ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আরও মারেন, একেবারে মেরে ফেলেন সবাইকে!

আজ সকালেই আবরারের বাবা বলছিলেন, ‘আমার ছেলেটাকে যেভাবে পিটিয়েছে ওরা, সেটা যদি প্রধানমন্ত্রী দেখেন, তাহলে তিনি নিজেই খুনীদের বিচার করবেন।’ আর বিকেল নাগাদ আমরা খবর পেলাম, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়েছে আবরারের পরিবারের সদস্যদের। আবরারের ছোট ভাই ফায়াজকে ধাক্কা মেরেছেন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার পদমর্যাদার এক অফিসার, আবরারের ফুপাতো ভাইয়ের স্ত্রীর জামাকাপড় টেনে করা হয়েছে শ্লীলতাহানি। অথচ কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার সবকিছু অস্বীকার করে উল্টো দায় চাপিয়েছেন আবরারের পরিবারের কাঁধে, বলেছেন, এই পরিবারের লোকজন নাকি শিবির করে।

ঘটনার সূত্রপাত দুপুরে। বুয়েট ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম আবরারের হত্যাকাণ্ডের পরে একরকম গা ঢাকা দিয়েছিলেন, ত্রিশ ঘন্টারও বেশি সময় পরে তিনি এসেছেন ক্যাম্পাসে। আবরারের জানাজা হয়েছে ক্যাম্পাসে, ভিসি ছিলেন না সেখানে। ছাত্রছাত্রীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছে, তিনি তখনও অনুপস্থিত। ভিসির এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে প্রধানমন্ত্রীও বিরক্ত হয়েছেন বলে খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে। তাই হয়তো গরু মেরে জুতো দানের আশায় ঘটনার দুইদিন পরে আবরারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আজ কুষ্টিয়া গিয়েছিলেন তিনি।

আবরারকে পিটিয়ে মারার ত্রিশ ঘন্টারও বেশি সময় পরে ক্যাম্পাসে হাজির হয়েছেন উপাচার্য্য

আবরারের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার রায়ডাঙ্গায় ভিসির গাড়ি পৌঁছানো মাত্রই এলাকাবাসী বিক্ষোভ শুরু করে। ঝামেলা হতে পারে এই আশঙ্কায় ভিসির গাড়িবহরের সঙ্গে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। ভিসিকে আবরারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেয় লোকজন। একারণে ভিসি কবর জিয়ারত শেষে আবরারের বাড়িতে ঢুকতে পারেননি।

এরপর ঢাকায় ফেরার জন্য তিনি গাড়িতে উঠে রওয়ানা হলে রাস্তা রোধ করে শুয়ে পড়েন আবরারের ফুফাতো ভাইয়ের স্ত্রী তমা। এসময় নারী পুলিশ সদস্যরা তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়ার সময় ধস্তাধস্তি হয়। এসময় পুলিশ তমাকে মারপিট করছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসীর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়; তারা ভিসির ওপর চড়াও হন। এসময় পুলিশ উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে ধস্তাধস্তিতে আবরার ফাহাদের ভাই ফায়াজসহ তিনজন আহত হন।

ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে আবরারের ছোট ভাই ফায়াজ লিখেছেন- “এখানকার দায়িত্বে থাকা অ্যাডিশনাল এসপি (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) মোস্তাফিজুর রহমান আমার বুকে কনুই দিয়ে আঘাত করেন এবং কালকেও যখন আমার ভাইয়ের জানাজা হয় তখন তিনি বলেছিলেন দুই মিনিটের মধ্যে জানাজা শেষ করতে হবে। আজ এখানে আমার ভাবি ছিল, তাকে বেধড়কভাবে পুলিশ দিয়ে মারা হয়েছে। তার কাপড়-চোপড় টেনে তার শ্লীলতাহানি পর্যন্ত করা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের কোন ধরনের পুলিশ?”

যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ফায়াজ উপাচার্যকে মারতে উদ্যত হলে তিনি তা নিরসন করেন। এ ছাড়া আশপাশের কয়েকজন উপাচার্যের দিকে তেড়ে আসেন। তার দাবি, কারও গায়ে তিনি হাত তোলেননি। সেখানে ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। আর আবরারের ভাবী তমা পুলিশের এক নারী কর্মীর সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়েছেন, সেখানে শ্লীলতাহানির কোন ঘটনা ঘটেনি।

তবে সবচেয়ে অবাক করার মতো ব্যাপারটা ঘটেছে এরপরে। কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের যিনি সর্বোচ্চ কর্মকর্তা, সেই পুলিশ সুপার তানভূর আরাফাত বলেছেন, জামাতের লোকজনকে নিয়ে ভিসির ওপর হামলা করতে না পারাতেই নাকি আবরারের পরিবার এসব গুজব রটাচ্ছে। তিনি আরও বলেছেন, এলাকাবাসী নয়, আবরারের পরিবার এবং জামাতের লোকজন মিলে ভিসির গাড়িবহরে হামলা করার চেষ্টা চালিয়েছে।

শিবির ট্যাগ দিয়ে আবরারকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে বুয়েটের ভেতরে। এখন তার পরিবারের ওপরে হামলার ঘটনাকেও কি চমৎকারভাবে ‘জামাতী’ ট্যাগ দিয়ে হালাল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর সেই চেষ্টাটা করছেন প্রজাতন্ত্রের একজন সরকারী কর্মচারী! আবরারের পরিবারের কাউকে মারধর করা হয়েছে কিনা, কেউ শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে জামাত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতা কিভাবে একজন পুলিশ সুপার টেনে আনতে পারেন, সেটা আমাদের মাথায় ঢোকে না।

আবরার মারা গেছে চরম যন্ত্রণা সহ্য করে, ছেলের লাশ কাঁধে বয়ে নেয়া বাবার যন্ত্রণাটা আমরা অনুধাবন করতে পারবো না। ভাইয়ের কষ্ট বা মায়ের দুঃখটাও আমরা বুঝবো না। আবরারের পরিবারটাকে আর যন্ত্রণা না দিলেও তো হয়, তাই না? আর যদি যন্ত্রণা দিতেই হয়, তিলে তিলে না দিয়ে একেবারে মেরে ফেলুন। ফায়াজ, তার বাবা-মা সবাইকে মেরে ফেলুন, আমাদেরকেও মারুন। জামাত-শিবির ট্যাগ খেয়ে হামলার বৈধতা সহ্য করার চেয়ে মরে যাওয়াটা বহুগুণে ভালো…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button