ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হাতে কর্মীদের প্রাণ কতটা নিরাপদ?

গত ২৫/০৫/২০১৭ তারিখে আনুমানিক দুপুর একটায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ই-কমার্স অথবা ডটকম (othoba.com) এর হেড অফ অপারেশন্স, আহসানুল আলম রাজু কোম্পানীর বাড্ডাস্থ অফিসের লিফট থেকে পড়ে মারা যান। প্রত্যক্ষদর্শী এবং ওই লিফট ব্যবহারকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, যে অফিস ভবনে দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন, ঐ ভবনের নির্দিষ্ট লিফটটি বেশ কয়েক মাস ধরে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। সেন্সর কাজ না করা, অটো জেনারেটর কানেকশন না পাওয়া, ইমার্জেন্সি লাইট-ফ্যান কাজ না করা এবং আরো অনেক সমস্যায় জর্জরিত এ লিফটটিই প্রতিষ্ঠানের ৬০০-৭০০ কর্মীরা দীর্ঘদিন থেকে ব্যবহার করে আসছিলেন।

কর্মীদের পক্ষ থেকে আরো জানা যায় যে, বারবার অভিযোগ জানানোর পরও কর্তৃপক্ষ লিফটটি মেরামত করার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি! এমতাবস্থায় দুর্ঘটনার দিন আনুমানিক দুপুর ১ টার দিকে আহসানুল আলম ৯ তলা থেকে ওই লিফটে ওঠার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে ৫ ও ৬ তলার মাঝখানে লিফট থেমে যায়। ওই মুহূর্তে দুর্ঘটনা কবলিত লিফটে লিফটম্যানও উপস্হিত ছিলেন। লিফটম্যান নিচে অপারটেরকে ফোন দিয়ে লিফটে জেনারেটরের কানেকশন দিতে বলার অনেক্ষণ পরও যখন বিদ্যুৎ আসে না, তখন লিফটম্যান দুই হাতে লিফটের দরজা টেনে ফাঁক করে ৫ তলার লোকজনকে ডাকাডাকি করলে একজন একটা চেয়ার এগিয়ে দেয়। এ ধরণের দূর্ঘটনাময় পরিস্থিতি মোকাবেলার পূর্ব অভিজ্ঞতার দরুন লিফটম্যান লিফটের ৫ তলার দরজার কাঠামো ধরে লাফ দিয়ে নিরাপদে ৫ তলায় নেমে যায়। এমতাবস্থায়  লিফ্টম্যান অনুরূপভাবে আহসানুল আলমকেও লিফট থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে আসার অনুরোধ করলে আহসানুল আলম ও একইভাবে নেমে আসার চেষ্টা করেন।  কিন্তু আহসানুল এরকম ঝুঁকিপূর্ণ পন্থায় নেমে আসার প্রচেষ্টায় লাফ দিলে দুই পা লিফটের গর্তের দিকে চলে যায় এবং মধ্যাকর্ষণ বলে তার শরীরও গর্তের দিকে চলে গেলে গর্ত দিয়ে বাড়ি খেতে খেতে একদম নিচে পড়ে যান। এতে ওনার মাথার একপাশ পুরো থেতলে যায়। সহকর্মীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে এপোলো হাসপাতালে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আহসানুলকে মৃত ঘোষণা করে!

দায়িত্বরত অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে নিজ অফিস বিল্ডিঙেই একজন কর্মকর্তা মৃত্যুবরণ করলেও, একজন স্ত্রী ও তাঁর তিন বছরের সন্তান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামী ও বাবাকে হারিয়ে আজ দিশেহারা হলেও, সন্তান হারানো বাবা-মা আজ পাগলপ্রায় হলেও ঘটনার সাড়ে সাত মাস পরেও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল মানবিক দায়িত্ব তো দূর, কোন প্রকার আইনি বাধ্যগত দায়িত্বও পালন করেনি, প্রদান করেনি আইনি ক্ষতিপূরণ কিংবা বীমাদাবির প্রাপ্য টাকা। দায়িত্বে অবহেলার এ চরম নিষ্ঠুরতা ও অন্যায়ের শিকার আহসানুলের পরিবার তাদের আইনি দাবী আদায়ের জন্য উপায়ন্তর না দেখে পরিবারের পক্ষ থেকে উকিল নোটিশ প্রেরণ করেছেন ও অন্যান্য আইনী দিক বিবেচনা করছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু এই কি হওয়া উচিৎ প্রাণ-আরএফএল এর মতন বৃহৎ ও সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানের তার কর্মকর্তাদের প্রতি দায়িত্ব ও শিষ্টাচার?

প্রসঙ্গত আহসানুল আলম, ই-কমার্স জগতে একটি মেধাবী ও উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। তিনি এর পূর্বে biponee.com (বর্তমানে kiksha.com নামে পরিচিত) এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার নেতৃত্বে মাত্র ২ বছরে অথবা ডটকম বাংলাদেশের প্রথম সারির ই-কমার্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়। অথচ সেই তিনি, তার স্ত্রী এবং তিন বছরের একটি ফুটফুটে পুত্র সন্তানকে একা করে দিয়ে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছেন তারই কর্মস্হলের কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে। প্রসঙ্গত দুর্ঘটনাস্থল প্রাণ- আরএফএল গ্রুপের ওই অফিস ভবনটির বিভিন্ন তলায় প্রায় ৬০০-৭০০ কর্মী কর্মরত আছেন। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কর্তৃপক্ষের অবহেলায় আহসানুল আলম তার  প্রাণ হারিয়েছেন, এই ভবনে কর্মরত বাকি কর্মীদের জীবনও যে কতটুকু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সেই বাস্তবতাকে মনে করিয়ে দিয়ে দেয়। সেই সাথে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হাতে এরই বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের কর্মরত প্রায় ৯০,০০০ এরও বেশি কর্মীদের প্রাণও কি নিরাপদ? সেই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button