রিডিং রুমলেখালেখি

প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে অদম্য এক অনুসন্ধ্যানী সাংবাদিক ও একজন সাহিত্যিকের গল্প!

আবদুল্লাহ আল ইমরান আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বড় ভাই। যদিও মানুষটাকে আমার চেনা মূলত তার সাহিত্য কর্মের মাধ্যমে। ‘দিবানিশি’ যার গল্পেরা ‘কালচক্র’ পেরিয়ে পাঠকের হৃদয়ে জায়গা খুঁজবার প্রয়াস পায়, পেশাগত দিকে যিনি একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকও বটে।

‘হৃদয়ের দখিন দুয়ার’ হতে প্লাবিত হয়ে আসা উপলব্ধি থেকেই বলতে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য সমুন্নত রাখবার প্রয়াসে প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আপনার কঠোর অবস্থান এবং সাহিত্যের প্রতি আপনার নিবেদন এবং ‘এইসব ভালবাসা মিছে নয়’। ‘নীল টিপ উড়ে যায়’ যাক, আসছে যে ‘চন্দ্রলেখা’ সে আসুক কালচক্র পেরুনো ভালবাসাদের উত্তরাধিকারী হয়ে…

এই মানুষটা সম্পর্কে একটু বিষদে কিছু বিত্তান্ত জানানো যাক।

*

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বছর কয়েক ধরে ভর্তি মৌসুমে একটা বিষয় বহুল চর্চিত হচ্ছিলো। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সহ সমাজের সকল স্তরের মানুষের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন গড়ার প্রতিষ্ঠান, কারো কারো ভীষণ আবেগের জায়গা, কারো কাছে আস্থা এবং স্বপ্নের প্রতিশব্দ যে প্রতিষ্ঠান এখানটায় কেনো প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে? এই প্রশ্নটি যেন এক প্রকার ট্যাবুও হয়ে উঠছিলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা যারা কঠোর পরিশ্রম করে এখানে পড়ার সুযোগ পেয়েছে কিংবা অল্পের ব্যবধানে যাদের এই সুযোগটি ঘটেনি তাদের কাছে এধরণের খবর ভীষণ যন্ত্রণার।

অন্যদিকে প্রশাসন কোনো এক অজানা কারণে এড়িয়ে যেতে চাইছিলো এই প্রসঙ্গ। প্রমাণের অভাবে ধামাচাপা পড়েই যেত হয়ত প্রশ্নফাঁস প্রসঙ্গ। গুটিকয়েক অসৎ ছাত্রছাত্রীদের জন্যে যে কলঙ্কজনক অভিযোগ সামনে এসেছে সেটিকে ব্যবচ্ছেদ করে, তদন্ত করে খতিয়ে দেখবে কে? একজন সত্যিকারের নায়কের দরকার ছিলো সেই সময়টায়, যিনি নিজের শ্রম সময় মেধা দিয়ে উদঘাটন করবেন প্রশ্নফাঁস রহস্য। যিনি শতবর্ষের পথে পা বাড়িয়ে রাখা ইতিহাস ঐতিহ্যের এই ভূমিটিকে কলঙ্কমুক্ত করবার প্রথম স্টেপটা নেবেন…

আবদুল্লাহ আল ইমরান
আবদুল্লাহ আল ইমরান ‘আউটস্ট্যান্ডিং জার্নালিজম এওয়ার্ড’ গ্রহণ করছেন সিআইডি থেকে।

এমনই এক সময়ে দৃশ্যপটে আমরা দেখতে পেলাম আবদুল্লাহ আল ইমরানকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এই ছাত্র তখন চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরে অনুসন্ধ্যানী অনুষ্ঠান ‘সার্চ লাইট’ এর সাথে যুক্ত। তিনি দিনের পর দিন সময় নিয়ে প্রশ্নফাঁসের মূল উৎস খুঁজে বেড়াতে শুরু করলেন। এই কাজটি শুরু করেন ২০১৭ সালে জুলাই থেকেই। সেবছর অক্টোবরে তার অনুসন্ধ্যানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সিআইডি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইটি হলে অভিযান চালিয়ে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। তখনই প্রথম সিআইডির সাথে কাজ করেন আবদুল্লাহ আল ইমরান।

কিন্তু, থেমে ছিলেন না তিনি৷ সমস্যাটির আরো গভীরে পৌঁছে মূল চক্রটিকে খুঁজে বের করতে তিনি অনুসন্ধ্যান চালিয়ে যান। তিনি কয়েকজন সম্ভাব্য প্রশ্নফাঁসকারীর নাম বের করেন। কয়েকজনকে নক দেন, এর মধ্যে একজনকে পেয়ে যান যে তাকে সহযোগিতা করতে রাজি হয়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনে এই প্রসঙ্গে বিবরণ দেন এভাবে, “জানতে পারলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৮তম হয়েছে একজন, যে প্রশ্নপত্র পেয়ে চান্স পেয়েছে। এই একটামাত্র ক্লু পেলাম। আমি নামও জানতাম না। পরে দেখলাম ৪৮তম তিনজন। তাদের মধ্য থেকে একজনকে ফাইন্ড আউট করে তার সঙ্গে কথা বললাম। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে তাকে ব্রেকডাউন করে ফেললাম। ও স্বীকার করলো। তার দেওয়া তথ্য ধরে কাজ শুরু করলাম।

এভাবে কাজ শুরুর পর একের পর এক লেয়ারের কাছে পৌঁছাতে লাগলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, এক সময় এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূলে পৌঁছাতে পারবোই। কোনও না কোনও জায়গা থেকে এই প্রশ্ন ফাঁস হয়। কোথায় থেকে কারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে চায়, আমি সেটা জানতে ও জানাতে চেয়েছি।”

আবদুল্লাহ আল ইমরানের অনুসন্ধ্যানী রিপোর্ট সার্চলাইটের মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে একটা আলোড়ন তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও টনক নড়ে। এর মধ্যে আবদুল্লাহ আল ইমরানের সাথে সিআইডি আবারো যুক্ত হয় এই কাজে। সিআইডি ১৩০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথম দফায় ১৫ জন প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে ভর্ত হওয়া অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের স্থায়ী বহিষ্কার করে। অতি সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় আরো ৬৯ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে। তারা জানিয়েছে এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। আরো একটি বড় খবর হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এমসিকিউ’র পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে রিটেন পরীক্ষাও!

আবদুল্লাহ আল ইমরান, চ্যানেল টুয়েন্টি ফোর
চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের সৌজন্যে।

আবদুল্লাহ আল ইমরানের দুইবছরের ক্রমাগত পরিশ্রম স্বার্থক হলো। সিআইডি তার এই অবদানের জন্যে তাকে “আউটস্ট্যান্ডিং জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড”-এ ভূষিত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসেও আবদুল্লাহ আল ইমরানের এই কনট্রিবিউশন গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় যোগ করেছে বলে মনে করি।

*

আবদুল্লাহ আল ইমরানের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি পরিচয় তিনি একজন কথা-সাহিত্যিক। তার কালচক্র উপন্যাস পড়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন মন্তব্য করেছিলেন, আবদুল্লাহ আল ইমরান সময়ের সম্ভাবনাময় লেখক। একজন কিংবদন্তির এই মন্তব্য নিছক উড়ো খবর হবার নয় নিশ্চয়ই। সেটাই যেন প্রমাণ পেয়েছে তার পরবর্তী বইগুলোর প্রতি পাঠকের ভালবাসায়।

অথচ সময় সবসময় কি এমন মধুর ছিলো? সবকিছুই কি কাকতালীয়? নিশ্চয়ই না। তার প্রথম গল্পের বইটির নাম ‘উড়ে যায় নীল টিপ’। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পড়ছেন। মজার ব্যাপার হলো, তখন গুটিকয়েক কাছের মানুষ ছাড়া কেউই বইটা কেনেনি। অথচ, আবদুল্লাহ আল ইমরান তখনো বেশ পরিচিত মুখ ক্যাম্পাসে, হাজারো লোক তাকে চিনতো।

কাল বদলায়। মহাকাল সাহসী, অধ্যাবসায়ী, বিনয়ী পরিশ্রমীদের জন্যে আলাদা একটা পাতা জমিয়ে রাখে। যে পাতায় সাফল্যের সংবাদগুলো পূর্ণ হতে থাকে ধীরে ধীরে। আবদুল্লাহ আল ইমরানের লেখক স্বত্তা ভিত্তি পেলো ‘কালচক্র’ উপন্যাসের মাধ্যমে। এই উপন্যাসের পর সবাই আবিষ্কার করলো, না তাকে আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না। অনেকেই নিজ থেকে তখন খুঁজতে শুরু করলো তাকে। ধীরে ধীরে আবদুল্লাহ আল ইমরান লেখক হিসেবে পাঠকের ভালবাসা পেতে থাকলেন।

কালচক্র, আবদুল্লাহ আল ইমরান
Courtesy: Boipoka.shop

পাটকলনির্ভর এক নদীবেষ্টিত জনপদের গল্প উঠে এসেছিলো ‘কালচক্র’ উপন্যাসে। এই উপন্যাস সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, “বুকের মধ্যে এক টুকরো মফস্বল নিয়ে ঢাকায় এসেও খুলনার রোদমাখা বিকেলগুলো ভুলতে পারিনি। ভুলতে পারিনি বলেই পাটকল শ্রমিক, মিষ্টি বউদি কিংবা চন্দ্রলেখাদের গোপন বেদনাগুলো লেখায় ফুটিয়ে তোলার ইচ্ছে আমার বহুদিনের।”

বেদনাগুলো ছবির মতো এঁকেছেন যেন তিনি। উপন্যাসের সাথে তার জীবনের শৈশব কৈশোরের চেনা পরিমন্ডলের দৃশ্যপটগুলো উঠে এসেছে বলেই হয়ত, এই গল্প তার ভীষণ আপন। ফলে এই গল্প আপন হয়েছে পাঠকেরও।

কালচক্রের পর দিবানিশি উপন্যাসটিও বেশ চমকপ্রদ। মহেরউদ্দিন ফকির নামক এক ফমির আজ থেকে দেড়শো বছর আগে ‘ফকিরের মনবিলাস’ পান্ডুলিপিতে কিছু গান, গজলে লিখে গিয়েছিলেন সৃষ্টিকর্তার আরাধনা। সেই স্ক্রিপ্টটি হাতে পান আবদুল্লাহ আল ইমরান। তখন তিনি বেশ চমকে যান মহেরউদ্দিন ফকিরের সহজিয়া জীবনদর্শন কিংবা চিন্তাভাবনায়। তিনি এই ফকিরকে তার উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন। ‘দিবানিশি’ নামে একটি মিউজিক্যাল ক্যাম্পেইনও করেন তিনি। গান গেয়েছেন দুর্গ ব্যান্ডের ভোকাল আবদুল্লাহ আল ফারাবী। ইউটিউবে এই নামে খুঁজলে গানটি পাওয়া যাবে, যার কয়েকটি লাইন এমন-

‘ক্ষনেক মুর্শিদ বইলা ডাকি,
ক্ষনেক আমার মনে লয় না,
নিদয়া হইয়ো না মুর্শিদ
নিদয়া হইয়ো না..’

অনেকগুলো চরিত্রের এই উপন্যাসে মনসা দেবীর অভিশাপের সেই লোকজ মিথেরও সন্ধ্যান পাওয়া যায়।

দিবানিশি

আবদুল্লাহ আল ইমরানের লেখার বিশেষত্ব হলো, প্রচন্ড মায়ার সঞ্চার করে তার শব্দগুলো। শব্দ নির্বাচনে তার প্রচেষ্টা চোখে পড়বার মতো। একই সাথে গল্প বলার ভঙ্গি বেশ চমৎকার। এক টানে পড়ে ফেলার মতো সহজ ভঙ্গিতে লেখার কৃতিত্বেত পাশাপাশি গল্পে পাঠকের আকর্ষণ ধরে রাখবার ক্ষেত্রেও তার দক্ষতা। ফলে, ‘এইসব ভালবাসা মিছে নয়’ দুই নরনারীর গল্প হলেও সেটি কেবলই রোমান্টিক হয়ে থাকে না, সেখানে সাসপেন্সও থাকে। সেই সাসপেন্স পাঠককে শেষ পাতার দিকে নিয়ে যেতে থাকে। ফলে, ‘হৃদয়ের দখিন দুয়ার’ বইমেলার শেষলগ্নে আসলেও পাঠকের দৃষ্টি এড়ায় না। পাঠক জানে, আবদুল্লাহ আল ইমরান হয়ত তাদের হতাশ করবেন না।

রকমারির সৌজন্যে

এই আস্থাটুকুই কি আবদুল্লাহ আল ইমরানের সবচেয়ে মহৎ অর্জন নয়? দারুণ ব্যাপার হলো, আবদুল্লাহ আল ইমরানের প্রতি এই আস্থা এখন তার সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য – যে দুটি মাধ্যমে তিনি কাজ করেন, সেই দুই ক্ষেত্রেই সমানতালে বেড়েই চলছে। প্রত্যাশার চাপকে ভালবাসা ধরে নিয়ে তিনি পর্যবেক্ষণ করে যাবেন এই সমাজকে নিবিড়চোখে, লিখে যাবেন বারোয়ারি উপলব্ধিতে ঠাঁসা মোহান্ধ জীবনের গল্প, এই তো শুভকামনা।

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button