সিনেমা হলের গলি

চলুন, একটু অন্যরকম করে ভাবি…

রুম্মান রশীদ খান

এক যুগ আগের কথা। ইমরান খান তখন সবে ‘জানে তু ইয়া জানে না’ ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। আমির খানের ভাগ্নের কথা বলছি। তার মামা সে সময় বলিউডের প্রথম অভিনেতা হিসেবে কোনো চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হবার জন্য পারিশ্রমিক নিতেন না। বরং প্রযোজকের পকেট ভারী হলে সেখান থেকে একটি নির্দিষ্ট লভ্যাংশ মুক্তির আগেই দাবী করতেন। বলা যায়, আজ পর্যন্ত এই বাজিতে আমির খান কখনো হারেননি। সেই পথে শাহরুখ খান, সালমান খান অনেকেই হেঁটেছেন পরবর্তীতে। তবে সবাই কি আর একই ভাগ্য নিয়ে জন্ম নেয়? ইমরান খানও মামার দেখাদেখি সেই একই পথে হাঁটবার চেষ্টা করেছিলেন, ক্যারিয়ারের প্রথম ছবি থেকে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, হাতে গোনা ৩-৪টি ছবি বাদে বাকি সব ছবি থেকেই শূণ্য হাতে ফিরতে হয়েছিল তাকে। ইমরান খান দ্য আমির খানের ভাগ্নে। তিনি চাইলে তো যে কারো কাছ থেকে যে কোনো পারিশ্রমিক চাইতে পারতেন। প্রযোজকরাও সেই পারিশ্রমিক তাকে দিতে পারতেন। কারণ নায়কের পারিশ্রমিক দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে সারা বিশ্বেই নায়িকাদের থেকে বেশি থাকে। কিন্তু ইমরান খান কখনো সেটি চাননি। তার নীতি ছিল: লাভ হলে ভাগ দাও, লস হলে ক্ষমা করো। তিনি চাননি প্রযোজক পথে বসুক। বরং চেয়েছিলেন প্রযোজক বেঁচে থাকুক, সাথে থাকুক, তাতে ইন্ডাস্ট্রি বেঁচে থাকবে, কাজ বাড়বে, ভালো ভালো সিনেমা হবে।

নিশ্চয়ই ভাবছেন সিনে কড়চা লিখতে গিয়ে কেন বলিউড অভিনেতা ইমরান খানের কথা বলছি? ধান ভাঙতে শিবের গীত গাইবার কিছু কারণ অবশ্যই আছে। আর তা হলো: আমাদের অনেক তারকা অভিনয়শিল্পীর (সবাই নন) বাস্তবতা বিবর্জিত পারিশ্রমিক।

আমাদের বাজার কত বড়? একটি চলচ্চিত্র যদি ব্যবসাসফল হয়-ও প্রযোজকের পকেটে কত টাকা আসে? আর দেখছেনই তো, বেশির ভাগ চলচ্চিত্রই বক্স অফিসে ফ্লপ/ ব্যর্থ। তাহলে বলুন এই যে দিনের পর দিন প্রযোজক চলচ্চিত্র বিমুখ হচ্ছে, যারা ছিলেন তারা তো ফিরে যাচ্ছেনই, নতুন কোনো লগ্নীকারীও (সে যত বড় ধনকুবেরই হোক না কেন) চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হচ্ছেন না; এর জন্য আপনিও কি কিছুটা দায়ী নন? দুই-একটি সিনেমার অভিনয়শিল্পী, হয়তো এককভাবে একটি হিট সিনেমায় অভিনয় করেছেন, তারা কেন ১৫-২০ লাখ টাকা পারিশ্রমিক চাইবেন?

ডজনখানেক ফ্লপ ছবির শিল্পী, ৭/৮ বছর আগে ১টি-২টি হিট ছবি উপহার দেয়ার রেকর্ড টেনে ৮-১০ লাখ টাকা পারিশ্রমিক চাইছেন।কেন? একটিও হিট ছবি দিতে পারছেন না, অথচ ৪-৫ লাখ টাকা চাইছেন, কেন? বাদ দিন প্রথম সপ্তাহের কথা, আপনার নাম কিংবা আপনার তারকা স্ট্যাটাস কি প্রথম তিন দিনের বক্স অফিস গ্যারান্টি দিতে পারছে? আচ্ছা প্রথম তিনদিনও বাদ দিন, মুক্তির প্রথম দিনও কি আপনার ছবি সব কটি প্রেক্ষাগৃহে ঝড় তুলতে পারছে? আপনার একটি নাম কি টিকেটের লম্বা লাইনের কারণ হতে পারছে? যদি না-ই পারে, এত আকাশ ছুঁই পারিশ্রমিক দাবী করাটা কি অন্যায় নয়?

সিনেমার বাজারটা আমরা সবাই মিলে বড় করি, দেশ বিদেশে ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি হোক, তখন আমরাও বলিউডের শিল্পীদের মত পারিশ্রমিক দাবী করতে পারবো। এখন কেন? ৯ বছর অভিনয়ের পর এখন রনবীর সিং তার নতুন ছবি ‘83’ কিংবা ‘Takht’-এর জন্য ছবির লভ্যাংশ দাবী করেন। কেন? কারণ তিনি দেখেছেন তার সর্বশেষ সব ক’টি ছবি বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে, প্রযোজকের মুখে হাসি ফুটিয়েই তিনি নিজের অন্নের কথা ভাবছেন। প্রযোজককে পথে বসিয়ে না।

শাকিব খান এখন ছবি পিছু উচ্চ পারিশ্রমিক হাঁকান। কিন্তু তিনি ‘দ্য শাকিব খান’ হবার আগে এই পারিশ্রমিক পেতেন কিংবা দাবী করার সাহস করতেন? তার কাছ থেকেই শুনেছি, বেশ কয়েক বছর তিনি বেশ কিছু চলচ্চিত্রে নাম মাত্র পারিশ্রমিকে কাজ করেছেন। অথচ এ মুহূর্তে হিট ছবির গ্যারান্টিও দিতে পারছেন না অনেকে, দাবী করে বসছেন লাখ লাখ টাকা। কিন্তু কেন? প্রযোজকের লোকসান হলে আপনারা পুষিয়ে দিতে পারবেন?

সালমান খানের ‘টিউবলাইট’ এবং ‘রেইস থ্রি’ সিনেমার জন্য অনেক হল মালিক এবং প্রদর্শক যখন পথে বসেছিলেন, সে সময় বাবা সেলিম খানের পরামর্শ মেনে বিপদগ্রস্ত পরিবেশকদের কিন্তু মোট ৩৫ কোটি রূপী দিয়ে রক্ষা করেছিলেন বলিউডের ‘ভাইজান’। শুধু সালমান খান কেন? শাহরুখ খান তার ‘জাব হ্যারি মেট সেজাল’, ‘জিরো’, ‘দিলওয়ালে’, ‘অশোকা’, ‘পহেলী’ ছবির পরিবেশকদের মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিয়েছিলেন। আমির খান দিয়েছেন ‘থাগস্ অফ হিন্দোস্তান’-এর পরিবেশকদের। ভাবছেন, সংশ্লিষ্ট ছবির সঙ্গে নায়করা প্রযোজক কিংবা অন্য কোনো সূত্রে জড়িত ছিলেন বলেই হয়তো ক্ষতিপূরণের কথা ভেবেছেন। কিন্তু আমাদের যেসব অভিনয়শিল্পী প্রযোজক হিসেবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তারাও কি কখনো কিংবা নিয়মিতভাবে এই কাজটি করি?

লাভের গুড় আমরা সবাই খেতে চাই কিন্তু ক্ষতির অঙ্ক পুষিয়ে দেয়ার কথা কি কখনো ভাবি? উচ্চ পারিশ্রমিক পাবার পরও কি ছবির প্রচার-প্রচারণা নিয়ে ভাবি? শিল্পের কদর না করে অনেক শিল্পী শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বানিজ্যের কদর করেন। কিন্তু বক্স অফিসে প্রযোজকের বানিজ্য হচ্ছে কিনা, সে ব্যাপারে নিজ থেকে কোনো উদ্যোগ কি নেই? আন্তরিকতা দেখাই? অবশ্যই এই প্রশ্নগুলো সবার ক্ষেত্রে খাটে না। বেশ কয়েকজন এর ব্যতিক্রমও আছেন। তবে দু:জনক হলেও সত্যি, চলতি সময়ের বেশির ভাগ অভিনয়শিল্পীর ভেতরেই সার্বিকভাবে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির জন্য দরদ কিংবা প্রেম কিংবা আন্তরিকতা আমরা জন্ম দিতে পারিনি।

বলিউডে এখন রাজকুমার রাও, আয়ুশমান খুরানা, ভিকি কৌশলদের জয়জয়কার। রাজকুমার তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘র‌্যান’-এ অভিনয়ের জন্য ২৫০০ রূপী পারিশ্রমিক পেলেও এখন ছবি পিছু দাবী করছেন ৪ থেকে ৫ কোটি রূপী! প্রযোজকরাও অনায়াসে তাকে তা দিচ্ছেন। কেন দেবেন না? ২৪ কোটি রূপী বাজেটের ‘স্ত্রী’ যদি ১৮০ কোটি রূপী প্রযোজককে এনে দেয়, ৯ কোটি রূপীর ‘নিউটন’ যদি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি বক্স অফিস থেকে ৩১ কোটি রূপী এনে দেয়, ২০ কোটি রূপীর ‘বারিলি কি বারফি’ যদি বক্স অফিস থেকে ৫৮ কোটি রূপী এনে দেয়, এরকম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতাকে কেন ৪০ কোটি বাজেটের ছবিতে প্রযোজক ৪ কোটি রূপী দেবেন না?

আয়ুশমান খুরানাকেই দেখুন। ভিকি ডোনার, দাম লাগাকে হেইশ্যা ছবির একক নায়ক সর্বশেষ দুই বছরে ৪টি হিট ছবি উপহার দিয়েছেন (বারিলি কি বারফি, শুভ মঙ্গল সাবধান, আন্ধাধুন, বাধাই হো)। বক্স অফিসে সোনার ডিম পাড়া এমন নায়ক যদি ৩ থেকে ৫ কোটি রূপী চান, সেটি তো অপরাধ নয়। ভিকি কৌশল আরেক বিস্ময় নায়কের নাম। একক নায়ক হিসেবে ৪৫ কোটি রূপী বাজেটের ছবি ‘উড়ি’র প্রযোজককে ভিকি এনে দিয়েছেন বিশ্বব্যাপী ৩৫৫ কোটি। ঝড়ে বক মরেনি, এর আগেও ৩৫ কোটি রূপীর ‘রাজি’র একক নায়ক হিসেবে ভিকি প্রযোজককে দিয়েছেন ১৯৫ কোটি রূপী। ‘সানজু’র মত ছবিতে এত তারকা থাকা সত্ত্বেও অনেক সমালোচকের চোখ যদি ভিকির দিকে পড়ে কিংবা ‘মাসান’ থেকে ‘মানমার্জিয়া’র মত সিনেমায় যদি ভিকি আমজনতা থেকে বোদ্ধা দর্শকের নজর কাড়েন, এমন তারকাকে ৩ কোটি রূপী পারিশ্রমিক কেন দু হাত ভরে প্রযোজক দেবেন না?

বেশ ক’বছর আগে ‘কেদারনাথ’ কিংবা ‘কাই পো ছে’, ‘এমএস ধোনি’-এর মত ব্যবসাসফল সিনেমার নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুতের সাক্ষাতকার দেখছিলাম টিভিতে। ছোট পর্দায় তার যখন শীর্ষস্থান ছিল, সে সময় সুশান্ত প্ল্যান করেছিলেন যে করেই হোক ব্যংকে এক কোটি রূপী জমা করবেন। কোনোভাবে যদি তিনি তার লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেন, ঠিক সে সময় থেকেই ছোট পর্দা ছেড়ে দেবেন। বড় পর্দায় কিছু না পেলেও সমস্যা নেই, এই এক কোটি রূপীই তার নির্ভরতা দেবে। হয়েছিলও তাই। একটা সময় ছোট পর্দার মায়া ছেড়ে বড় পর্দার জন্য সুশান্ত সংগ্রাম শুরু করেন। প্রথম চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন মাত্র ১০ লাখ রূপী পারিশ্রমিকে। সেই সুশান্ত নিজেকে প্রমাণ করার পর যদি ৫ কোটি রূপী দাবী করেন, প্রযোজক তো দেবেনই।

ভাবছেন, বলিউডের প্রেক্ষাপট আর আমাদের এক নয়। ভাবছেন, হিন্দি সিনেমার শিল্পীরা ছোট পর্দা থেকে যা আয় করেন, আমাদের দেশে তা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন, আমরা সবসময় ‘নিরাপদ’ যুক্তিগুলোই কেন ভাবি? কেন এভাবে ভাবিনা, যে দেশে যে বাজার সে দেশে সেরকম ব্যবস্থা। বলিউডের তারকারা যে আজ কোটি কোটি রূপী পারিশ্রমিক দাবী করবেন, ২০ বছর আগেও কি ভাবতে পেরেছিলেন? এখন পারছেন। কারণ বিশ্বব্যাপী তাদের বাজার বিস্তৃত হয়েছে। আমরা কেন সে চেষ্টা না করে প্রযোজকের প্রতি এতটা নির্দয় হচ্ছি?

ভাবছেন, অভিনয় আপনার পেশা। রুটি রুজির মাধ্যম। প্রযোজকের প্রতি সদয় হলে দিন শেষে কে আমার খেয়াল রাখবে? এ ক্ষেত্রে একটাই কথা আমার: ঝুঁকি নিন, হিট ছবি উপহার দিন, প্রযোজক আপনাকে মাথায় উঠিয়ে রাখবে। কিন্তু যেখানে সফল হবার নূন্যতম নিশ্চয়তাই নেই, যেখানে প্রথম দিন প্রথম শো’তেই প্রায় শূণ্য প্রেক্ষাগৃহ দেখতে হয়, সেখানে অভিনয়শিল্পীরা এতটা নিমর্ম না হলেই পারি।

শাহরুখ খান একবার বলেছিলেন, আমি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধনী হতে চাই। কিন্তু আমি সিনেমায় অভিনয় টাকার জন্য করিনা। আমি বিভিন্ন পণ্যের দুতিয়ালি করে কিংবা টিভি অনুষ্ঠান কিংবা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করে অথবা বড়লোকের বাড়ির বিয়ে/ মেহেদী অনুষ্ঠানে নেচে গেয়ে অর্থ উপার্জন করি। আমাদের অভিনয়শিল্পীরাও তো একটা ‘স্মার্ট ক্যারিয়ার প্ল্যান’ করে কিংবা ‘অর্থ উপার্জনের অন্য ক্ষেত্র’ তৈরি করে সম্পদশালী হতে পারেন। মুমূর্ষু চলচ্চিত্রের গলায় ছুড়ি চালিয়ে লাভ কি? ইন্ডাস্ট্রি মরলে দিন শেষে আমাকেও তো মরতে হবে।

আলিয়া ভাটের যে কোনো সাক্ষাতকার পড়–ন। তিনি জানেন, কার কোন ছবি কত ব্যবসা করছে। নেট ইনকাম কত, গ্রস ইনকাম কত। কোন সিনেমা কতগুলো স্ক্রিন পেয়েছে? কম পেয়েছে কেন? বেশি পেয়েছে কেন? কোন সিনেমা মুক্তির তারিখ কবে হওয়া উচিত? আমাদের অনেক অভিনয়শিল্পীকেই দেখেছি এসব ব্যাপারে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামান না। যুগ যুগ অভিনয় করেও ইন্ডাস্ট্রির অর্থ বিনিয়োগ কিংবা কোথায় ফাঁকফোকড় রয়েছে, সমাধানের রাস্তা কোথায়-এসব ব্যাপারেও অবগন নন। অভিনয় চর্চার পাশাপাশি এসব নিয়েও তো নিয়মিত পড়াশোনা করা যায়।

কখনো কখনো একটি কম বাজেটের ছবি ‘ব্লকবাস্টার হিট’ হয়ে যায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট তারকা ছবির বাজেট বুঝে তার পারিশ্রমিক কমিয়ে আনবার কারণে। আবার কখনো কখনো একটি জনপ্রিয় ছবিও অ্যাভারেজ কিংবা ফ্লপ হয়ে যায় শুধুমাত্র তারকা নায়ক-নায়িকা তাদের পারিশ্রমিক আকাশছুঁই করবার কারণে। এই অঙ্কগুলোও তো বোঝা যায়। দিন শেষে আসলে আমরা কি চাই, সবার ভাবতে হবে। সম্মিলিতভাবে ভাবতে হবে। দিন যাবে, মাস যাবে, বছর শেষে সালতামামীতে হতাশার চিত্রই ফুটে উঠবে, লাভের লাভ কিছুই হবে না।

জীবনের সায়াহ্নে ‘দুস্থ শিল্পী’র খেতাব গায়ে না লাগিয়ে চলুন সবাই ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচানোর চেষ্টা করি, সঠিক তরিকায় সময়োপযোগী পরিকল্পনা করে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করি। ‘দশের লাঠি একের বোঝা’-ছোটবেলায় কত পড়েছি! দশজন যদি সমান্তরালে একই ভাবনার পথে হাঁটতে শুরু করি, জয় আসবেই। আসতে হবেই। চলুন তাহলে, নতুন করে ভাবি।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button