খেলা ও ধুলা

ক্রিকেটের খেয়ালী রাজপুত্র ও টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ!

ফেসবুকে হালের অন্যতম জনপ্রিয় ট্রেন্ড হচ্ছে ‘টেন ইয়ার্স চ্যালেঞ্জ’। কোন মানুষ কিংবা বিষয়ের ১০বছর আগের ও পরের অবস্থা নিয়েই মূলত এই চ্যালেঞ্জ। সেদিন এই চ্যালেঞ্জেই একজনকে লিখতে দেখলাম, ‘২০০৯ সালে ২১/২২ বছরে আমি যখন ভার্সিটিতে পড়তাম আফ্রিদি তখন ছিলেন ২১/২২ বছরের তরুণ। এখন ২০১৯ সাল, আমার ছেলে স্কুলে ভর্তি হয়েছে, আফ্রিদি এখনও সেই ২১/২২ বছরের তরুণই আছেন!’

কেউ কেউ আবার ২০০৯ সালে আফ্রিদির একটা ছবি পোস্ট করে ২০১৯ সালের বেলায় পোস্ট করেছেন ঝাকাভরা হাসের ডিমের ছবি। যা দিয়ে আসলে সময়ানুবর্তী আফ্রিদির দ্রুত মাঠে গিয়ে কোন রান না করেই দ্রুত প্যাভিলিয়নে ফিরে আসার শিশুসুলভ খেয়ালের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

সত্যিই, আফ্রিদির এই চিরসবুজ রূপ, শিশুসুলভ খেয়ালীপনা আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। চিরতরুণ আফ্রিদিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে তার খেয়ালী মন। ক্রিকেট নামক খেলাটির ইতিহাসে তার চেয়ে খেয়ালী কোন ক্রিকেটার এখনো পর্যন্ত এসেছে কি না তা ভেবে দেখার বিষয়। ব্যাটিং, বোলিং কিংবা ফিল্ডিং নয়। খেয়ালী আফ্রিদি আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটাকে নিয়ে খেলেছেন সেটি হচ্ছে ‘অবসর’।

২০০৬ সালের ১২ এপ্রিল। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সেদিন ছিল এক কাল দিন। কারণ এদিনই টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন টেস্ট ক্রিকেট নামক খেলাটিকে নিজেকেই কখনই যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে না পারা পাকিস্তানের মারকুটে ব্যাটসম্যান শহীদ আফ্রিদি। যদিও নিজের ভুল বুঝতে মাত্র সপ্তাহদুয়েক সময় নেন তিনি। ২৭এপ্রিলই জানা যায় টেস্ট ক্রিকেট ছাড়ছেন না আফ্রিদি। যদিও তিনি না ছাড়লেও টেস্ট ক্রিকেট তাকে ধরে রাখতে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। মাত্র ১৪দিনে অবসর ভেঙ্গে ফিরে আসার পর দীর্ঘ ৩ বছরেও আর টেস্ট ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাননি তিনি। এবং ২০১০ সালে ফিরে এসেই গুটিকয়েক টেস্ট খেলে আবারো বিদায় বলে দেন সাদা পোষাকের ক্রিকেটকে।

সেই ২০০৬ এ শুরু। এরপর অবসর নেয়া আর অবসর ভাঙ্গার ব্যাপারটাকে যেন ‘ডাল-ভাত’ বানিয়ে ফেলেছেন তিনি। ২০০৬ সাল থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ৬বার অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন আফ্রিদি। এখনো পর্যন্ত ৫বার ফিরে এসেছেন অবসর ভেঙ্গে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে তৃতীয়বারের মত ‘চুড়ান্ত অবসর’ ঘোষণা করেছিলেন আফ্রিদি।

প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আজাদ দাবি করেছিলেন জীবনের প্রতিটি প্রেমই নাকি প্রথম প্রেম। শহীদ আফ্রিদি তেমন দাবি করতে পারেন তার জীবনের প্রতিটি অবসরই শেষ অবসর।

লোকমুখে প্রচলিত আছে, একবার এক ফাঁসির আসামীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মৃত্যুর আগে তার শেষ ইচ্ছা কী? লোকটি উত্তরে বলেছিল, ‘শহীদ আফ্রিদিকে ক্রিকেট থেকে চিরতরে অবসর নিতে দেখা!’ ভদ্রলোক এখনো জেলে বসে ফাঁসির আসায় প্রহর গুনছেন!

কথা বলে, একজন স্মোকার সিগারেট ধরে একবার, ছাড়ে বার বার। আফ্রিদির কাছে অবসর নামক ব্যাপারটিও অনেকটা নেশার মত। তিনি আসলে অবসর নিয়েছেন একবার, আর ভেঙ্গেছেন বার বার। অবসর নেয়া ব্যাপারটি যদি শিল্প হয় তবে নিঃসন্দেহে আফ্রিদি সেই শিল্পের পিকাসো।

সর্বশেষ ২০১৯ এর বিপিএল চলাকালীন সময়ে মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের এক হোস্ট মাঠে আফ্রিদিকে বলেছেন, ‘সামনেই তো ২০১৯ বিশ্বকাপ। আপনি তো এখনো দারুণ ফিট আছেন। বোর্ড যদি ডাকে আপনি কি সাড়া দেবেন?’ আফ্রিদি মুখে যদিও বলেছেন, ‘না না, তেমন কোন সম্ভাবনা আর নেই। ওসব এখন অতীত!’

যদিও ক্রিকেটের খেয়ালী রাজপুত্র আফ্রিদির ভক্তকূল তার এই কথাতে বিশ্বাস রাখতে নারাজ। তারা বিশ্বাস করেন আফ্রিদি আবারো ফিরে আসবেন অবসর শেষে, রবার্ট ব্রুস কিংবা হংসবীরের বেশে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button