সিনেমা হলের গলি

ডায়াবেটিস আর হাইপারটেনশনের চিকিৎসায় কি ৩৫ লাখ টাকা লাগে?

বাংলা সিনেমায় তিনি ছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ‘চৌধুরী সাহেব’, চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের একমাত্র কর্ণধার। কতবার নায়কের স্বপ্ন ভাঙার চেষ্টা করেছেন কূটকৌশল দিয়ে! ক্যারিয়ারে আটশোর বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, খ্যাতি পেয়েছেন খল চরিত্রে দারুণ অভিনয়ের কারণে। অভিনেতা আহমেদ শরীফের কথা বলছি। বেশিরভাগ সিনেমায় নায়িকার ধনাঢ্য বাবার চরিত্রে অভিনয় করলেও, কিছুদিন আগেই আমরা জানতে পারলাম, বাস্তবে তিনি নাকি অর্থকষ্টে ভুগছেন! পর্দায় টাকার গরম দেখানো এই মানুষটার এখন নিজের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও নেই!

শিল্পীবান্ধব হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুনাম আছে। এর আগেও অনেক অসহায় কিংবদন্তী শিল্পীকে তিনি নিজের তহবিল থেকে সাহায্য করেছেন। প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার থেকে শুরু করে পরিচালক আমজাদ হোসেনসহ আরও অনেকেই পেয়েছেন এই সাহায্য। আহমদ শরীফের বেলায়ও ব্যতিক্রম ঘটলো না, তাকে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকা অর্থসাহায্য দেয়া হলো চিকিৎসার জন্যে।

তবে এই অর্থসাহায্যের খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। অনেকেই দাবী করেন, আহমেদ শরীফ জালিয়াতির মাধ্যমে সবাইকে বোকা বানিয়ে এই পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকা অর্থসাহায্য নিয়েছেন। তার অসুস্থতাটা কি, সেটা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে সিনেভিত্তিক বেশ কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপে, কারণ যেদিন প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে তাকে পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকার চেক দেয়া হয়, সেদিনই তিনি এক প্রযোজকের বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন সস্ত্রীক, এবং সেখানে তাকে দেখে কারো কাছেই অসুস্থ বলে মনে হয়নি।

এরপরে সবার নজরে আসে আরও চাঞ্চল্যকর এক তথ্য, যেটা অনেকেই হয়তো জানতেন না। আহমেদ শরীফের বড় ভাই বিজিএমই’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। ডেনিম গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন আহমেদ শরীফ। উত্তরায় তার হাউজিং ব্যবসাও আছে। ডেনিম গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর পদে থাকার পরেও তার টাকার অভাব, এবং অভাবের কারণে তিনি নিজের চিকিৎসা করাতে পারছেন না- এই তথ্যটা মোটামুটি অবিশ্বাস্য!

আরও জানা যায়, চেক জালিয়াতির মামলায় আহমেদ শরীফকে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল আদালত। ২০১৫ সালে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, ১ লক্ষ ৬৭ হাজার টাকার চেক জালিয়াতির অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। জামিনে থাকা এই অভিনেতা আদালতে হাজিরা না দেয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন আদালত।

কেউ কেউ আহমেদ শরীফের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকে কটুক্তি করার অভিযোগও এনেছেন, যদিও সেটা এখনও প্রমাণীত হয়নি। তবে রাজনৈতিকভাবে তিনি ছিলেন বিএনপির মতাদর্শে বিশ্বাসী, বিএনপির সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট জাসাসের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন একটা সময়ে। কুষ্টিয়া থেকে পৌর মেয়র নির্বাচনও করতে চেয়েছিলেন আহমেদ শরীফ, শহরজুড়ে পোস্টার লাগানো হয়েছিল তার নামে, করা হয়েছিল মাইকিং। তবে রাজনৈতিকভাবে বিপরীত মেরুর বাসিন্দা হলেও, আহমেদ শরীফের অসহায় অবস্থার কথা শুনে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, এবং পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকা অর্থসাহায্য দেয়া হয়েছে তাকে।

জালিয়াতি করে অনুদানের টাকা নিয়েছেন কিনা, এই বিষয়ে আহমেদ শরীফ বলেছেন, এগুলো ভিত্তিহীন অভিযোগ। নিজের অসুস্থতা সম্পর্কে তার দাবী, তিনি ডায়বেটিস, হাইপারটেনশন সহ আরও অনেক অসুখে ভুগছেন, সবগুলোর নামও মনে করতে পারেননি তিনি। অনেক আগে শুটিং করতে গিয়ে পা ভেঙে গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন আহমেদ শরীফ, আর তিনি প্রশ্ন করেছেন, ৭৪ বছর বয়সে একটা মানুষ কতটাই বা সুস্থ থাকতে পারে?

আমরাও আহমেদ শরীফের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, চুয়াত্তর বছর বয়স হলেই যে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে অনুদানের জন্যে আবেদন করতে হবে, এই নিয়ম কে বানিয়েছে? আটশো সিনেমায় অভিনয় করেছে আহমেদ শরীফ, নায়ক হয়তো ছিলেন না, কিন্ত খল অভিনেতার পারিশ্রমিক তো দুই-চারশো টাকা হওয়ার কথা নয়। এই যে পাঁচ দশক ধরে তিনি অভিনয় করলেন, এখনও করে চলেছেন, তার কি কোন সঞ্চয় নেই? ডেনিমের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে তার আয় কত? প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে দুস্থ আর অসহায় শিল্পীদের সাহায্য পাবার কথা, আহমেদ শরীফ কি এই তালিকায় পড়েন?

প্রধানমন্ত্রীর দফতরের যেসব কর্মকর্তা কাকে অনুদান দেয়া হবে আর কাকে দেয়া হবে না- এই সিদ্ধান্তগুলো নেন, তাদেরও জবাবদিহি করার সময় এসেছে। এর আগে অভিনেতা আফজাল শরীফকে বিশ লক্ষ টাকা দেয়া হয়েছিল চিকিৎসার জন্যে, পরে জানা গেল, ঢাকা শহরে তার পাঁচতলা একটা বাড়ি আছে! পাঁচতলা বাড়ির মালিককে কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাত পাততে হবে সাহায্যের জন্যে? এই সাহায্যটা তো দুস্থ শিল্পীদের পাবার কথা। কত অসহায় শিল্পী আছেন, প্রচারের আলোর বাইরে ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটাচ্ছেন, আর এদিকে আফজাল শরীফ বা আহমেদ শরীফরা সম্পদের মালিক হবার পরেও শুধু ‘শিল্পী’ হবার সুবিধা নিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন অনুদানের টাকা!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button