন আপনি থাকবেন।’

‘মুকুন্দ।’
‘জ্বী স্যার?’
‘তুমি ভয় পাচ্ছ কেন?’
‘ভয় পাচ্ছি বুঝলেন কীভাবে?’
‘তোমার গলায় তাবিজ।’
‘তাবিজ গলায় থাকলেই ভয় পাব এমন তো নয়। ওঁঝার চিকিৎসা চলছে।’
‘চিকিৎসা টাইপের কিছু হবার সম্ভাবনা কম। তুমি বারবার তাবিজে হাত দিচ্ছ। খেয়াল রাখছ, তাবিজ আছে কি নেই। তুমি কিছু একটা নিয়ে মারাত্মক ভয় পাচ্ছ। সেটা কী?’

মুকুন্দ ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিল না। গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আমি যাই। খানাখাদ্যের ব্যবস্থা করি। এখানে সাপখোপ বেশি। খাটের তলায় কার্বলিক এসিডের বোতল আছে। ছিপি খোলা। তবুও সাবধান। আজকাল সাপ কার্বলিক পোছে না। বিছানায় উঠে কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে থাকে।’
‘এখানে সাপ আছে?’
মুকুন্দ গম্ভীর মুখে বলল,
‘জায়গাটা দেখেন। দেখলেই বুঝবেন।’

জায়গা দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে। গাঢ় অন্ধকারে যতটুকু বোঝা যায়, বাড়িভর্তি বড়বড় গাছপালা। আয়তন অনুমান করা যাচ্ছে না। রংপুরের একটি বিলাসবহুল আবাসিক এলাকায় এতবড় বন জঙ্গলওয়ালা বাড়ি আছে বোঝা মুশকিল।

রাতে আজিজ সাহেবের সাথে দেখা হল না। মুকুন্দ এসে বলল,
‘স্যার ব্যস্ত। কাল সকালে কথা বলবেন। আপনি আরাম করুন।’

রাতে খাবার ব্যবস্থা হল। আয়োজন ভালো। টেংরা মাছের ভুনা, বিলেতি আলুভর্তা। বেশি করে পেঁয়াজ দেওয়া। ভর্তা মাখা হয়েছে ঝাঁঝালো সরিষার তেলে। ভুরভুর করে গন্ধ আসছে নাকে। মুকুন্দ বলল, ‘খানা বিশেষ কিছু নেই। স্যার আমাকে আগে জানান নি।’
‘কখন জানিয়েছেন?’
‘আপনি যখন বেল দিলেন তখন। স্যার বলল- যা, প্রফেসর সাহেবরে গেট থাইকা নিয়া আয়।’
‘মুকুন্দ?’
‘জ্বি স্যার।’
‘এইসব খানা আমার পছন্দের।’
‘স্যার মাছের ঝোলটা কেমন হয়েছে?’
‘চমৎকার হয়েছে। একটু ঝালঝাল। আমি ঝাল খেতে পারি না। তবে আজ যথেষ্ট তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছি। তুমি যদি আমার পাশে বসে অল্প খানা খাও, আমি খুশি হব।’
মুকুন্দ বলল, ‘সেই অনুমতি নাই। আপনি খান। আচার আছে। টমেটোর আচার। আমি বানিয়েছি। দিব?’
‘দাও।’

মুকুন্দ বলল, ‘আপনি খেতে থাকুন। আমি দেখে আসি স্যারের কিছু লাগবে কিনা।’ মুকুন্দ আরেকবার চলে গেল।
তাকে স্বাভাবিক লাগছে না। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে পলায়নপর। কিছু একটা থেকে পালিয়ে বেড়াবার চেষ্টা করছে। কিছু একটা কী? আমি নোটখাতা খুললাম। সেখানে লিখলাম,

নামঃ মুকুন্দ
বয়সঃ বিশ অথবা বাইশ
রোগঃ ? বহু ব্যক্তিত্ব (Multiple Personality)

আমাকে যে ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছে তার বিশেষত্ব নেই। অতি আশ্চর্যজনকভাবে দেয়ালে কালো রঙ করা হয়েছে। কালো রঙ্গের দেয়াল হয় এক্স-রে রুমে। শোবার ঘরে কালো এই প্রথম দেখলাম। দেয়ালের সাদা চুনসুড়কি খসে পড়েছে কয়েকবার। রাজমিস্ত্রি এনে সংস্কার করা হয়েছে। ঘরের মাঝখানে পুরাতন খাট। সেগুন কাঠের। পাশে ছোট আলমারী। গোটাবিশেক বই সাজানো। মুকুন্দের পড়ার অভ্যাস আছে। ঘরে বিশাল সাইজের জানালা। জানালার নিচের প্রান্ত প্রায় মেঝের কাছাকাছি। সবকটা জানালা খুলে রাখা হয়েছে। যে ঘরে সাপ আসে, সে ঘরের জানালা খোলা থাকার কথা নয়।

মুকুন্দ আসল একঘন্টা পর। তাকে হাস্যোজ্বল লাগছে। আমাকে বলল,‘আপনি ঘুমোন স্যার। আমি বাইরে থাকব। বারান্দায় চৌকি পাতা আছে। কিছু লাগলে আওয়াজ দিবেন।’ আমি বললাম, বারান্দায় থাকতে হবে না। চৌকি ভেতরে ঢোকাও। কেউ আমার জন্য ঘর ছেড়ে বাইরে থাকবে সেই যন্ত্রনায় আমার রাতে ঘুম হবে না।’ মুকুন্দ কিছু বলল না।

‘মুকুন্দ, বাইরে অন্ধকার কেন?’
‘ইলেকট্রিসিটির লাইনে গণ্ডগোল। আমি সারানোর চেষ্টা করছি।’
‘ঘরে ঠিক আছে, বাইরে গণ্ডগোল? ব্যাপারটা কি?

মুকুন্দ জবাব দিল না। সন্ত্রস্ত মুখে দরজা লাগিয়ে বাইরে গেল। রাতে ঘুম হল না। ছাড়াছাড়া স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নে একটা বড়সড় সাপ আমার গায়ের উপর। নড়াচড়া করছে না। স্থির হয়ে শুয়ে আছে। কালো সাপ। গায়ে সাদা সাদা ফুটকী। আমি বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করছি। পারছি না। স্বপ্নক্ষেত্র বদলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে আছি বিশাল নারকেল গাছের নিচে। গাছের নিচে পাখি। হাজারে-বিজারে। তারা হাঁটছে। হাটার সময় খসখস করে শব্দ হচ্ছে।

ভোরবেলা আজিজ সাহেব উঠোনে বসে আছেন। তার সামনে একজন অপরিচিত লোক হাঁটু মুড়ে বসে আছে। তার চোখেমুখে মিনতি। লোকটার পাশে একছড়া নারকেল। আজিজ সাহেব চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে শুয়ে আছেন। তার পায়ে তেল মালিশ করছে মুকুন্দ। অপরিচিত লোক ধীরেধীরে হেটে বের হয়ে গেল। তার হাটার সময় দু’পা যেন ভারী হয়ে আছে। কয়েকবার পড়ে যেতে যেতেও পড়ল না। আজিজ সাহেবের সামনে কিছু খাবার রাখা। দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। পেয়াজ মরিচে মাখানো মুড়ি টাইপের কিছু একটা। আজিজ সাহেব হাত বাড়িয়ে মুড়ি খেতে চেষ্টা করলেন। গিলতে পারলেন না। বমির মত হল। মুকুন্দ পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। আজিজ সাহেব পানি খেতে চেষ্টা করলেন। পারলেন না। পানিও উগড়ে দিলেন।

মুকুন্দ আমাকে দেখে হাত নেড়ে বলল, ‘স্যার এদিকে আসেন। কড়া রোদ। মজা আছে।’ আমি এগিয়ে গেলাম। আমার জন্য চেয়ার রাখা হয়েছে উঠোনে। আজিজ সাহেব চেয়ারে হেলান দিয়ে হেসে বললেন, ‘প্রফেসর সাহেব, ঘুম কেমন হল?’
আমি হেসে বললাম, ‘ভাল হয়েছে।’ তিনি বললেন, ‘ভাল হলে ভাল। সমস্যা হল সাপখোপে ভরে গেছে বাড়ি। সেই সাপ নিয়ে পড়েছি যন্ত্রনায়। আজ একটা সাপ আপনার ঘরে ঢুকেছিল। শঙ্খচূড়। বিষধর সাপ। এর ছোবলে হাতিও মরে। মুকুন্দ পিটিয়ে মেরেছে। ঐ দেখেন।’

ডিপ্রেশন, সাইকিয়াট্রিক

আঙ্গিনায় একটা সাপ মরে পড়ে আছে। গায়ের রঙ কালো। সাদা ফুটকী গায়ে। স্বপ্নে এরকম সাপই দেখেছি। আমার বুকের উপর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে ছিল। আজিজ সাহেব সাপের ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দিলেন। পায়ের উপর পা তুলে ঝাঁকাতে শুরু করলেন। মুখে আনন্দ নিয়ে বললেন,

‘আপনি কোন রহস্য খুঁজে পেলেন?’
‘কীসের রহস্য?’
আজিজ সাহেব আয়েশী ভঙ্গিমায় হাসলেন।
‘আপনি একটা চিঠি পেয়েছেন। এক মানুষের কান্নার রহস্য উদঘাটন করতে আপনাকে অনুরোধ করা হয়েছে। ঠিক না?’
‘জ্বী ঠিক।’
আজিজ সাহেব গম্ভীরমুখে বললেন,
‘কিছুক্ষন আগে যাকে দেখলেন এ সেই মানুষ। আপনি চাইলে তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। সমস্যা হল আগামী সোমবার ছাড়া সে আসবে না। আপনার হাতে ততদিন সময় আছে?’
‘আমি নির্ভার মানুষ। হাতে অফুরন্ত সময়।’
আজিজ সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন,
‘সামান্য কান্নার রহস্য উদ্ঘাটন করতে এত দূর আসলেন। খারাপ লাগছে না?’
‘না লাগছে না। কান্না খুব সামান্য হলেও পেছনে বেশ বড় অপরাধ লুকিয়ে আছে। আমার ধারণা, আপনি বড় ধরণের অপরাধ করেছেন।’
‘কেন মনে হল বড় অপরাধ?’
‘আমার মত চিঠি আপনিও পেয়েছেন। সেখানে স্পষ্ট করে বলা আছে, প্রফেসর নাজিব আসবে রহস্য সমাধানের জন্য। ছোটখাট অপরাধ হলে আপনি গুরুত্ব দিতেন না। অস্বাভাবিক ও বড় বলেই আপনি চিঠিটাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আমি আসার আগে একটা ঘর গুছিয়ে রেখেছেন।’
‘রহস্য ধরে ফেলেছেন?’
‘না।’
‘ধরতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে?’
‘এখনো কিছু মনে হচ্ছে না। আমি দীর্ঘদিন স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী ছিলাম। ব্যাপারটা আমার জন্য যন্ত্রণাদায়ক। প্রথমবার রংপুরে এসেছি। আলো হাওয়া নিই। রহস্য সমাধানের জন্য আমার তাড়া নেই।’

আজিজ সাহেব স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় হাসলেন। প্রশ্ন করলেন,
‘এখন পর্যন্ত রহস্যের কোন অগ্রগতি নেই?’
‘তেমন কিছু নেই। চিঠিতে লেখা ছিল, আপনি সবার বাসায় গিয়ে বলেছেন ‘বিদায় লইলাম’। পত্রপ্রেরকের ধারণা আপনি বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছেন।’
‘আপনার কী ধারণা?’
‘আমার ধারণা সাধারণ। কিছুক্ষন আগে আপনি মুড়ি খেতে চেষ্টা করলেন। পারলেন না। পানি খেতে চেষ্টা করলেন। সেটাও উগড়ে দিলেন। আপনার গলার স্বাভাবিক স্বর বদলে কর্কশ হয়েছে। অন্ননালীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে এরকম হয়। আপনি বিদেশ যাচ্ছেন না। মারা যাচ্ছেন।’

আজিজ সাহেব মৃত্যুর ব্যাপারটাকে বেশ স্বাভাবিকভাবে নিলেন। কোন পরিবর্তন দেখালেন না। গম্ভীর গলায় বললেন,
‘আপনি বেশ বুদ্ধিমান। বুদ্ধিমানদের আমি পছন্দ করি। আপনার কি ধারণা আমার অপরাধের রহস্য উদঘাটন করতে পারবেন?’
‘আমি জানি না আজিজ সাহেব। আপনি বেশ স্বাভাবিকভাবে কথা বলছেন। স্বাভাবিক ব্যবহার করছেন। যে রহস্য যত স্বাভাবিক তাকে উদঘাটন করা তত সহজ। আপনাকে আত্মবিশ্বাসী লাগছে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসীরা ভুল করে বেশি। সে ভুল তাদের নিজেদের চোখে পড়ে না।’
আজিজ সাহেব হাসলেন। হাসিতে আনন্দ। তিনি গভীর আনন্দে বললেন,
‘বুদ্ধিমানদের সাথে খেলতে মজা। তুলনাহীন মজা। চলুন আমরা একটা খেলা খেলি। আপনি যদি আমার অপরাধের রহস্য উদঘাটন করতে পারেন, আমি সেই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মেনে নিব।’
‘কতদিনের মধ্যে সমাধান করতে হবে?’
‘তিন দিন।’
‘যদি না পারি?’
‘যদি না পারেন, একটা সাদা কাগজে লিখে দিবেন, আমি প্রফেসর নাজিব। আমি রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হইয়াছি। আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’
‘শর্ত তো সমান সমান হল না।’
আজিজ সাহেব বললেন, ‘অসমান শর্তে একপক্ষ অধিক আনন্দ ভোগ করবে। যেহেতু শর্তের পাল্লা আমার দিকে ভারী, এই খেলায় আমার আনন্দও বেশি। মৃত্যুর আগে আমি এই আনন্দ পেয়ে যেতে চাই। আপনি রাজি?’
আমি বললাম, ‘জ্বি রাজি।’

আজিজুল ইসলাম ঘড়েল মানুষ। মৃত্যু পথযাত্রীদের মধ্যে অস্বাভাবিকত্ত্ব থাকে। চোখভরা থাকে শূন্যতা। মানুষের সান্নিধ্য পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ডাঙায় ওঠা মাছের মত অস্থির হয়ে তড়পায়। আজিজ সাহেবের মধ্যে তেমন কিছু নেই। দেখা হলে হাসছেন। কুশল বিনিময় করছেন। দুপুরে খাবার সময় আমাদের দেখা হল। মুকুন্দ নানান ধরণের তরকারী দেশি পদের রান্না করে আমাকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আমি আয়েশ করে খাচ্ছি। আজিজ সাহেব খেতে পারছেন না। তিনি টেবিলের খাদ্য তালিকায় চোখ বুলিয়ে নিয়ে বিরক্ত হলেন। বেশ কষ্ট করার পর অল্প কিছু মুখে ঢোকাতে পারলেন। খাবার টেবিলে জিজ্ঞাসা করলাম,
‘আজিজুল ইসলাম সাহেব?’
‘জ্বী বলুন।’
‘এতবড় বাড়িতে আপনি একা থাকেন কেন?’
আজিজ সাহেব বললেন, ‘মানুষ হিসেবে আমি তৃতীয় শ্রেণীর। আশেপাশে কোন ভাল মানুষের উপস্থিতি সহ্য করতে পারি না।’
‘মুকুন্দ মানুষ হিসেবে কেমন? তৃতীয় শ্রেণীর?’
আজিজ সাহেব মুকুন্দের দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করে বললেন,
‘না, সে প্রথম শ্রেণীর। অনুগত। কাজের ছেলে। কাজ শেষে ঘুটঘাট করে ঘুরে বেড়ায়। এছাড়া তার কোন দোষ নেই।’
‘তাহলে স্বীকার করছেন, আপনার স্বভাবের সাথে মেলে না এমন লোকও আপনার পাশে থাকতে পারে?’
‘থাকতে পারে না বলি নি। সহ্য করতে পারি না। মুকুন্দ আলাদা।’

‘বিয়ে করেন নি কেন?’
‘বিয়ে করি নি কে বলল?’
‘কেউ বলে নি। আপনার মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। মানুষের মুখমণ্ডলে চারটা আলাদা পেশী থাকে। মাসল অফ এক্সপ্রেশন। অভিব্যক্তি বদলের সাথেসাথে এদের সংকোচন-প্রসারণ ঘটে। মুখের আকারও বদলে যায়। সকালে এক বয়স্ক লোক আপনার পায়ের কাছে বসে কাঁদছিল। আপনার চোখ বন্ধ করে ছিলেন। কোন কথাই বললেন না। মানুষের কান্না শুনে কারো আবেগের পারদ উঁচুনিচু হবে না, এটা অস্বাভাবিক। আপনি মারা যাচ্ছেন। এই মুহুর্তে পারিপার্শের মৃদ্যু কান্নাতেই আপনার ভড়কে যাবার কথা। আপনি ভড়কান নি। বেশ স্বাভাবিক আছেন। আশেপাশে স্ত্রী পুত্র কন্যাকেও দেখছি না। তাদের তো পাশে থাকার কথা।’

‘পাশে কাউকে রাখতে আমার ভাল লাগে না। বলেছি তো।’
‘ভাল লাগা না লাগা গুরুত্বপুর্ণ নয়। নিশ্চয়ই অন্য কোন কারণ আছে। শারীরিক বয়স বৃদ্ধির সাথেসাথে মানুষের মানসিক বয়স ব্যস্তানুপাতে কমতে থাকে। তার উপরে আপনি অসুস্থ। সূত্রানুযায়ী এই বয়সে আপনার মানসিকতা দশ বছরের শিশুর পর্যায়ে পৌছে যাবার কথা। পরিবারের সান্নিধ্য লাভের জন্য আপনি উতালা হয়ে যাবেন। যান নি কেন?’

আজিজ সাহেব আলোচনা ঘুরিয়ে দিলেন। হাত ধুয়ে উঠে পড়লেন। আমি পেছন থেকে ডেকে বললাম,
‘ঢাকা থেকে একটা জিনিস এনেছি আপনার জন্য। যদি একটু খেয়ে দেখেন, আমি খুশি হব।’
‘কী এনেছেন?’ মুকুন্দ বৈয়াম খুলে ছোটছোট নাড়ু বের করল। নারকেলের নাড়ু। আজিজ সাহেবের হাতে দিল। আজিজ সাহেব নাড়ুর দিকে চেয়ে বললেন,

‘আমি নারকেল খাই না’
‘কেন খান না?’
‘না খাবার জটিল কিছু কারণ আছে। সবচেয়ে সহজ কারণ হল, নারকেল তেল আর নারকেলের নাড়ুর গন্ধ এক। নাড়ু খাওয়া আর তেল খাওয়া এক কথা। এই বাজে জিনিস মানুষ খায় কী করে?’
আজিজ সাহেব বের হয়ে যাচ্ছিলেন। আমি শেষমুহুর্তে জিজ্ঞাসা করলাম,
‘যদি নারকেল না খান, সকালের লোকটা একঝাঁক নারকেল কেন এনেছিল?’
আজিজ সাহেব ভ্রু কুঁচকে ফেললেন। বললেন, ‘সে কেন এনেছিল, আমি কীভাবে জানব?’
‘কেউ আপনার বাসায় প্রতিসপ্তাহে নারকেলের ঝাঁকি রেখে যাবে, আপনি জানবেন না?’
‘না জানব না। সেজন্য মুকুন্দ আছে।’
‘আমি মুকুন্দকে জিজ্ঞেস করেছি। সে কিছু জানে না।’
‘সে না জানলে কেউ জানবে না। সম্ভবত ভুলে রেখে গেছে।’
‘ভুল করে রাখে নি। আপনি নারকেল খান না। নারকেলের নাড়ু খান না। কেউ প্রতি সপ্তাহে নারকেল আনছে, পায়ের কাছে বসে কাঁদছে। আপনি তাকে ধমকও দেন না। নিশ্চয় এই বাসায় এমন কেউ আছে যে নারকেল খেতে পছন্দ করে। তার জন্যে এসব নারিকেল আসে।’

আজিজ সাহেব কিঞ্চিত রাগান্বিত। তার মুখের অভিব্যক্তির বদল ঘটছে। মাসল অফ এক্সপ্রেশন কাজ করতে শুরু করেছে। একজন নিখুঁত অপরাধীর অভিব্যক্তি বদলে যাবার সাথেসাথে সে হেরে যেতে শুরু করে। আজিজ সাহেব হেরে যাচ্ছেন। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,
‘নারকেল পছন্দ করার মত কে আছে এই বাসায়?’
‘কেউ নেই।’
‘আগে কেউ ছিল?’
আজিজ সাহেব দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লেন। কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বললেন,
‘আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?’
‘বাসার বাসিন্দা আপনারা দুজন যে নন, সেটা আগেই বলেছি। তৃতীয় একজন থাকতেই পারে।
বাজারে নারকেলের দাম চড়া। একজন হতদরিদ্র লোক যদি প্রতি সপ্তাহে সখ করে নারকেল কেনে, সে নিশ্চয় তার রক্তের সম্পর্কের কারো জন্যই কিনবে। হয় সেই তৃতীয় ব্যক্তিটি তার বাবা-মা অথবা স্ত্রী অথবা পুত্র-কন্যা।’
‘এই বাড়িতে তার রক্তের কেউ নেই। মুকুন্দ আর আমি। আমরা তার কেউ না।’

আমি বললাম, ‘আমি তো বলেছিই, আপনারা দুজন তার কেউ না। অন্য কেউ। কে সে?’
আজিজ সাহেব চড়া ভাষায় বললেন, ‘আমি কীভাবে জানব?’
‘যেহেতু আপনার পা ধরে সে প্রতি সপ্তাহে কাঁদে, ধারণা করা যায় আপনি এর জবাব কী হবে জানেন। বিশেষ কারণে আপনার কারণেই তৃতীয় মানুষটি সামনে আসতে পারছে না। আবার আপনি নারকেলওয়ালা লোকটাকে বের করেও দিচ্ছেন না। কেন? আপনার তো এসব জিজ্ঞাসার জবাব জানার কথা।’
আজিজ সাহেব অনেকক্ষন চুপ করে থাকলেন। এরপর দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলেন। পুরোপুরি গেলেন না। দরজার ওপাশ থেকে বললেন,
‘স্বীকার করছি কেউ একজন এই বাড়িতে ছিল। এবার আপনি তাকে খুঁজে বের করুন। রহস্য সমাধান আপনার ডিপার্টমেন্ট। আমি হলাম অপরাধী। আমার কাজ হল চোখমুখ বন্ধ করে বিষয়টাকে উপভোগ করা।’

আজিজ সাহেব চলে গেলেন। আমি টেবিলে বসে আছি। মুকুন্দ এই দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যহীন কথোপকথনে পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। মুকুন্দের হাসির কারণ কী? আমি জিজ্ঞেস করলাম,
‘চোখে সুরমা দিয়েছ?’
‘জ্বি স্যার। নবীজি দিতেন। আমি সুন্নাত পালন করছি।’
‘বেশ ভাল করেছ।’
‘অবশ্যই স্যার ভাল করেছি। তুর পর্বতের নূরে তাজাল্লী থেকে সুরমা এসেছে। এর নাম ইসমিদ সুরমা। এই সুরমা আমাদের চক্ষে মাখা জরুরী।’
‘অবশ্যই জরুরী মুকুন্দ। অবশ্যই জরুরী।’

আজ শেষদিন। দুপুর। কাঠালপাকা গরম। আকাশ থেকে হলকায় হলকায় আগুন পড়ছে। গুপ্ত অপরাধ রহস্যের কোন কূলকিনারা হয় নি। মুকুন্দের মুখের হাসি উধাও। মন খারাপ করে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি তিনদিন আয়েশ করে কাটালাম। সারাদিন উঠোনে গাছের তলায় বসে থাকি। মুকুন্দ পড়ার জন্য একটা বই এনে দিয়েছে। অতি প্রাচীন বই। বইয়ের নাম নেই। প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা থেকে প্রথম দশ পৃষ্ঠা উধাও। আমি শুরু করলাম এগারো পৃষ্ঠা থেকে। একাদশ পৃষ্ঠায় লোহাগড়ার জমিদার মানিক সাহা ও রুপক সাহার অত্যাচারের বিষদ বিবরণ শুরু হয়েছে। রগরগে বর্ণনা। অত্যাচারের নমুনা দিতে লেখক একটি বিশেষ ঘটনা টেনে এনেছেন।

মানিক ও রুপক সাহার মা একবার আম ও দুধ খেতে চাইলেন। মাতৃ আজ্ঞা পালনে ব্রতী হয়ে দুই সন্তান সদর দরজার সামনে বিশাল পুকুর কাটলেন। রাজত্বে ঘোষনা দিলেন, আম-দুধ বিক্রি বন্ধ। সবাই নিজেদের আম-দুধ এনে পুকুরে ঢালবে।
রাজ আজ্ঞা পালিত হল। প্রজারা ভয়ে ভয়ে রাজ্যের সমস্ত আম ও গো-দুগ্ধ পুকুরে ঢালল। পুকুর পূর্ণ হল কানাকানায়। এরপর মানিক সাহা ও রুপক সাহা তাদের মাকে পুকুরের পাড়ে দাড় করিয়ে বললেন, ‘কত আম দুধ খাবি খা’।

এরপর ‘হেইচো’ বলে দুই সন্তান নিজেদের মা’কে ধাক্কা দিয়ে পুকুরে ডুবিয়ে মারেন। অজ্ঞাত লেখক চেষ্টা করেছেন বিষয়টাকে মর্মস্পর্শী করতে। পরতে পরতে প্রাচীন পুঁথির শ্লোক যুক্ত করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শ্লোক হল,

দিনশেষে আলোক রবি অস্ত যায় যায়
সাহার মাতা ডুবে গেল মরি হায় হায়

এই বিশেষ বই অথবা বর্ণনার সাথে আমার রহস্যভেদের সম্পর্ক কী আমি জানি না। মুকুন্দের সাথে কয়েকবার দেখা হল। তার মুখভরা বিষাদ। মাল্টিপল পার্সোনালিটির মানুষের মানসিকজগত দ্রুত পাল্টে যায়। সেখানে একেকজন আসে একেক সময়ে। এই পরিবর্তনের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নেই। মুকুন্দকে প্রথম দর্শনে ভীত, হাস্যোজ্জ্বল এবং দ্বিধান্বিত মনে হয়েছিল। আজ লাগছে বিষাদগ্রস্থ। কেন? আমার রহস্যভেদের সাথে কি তার কোন সম্পর্ক আছে? সে-কি নারকেলওয়ালার কেউ হয়? আমি নোটখাতা খুলে লিখলাম,

নামঃ মুকুন্দ
রোগঃ মাল্টিপল পার্সোনালিটি (এখনো নিশ্চিত নই)
পিতাঃ নারকেলওয়ালা (এখনো নিশ্চিত নই)

জটিল রহস্য দামী কাপড়ের মত।
সুতোর বুনন ঠিকঠাক। রঙের ব্যবহারও নিখুঁত। তবে যত নিখুঁতই লাগুক না কেন, একটা সুতো খুঁজে পাওয়া যাবে যার মাথা ঠিকই বের হয়ে থাকবে। আমার কাজ হল এমন একটি ত্রুটিপূর্ণ সুতো খুঁজে বের করা। অতঃপর হেঁচকা টান দিয়ে সুতোর গোড়ায় চলে যাওয়া। আমি এখনো ত্রুটিপূর্ণ সুতো খুঁজে পাইনি। এর মধ্যে আজিজ সাহেবের সাথে দেখাও হয় নি। মুকুন্দকে জিজ্ঞাসা করলাম,

‘তোমার স্যার কোথায়?’
মুকুন্দ বলল, ‘আনারস বাগানে।’
‘তুমি কি আমাকে দেখিয়ে দিবে, বাগানটা কোথায়?’
মুকুন্দ হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘বাগানের পুব কোনে। যাবেন না স্যার।’
‘কেন?’
‘উনি বিরক্ত হবেন। আনারস বাগানে উনি কাউকে ঢুকতে দেন না।’

আজিজ সাহেবের উঠোনে সব প্রাচীন গাছ। কয়েকটা দেবদারু। অধিকাংশই অতি প্রাচীন শালগাছ। ত্রিশ ফুটেরও বেশী লম্বা। ঘন বাগান। বাগানের ভেতরে একটা অংশ আশ্চর্যজনকরকম ফাঁকা। ফাঁকা স্থানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল- স্থানটা বৃত্তাকার। বৃত্তের মাঝে গাছপালা নেই। সম্ভবত কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে। আজিজ সাহেব সেখানে আনারস আবাদ করেছেন। বাগান দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। প্রতিটা গাছেই পাকা রসালো আনারস রঙ বদলে হলুদ হয়ে আছে। এত চমৎকার আনারসের বাগান আমি আমার ক্ষুদ্র জীবনে দেখি নি।

আজিজ সাহেব আনারসের ঝোপে গম্ভীর হয়ে কাজ করছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী করছেন?’ আজিজ সাহেব আমাকে দেখে কিছুটা বিরক্ত হলেন। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি খুব একটা খুশি হন নি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,

‘দুপুর বেলা ঝোপের মধ্যে কী করছেন?’
‘কিছু করি না। আগাছা পরিষ্কার করি।’
‘আমার জানামতে আনারস ক্ষেতে আগাছা পরিষ্কার না করলেও চলে। আনারসের স্বভাবই হল ঠাণ্ডা জায়গায় জন্মানো। যেখানে ঝোপঝাড় বেশী।’
‘তা ঠিক বলেছেন। তবুও। বসে থেকে আরাম পাই না। শেষ কটা দিন সময় কাটানো জরুরী। আপনি চলে যান। এখানে সাপের উপদ্রব।’
‘সাপ তো আপনাকেও কাটতে পারে।’
আজিজ সাহেব একবার মাথা তুলে দু’সেকেন্ড দেখে আবার মাথা নামালেন। কোন জবাব দিলেন না। আমি ঘরে চলে আসলাম।

দুপুরের পর ভ্যাপসা গরম নামল। হিউমিডিটি বেড়ে গেছে। আজিজ সাহেব নিজের ঘরে শুয়ে আছেন। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। আমার সামনে মুকুন্দ।

‘আজিজ সাহেব, ঘুমুচ্ছেন?’
‘না। কিছু বলবেন?’
‘জ্বী। আজ আমার তৃতীয় দিন। সন্ধ্যা নামলে দিন শেষ হয়ে যাবে।’
‘তৃতীয় মানুষটাকে খুজে বের করেছেন?’
‘না।’
‘মুকুন্দ কী কাগজ কলম এনে দিবে? আপনি সেখানে দস্তখত করবেন।’
‘হ্যাঁ, আনতে বলুন। আপনার ঘরে কোনো চেয়ার নেই। আমি কি বিছানার পাশে বসব?’
আজিজ সাহেব পা সরিয়ে নিলেন। দেয়ালের দিকে সরে গেলেন। মুকুন্দ খাতাকলম আনার জন্য বাইরে গেল।

আজিজ সাহেবের ঘরটা বড়। আমার ঘর থেকে এই ঘরের পার্থক্য অনেক। দেয়ালে সাদা রঙ। চারটা জানালা। তিনটা খুলে রাখা, বিছানার পাশের জানালা বন্ধ। আজিজ সাহেব বিছানার তলা থেকে একটা কাগজ বের করলেন। বাসের টিকেট। আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন।

‘আজ রাতে ফিরতে কাজে লাগব।’
‘ধন্যবাদ আপনাকে।’
আমি বিছানায় বসলাম। পা মুড়িয়ে আরাম করে বসে আজিজ সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম,
‘কারেন্ট নেই। গরম। সব জানালা খোলা কিন্তু বিছানার পাশের জানালা বন্ধ কেন?’
আজিজ সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন। বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললেন,
‘কেন? এখানেও অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ছে?’
আমি বললাম, ‘অস্বাভাবিক কিছু পড়ে নি। দেখে মনে হচ্ছে এই জানালা প্রায়ই বন্ধ থাকে। গ্রীলে মাকড়সার পুরু জাল।’
‘হ্যাঁ, অনেকদিন খোলা হয় না।’
‘কেন খোলেন না? বাকী তিনটা জানালা দিয়ে তো কোন বাতাস আসছে না। অথচ এই জানালার ওপাশটা বেশ ফাঁকা। বাতাস আসত।’

আজিজ সাহেব বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলেন,
‘কী বলতে চাচ্ছেন? স্পষ্ট করে বলুন।’
‘ঠিক আছে আজিজ সাহেব। আমি ব্যাখ্যা করছি। আমার ব্যাখ্যার নিজস্ব কিছু কলাকৌশল আছে। জটিল না। খুব সাধারণ কৌশল। আমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি। আমিই উত্তর দিই। এভাবে প্রশ্নে প্রশ্নে রহস্য সমাধানের চেষ্টা করি। এই ধরুন,
প্রশ্নঃ ১- জানালা না খোলার মাঝে কী কোন রহস্য আছে?’
উত্তরঃ অল্প রহস্য।
প্রশ্নঃ২- অল্প রহস্যটা কী রহস্য?
উত্তরঃ এই জানালা দিয়ে হাওয়া বেশি আসার কথা। অথচ বন্ধ থাকে। অন্যগুলোয় হাওয়া চলে না কিন্তু খোলা থাকে। এটাই রহস্য।
প্রশ্নঃ ৩- এটা রহস্য নয়। অন্য কিছু আছে?
উত্তরঃ আছে। সম্ভবত আজিজ সাহেব জানালার ওপাশটায় তাকাতে চান না।
প্রশ্নঃ ৪- কেন তাকাতে চান না?
উত্তরঃ কেন চান না সেই তথ্য এখনো পাওয়া যায় নি। সেখানে কোন নর্দমাও নেই। বাজে পরিবেশও নেই।

প্রশ্নঃ ৫- জানালার ওপাশে কী আছে?
উত্তরঃ কিছু নেই। ফাঁকা জায়গা। ফাঁকা জায়গায় আনারস চাষ করা হয়েছে।
প্রশ্নঃ ৬- আনারসের সাথে কোন রহস্য জড়িত?
উত্তরঃ আনারসের সাথে কোন রহস্য জড়িত নয়। তবে রহস্য আনারসের জমি অল্প রহস্যময়।
প্রশ্নঃ ৭- কী সেই রহস্য?
উত্তরঃ আনারসের বাগান বৃত্তাকার।
প্রশ্নঃ ৮- বৃত্তাকার জমিতে আবার রহস্য কী?
উত্তরঃ পুরো বাড়িতে বড় বড় প্রাচীন গাছ অথচ একটা বৃত্তাকার অংশে কোন গাছ নেই।
প্রশ্নঃ ৮- কেন বড় গাছ নেই?
উত্তরঃ কারণ বড় গাছ সেখানে জন্মাতে পারে না। বড় গাছ জন্মাতে গভীর মাটি এবং শক্ত ভুমি দরকার। আনারসের ক্ষেতকে শক্ত মনে হয় নি। মনে হয়েছে এই মাটি অগভীর।

প্রশ্নঃ ৯- কেন অগভীর মনে হচ্ছে?
উত্তরঃ আজিজ সাহেব দুপুরে ক্ষেতে কাজ করছিলেন। কোদাল নড়াচড়ার সময় বিশেষ ধরণের শব্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এই মাটি একটি ফাঁকা স্থানের উপর ভেসে আছে।
প্রশ্নঃ ১০- ফাঁকা স্থান কী হতে পারে?
উত্তরঃ প্রাচীন কোন কুয়া অথবা ছোট গোলাকার পুকুর। যা সাম্প্রতিককালে ভরাট করা হয়েছে। অতঃপর আনারসের চারা লাগিয়ে জায়গাটাকে আড়াল করে ফেলা হয়েছে।
প্রশ্নঃ ১১- এই যুক্তিকে সত্য ধরতে হবে নাকি অনুমান?
উত্তরঃ অনুমান।
প্রশ্নঃ ১২- অনুমানের সত্যতা যাচাই করতে হলে কী করতে হবে?
উত্তরঃ খনন করতে হবে। আনারসের গাছ উপড়ে ফেলতে হবে।
প্রশ্নঃ ১৩- রহস্য সমাধানে আনারসের ঝোপকে আনার যুক্তি কী?
উত্তরঃ যুক্তি বড় সরল। আজিজ সাহেব আজ দুপুরে আমার আনারসের ক্ষেতের পাশে যাওয়া পছন্দ করেন নি। তিনি সাপের ভয় দেখিয়ে আমাকে চলে যেতে বলেছে। এই হল আমার যুক্তি। আরেকটা যুক্তি হল আজিজ সাহেব কোন কারণ ছাড়াই আনারসের ঝোপের আগাছা পরিষ্কার করছিলেন।

এই আমার যুক্তি তর্ক। আপনি কিছু বলবেন আজিজ সাহেব?

আজিজ সাহেব কিছু বললেন না। তিনি দেয়ালে হেলান দিয়ে আছেন। তার চোখ বন্ধ। মুকুন্দ আসল। তার মুখে হাসি। হাসিমুখে বলল,
‘স্যার কলম খাতা নাই। কিনে আনতে হবে। যাব?’
আজিজ সাহেব জবাব দিলেন না। এখনো চোখ বন্ধ করে আছেন। আমি বললাম, ‘খাতার দরকার নেই। তুমি টেলিফোন করার ব্যবস্থা কর।’
‘কোথায় টেলিফোন করব?’
‘ রংপুর কোতয়ালী থানা। ওসি সাহেবের নাম ওবায়দুল হক। তাকে বল, প্রফেসর নাজিব আপনাকে নিমন্ত্রণ করেছে।’
‘যদি জিজ্ঞেসে করে, কীসের নিমন্ত্রন?’
‘বলবে আনারসের নিমন্ত্রন। শিমুলবাগে বেশকিছু রসালো আনারসের চাষ হয়েছে। তুমি টেলিফোন করার পর বাগানে যাবে। দুটো ভাল দেখে আনারস তুলে আনো। বীট লবন আছে?’
মুকুন্দ কিছু বুঝতে পারছে না। তবুও তার মুখে হাসি।
‘আছে স্যার।’
‘গুড। তাহলে আনারস কেটে সাথে বাটিতে করে বীট লবন এনে রাখো। আনারসে বীট লবণ ভাল স্বাদ আনে। যাও আগে টেলিফোন করো।’
মুকুন্দ চলে গেল।
টেলিফোনে সে উচ্চস্বরে কথা বলছে।

রংপুর কোতয়ালী থানার ওসি ওবায়দুল হক আজিজ’স টেরিটরিতে বড় ধরণের অনুসন্ধান চালালেন।
আনারসের বাগান উপড়ে ফেলা হল। মাটির তলায় পাওয়া গেল জারুল কাঠের পুরু তক্তা। তক্তার নিচে প্রাচীন কুয়ো। কুয়োর পাড় নতুন। সম্ভবত আজিজ সাহেব নিকট অতীতে সংস্কার করেছিলেন। পরবর্তীতে ঢেকে দেন। গরম কেটে বৃষ্টি নামল। প্রবল বর্ষনে উদ্ধারকার্যে বেশ বিঘ্ন ঘটছিল। তবুও পুলিশের আন্তরিকতায় উদ্ধারকার্য চলতে থাকল। কুয়োয় জাল ফেলা হল।
প্রথমবারেই পাওয়া গেল মানুষের কোমরের হাড়। পেলভিস। পেলভিসের ইশকিয়াল স্পাইন জালে গেঁথে উঠে এসেছে। ডুবুরি নামল। মাঝরাতের মধ্যেই উঠে আসতে শুরু করল হাড়গোড়। রংপুর মেডিকেলের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিত্যানন্দ রায় জানালেন, মেয়ে মানুষের হাড়। পেলভিস ও স্টার্নাম দেখে বয়স বের করা হল। আট দশের মাঝামাঝি।

আজিজ সাহেবকে হ্যাণ্ডকাফ পরিয়ে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়েছে সন্ধ্যার পরেই। টানাহেঁচড়া করতে হয় নি। তিনি চুপচাপ উঠে পড়লেন। ভ্যানে বসেও তাকে বেশ স্বাভাবিক লাগছে। এখনো চোখ খোলেন নি। পৃথিবীর সকল মায়ার বাঁধন কেটে গেছে। বাঁধন কেটে গেলে মাসল অফ এক্সপ্রেশন কার্যহীন হয়ে পড়ে। আজিজ সাহেবের মুখ অভিব্যক্তিহীন। বিদায় নেবার সময় মুকুন্দ আসল গেট পর্যন্ত। আমাকে বলল,

‘ধন্যবাদ স্যার।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন ধন্যবাদ দিচ্ছ?’
‘রহস্য উন্মোচিত করার জন্য।’
আমি হেসে বললাম,
‘আমি উন্মোচন করিনি মুকুন্দ। করেছ তুমি।’
মুকুন্দ চমকে উঠল।
‘আমি কীভাবে করলাম? আমি তো কিছুই জানতাম না।’
‘তুমি জানতে না এমন নয়। আন্দাজ করেছ। আন্দাজ থেকে তুমি আমাকে চিঠি লিখেছ।’
মুকুন্দ অবাক হয়ে বলল, ‘চিঠি কবে লিখলাম?’
‘কবে লিখেছ মনে করতে পারবে না। আমি তোমাকে তিনদিন খেয়াল করেছি। প্রথমে ভেবেছি, তুমি সব জানো। না জানার ভান করছ। পরে বুঝলাম, ভান করছ না। তোমার মধ্যে আরো একজন মানুষ বসবাস করছে।’
‘কী বলছেন স্যার?’
‘হ্যাঁ, এটা সত্যি। তুমি নারকেলওয়ালা হতদরিদ্র মানুষটির কান্না প্রতিদিন শুনতে। আজিজ সাহেবও শুনত। তার অভিব্যক্তি না বদলালেও তোমার বদলেছে। তুমি একসময় খেয়াল করতে শুরু করলে, মানুষটা বিপদে পড়েছে। তার কান্না তোমার অসহনীয় লাগতে শুরু করল। তোমার অবচেতন মন চেষ্টা করল তাকে সাহায্য করতে হবে।’
‘কিন্তু কীভাবে?’

‘তুমি আজিজ সাহেবকে ভয় পাও। তুমি চাওনি সে বুঝতে পারুক। একসময় তোমার অবচেতন মন বুদ্ধি করে তোমার মস্তিষ্কেই আরেকটা চরিত্র দাঁড় করে ফেলল। সে হল অল্পবয়স্ক তরুনীর চরিত্র। তরুনী সেজে তোমার মস্তিষ্ক চিঠি লিখল। চিঠি এতটাই নিখুঁত হল যে আমিও ধরতে পারলাম না। তোমার স্যারও পারল না।’
‘আমি অন্য কোন মানুষ না হয়ে তরুনী হলাম কেন?’
‘তরুনী হবার একটা ব্যাখ্যা আছে। তোমার বাসার গেটের উল্টদিকে একটা বড় দালান আছে। সেখানে দোতলার ব্যালকনীতে একটা অল্পবয়স তরুনী বসে থাকে। তুমি দরজা খুলতে বা বাইরে যেতে তাকে প্রায় খেয়াল করো। তোমার অবচেতন মন সেই তরুনী সেজে ফেলল। এতে সুবিধা হল চিঠির দায়ভার তোমার কাঁধে থাকল না।’
‘আর কোন প্রমাণ আছে?’
‘আছে। তোমাকে খাতা কলম আনতে বলা হয়েছে। তুমি আনো নি। তুমি বুঝতে পেরেছ তোমার খাতা কলম নেই। যেগুলো আছে তা দিয়ে তুমি চিঠি লিখেছ। সেই সুগন্ধি কলম এবং চিঠি লেখার প্যাড আনলে তুমি ধরা পড়বে। আমি যখন ওবায়দুল হককে ফোন করতে বললাম, তুমি নাম্বার না নিয়েই সরাসরি তাকে ফোন করলে। কারণ তুমি তার নাম্বার জানতে। তুমি অনেক আগে থেকে চেষ্টা করছ আজিজ সাহেবের ব্যাপারটা সুরাহা করতে। পুলিশের নাম্বার জোগাড় করে রাখা সেই সুরাহার অংশ।’
মুকুন্দ বলল, ‘এই রোগ কী খারাপ?’
‘অবশ্যই খারাপ। তবে তোমার ক্ষেত্রে পজিটিভ কাজ করেছে। এটা বেশ আনন্দের কথা।’

‘আমার কিছু মনে নেই কেন স্যার?’
‘মনে না থাকা স্বাভাবিক। তুমি এখন তরুনী নও। তুমি এখন মুকুন্দ। রহস্য উন্মোচনের সাথে সাথে তোমার অবচেতন মন সন্তুষ্ট হয়েছে। সন্তুষ্ট অবচেতন মন অন্য কোন চরিত্র তৈরি করতে পারে না। নতুন চরিত্র তৈরি হয় অসন্তুষ্টি থেকে। প্রচণ্ড অভাববোধ ও অক্ষমতা থেকে। তোমার মাঝে এখন সেই অভাববোধটা নেই। তাই তরুনীর চরিত্র এখন উধাও হয়েছে তোমার মস্তিষ্ক থেকে। তুমি এখন সুস্থ্য মানুষ।’
মুকুন্দের সন্দেহ এখনো কাটে নি। মাসল অফ এক্সপ্রেশন বেশ নিখুঁত কাজ করছে। তারা এখন ভয়ের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলছে। আমি বললাম,
‘কখন তোমার মধ্যে থেকে তরুনী চরিত্র বিদায় নিয়েছে জানো?’
‘কখন স্যার?’
‘তুমি যখন খাতা কলম না এনেই দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আনারস বাগানের রহস্য ব্যাখ্যা শুনছিলে।’
মুকুন্দ বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘স্যার তরুনী চরিত্রটা কি খুব বুদ্ধিমতি ছিল?’
‘হ্যাঁ মুকুন্দ। সে আমাকে প্রতিটা পদে সাহায্য করেছে। যখন আমি রহস্য ধরতে পারি সে আনন্দিত হত। যখন পারতাম না সে বিমর্ষ হত। আমি তোমার মুখভঙ্গিমার এই পার্থক্য দেখে সমুদ্রে পথ চিনে নিয়েছি। নাবিকদের মত। আমি যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছিলাম তখন সে আমাকে একটা পুরাতন বই এনে দেয়। সেই বইতে এক পুকুরের কথা ছিল। যেখানে দুই জমিদার তাদের মাকে চুবিয়ে মারে। এই ব্যাপারটা আমাকে ভাবতে সাহায্য করেছে। আমি যখন উপরে উপরে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না তখন আমি মাটির নিচে দেখা শুরু করলাম। আজিজ সাহেবের রহস্যে হয়তো পুকুর ছিল না, ছিল কুয়া। বইটির গল্পের সাথে কত মিল। আমার ধারণা সে রহস্যের পুরো সমাধানটাই করে ফেলেছিল। আমি তার দেখানো পথে হেটেছি।’

মুকুন্দ কিছু বলল না। তাকে বিমর্ষ লাগছে। দুটো চরিত্র একসাথে কাজ করতে গিয়ে তার নিউরন বেশ ক্লান্ত। ক্লান্ত মস্তিষ্কে মনোঅ্যামাইনের পরিমান কমে যায়। তখন মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস হয় বিমর্ষ।

পরিশিষ্টঃ আজিজুল ইসলামের হত্যাকাণ্ডটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। পত্রপত্রিকা বিস্তর লেখালেখি শুরু করল। দেশে মোটামুটি বড় ধরণের তোলপাড় হল। অলসতায় আমি তেমন একটা খোঁজখবর রাখতে পারলাম না। ভাসাভাসা খবর উড়ে আসল। মামলা হয়েছিল। সরকারের নির্দেশে মামলা চলে গেল দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে। আজিজুল ইসলাম কাঠগড়ায় তার অপরাধ স্বীকার করলেন।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া মেয়েটি ছিল তার বাসার কাজের মেয়ে। কোন এক ঝড়ের রাতে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করেন। ব্যাপারটিকে আড়াল করার জন্য তিনি মেয়েটির লাশ কুয়োয় ফেলে দেন। এরপর কুয়ো ঢেকে দেন জারুল কাঠে। কাঠের উপর মাটি জমা করলেন। জঙ্গলের মধ্যে একটি গোলাকার ফাঁকা স্থানকে সামঞ্জস্যহীন লাগছিল। সেখানে গাছ হচ্ছিল না। তাই তিনি চাষ করলেন আনারস। আনারসের ঝোপের নিচে তিনি আড়াল করতে চেয়েছিলেন তার অতীত অপরাধ।

ফাঁসির আদেশ দিল আদালত। নিকটাত্মীয়দের অনুরোধেও আজিজুল হক মার্সি পিটিশিন করলেন না। তিনি বেশ স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। শেষপর্যন্ত ফাঁসি হল না। ফাঁসির একদিন আগে তিনি কনডেম সেলে মারা যান।

হতদরিদ্র লোকটিকে তার কন্যার হাড় কফিনে ভরিয়ে দেওয়া হল দাফনের জন্য। লোকটি কন্যার হাড় দাফনের পর প্রতিদিন থানার গেটে বসে কান্নাকাটি করেন। ওসি ওবায়দুল হক বিরক্ত হয়ে একদিন আমাকে চিঠি লিখলেন। চিঠিতে জানালেন, আমি যেন তাকে তর্ক বিতর্ক করে বুঝিয়ে দিই, তার কন্যা বেঁচে নেই। আমি চিঠি লিখলাম। ওবায়দুল হককে না, মুকুন্দকে। চিঠির ভাষা মোটামুটি এরকম,

কল্যাণীয়াসু মুকুন্দ,
কেমন আছো? তোমার সুরমা নিয়ে আমি বিস্তর পড়াশোনা করেছি। তুরের নূরের তাজাল্লী (আল্লাহপাকের নুরের ছটায় তুর পাহাড়ের একাংশ জ্বলে গিয়ে পাহাড়ের মাটি সুরমা হয়েছে) সুরমা তৈরি হবার বিষয়টি একটি ভুল ধারণা। আমি কয়েকজন ইসলামী স্কলারের সাথেও কথা বলেছি। তারা বিষয়টা উড়িয়ে দিয়েছেন। সূরা আরাফের একশত তেতাল্লিশ আয়াত পড়লে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। কোথাও সুরমার উল্লেখ নেই।

সুরমা হল লেড সালফাইড। পরীক্ষাগারে হাইড্রোজেন সালফাইডের সাথে লেডের বিক্রিয়া ঘটিয়ে তৈরি করা হয়। সবচেয়ে বিশুদ্ধ লেড সালফাইডের আরবে আঞ্চলিক নাম ‘ইসমিদ’। আরবের কিছু পাথুরে পাহাড়েও পাওয়া যায়। ইসমিদ সুরমা একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত অক্ষতিকর। তোমার চোখে তা বেশ মানায়। তুমি যেদিন আমাকে চিঠি লেখো, সেই রাত্রে চিঠি লেখার সময় তুমি অনেক কেঁদেছ। তোমার চোখের জল সুরমার সাথে মিশে কিছু সুরমার দানা চিঠিতে পড়ে কালো দানাদার ছোপ হয়ে যায়। চিঠি যে তুমিই লিখেছ, প্রথমদিন তোমার চোখ দেখেই বুঝতে পেরেছি। তুমি ভালো থেকো।

আশীর্বাদক,
প্রফেসর নাজিব

পুনশ্চঃ সাপের রহস্যটা কি ব্যাখ্যা করতে পারবে?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button