ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

কাউকে গালি দেওয়া আমরা পছন্দ করি না, কিন্তু…

ছবিতে যে লোকটাকে দেখছেন, তার নাম আবুল কালাম। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে সম্প্রতি তিনি চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন। এর আগেও দুই দফায় তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন, সেই হিসেবে এটা তার হ্যাটট্রিক বিজয়। টানা তিনবার চেয়ারম্যান হবার আনন্দেই সম্ভবত বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। নইলে আদিবাসী ম্রো সম্প্রদায়ের পাড়ায় সংবর্ধনা নিতে গিয়ে ম্রো নারীদের জড়িয়ে ধরার কাজটা তো বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন কোন মানুষের করার কথা নয়। ভিক্টিম নারীটি যাতে কোন ধরনের বিড়ম্বনার শিকার না হন, একারণে তার চেহারা ঝাপসা করে দেয়া হয়েছে, নইলে আপনারা স্পষ্ট দেখতে পেতেন, এই লোকটার এমন আচরণে কতটা বিব্রতবোধ করছেন সেই নারী।

ঘটনাটা গত ২২শে মার্চের। উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল আলিকদম উপজেলার নির্বাচন, সেই নির্বাচনে প্রায় হাজারখানেক ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে পরাজিত করেছিলেন আবুল কালাম। দুইদিন আগে বিজয় উদযাপন করতে স্থানীয় নোয়াপাড়া ইউনিয়নের মেরিনচর পাড়ায় সংবর্ধনা নিতে যান তিনি। ওই পাড়াটিতে মূলত ম্রো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির মানুষদের বসবাস।

সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের কয়েকটি ছবি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেসব ছবিতে দেখা যাচ্ছে, চেয়ারম্যান আবুল কালাম এক নারীকে পেছন থেকে আপত্তিকরভাবে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন। সেই নারীর চেহারায় স্পষ্ট বিরক্তি এবং অসহায়ত্ব, একাধিক ছবিতে দেখা গেছে তিনি আবুল কালামের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইলেও, চেয়ারম্যান তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছেন। এই ছবিগুলো নিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তি তুলেছেন অনেকে, আবুল কালামের এমন অভদ্র আচরণের সমালোচনা করে তার বিচারও দাবী করেছেন কেউ কেউ।

মোহাম্মদ রকি নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, “মো: আবুল কালাম, একজন নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান। বান্দরবন জেলার আলীকদম উপজেলায় সম্প্রতি তিনি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ম্রো আদিবাসীদের পাড়ায় যান সংবর্ধনা নেওয়ার জন্য। বান্দরবনের ম্রো আদিবাসী জনগোষ্টিরা সচরাচর একটু সরল প্রকৃতির। সাদা মনের মানুষ ও বটে, সরল মনে ম্রো আদিবাসীরা খুব সহজে বিশ্বাস করে থাকেন। তারা হয়ত এটা জানেনা যে, মোঃ আবুল কালাম সাহেব ( নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান) ম্রোদের মত একজন সরল প্রকৃতির মানুষ নন।

তিনি আরও লিখেছেন, “একজন জনপ্রতিনিধি কখনো এইভাবে একজন নারীকে জড়িয়ে ধরতে পারেননা ওই নারীর অনুমতি ছাড়া। কান্ডজ্ঞানহীন ব্যক্তি ছাড়া কখনো একজন নারীকে এইভাবে জড়িয়ে ধরতে পারেনা। এটি সম্পৃর্ণ শ্লীলতাহানি ও নারী সমাজকে অবমূল্যায়ন করা।”

আমাদের কথাও সেটাই, মতের বিরুদ্ধে একজন নারীকে জোরপূর্বক জড়িয়ে ধরার অধিকার আবুল কালামকে কে দিলো? কোন সাহসে তিনি এই ধৃষ্টতা প্রদর্শন করলেন? তিনি চেয়ারম্যান, এলাকার সর্বময় কর্তা, তাই তাকে কেউ কিছু বলতে পারবে না- এটাই কি তার ধারণা? নাকি একজন ‘পাহাড়ি’ ‘উপজাতি’ বা আদিবাসী নারীকে জড়িয়ে ধরাটাকে একজন বাঙালী হিসেবে তিনি নিজের মৌলিক অধিকার বলে ভাবেন?

সবচেয়ে অবাক লেগেছে কি জানেন? আশেপাশে আরও অনেকগুলো মানুষ দাঁড়িয়েছিলেন, কেউ কেউ হাসছিলেন আবুল কালামের কাণ্ড দেখে, কিন্ত তাকে নিবৃত্ত করতে কেউ এগিয়ে আসেননি, অসহায় সেই ম্রো নারীর মুখের ভীতির ছাপটা কারো চোখে পড়লো না তখন! নাকি তারাও ভীত ছিলেন? কিছু বললে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হবে, জুমের ক্ষেত পুড়িয়ে দেয়া হবে, এমন ভয় পাওয়াটা তো অস্বাভাবিক নয়। পাহাড়ের মানুষগুলোর সঙ্গে এমন অনাচার তো যুগের পর যুগ ধরে হয়ে আসছে। ঘর পোড়া গরুর মতো সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাওয়াটাকে তাই দোষ দেয়া যাচ্ছে না ঠিক।

পাহাড়ের হিসেবটা বড় অদ্ভুত। শত শত বছর ধরে এখানে বাস করে আসা আদিবাসীরা যেন নিজ ভূমেই পরবাসী। বাঙালী সেটেলারে ভরে গেছে পার্বত্য জেলাগুলো। বাঙালীরা সেখানে ব্যবসা করছে, গাছ কেটে পাহাড় ন্যাড়া করে ফেলছে, অবৈধ বসতি স্থাপন করে আরও বাঙালী নিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য এলাকায় এখন বিভিন্ন জাতিস্বত্ত্বার আদিবাসীর চেয়ে বাঙালীর সংখ্যা বেশি। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কোন সমস্যা ছিল না, যদি না বাঙালী এসব সেটেলারেরা নিজেদের পাহাড়ের রাজা ভাবতে শুরু করতো।

পার্বত্য জেলাগুলোতে দিনে দুপুরে মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়। শিশু থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ, সব বয়সের নারীদেরই ধর্ষনের মতো জঘণ্য ঘটনা অজস্রবার ঘটেছে। জীবনে কখনও শুনেছেন, আদিবাসীরা এসে বাঙালী কাউকে ধর্ষণ করেছে? কিংবা ধর্ষণের পরে কোন বাঙালী নারী খুন হয়েছেন কোন আদিবাসীর হাতে, এরকম খবর চোখে পড়েছে কখনও? ধর্ষণের শিকার হয়ে আদিবাসীরাই। আর করে কারা জানেন? বাঙালীরা। সমতল থেকে পাহাড়ে গিয়ে যারা পাহাড়ের ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠেছে দিনে দিনে!

এসব ঘটনার কোন বিচার হয় না। হবে কিভাবে? বিচার তো করবে বাঙালী বিচারক, অপরাধী তো ধরবে বাঙালী পুলিশই! এজন্যেই আদিবাসীরা সব বাঙালীকে এক চোখে দেখে, ওদের ভাষায়, সব বাঙালীর পাছা এক! উল্টো এসব ঘটনায় বিচারের দাবীতে আন্দোলন বা ধর্মঘট করলে আদিবাসীদের ওপর হামলা চালানো হয়, তাদের বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়, জুমের পাহাড় পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হয়, কখনও হয়তো তরুণ নেতাদেরই তুলে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য কোথাও! ভিটেমাটি হারিয়ে পাহাড়ের গভীরে চলে যাওয়া এমন অজস্র আদিবাসী পরিবারের গোপন কান্নার কথা রাষ্ট্র হয়তো জানেও না!

বছরখানেক আগে দুই মারমা তরুণীকে ধর্ষণ করা হলো। সেই ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্যে কত নাটকই না সাজানো হয়েছিল! চিকিৎসার নামে তাদের আটকে রাখা হলো হাসপাতালে, মেয়েগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছেন চাকমা রানীও! এগারো বছরের কৃত্তিকা ত্রিপুরাকে দিনে দুপুরে ধর্ষণ করে মেরে ফেললো বাঙালি কয়েকজন শ্রমিক! এরকম উদাহরণ আরও হাজার হাজার পাবেন, যেগুলোর বিচার আজও হয়নি, কোনদিন হবে কিনা সেটা নিয়েও আছে সন্দেহ। আর তাই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবার আনন্দে যখন আবুল কালামদের শাহরুখ খানের মতো রোমান্টিক নায়ক হবার শখ হয়, সেই শখ পূরণের জন্যে জোর করে ম্রো নারীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে জড়িয়ে ধরে নিজেদের কামনা চরিতার্থ করতে চান, সেসবের ছবি দেখে অক্ষম আক্রোশে তেতে ওঠা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না আমাদের…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button