রিডিং রুমলেখালেখি

পৃথিবী জয়ের মুকুট যেভাবে পাকাপাকিভাবে মানুষের মাথায় চলে আসলো!

পৃথিবীর মানুষ একটা সময় প্রাণী শিকার করত, এরপর ভক্ষণ করত। পরদিনের রুটিন গতদিনের মতোই। হোমো সেপিয়েন্স (মানুষ) বাদে অন্য প্রজাতিগুলো (হোমো নিয়েনডারথালস, হোমো ইরেক্টাস, হোমো এরগেস্টার) শিকারের পাশাপাশি ডুমুর সংগ্রহ করত। কিন্তু তারা কখনোই মাথা ঘামায়নি কীভাবে ডুমুরের চাষ করা যায়। হোমো সেপিয়েন্স আগুন আবিষ্কার করল। শুধু আগুনের ব্যবহার শিখে ফেলায় অন্য প্রজাতিদের চেয়ে এক লাফে এগিয়ে গেল সহস্র বছর। দ্বিতীয় লাফটা ছিল কৃষি বিপ্লব। খুব সহজ দুটো প্রশ্ন কিন্তু হ্যাভ আ ডিপ ইনসাইডার। ফলে অন্যপ্রজাতিগুলো আর হোমো সেপিয়েন্সের সাথে পাল্লা দিতে পারেনি। না যুদ্ধে, না জ্ঞানে। মানুষ অল্প অল্প করে চাষাবাদ শুরু করল। হোমো সেপিয়েন্সরা তার সাধ্যের সবটুকু জ্ঞান এবং সময় ব্যয় করে শুরু করল বিভিন্ন বীজের চাষ। সারাদিন পানি দেয়, আগাছা পরিষ্কার করে। ভেড়ার পাল চরাতে নিয়ে যায় দূর পর্বতে। যেখানে তারা ঘাস ও খাবার পায়।

খেয়াল করেছেন? ভেড়ার পালের কথা? ভেড়ার পাল কিংবা মেষের কথা আসলে শুরুতেই মাথায় আসে মধ্যপ্রাচ্য। সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, তুরষ্কের কথা। উত্তপ্ত, উষর মরুভূমির কথা। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হল- এখানেই প্রথম কৃষি বিপ্লব ঘটে। তুরস্ক, ইরান কৃষিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল গোটা বিশ্বে। তারাই প্রথম ছাগল পোষ মানানো শুরু করে। গমের চাষ শুরু করে। এরপর ক্রমে ক্রমে আসে মটর>মসুর> জলপাই> ঘোড়া পালন> আঙ্গুরের চাষ> উট> কাজুবাদাম চাষ। বিজ্ঞানীরা শুরুতে ধারণা করতেন পৃথিবীর একটিমাত্র অংশেই কৃষিবিপ্লব ঘটে। পরবর্তীতে নানান চিহ্ন ও ফসিল থেকে ধারণা পাওয়া যায়- মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি পৃথিবীর অন্য এলাকাগুলোতেও স্বাধীনভাবে চাষাবাদ শুরু হয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে যখন গম আর ডালের চাষ শুরু হয়েছে, তখন মধ্য আমেরিকায় ভুট্টা ও মটরশুটির চাষ চলছিল। অথচ কেউ কারো সম্পর্কে কিছু জানত না। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার মানুষরা তখন লামা নামক পশুর পালকে পোষ মানিয়ে ফেলে। আলু চাষ শুরু করে। যেহেতু যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা ছিল না এবং বাসিন্দারা মনে করত তাদের পৃথিবী তাদের এলাকাতেই সীমাবদ্ধ, তাই তখন মেক্সিকোতে কী ঘটছিল কেউ জানে না। ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় কী ঘটছে এটা জানত না তুন্দ্রার বাসিন্দারা। অস্ট্রেলিয়ায় কী ঘটছে জানত না প্রাচীন মিসরীয়রা। কী অসাধারণভাবে পুরো পৃথিবী বৈচিত্র্যময়ভাবে আলাদা আলাদা পথে কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল!

কেন মধ্যপ্রাচ্যেই কৃষি বিপ্লব ঘটল? তুন্দ্রা এলাকায় মানুষরা লোমশ ম্যামথ শিকার করে, যা অতিকায় প্রাণী। তাকে পোষ মানানো সহজ নয়। কিংবা বল্গা হরিণ, দ্রুতগামী ও ভীতু প্রাণী। তাকে পোষ মানানোর চেষ্টা করার অর্থ আত্মহত্যা করা। ছত্রাকজাতীয় খাবার অধিকাংশই বিষাক্ত এবং দুষ্প্রাপ্য। আর অতিকায় প্রাণীরা? তারা হিংস্র। ফলে অন্য কোথাও প্রাণীদের গৃহপালিত বানানো সম্ভব হয়নি। তুন্দ্রায় বরফের মাঝে চাষাবাদ শুরু করাও সম্ভব হয়নি। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যে ছিল নিরীহ ভেড়া আর অবিষাক্ত গম-ডালের সমাহার। চাইলেই তাদের পোষ মানানো যায়, চাষাবাদ করা যায়। উট কিংবা ঘোড়া অতিকায় হলেও তারা নিরীহ। সহজেই পোষ মানানো সম্ভব ছিল এবং বছরের একটা দীর্ঘ সময় এসব এলাকায় গম ও মসুরে ভরে থাকত। ফলে তারা শিকারে কঠিন খোলস ছেড়ে সহজলভ্য কৃষির দিকে ঝুকে পড়ে।

হোমো সেপিয়েন্স বাদে অন্যরা দূরদূরান্ত থেকে কুড়িয়ে আনত ডুমুর। আর হোমো সেপিয়েন্সরা কুড়িয়ে আনার উপর নজর না দিয়ে ঘরের পাশে লাগিয়ে ফেলল ডুমুরগাছ। থিংকির আউটসাইড দ্যা বক্সের জন্যই মানবপ্রাজাতি এক লাফেই উঠে পড়ে সম্রাজ্যের চুড়ায়। অন্য সহপ্রজাতিদের থেকে এগিয়ে যায় বহু দূর। পৃথিবী জয়ের মুকুট পাকাপাকিভাবে হোমো সেপিয়েন্সদের (মানুষের) মাথায় চলে আসে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button