ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আবরার হত্যার দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না আপনিও!

বিষয়টা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক হলেও উলঙ্গ সত্য যে, খুন-গুম-ধর্ষণ প্রভৃতি এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ভিন্নমতের জন্য দিনে-দুপুরে কাউকে কুপিয়ে কিংবা পিটিয়ে খুন? এ তো এখানে প্রতিবেলা নিয়ম করে ডাল-ভাত খাওয়ার মতো একটা ঘটনা।

কেন আমি এমনটা বলছি? বলছি, একটু অপেক্ষা করুন।

এখনো পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আবরারকে শায়েস্তা করতে ডাকা হয়েছিলো তার ভিন্নমতের কারণে। কী সেই ভিন্নমত? সে একটা ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কিত সাম্প্রতিক চুক্তিগুলি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডযুক্ত এক সচেতন নাগরিকের মতো সরকারের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু বাঁশের কেল্লা’র মতো পেইজে আবরারের আনাগোণা থাকায় তাকে শিবিরপন্থী তকমা দেয়া হয়, শিবির সন্দেহে পেটানো হয়। কিন্তু কেউ শিবির না কেবল, খুনী বা ধর্ষক হলেও যে তাকে পেটাতে পেটাতে মেরে ফেলাকে কোনো দিক দিয়ে বৈধতা দেয়া যায় না; সে আলাপে নতুন করে যাচ্ছি না আমি।

তবে আবরারের এই নির্মম মৃত্যুর জন্য আজ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই গভীর শোক প্রকাশ করছে, মানুষ গণমানুষের বাক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করছে যে কেউ ভিন্নমতের হলেই তাকে খুন করা যাবে কিনা। মানুষের এমন প্রতিক্রিয়া দেখে ভালো লাগছে আমার, শত কষ্টের মাঝেও কোথাও যেন একটা চাপা স্বস্থিবোধ কাজ করছে মনে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ফেসবুকে ভিন্ন মতাদর্শের লেখালেখির জন্য খুন হওয়ার এই সংস্কৃতি কি আজ নতুন শুরু হয়েছে? হয়নি কিন্তু। এর গোড়াপত্তন হয়েছে আজ থেকে প্রায় ৭ বছর আগে।

মনে আছে সেইসব দিনের কথা, যখন ‘আল্লাহু আকবার’ বলে ধরে ধরে পথেঘাটে নাস্তিক জবাই করা হতো? রাস্তায়-বাড়িতে-অফিসে সব জায়গায় গিয়ে তথাকথিত দুর্বৃত্তরা তাদের লোমহর্ষক চাপাতির খেলা দেখাতো। নির্দিষ্ট বিরতিতে চাপাতিওয়ালারা রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতো। দেশমাতা তার সন্তানদের রক্তমাখা নিথর লাশ বয়ে বেড়াত সেইসব সন্তানদের, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য না, আল্টিমেট মুক্তির জন্য কথা বলতো, কলম ধরতো। আবরার ফাহাদ তার দেয়া স্ট্যাটাসটি শেষ করেছেন কবি কামিনী রায়ের সুখ কবিতা’র কয়েকটি পঙক্তি’র মধ্য দিয়ে-

পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি,
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।

বিশ্বাস করুন, এ তল্লাটের সেইসব মৃত কিংবা জীবিত নাস্তিকরাও ঠিক এই কবিতারই মতো নিজের কথা ভুলে গিয়ে একটা সুন্দর শাশ্বত বসবাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য বিলাপ করে গেছেন এবং এখনো করছেন। কিন্তু এর প্রতিদানস্বরূপ তারা কী উপহার পেয়েছেন? চাপাতির কোপ, মানুষের নিন্দা আর প্রাণনাশের হুমকি। তারপর? তারপর তারা ঘরে বাইরে কোথাও নিরাপত্তা না পেয়ে প্রাণ ভয়ে যখন গা ঢাকা দিতে শুরু করলো, যাদের সুযোগ-সামর্থ্য ছিলো তারা বিদেশে পাড়ি জমাতে লাগলো। আজও তারা তাদের কলম থামায়নি। বৃহত্তর কল্যাণে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছেন।

কিন্তু আমার আজ এটা ভাবতে অবাক লাগে যে যখন যারা ‘একটা একটা নাস্তিক ধরো, ধইরা ধইরা জবাই করো’ বলে গলা এবং কিবোর্ড ফাটাচ্ছিলেন; একেকজন নাস্তিক খুন হওয়ার পরে সুখের জোয়ারে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে বগল বাজিয়ে তা উদযাপন করেছিলেন; অতি চালাকেরা আবার মৌনতা সম্মতির লক্ষণ কথাটার প্রমাণ দিতে নীরবতা পালন করেছেন; আজ তারাই ভিন্নমতের জন্য আবরারের এই অকাল মৃত্যুতে আহাজারি করছেন, সরব হয়ে উঠেছেন। সেদিন কোথায় ছিলো আপনাদের এই সরব কিংবা প্রতিবাদী মূর্তি, যেদিন নির্বিচারে নাস্তিকদেরকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করা হয়েছিলো?

আপনারা যারা সেদিন নাস্তিক ব্লগারদের মৃত্যুতে নগ্ন, কুৎসিত, ভয়ংকর উল্লাসে মেতে উঠেছিলেন; তাদেরকে জিজ্ঞেস করছি- আপনারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদেরকে কি কখনো এই প্রশ্নখানা করেছেন যে দেশের আজকের এই ‘পরমতঅসহিষ্ণু’ পরিস্থিতির জন্য পরোক্ষভাবে হলেও আপনার মতো মানুষগুলি দায়ী কিংবা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া আজমের এই ‘পরমতঅসহিষ্ণু’ তথা কর্কট রোগের রোগাপত্তন যে আপনাদের হাত ধরেই হয়েছিলো?

আজ এত বছর পর তুলনার সুবিধার্থে সবাই বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলছে দেখলাম। কারণ বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডও হয়েছিলো উন্নয়নের প্রবাদপ্রতিম উদাহরণ ছাত্রলীগের হাত ধরে। কিছুদিন আগে বরগুনার রিফাত শরীফ যখন দিনের আলোয় কোপ খেয়ে খুন হলো, তখনও বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড আলোচনায় উঠে এসেছিলো। কিন্তু বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের পরও যে আরও কতগুলি মানুষকে প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে কুপিয়ে খুন করা হলো, কেন যেন তা আমাদের আলোচনায় উঠে আসে না। কারণটা কী? তারা নাস্তিক বলে? তারা নিজের স্বার্থ না দেখে বৃহত্তর স্বার্থের জন্য কথা বলতো বলে? তারা স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো ব্যক্তিবর্গ বলে? নাকি তাদেরকে আমরা ভালো মানুষেরা মানুষ বলে গণ্য-ই করি না? কোনটা?

মূলত ভিন্ন মতের কারণে সর্বপ্রথম আগ্রাসী আঘাতটা আসে বোধহয় আজকে বিশ্বমঞ্চে নির্বাসিত লেখিকা হিসেবে পরিচিত তসলিমা নাসরিনের ওপর, তখন আমার জন্মও হয়নি। তারপর ঠিক এই ভিন্ন মতের কারণে আঘাত আসে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর, ২০০৪ সালে। হুমায়ুন আজাদকে বাংলা একাডেমির বইমেলা প্রাঙ্গনে নির্মমভাবে কোপানো হয়, কিন্তু কোপ খেয়েও সে যাত্রায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। ঐ ঘটনার প্রায় ১০ বছর পর ফের নতুন মোড়কে পুরাতন আঘাত আসে এ তল্লাটের ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষজনের ওপর। দৃশ্যপট তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছাপা কাগজের যুগের পরিবর্তে চলে এসেছে ব্লগের যুগ।

ব্লগ বা ফেসবুকে অপ্রথাসিদ্ধ মতামত প্রকাশ এবং প্রচারের জন্য এ পর্যন্ত যতগুলি খুন হয়েছে, সেসবের হিসেব কষতে বসলে প্রথমেই উঠে আসে আহমেদ রাজিব হায়দার ওরফে থাবা বাবা’র নাম। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুরের রাস্তায় হুমায়ুন আজাদের মতো একই ধরণের আক্রমণ করা হয় রাজিব হায়দারের ওপর। সেদিন হুমায়ুন সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন, কিন্তু রাজিব হুমায়ুনের মতো অতটা ভাগ্যবান না হওয়ায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন। রাজিবকে চাপাতি দিয়ে এত নির্মমভাবে কোপানো হয়েছিলো যে তার পরিবার ও আত্মীয়রা তার দেহ শনাক্ত করতে পর্যন্ত হিমশিম খান। কিন্তু তার অপরাধ? তার অপরাধ- তিনি ছিলেন একজন নাস্তিক এবং তিনি ব্লগে ধর্মের সমালোচনা করে লেখালেখি করতেন। অথচ এই রাজিব হায়দার ছিলেন ২০১৩ শাহবাগ আন্দোলনের এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজিব হায়দারের মতো প্রতিবাদীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানপন্থীদের দ্বারা সংগঠিত গণহত্যার বিচারের দাবী জানায়।

এর ঠিক ২ বছর পর, আবারও নেমে আসে চাপাতির আঘাত। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা প্রাঙ্গনে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে। সঙ্গে ছিলেন প্রিয়তমা স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। অভিজিৎ এর অপরাধ? তার অপরাধ ছিলো মুক্তমনা ব্লগ প্রতিষ্ঠা করে তাতে লেখালেখি করা, অন্যদেরকেও লেখার সুযোগ করে দেয়া; মুক্তবুদ্ধি, নাস্তিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার, মানবাধিকার ও সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে কথা বলা।

এরপর আসে ওয়াশিকুর রহমান বাবুর পালা। ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ নাস্তিক ব্লগার তথা অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট এই ওয়াশিকুর বাবুকে তার বাসা থেকে পাঁচশ গজ দূরে অফিসে যাবার পথে তেজগাঁওয়ের রাস্তায় চাপাতি দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার অপরাধও ঐ একই; মুক্তচিন্তা, সাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞান, ধর্মীয় কুসংস্কার বা গোঁড়ামি ইত্যাদি বিষয়ে ব্লগে, ফেসবুকে লেখালিখি এবং তীক্ষ্ণ মন্তব্য করা।

বাবু হত্যার রেষ কাটতে না কাটতেই ২০১৫ সালের ১২ মে সিলেটের সুবিদবাজারে নূরানী আবাসিক এলাকায় নিজ বাসার সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় অনন্ত বিজয় দাশকে। বিজয় মুক্তমনা ব্লগে লিখতেন। মুক্তচিন্তা করতেন। প্রথাগত মতামতের বাইরে গিয়ে মতামত প্রচার এবং প্রকাশ করতেন।

ঐ একই বছর পঞ্চমবারের মতো আঘাত আসে জাগৃতির প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের ওপর। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর শাহবাগে তার আজিজ সুপার মার্কেটে তার কার্যালয়ে ঢুকে তাকেও নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে তথাকথিত ‘দুর্বৃত্তরা’। তার অপরাধ, তিনি ছিলেন একজন সেক্যুলার প্রকাশক। তার মালিকানাধীন জাগৃতি প্রকাশনী অভিজিতের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ নামের জনপ্রিয় বইটি প্রকাশ করেছিলো।

এরপর কয়েক মাস এই ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, মুক্তচিন্তক হত্যাযজ্ঞ বন্ধ থাকলেও খুব বেশিদিন এটা স্থায়ী হয় না। ২০১৬ সালের ৬ এপ্রিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গণজাগরণ মঞ্চের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নাজিম উদ্দিন সামাদকে পুরাণ ঢাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে এবং গুলি করে খুন করা হয়। নাদিমের অপরাধ, নাদিম ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তিনি রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে বহাল রাখার সমালোচনা করেছিলেন। তিনি নিজের ভালো ভুলে গিয়ে গণমানুষের ভালোর জন্য দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং রাজনৈতিক দৈন্যদশা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

তো, কোন যুক্তিতেই আমরা একের পর এক ঘটে যাওয়া এইসব হত্যাকাণ্ডগুলিকে বৈধতা দেব? আজ আবরার ফাহাদের মৃত্যুতে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নিয়ে কথা বলছি আমরা। কিন্তু তখন আমরা কেন কোনো কথা বলিনি, যখন একের পর এক নাস্তিক ব্লগার-অনলাইন অ্যাকটিভিস্টকে তাদের ভিন্নমতের জন্য মর্মান্তিকভাবে খুন করা হয়? তখন কেন আমাদের মতামত নানান ধরণের অব্যয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো? তখন কেন আমরা সম্মিলিত রূপে বাকস্বাধীনতার পক্ষে আওয়াজ তুলিনি?

আর আমাদের সরকারও বলিহারি যাই। কোথায় তারা এই নির্বিচারে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে কথা বলবে, তা না! উল্টো সরকারের তরফ থেকে ব্লগারদের প্রতি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে তারা যেন তাদের লেখনীর মাধ্যমে কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না করেন। এমনকি তারা ফলাও করে এও বলে যে তারা কারও বেডরুমের নিরাপত্তা দিতে পারবে না।

সেদিন এভাবে মুখে কুলুপ এঁটে মিটিমিটি না হেসে, ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিপাত না করে, বৃহত্তর ভালোর পক্ষে দ্ব্যর্থহীনভাবে কথা বললে এভাবে কোনো ৭ অক্টোবরের জন্ম হতো না। কোনো আবরারকে আর সামান্য এক ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়ার জন্য মরতে হতো না।

আরও পড়ুন-

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button