ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

‘ছাত্রলীগ’, ‘যুবলীগ’ যে সড়কে মারা যায়, সেই সড়কে মৃত্যু হতে পারে আপনারও!

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনটা হয়েছিল সবার জন্যেই। সড়কে কেউ নিরাপদ নয়। আপনি এই মুহুর্তে ঘর থেকে বের হলে জানটা হাতে নিয়েই বের হতে হবে। কারণ, বাংলাদেশের সড়কের অনিশ্চয়তা, অনিয়ম, অনিরাপদ অবস্থা এতটুকু নিশ্চয়তা আমাদের দেয় না যে, আমরা যেভাবে ঘর থেকে বেরিয়েছি, একইভাবে আবার সুস্থ শরীরে ঘরে ফিরব৷ মৃত্যু এমনিতেই এক অনিশ্চিত ব্যাপার, কিন্তু তাই বলে অস্বাভাবিক মৃত্যু তো কেউ কামনা করে না, অসময়ে দূর্ঘটনার মৃত্যু তো কেউ চায় না।

গত রোববার খুলনার রূপসা সেতু বাইপাস সড়কে একটি প্রাইভেটকারের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাকের সংঘর্ষে ঘটে যায় এক ভয়ানক দূর্ঘটনা। এই দূর্ঘটনায় হয়ত আপনিও পড়তে পারতেন, কিংবা আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ অথবা কোনো নিকটাত্মীয়, বন্ধু-স্বজন। যাহোক, এই ভয়ংকর দূর্ঘটনায় নিহত হলেন গোপালগঞ্জের ছাত্রলীগ ও যুবলীগের পাঁচ নেতা। শুধু নিহতরা ছাত্রলীগ, যুবলীগ করেন বলেই কি না কে জানে, এই মৃত্যুর খবর অনলাইনে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হবার মানুষ সেখানে কমেন্টে গিয়ে বাজেরকম প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে এসেছে। মৃত্যুর খবরে তাদের যেন আনন্দ ধরে না, পোষ্টে ‘হা হা’ রিয়েক্ট তো বটেই, কমেন্টে তাদের বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দিয়ে এসেছে।

ছাত্রলীগ, যুবলীগ, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন,

 

মৃত্যু কাউকে বাছবিচার করবে না। প্রত্যেক প্রাণীকেই এই স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, এটাতে কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। তাই যারা মানুষের মৃত্যুতে খুশি হয়, হাসে, বিকৃত মস্তিষ্কের পরিচয় দেয় তারা যে অমর হবে না এটা তাদের স্মরণ রাখা উচিত। এমন মৃত্যু আপনাদের কারো না হোক, আপনার কোনো প্রিয়জন এভাবে বীভৎস অবস্থায় না মারা যাক। রাজনৈতিক কারণে ক্ষোভ থাকতে পারে, অপছন্দ থাকতে পারে, বৈরিতা থাকতেই পারে কিন্তু দূর্ঘটনার এমন মৃত্যুতে কিভাবে অমানুষের মতো কেউ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে? আনন্দ প্রকাশ করতে হবে? আপনারা কারা যাদের মধ্যে এই মানবিকতা পর্যন্ত উঠে গেছে? আপনারা কারা, আপনারা কি এখনো আয়নায় তাকালে মানুষের চেহারা দেখেন না শুয়োরের?

আপনাদের কারো কারো প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে আপনাদের ‘অভিশাপ’ এ বোধহয় এই পাঁচজন মানুষ মারা গেছে। আদতে তা নয়। ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য শুনলে তাদের এই মৃত্যু আরো করুণ মনে হবে। প্রত্যক্ষদর্শী এবং খুলনা লবণচরা থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “তারা পাঁচজনই বন্ধুর মতো চলাফেরা করতেন। মাদকবিরোধী সংগঠনেও সক্রিয় ছিলেন তারা। রবিবার তারা একটি প্রাইভেট কারে করে খুলনায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। প্রাইভেট কারটি খুলনা মহানগরীর জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে গোপালগঞ্জ ফেরার পথে সাদিকুল চালকের আসনে ছিলেন। খেজুরবাগান অতিক্রম করার সময় ‘মানসিক ভারসাম্যহীন এক ভবঘুরে পথচারী’ প্রাইভেট কারের সামনে এসে পড়ে। এ সময় চালক তাকে বাঁচাতে গেলে বিপরীত দিক থেকে আসা মংলা থেকে জিরো পয়েন্টগামী সিমেন্টবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।”

ছাত্রলীগ, যুবলীগ, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন,

একজন মানুষকে বাঁচাতে দূর্ঘটনায় প্রাণ দিতে হলো এই পাঁচজনকে। নিহত পাঁচজন হলেন – গোপালগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুব হাসান বাবু, গোপালগঞ্জ সদর যুবলীগের সহ-সভাপতি এস.এম সাদিকুল আলম সাদিক, জেলা ছাত্রলীগের ছাত্র বৃত্তি বিয়ষক সম্পাদক ওয়ালিদ মাহমুদ উৎসব, জেলা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সাজু আহমেদ এবং জেলা ছাত্রলীগের সদস্য অনিমুল ইসলাম গাজী। এদের মধ্যে সাদিকুল গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সাদিক বাদে বাকী সবাই গোপালগঞ্জ সরকারি বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থী। নতুন গাড়িতে তারা ঘুরতে বেরিয়েছিলেন শখ করে৷ তারপর একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে বাঁচাতে পড়লেন দূর্ঘটনার কবলে। আর ফেরা হলো না তাদের ঘরে।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো এত বৃহত্তর একটা আন্দোলনের পরেও মৃত্যুর মিছিল থামছে না। কখনো সাধারণ মানুষ, কখনো সেলিব্রেটি, কখনো রাজনীতির সাথে জড়িত মানুষ- মৃত্যুর এই সড়ক, দূর্ঘটনার এই সড়ক কারো জন্যেই নিরাপদ না। আপনি আজ কারো মৃত্যুতে হাসছেন, খুব আনন্দ হচ্ছে? কিন্তু কে জানে কাল এই সড়কেই ‘আজরাইল’ আপনার অপেক্ষাতেই আছে! অস্বাভাবিক কিছু নয়। ‘ছাত্রলীগ’, ‘যুবলীগ’ নিহত হওয়াতে আপনার খুশি হবার কিছুই নেই, বরং এটা ভাবুন যে, তাদের ঘরে আজকে যে শোকের মাতম, তাদের মায়ের যে আহাজারি এমন যেন আপনার ঘরে কাল না হয়। আপনি নিরাপদে থাকুন, সুস্থ থাকুন এবং মস্তিষ্কের যত্ন নিন।

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button