সিনেমা হলের গলি

একজন কিংবদন্তীর প্রস্থান ও আমাদের ঋণ শোধ না হবার যন্ত্রণা!

সকালটা শুরু হলো একটা দুঃসংবাদ দিয়ে। একাত্তরের রণাঙ্গণের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রখ্যাত সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন আজ ভোরে। একুশে পদক, রাষ্ট্রপতি পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার সহ আরও অনেক সম্মানে ভূষিত হওয়া মানুষটা একদম হুট করেই চলে গেলেন অজানায়। ফেসবুকে এখন শোকের ছায়া নামছে, সবাই দলবেঁধে আহা আহা করবে, মৃতদেহ শহীদ মিনারে আনা হলে ফুলের সম্ভারে ঢেকে যাবেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। অথচ কেউ স্মরণ করবে না যে এই মানুষটাই জীবনের শেষ দিনগুলো গৃহবন্দী অবস্থায় কাটিয়েছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন কিংবদন্তী সুরকারকে তার প্রাপ্য মর্যাদার ছিটেফোঁটাও দিতে পারিনি আমরা- এই সত্যি কথাটা হয়তো কারো মুখে উঠে আসবে না!

এই মানুষটাকে প্রথম দেখেছিলাম ক্লোজআপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ নামের একটা অনুষ্ঠানে। সেখানে তিনি ছিলেন বিচারক। মাথায় উশকো খুশকো লম্বা চুল, কি মিষ্টি করে আর প্রচণ্ড মমতা নিয়ে তিনি কথা বলেন প্রতিযোগীদের সঙ্গে। প্রত্যেকটা মেয়েকে তিনি ‘মা’ বলে ডাকেন। জানলাম, সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ কিংবা ‘সেই রেললাইনের ধারে’র মতো বিখ্যাত গানগুলোর সুরকার তিনি। এগুলো ছাড়াও অনেক বিখ্যাত সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনাও করেছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তারও অনেক পরে তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টা জেনেছিলাম।

মানুষটা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। মাত্র পনেরো বছর বয়স তখন তার। ১৯৭১ সালে দেশটাকে যখন খুবলে খাচ্ছে পাকিস্তানী জান্তারা, তখন মাতৃভূমিকে রক্ষার তাগিদে মাত্র পনেরো বছরে কিশোর ইমতিয়াজ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। বয়স কত, ছোট্ট শরীরটা নিয়ে বন্দুক ধরতে পারবেন কিনা, এসব কিছুই তখন ভাবেননি তিনি। শুধু মাথায় ছিল, যেভাবেই হোক, দেশকে হানাদারমুক্ত করতে হবে। হয়তো সেটাই তার ভুল ছিল।

একাত্তরের পঁচিশে মার্চের ক্র‍্যাকডাউনের পরে বিহারীদের অস্ত্র ছিনতাই করে পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েছিলেন কিশোর আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। জিঞ্জিরায় পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধও করেছিলেন সেই সময়। পরে বড় ভাই এবং ক্র‍্যাক প্লাটুনের গেরিলা ইফতেখার উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে ঢাকার ভেতরে কয়েকটা গেরিলা অপারেশনে অংশ নেন তিনি। বয়সে কিশোর হওয়ায় শহরে চলাফেরায় একটা বাড়তি সুবিধা পেতেন তিনি। ঢাকা থেকে পরে ভারতে চলে গিয়েছিলেন তিনি, নিয়েছিলেন প্রশিক্ষণ।

ইয়াং প্লাটুনের এই বীর যোদ্ধা কয়েকবার পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন, শিকার হয়েছিলেন অমানবিক নির্যাতনের। রমনা থানায় আটকের পরে তাকে নির্যাতন করতে করতে পিঠ আর পায়ের পেছনের চামড়া তুলে ফেলা হয়েছিল। ব্রাক্ষণবাড়িয়া কারাগারে তিনি যখন আটক ছিলেন, তখন সেখানে ঘটেছিল এক মর্মান্তিক গণহত্যা।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া গণহত্যা, গোলাম আজম

ঈদের দিন রাতে শহীদ সিরু মিয়া দারোগা এবং তার সন্তান শহীদ কামাল আনোয়ার এবং শহীদ নজরুল সহ আটত্রিশজন বন্দীকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী সেনারা। গণকবরে পুঁতে রাখা হয়েছিল সবার লাশ। সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, তার চোখের সামনেই জেলখানার সেল থেকে এই মানুষগুলোকে বের করে নিয়ে গিয়েছিল হানাদার আর রাজাকারেরা। ওদের কেউ আর ফিরে আসেননি। সেই নির্মমতার সাক্ষী ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

২০১৩ সাল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে তখন দেশ উত্তাল। শাহবাগে তরুণেরা একত্রিত হয়ে কাদের মোল্লার বিচারের আইন পরিবর্তন করিয়ে নিয়েছে। এই মানুষটা সেই উত্তাল সময়ের বছরখানেক আগে ১৯৭১ সালে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার জেলে ঘটে যাওয়া জঘণ্য গণহত্যার ঘটনায় সাক্ষ্য দিতে দাঁড়িয়েছিলেন ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায়। সাতচল্লিশ বছর আগের সেই ঘটনার দিনে প্রাণে বেঁচে যাওয়া পাঁচ ভাগ্যবানের একজন ছিলেন তিনি। হয়তো এই বেঁচে থাকাটাই তার জন্যে কাল হয়েছিল, অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে যাওয়াটাই তার ভুল ছিল…

যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমের মামলার চৌদ্দ নম্বর সাক্ষী ছিলেন তিনি। নির্মম আর নিষ্ঠুর এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ট্রাইব্যুনালে কেঁদেছিলেন তিনি, কাঁদিয়েছিলেন সবাইকে। এই সাক্ষ্য দেয়াটাই কাল হয়েছিল তার জীবনে। তার ছোটভাই মিরাজকে আততায়ীরা খুন করেছিল, এর পেছনে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষ্য দেয়াটাই মূল কারণ হতে পারে বলে জানিয়েছিল পুলিশ।

তার ওপর হামলার ঝুঁকি থাকায় সরকারের তরফ থেকে তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার বাসায় সার্বক্ষণিক পুলিশি প্রহরা বসানো হয়। যখন যেখানে খুশী যেতে পারেন না তিনি, জরুরী প্রয়োজনে কোথাও গেলেও সাথে থাকে পুলিশ। সর্বক্ষণ একটা আতঙ্ক থাকে, আশেপাশেই কোথাও বুঝি লুকিয়ে আছে আততায়ী!

অস্ত্র হাতে যে দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, সেই দেশেই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না তিনি, গত ছয়/সাত বছর ধরে। আর যে রাজাকারদের বিরুদ্ধে একাত্তরে অস্ত্র ধরেছিলেন তিনি, যে নরপিশাচগুলো সেই সময়ে পাকিস্তানীদের সাহায্য করেছিল ত্রিশ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে আর দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত লুট করতে, তাদের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়েছে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মতো মুক্তিযোদ্ধাকে!

কত বিখ্যাত গানে তিনি সুর দিয়েছেন, সেটা গুণে শেষ করা যাবে না। বাংলাদেশের আর কোন সুরকারের ভাণ্ডারে এত জনপ্রিয় গান নেই, নেই হয়তো পুরো বিশ্বে আর কারোই। সব ক’টা জানালা খুলে দাও না, সেই রেললাইনের ধারে, মাঝি নাও ছাইড়া দে, সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবন্য, আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি, আমার বুকের মধ্যেখানে, আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান, আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে, আম্মাজান আম্মাজান- তালিকাটা শেষ করতে গেলে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হবে নিশ্চিত। একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দিয়ে কি তার ঋণ শোধ করা যাবে? তাকে আমরা স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দিতে পারিনি, এসব পদক-পুরস্কার পেয়ে তাহলে কি লাভ হলো তার?

এদেশে রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওঠে, তারা এমপি-মন্ত্রী হয়! এদেশে রাজাকারের ফাঁসির রায় হলে মিথ্যে গুজব ছড়িয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়, লোক ভাড়া করে এনে রাজাকারের জানাজা পড়ানো হয় দেশের জাতীয় মসজিদে, রাজাকারের কবরে ‘শহীদ’ লেখা ফলক লাগানো হয়! অথচ সেই দেশের সূর্যসন্তান, একজন মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে জীবনের শেষ বছরগুলোতে অনেকটা গৃহবন্দী হয়ে থাকতে হয়েছে এই স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির কারণে! এই লজ্জা আমরা কোথায় লুকিয়ে রাখব? ফেসবুকের শোকের মিছিল কিংবা শহীদ মিনারের ওই ফুলের স্তবকগুলো তো এই গুণী মানুষটার প্রতি টিটকারির মতোই মনে হবে এখন!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button