ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

মগের মুল্লুক ও একজন অহনার গল্প

নিরাপদ সড়ক চেয়ে এত আন্দোলন, এত প্রতিবাদে লাভ কি হলো? দিনশেষে আমরা কি পেলাম? জীবনের নিরাপত্তার দাবী নিয়ে রাস্তায় নেমে মার খেতে হলো ছাত্রদের, নিরাপত্তা কেমন মিলেছে সেটা তো আজ অভিনেত্রী অহনার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটাতেই প্রমাণ হয়ে গেল। মাদকাসক্ত অবস্থায় এক ট্রাক চালক গতকাল ভোররাতে তার গাড়িকে চাপা দিয়েছে, তারপর অহনা যখন সেই ড্রাইভারের সঙ্গে তর্ক করছিলেন, এবং ট্রাকের দরজায় উঠে তাকে গাড়ি থেকে নেমে আসতে বলছিলেন, তখন অহনার কথায় কোন পরোয়া না করেই তাকে নিয়ে গাড়ি টান দিয়েছিল সেই ড্রাইভার। অনেকটা পথ ট্রাকের জানালা ধরে ঝুলে থাকার পরে তাকে ফেলে দেয়ার উদ্দেশ্যেই ট্রাকচালক জোরে বাঁক নিয়েছে। রাস্তায় পড়ে গিয়ে মারাত্নক আহত হয়েছেন অহনা, আর উল্টে যাওয়া ট্রাক রেখেই বীরদর্পে পালিয়েছে সেই চালক।

পুরান ঢাকায় একটা অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফিরছিলেন অহনা। পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন তার সঙ্গে, ড্রাইভ করছিলেন অহনা নিজেই। উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে রাত সোয়া তিনটার দিকে পাথর বোঝাই একটি ট্রাক অহনার গাড়িকে চাপা দেয়। একটা ভিডিওতে দেখা গেছে, অহনা উত্তেজিত হয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে এসে ট্রাকচালককে ট্রাক থেকে নামতে বলছেন। কিন্ত ট্রাক চালক নিজের দোষ স্বীকার করতে রাজী নন। অহনা তখন ড্রাইভারকে মাদকাসক্ত বলেও অভিহিত করেন।

তর্কাতর্কির একটা পর্যায়ে সেই চালক তার ট্রাকটাকে সামনে নিয়ে গিয়ে ব্যাকগিয়ারে দিয়ে অহনার গাড়িকে আবারও চাপা দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অহনা ট্রাকচালকের দরজায় উঠে তাকে নামতে জোর করেন। চালক তার কথায় পরোয়া না করে গাড়ি টান দেয়। অহনা তখন চালকের জানালা ধরে ঝুলতে থাকেন।

ট্রাকটি উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের সামনে গিয়ে অহনাকে ছিটকে ফেলে দেয়ার উদ্দেশ্যে জোরে বাঁক নেয়। কিন্তু গতি সামলাতে না পেরে ট্রাকটিই বাম দিকে উল্টে পড়ে যায়। আর অহনা ছিটকে গিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা পাথর কুচির ওপর পড়েন। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন স্থানীয় লোকজন।

অহনার বোন ইয়াসমিন মিতু তখন বোনের সঙ্গেই ছিলেন, তিনি বলছিলেন, ‘আমি প্রাইভেটকারে ছিলাম। ট্রাকের দরজা খোলার পর দেখি ড্রাইভারের পায়ের কাছে মদের বোতল। তার হাতেও গাঁজা ছিল। তিনি আসলে গাড়িতেই নেশা করছিলেন। আর এতটাই আসক্ত ছিলেন যে, অহনা ঝুলে থাকলেও সে গাড়ি তো থামায়নি বরং ৭ নম্বর সেক্টরের ব্রিজের পাশে ল্যাম্পপোস্টেও ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করে। চারবার এমন করার পর গাড়ির গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। ১২ নম্বরে গিয়ে বাঁক নিয়ে কষে ব্রেক করে ড্রাইভার। ভাগ্য ভালো ট্রাকটি বাম পাশে উল্টে যায়। ডানে উল্টালে অহনাকে আর পাওয়া যেত না।’

অহনার শারীরিক অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক, ডাক্তাররা জানিয়েছেন, তার কোমরের আঘাতটা যথেষ্ট ভয়াবহ। দুর্ঘটনায় তার কোমরের হাড়ের সংযোগস্থল সরে গেছে। তার পিঠও থেঁতলে গেছে এবং পাথর কুচি ঢুকে গিয়েছে। এরমধ্যে আবার নতুন এক নাটক শুরু হয়েছে। অহনার পরিবারের পক্ষ থেকে সেই মাদকাসক্ত ট্রাক চালক এবং তার সহকারীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এখন ট্রাকচালক সমিতির কয়েকজন নেতা নাকি সেই মামলা উঠিয়ে নেয়ার জন্যে হুমকি দিচ্ছে অহনার পরিবারকে!

ভাবতে পারেন অবস্থাটা? অহনার সঙ্গে যে নির্মম আচরণটা করা হলো, সেটার বিচারও চাওয়া যাবে না! মানুষের চেহারা নিয়ে ঘুরতে থাকা এই শুওরগুলোকে যে আসলে কি করা উচিত, সেটাই মাঝেমধ্যে বুঝে উঠতে পারি না! চালক মদ-গাঁজা খেয়ে গাড়ি চালাবে, অন্য গাড়িকে চাপা দেবে, প্রতিবাদ করলে মারাত্নক আহত করবে, বিচার চেয়ে পুলিশের কাছে মামলা করলে উল্টো আবার সেই মামলা তুলে নেয়ার হুমকি পেতে হবে! হায়েনাগুলো এই দেশটাকে মগের মুল্লুক বানাতে চাইছে! এত সাহস এরা পায় কোথায়? এই ক্ষমতার উৎস কি?

আমাদের দেশের পরিবহন জগতটা যে একদল মাফিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটা তো নতুন কিছু নয়। এরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে পুরো দেশ অচল করে দিতে পারে, বিশ কোটি মানুষকে জিম্মি করে ফেলতে পারে। এদের ছত্রছায়ায় থেকে পরিবহণ শ্রমিকদের অনেকেও নিজেদের ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইন মনে করছে ইদানিং, হোলি খেলার মতো করে তারা কালি মাখিয়ে দিচ্ছে আমাদের গালে। আর আমরা নির্যাতিত, নিপীড়িত জনতা বসে আছি ভ্যাবলার মতো, আমাদের যেন করার কিছুই নেই! আসলেও হয়তো নেই। এই জিম্মি অবস্থা থেকে উদ্ধার পাবার আশাও তাই ছেড়ে দিয়েছি।

এই মাফিয়ারা কতটা ক্ষমতাশালী সেটা তো আমরা জানিই। আনিসুল হকের মতো মানুষকে এরা জিম্মি করে ফেলেছিল, যখন তিনি অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করতে গিয়েছিলেন। আনিসুল হক সাহসী ছিলেন, স্মার্ট ছিলেন, তাই তার সামনে পাত্তা পায়নি এরা। কিন্ত ঠিকই পেয়ে বসেছে আমাদের ওপরে।

অহনার এই ঘটনাটা কেবল অনেকগুলো উদাহরণের একটা মাত্র। হানিফ পরিবহনের চালক আর সহকারীর যাত্রী খুনের ঘটনাটা স্মরণ করুন, মনে করে দেখুন চলন্ত বাসে ধর্ষণের ঘটনাগুলো, কিংবা চট্টগ্রামে ভাড়া নিয়ে বাদানুবাদের পরে এক যাত্রীকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করার ঘটনাগুলো। জবাবটা পেয়ে যাবেন। আমরা বাস করছি মগের মুল্লুকে, আমরা বেঁচে আছি নির্যাতিত হবার অপেক্ষায়। আজ অহনার সাথে যেটা ঘটেছে, সেটা কাল আমার-আপনার সাথেও ঘটবে। অপেক্ষায় থাকুন শুধু…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button