ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ওস্তাদ স্পিড বাড়ান, সামনে স্টুডেন্ট…

ওস্তাদদের মাথা গরম। সামনের বাসটা তাকে ওভারটেক করে গেছে। তাকেও পালটা জবাব দিতে হবে। স্পিড বাড়িয়ে সামনের বাসকে বুঝিয়ে দিতে হবে সেও কম এক্সপার্ট ড্রাইভার না। স্কুল জীবন থেকে বাসে যাতায়াত করতে হয়েছে দীর্ঘদিন। এখনো যেতে হয়। এই দৃশ্যগুলো নিয়মিতই চোখে পড়ে। এই প্রতিযোগিতায় কে কখন বলি হয়ে যায়, কে কখন বাসের চাপায় পিষ্ট হয় তার গ্যারান্টি নাই।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন যে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শুরু হয়েছিল সেখানে আমরা জেনেছি, দুই বাসের পাগলাটে প্রতিযোগিতায় স্কুল শিক্ষার্থীরা নিহত হয়। এরপর শহরে, শহরের বাইরে শিক্ষার্থীদের বাস চাপায় মারা যাওয়ার ঘটনা আরো অনেক ঘটেছে। যেগুলো আলোচিত হয়, সেখানে হয়ত কিছু ক্ষতিপূরণের আশ্বাস, বিচারের আশ্বাস পাওয়া যায়। এর বেশি কি হয় আর? কালকেও আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলো শহরে। আবরার নামক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী দুই বাসের প্রতিযোগিতায় হেরে গেল। আন্দোলন চলছে বেশ কয়টি দাবি নিয়ে। আমরা জানি, মনভোলানো কিছু আশ্বাস আসবে। তারপর আবার যেই লাউ, সেই কদুর সড়কে আমরা মারা যাব। পরের সিরিয়ালে কে আসবে জানি না।

বাস চালকরা শিক্ষার্থী দেখলে যেন না দেখার ভান করে বসে, মানুষ দেখেও না দেখার ভান করে। তারা রাস্তাকে দেখে রেসিং সড়কের মতো, নিজেদের ভাবে বিশ্বজয়ী রেসার। খারাপ কি! রেস খেলুন আপনারা, আমাদের মারুন। আমরা শিক্ষার্থী। আমাদের দেখে আরো স্পিড বাড়িয়ে দেন। কোনো ক্ষতি নেই। মারা যাওয়ার পর আপনাদের বিচার হবে এই আশ্বাসের তলায় আমাদের বিশ্বাসও মারা যাবে, যেমন অসহায় হয়ে মারা যাই আমরা।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চেষ্টা করা হয়েছিল। জেব্রাক্রসিংয়ের উপর জোর দেয়া হয়েছিল। আবরার যিনি আজ মারা গেলেন, তিনি নিয়মে মধ্যেই ছিলেন। নিয়ম মেনে রাস্তা পার হচ্ছিলেন জেব্রাক্রসিং দিয়ে। কিন্তু, সড়কের ফ্রাঙ্কেইস্টাইনরা যদি রেসিং করতে সড়কে নামে, তারা নিজেরা কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করে না। সুপ্রভাত পরিবহনের ড্রাইভারও তোয়াক্কা করেনি। আরেকটি বাসের সাথে প্রতিযোগিতা করে ধাক্কা দেয়, পিষ্ট করে আবরারকে। এই আবরার আহমেদ চৌধুরীই নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ফ্রেম দিয়ে ফেসবুকে ছবি দিয়েছিল। নিরাপদ সড়কের দাবি যে তারও ছিল। আবরার নিজেই আজ ছবি হয়ে গেল। হয়ত আমরা অনেকে আবরারের কথা ভেবে আবারো নিরাপদ সড়ক চেয়ে ছবি দিব, ফ্রেম বদলাবো, শোকাহত হব, কিন্তু কাল আমি কিংবা আমাদের কেউ যে ছবি হয়ে যাবে না, সড়কে মারা পড়বে না তা কেউ বলতে পারে না৷ মেয়র সাহেবও না, মন্ত্রী সাহেবও না। কেউ বলতে পারে না।

আমাদের উত্তরের নতুন মেয়র বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের থামাতে কালই কত আশ্বাস শুনালেন। অবরোধ তুলে নিতে বলেন। তিনি আশ্বাস দেন, সুপ্রভাত পরিবহনের বাস নাকি আর চলতে দেয়া হবে না। তার মুখের উপর শিক্ষার্থীরা শুনিয়ে দিয়েছে, জাবালে নূরের বাস তো এখনো চলছে। এইসব আশ্বাস যে ছলনা, মনভোলানো ফালতু আলাপ এটা শিক্ষার্থীরা জানে। তারা জানে, তাদের জীবনের নিরাপত্তা এতই ঠুনকো ওসব নিয়ে কেউ সত্যি মন দিয়ে ভাবে না। বাস চালকরাও জানে, তাদের পেছনে খুঁটি, নাটের গুরুরা এতই শক্তিশালী তাদেরকেও রুখে দেওয়া যাবে না। ছাত্ররা কি আন্দোলন করবে, তারা একদিন এসে রাস্তায় নেমে ছাত্রদের পিটালে, বাস ধর্মঘট দিলে দেশ অচল হয়ে যাবে। তারা জমদূত হয়েই সড়কে টিকে থাকবে।

মেয়র সাহেব আশ্বাস দিলেন, আবরারের নামে পথচারী সেতু হবে। হায় সেতু! সড়ক ভরে যাবে সেতুতে যদি প্রত্যেকটা মৃত্যুর দায় হিসেবে সেতু করে দেওয়ার আশ্বাস দেয়া হয় এভাবে। এইসব সমাধানে, আশ্বাসে আন্তরিকতা দেখি না আমরা। তবুও, ভাল আজ অন্তত কেউ হাসাহাসি করেনি। কেউ তেলিয়ে হেসে বলেনি, অমুক দেশে কেউ রাস্তায় মরলে এত কাবজাব হয় না। কিন্তু, চাপা প্রহসন তো চলছেই আমাদের সাথে। আন্দোলন, বিক্ষোভ, অবরোধ থামানো কঠিন ব্যাপার হয় না দেশে, ছাত্রদের উপর হামলা করা কঠিন ব্যাপার নয় এদেশে, শুধু কঠিন হয়ে যায়, সড়কের জমদূতদের আটকানো। কঠিন হয়ে যায়, সড়কে রেস খেলা খুনিদের আটকানো। কঠিন হয়ে যায়, সড়কে বাস সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করা।

ব্যাপার না, এই কঠিন অবস্থার মধ্যেই বেঁচে থাকতে হবে বুঝে গেছি আমরা। আশ্বাস শুনে হাত তালি দিব, ক্ষতিপূরণের অঙ্ক শুনে অবাক বিস্ময়ে কৃতজ্ঞ হব। তবুও মাঝে মধ্যে দাবি জানাব, যদি সড়কে কোনোদিন সুবোধ আসে সেই অপেক্ষায় থাকব। ততক্ষণ ওস্তাদ আরো জোরে চালান, ওস্তাদের ওস্তাদরাও কলকাঠি নাড়িয়ে যান পেছন থেকে, আমরা দেখে যাই আমাদের রক্তের দাগ..

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button