সিনেমা হলের গলি

‘আহা রে’-তে মুগ্ধতা ছড়ানো অন্য এক আরিফিন শুভ!

নেপথ্যে পরাণ বন্দোপাধ্যায় ভরাট গলায় বলে চলেছেন- ‘আসলে ভালোবাসা কি জানতো ভায়া? অনেকটা ঠিক ওই ম্যাজিকের মতো! আড়াই মিনিটের একটা ট্রেলার দেখার পরেও মনে হলো, ম্যাজিক্যাল কিছুই দেখলাম না তো? ‘আহা রে’ সিনেমার ট্রেলারের কথা বলছিলাম, আরিফিন শুভ টালিগঞ্জে পা রাখতে চলেছেন যে সিনেমাটা দিয়ে। ট্রেলার মুক্তি পেয়েছে বেশ কয়েকদিন আগেই, সেটা নিয়ে লিখতেই দেরী হয়ে গেল। কথায় আছে, বেটার লেট দ্যান নেভার- তবে তাই হোক!

গল্পটা প্রেডিক্টেবল, সেটাকেই ভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশনের একটা অন্যরকম চেষ্টা দেখা গেল পরিচালক রঞ্জন ঘোষের মধ্যে। সিনেমার গল্প এবং চিত্রনাট্যও তারই লেখা। পরিবেশনার জোরে যে সাধারণ ডালভাতও দারুণ মুখরোচক খাবার হয়ে উঠতে বাধ্য, সেটা হয়তো নতুন করে বুঝিয়ে দিতে আসছে ‘আহা রে’। শুভ’র সহশিল্পী হিসেবে সিনেমায় আছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত এবং পরাণ বন্দোপাধ্যায়ের মতো দাপুটে অভিনেতারা। ঋতুপর্ণা আবার সিনেমার প্রযোজনাও করছেন!

‘আহা রে’ সিনেমার গল্পে বড় একটা অংশ জুড়ে আছে রান্না। ঋতুপর্ণা এখানে একটা ক্যাটারিং সার্ভিস চালান, মোটামুটি ঘরোয়া আয়োজন। শুভ’র চরিত্রের নাম ফারাজ চৌধুরী, ঢাকার ছেলে, পেশায় রাঁধুনি। সেই রান্নার তেল নুন পেঁয়াজ মশলার মাপে গল্প এগিয়ে যায় সামনের দিকে, সেখানে প্রেম জমে, আসে অপ্রেমের গল্পও। দুটো মানচিত্রের ভেদাভেদ মুছে যাওয়ার প্রাক্কালে আবার বয়স কিংবা ধর্মের বেড়াজাল বড় হয়ে ওঠে কারো চোখে। মিলন আর বিচ্ছেদ যেখানে পাশাপাশি বাস করে, সেই মূহুর্তটার গল্প নিয়েই নির্মিত হয়েছে ‘আহা রে’।

ট্রেলারে আরিফিন শুভকে দেখে একটু হোচট খেলাম। এমনিতে শুভ ভীষণ আকর্ষণীয় দেখতে, সেটা তার নিন্দুকেও স্বীকার করবে। তবে ‘আহা রে’ সেটাকে অন্যরকম একটা মাত্রা দিয়েছে। রোমান্টিক বা অ্যাকশন হিরোর ইমেজ ছেড়ে একদমই আলাদা একটা মূর্তি এখানে শুভ’র। হিরোইজম নেই, পুতুপুতু টাইপের রোমান্টিক ডায়লগ নেই, একদমই সাদামাটা একটা ইমেজ তার চরিত্রটার, আর সেটার সঙ্গে দারুণ মানিয়ে গিয়েছেন শুভ। ভরাট গলায় দেয়া সংলাপগুলোও শুনতে দারুণ লেগেছে।

রান্নায় যেমন মশলার পরিমানটা ঠিকঠাক না হলে পুরোটাউ বেখাপ্পা মনে হয়, সিনেমাটাও তেমনই। কোন কিছুর বেশি বা কম হলেই সেটা অখাদ্যে পরিণত হয়। আহা রে এই জায়গাটাতেও ভীষণ সতর্ক, সবকিছুতেই পরিমিতির ছাপ স্পষ্ট। সেই পরিমিতিবোধটা চোখে পড়ে শুভ’র অভিনয়ে, তার অভিব্যক্তিতে, এমনকি সংলাপেও।

ট্রেলারটা দেখে আক্ষরিক অর্থেই মুখ থেকে ‘আহা রে!’ শব্দটা বেরিয়ে এলো। সেটার সঙ্গে অনেকটা আফসোসও মিশে ছিল। আরিফিন শুভ’র সবশেষ দুটো সিনেমার কোনটাই দর্শককে তৃপ্ত করতে পারেনি। একটি সিনেমার গল্প তো মোটামুটি গার্বেজ ছিল, ‘ভালো থেকো’ও পূরণ করতে পারেনি প্রত্যাশা। শুভ কলকাতায় গেলেন, অমনি যেন সবকিছু বদলে গেল! অভিনয়ের সেই ন্যাকামী নেই, নেই বাড়তি কোন প্রলেপ, আতিশয্যের উপস্থিতিও শূন্যের ঘরে।

আড়াই মিনিটের এই ট্রেলার আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, আমাদের দেশের বেশিরভাগ নির্মাতাই শিল্পীদের ব্যবহার করতে পারেন না ঠিকমতো। এই ঋতুপর্ণার সঙ্গেই শুভ ‘একটি সিনেমার গল্প’ করেছিলেন, সেটার নির্মাণ আর আহা রে’র নির্মাণকে মেলান, আকাশ পাতাল তফাত! এক বছরের মধ্যে আরিফিন শুভ নিজেকে আমূল বদলে ফেলেননি, অভিনয়ে বিশাল পারদর্শী হয়ে যাননি। শুধু তাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, নতুন একটা এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে, যেটা আমাদের দেশের নির্মাতারা এর আগে শুভ’কে নিয়ে করেননি কখনও। এর আগে শাকিব খান যখন কলকাতায় গেলেন, তখনও এই একই ব্যাপারটাই ঘটেছে, এখনও ঘটছে।

শুভ’র নিজেরও সচেতন থাকাটা খুব দরকার এসব জায়গায়। স্ক্রিপ্ট চয়েজ ব্যাপারটা যে কোন অভিনেতাকে চূড়ায় ওঠাতে পারে, আবার খাদেও নামিয়ে ফেলতে পারে। আহা রে’র ট্রেলারে শুভ’র কণ্ঠে যেমন আমরা শুনতে পাই- ‘রান্নার জন্যে রুলসটা আসলে জরুরী নয়, জরুরী হচ্ছে ইম্যাজিনেশন। ভালো রান্না আর খারাপ রান্নার মধ্যে এটাই পার্থক্য এনে দেয়।’ ঠিক তেমনই দুর্দান্ত অভিনেতা হওয়ার চাইতেও যেটা বেশি জরুরী, সেটা হচ্ছে চিত্রনাট্য বাছাইয়ের বেলায় পারদর্শী হওয়াটা। ভালো অভিনেতা বা ভালো পরিচালক নন, সিনেমার গুণাগুণ ঠিক করে চিত্রনাট্য। ভালো সিনেমা আর খারাপ সিনেমার মধ্যে এটাই পার্থক্য গড়ে দেয়।

এরপরেও কথা থেকে যায়। আড়াই মিনিটের ট্রেলার বানানো আর দুই ঘন্টার সিনেমা বানানো তো এক জিনিস নয়। সিনেমা দেখলেই বোঝা যাবে, ভিন্নধর্মী এই নীরিক্ষা কতটা সফল হলো। ‘আহা রে’ কলকাতায় মুক্তি পাবে ফেব্রুয়ারীর আট তারিখে। তবে তার আগে মুগ্ধতা ছড়ানোর জন্যে ‘আহা রে’ টিম আর আরিফিন শুভ ধন্যবাদ পেতেই পারেন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button