খেলা ও ধুলা

আফ্রিদীরা জাতে মাতাল, তালে ঠিক!

সংযুক্ত আরব আমিরাতকে গত কয়েক বছর ধরেই নিজেদের হোমগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করছে পাকিস্তান ক্রিকেট দল। সেই আমিরাতের মাটিতে সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টানা দুই ওয়ানডে হেরেছে পাকিস্তান, আর তাতেই ক্ষেপেছেন ক্রিকেটে শূন্যের জনক, ধারক ও বাহক খ্যাত ‘সাহিবজাদা’ শহীদ খান আফ্রিদী। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে খেলতে নেমে পাকিস্তান কেন সিনিয়র কয়েকজন খেলোয়াড়কে বিশ্রামে রেখেছে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। পাকিস্তানের ব্যাপারস্যাপার নিয়ে আফ্রিদী প্রশ্ন তুলতেই পারেন, তাতে নাক গলানোর কিছু নেই আমাদের। কিন্ত নিজের দেশ, নিজেদের ক্রিকেট দল নিয়ে কথা বলার ফাঁকে সূক্ষ্মভাবে তিনি বাংলাদেশকেও অপমানের চেষ্টা করেছেন, তার কথাবার্তা শুনে মনে হলো, দিগ্বিজয়ী এক দলের হর্তাকর্তা হয়ে তিনি কোন এক তৃতীয় শ্রেণীর ক্রিকেট দলকে নিয়ে মন্তব্য করছেন, যারা কিনা সবেমাত্র ক্রিকেটটা খেলা শুরু করেছে!

আফ্রিদী কি বলেছেন সেটা আগে বলে নেয়া যাক। এক সংবাদ সম্মেলনে বেশ বিরক্তি সহকারেই তিনি অভিমত প্রদান করেছেন- “অস্ট্রেলিয়ার মতো একটা দলের বিরুদ্ধে খেলার সময় সেরা একাদশ নিয়েই মাঠে নামা উচিত। ‘খর্বশক্তির’ দল নিয়ে মাঠে নামার কোন মানে নেই। আজ যদি জিম্বাবুয়ে, বাংলাদেশ বা র‍্যাঙ্কিঙের ৭-৮ নম্বর দলের সঙ্গে খেলা থাকতো, তাহলে এই বিশ্রামটা মেনে নেয়া যেতো, কিন্ত অস্ট্রেলিয়ার সাথে সেটা মোটেই কাম্য নয়…”

আফ্রিদীর কথা শুনে মনে হচ্ছিল, পাকিস্তান বুঝি ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিঙের শীর্ষে আছে এখন! গুগল ঘেঁটে জানা গেল, তাদের অবস্থান এখন ছয়ে, রেটিং পয়েন্ট ১০২, তাদের ঠিক নিচেই আছে বাংলাদেশ, আমাদের রেটিং পয়েন্ট ৯০। ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিঙে ঠিক একধাপ ওপরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে এমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার পরিকল্পনা কিভাবে আফ্রিদীর মাথায় এলো, তিনিই ভালো জানেন। ক্রিকেটার হলেই যে ক্রিকেটীয় জ্ঞান টনটনে থাকবে, এমন কোন কথা নেই অবশ্য!

আচ্ছা, আফ্রিদী কি ২০১৫ বিশ্বকাপের পরে বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের খেলার ফলাফলগুলো জানেন? নাকি ক্রিকইনফো থেকে স্কোরকার্ডের স্ক্রীনশটগুলো নিয়ে তাকে মেইল করতে হবে? একটা সময় ক্রিকেটে পাকিস্তান আমাদের কাছে দুর্বোধ্য একটা প্রতিপক্ষ ছিল, সবাইকেই আমরা হারাতে পারতাম, শুধু পাকিস্তানের বিপক্ষেই কেন যেন আটকে যেতাম বারবার। সেই গেরোটা কেটেছে ২০১৫ সালে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত রঙিন পোষাকে সাতবার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল, ২০১৬ টি-২০ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের ম্যাচটা ছাড়া আর একবারও জিততে পারেনি মারখোরে ভর্তি এই দলটা।

ওয়ানডেতে গত চার বছরে চারবার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান, ২০১৫ সালে তিন ম্যাচের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ, ২০১৮ এশিয়া কাপের গ্রুপপর্বের ম্যাচে ৩৭ রানের হার- এই হচ্ছে পাকিস্তানের অর্জন। চার ম্যাচের চারটাতেই জিতেছি আমরা, এই সময়ে মুখোমুখি হওয়া তিনটা টি-২০ ম্যাচের দুটিতেই জিত আমাদের- এরপরেও আফ্রিদী কোন যুক্তিতে বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করেন? টাইগারদের সাথে খেলতে নামলে যে পাকিস্তানীরা এখন সম্মানজনক পরাজয়ের কথা মাথায় গেঁথে মাঠে নামে, সেটা কি আফ্রিদী ভুলে গিয়েছেন?

ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিঙের সেরা সাত দলের একটি পাকিস্তান, বাকী ছয় দলের বিরুদ্ধে তাদের পারফরম্যান্স কেমন? র‍্যাঙ্কিঙের সেরা ছয় দলের কোনটির বিপক্ষে পাকিস্তান সবশেষ ওয়ানডে সিরিজ জিতেছিল সেই ২০১২-১৩ সালে! ভারতের মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ১-২ ব্যবধানে সেবার জিতেছিল পাকিস্তান, গত সাত বছরে শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তান, জিম্বাবুয়ে আর বাংলাদেশ (২০১৪ সালে একবার) ছাড়া ‘বড়’ কোন দলের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিততে পারেনি তারা।

সেখানে এই সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ ঘরের মাটিতে ভারত-পাকিস্তান আর দক্ষিণ আফ্রিকাকে সিরিজ হারিয়েছে- এসব পরিসংখ্যান কি আফ্রিদী জানেন? তিনি নিজেও তো এই দিগ্বিজয়ী দলের সদস্য ছিলেন কিছুদিন আগেও, নিজেদের এমন অভাবনীয় কীর্তির কথা তিনি ভুলে গেলেন কি করে?

পাকিস্তানী ক্রিকেটারেরা জাতে মাতাল, তালে ঠিক। আফ্রিদীর কথাই ধরুন না, বাংলাদেশের মতো একটা ‘ছোট ক্রিকেটীয় শক্তির’ দেশে বিপিএল খেলার জন্যে মুখিয়ে থাকেন তিনি, কারণ এখানে কড়কড়ে নগদ টাকার লোভ আছে! টাকাপয়সা পেয়ে বাংলাদেশকে ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ হিসেবে ঘোষণা করে দিতেও আপত্তি থাকে না। তবে নেশা কেটে গেলে আবার বাংলাদেশকে ‘ছোট দল’ বলতেও তার সময় লাগে না। শিরোপা জেতার পরে আনন্দের আতিশয্যে আমাদের দেশের মন্ত্রীরা আফ্রিদীর বুকে জায়গা নেন, তবে আফ্রিদীরা যে বাংলাদেশকে কখনও আপন ভাবেন না, সেটা তো তাদের কথাবার্তাতেই প্রমাণ!

মুক্তিযুদ্ধের আগে আমরা যখন পাকিস্তানের অংশ ছিলাম, তখন পশ্চিমারা বলতো, ‘শালা মছুয়া বাঙাল, ভুখা-নাঙ্গা, তোরা কিসের ক্রিকেট খেলবি?’ শুধু তো ক্রিকেটই নয়, প্রতিটা জায়গাতেই তারা আমাদের অবজ্ঞা করতো, নিদারুণ অবহেলা আর নিষ্পেষণের শিকার হয়েছি আমরা যুগের পর যুগ ধরে। রাষ্ট্র হিসেবে আমরা এখন পাকিস্তানের চেয়ে ঢের উন্নত, খেলাধুলাতেও তাদের পেছনে ফেলেছি বিপুল ব্যবধানে- তবুও পাকিস্তানীদের নাকউঁচু স্বভাবটা যায়নি। আফ্রিদীদের এসব কথাবার্তা শুনলে মনে হয়, গায়ে একচিলতে কাপড় নেই ব্যাটাদের, আদুল শরীর দেখে দুনিয়া হাসাহাসি করছে- আর তারা ভাব দেখায় যেন হীরে-জহরতে গা মোড়ানো আছে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button