রিডিং রুমলেখালেখি

“তুমিও সমান পাপী, কারণ তুমি নীরব”

ধরে নেই, জনাব মোখলেস স্কুল কলেজে বেশ ভালো ছিলেন লেখাপড়ায়। তাঁর দুই সহপাঠি জনাব মোদাব্বের ও জনাব আবুল। তারাও লেখাপড়ায় বেশ ভাল ছিলেন। ভাল ছিলেন বলতে সেই চিরায়ত ফলাফলভিত্তিক ভালো। কষে গণিতের সমস্যা সমাধান করতে পারতেন তিনজনেই। শিক্ষকেরা মোখলেস ও মোদাব্বের সাহেবের গাল টিপে দিত। আবুল সাহেবের গাল এ আদর সোহাগ কম পড়ত একটু।

কারণ তিনি লেখাপড়ায় ভাল হলেও সাথে সাথে “আউট বই” পড়তেন। তাই গণিতের কষা প্যাচ এর পিছনে দুই চার মিনিট সময় কম পড়ত। নাম্বার ও দুই চারটা কম পেতেন। গালে শিক্ষকের আদর ও দুই চারটা কম পড়ত। পাবলিক পরীক্ষায় “মিষ্টি বিতরণযোগ্য” ভাল করে তিনজনেই “স্বনামধন্য” বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন।

এরপর তারা তিনজনেই বাজারের ব্যাগের মত এক ব্যাগ ভর্তি স্বপ্ন নিয়ে সেখানে যাওয়া আসা শুরু করলেন। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয় অন্য শহরে। থাকতে হবে হলে। গেলেন সেখানে। রাতে ডাক এল “পরিচিত” হবার। পরিচিত হতে গিয়ে পরিচয় হল কিছু নতুন নিয়ম কানুন, আদব কায়দা আর মানুষের সাথে। তারা জানলেন তারা আসলে এতদিন যে ভদ্রতা শিখে এসেছেন তা যথেষ্ট নয়।

তারা আস্তে আস্তে প্রটোকল শিখবেন। শিখে নিতে হবে টিকে থাকার দাওয়াই। গোল বাঁধালো সেই “আউট বই” পড়া আবুল। বিস্তর চিল্লাচিল্লি লাগিয়ে দিল সে যে এসব অনুচিত। অবশ্য বেশিক্ষণ টিকল না তাঁর চিল্লাচিল্লি। কারণ সে একা। আর এটা “স্বনামধন্য” জায়গা। এখানে সবাই হাতে কলমে জানে “দশের লাঠি, একের বোঝা”। লাঠি আর বোঝার প্র্যাকটিকাল কোর্স এর পরিক্রমাতে মোখলেস, মোদাব্বের বা আবুল সবাই চুপ হয়ে গেল। মিশে গেল সমাজে।

এর পরের কয় বছর অবশ্য বেশ আলাদা তাঁদের জীবনে। মোদাব্বের সাহেব সমাজে মিশে যাওয়ার সময় যে মানসিক বেদনা পেয়েছিলেন তাঁকে লেখাপড়ার শক্তিতে রুপান্তর করলেন। তিনি এখন শুধুই পড়েন। সারাজীবন পড়ে এসেছেন। সুতরাং কোন সমস্যা হচ্ছে না। তিনি সকালে জলোচ্ছাস হইলেও গণিত কষেন, দুপুরে আরব বসন্তের খবর টিভির ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজলেও গণিত করেন, রাতে জোনাকি পোকা দিয়ে তাঁর বারান্দা ভরে গেলেও তিনি গণিত করেন।

গ্রাজুয়েশান শেষ হবার আগেরদিন তিনি মনে মনে ভাবেন- আগামীকাল তিনি আর “সামান্য ছাত্র” থাকবেন না। জীবনের লক্ষ্য পূরণ হয়ে যাচ্ছে এত অল্প বয়সে। মোখলেস ব্যাটাকে পিছনে ফেলা গেছে। আর আবুলের সাহচর্য থেকে দূরে থাকার উপদেশটা সময় মত কানে নিয়ে বেশ ভাল কাজ করেছেন তিনি। চোখ বন্ধ করেন বেড়া প্রায় অতিক্রম করার খুশীতে তিনি।

আবুল সাহেবের অবশ্য ছোটবেলা থেকেই “সমস্যা” আছে। তিনি এই পাউডারের মত মিশে যাওয়ার ব্যাপারটা পুরাপুরি হজম করতে পারেন নাই। তিনি খবর পড়ে রিয়াকশান লিখেন। প্রতিটা খবর খুটিয়ে পড়তে হয় তাঁকে পড়ার বই বাদ দিয়েও এই কারণে। মাঝে মধ্যে কথাও বলেন বেশ জোরে বন্ধুমহলে। বন্ধুরা তাঁকে মনে করায় দেন- লাঠি-বোঝা প্র্যাকটিকাল এর কথা কি তাঁর মনে নাই? আবুল অবশ্য আবুল বলেই মনে হয় থামতে পারে না। আসলে তাঁর মনে হয় খুব সাহস তো আমার নাই।

আমি শুধু যা মনে করি তা নিয়ে একটু লেখালেখিই করি না হয়। আবুল সাহেব এর রেজাল্ট অবশ্য খুব সুবিধার যাচ্ছে না। আবার একদম খারাপ ও যাচ্ছে না। তাঁকে মাঝে মাঝে তাঁর বাবা মা বলেন সেদিকে নজর দিতে। মাঝে মাঝে বলেন এইসব না করতে। লাভ তো নাই। উলটা ভয় আছে। আবুল সাহেব এর একটু একটু মন খারাপ হয়। তখন উনার বারান্দায় জ্বলতে থাকা জোনাকির দিকে তাকিয়ে উনি ভাবেন- তাহলে কি “আউট বই” তাঁকে চিন্তা করতে শিখায়ে ভুল করে ফেলছে? আচ্ছা নিজে একটা বই লিখে ফেলা যায় না? আবুল সাহেব একটা লাইন লিখে ফেলেন। কিন্তু আর ইচ্ছা করে না। ঘুম পাচ্ছে। কালকে লিখবেন।

মোখলেস সাহেব এর জীবন অবশ্য খুব আনন্দময় বলা যায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন উপভোগ করেছেন চুটিয়ে। ঝামেলা থেকে ১০ হাত দূরে থেকেছেন। ঘুরে বেড়িয়েছেন দূর দুরান্তে ছুটি পেলেই। ফিস্ট করেছেন, আয়োজক হয়েছেন, কনসার্ট এ হেডব্যাং দিয়ে নেচেছেন। বন্ধু পরিবেষ্টিত হয়েছেন। তিনি প্রতিদিন মনে করেন তিনি ভাগ্যবান যে তিনি এখানে এসেছিলেন। সমাজে পাউডার হয়ে মিশে যাবার যে ব্যাপারটা তিনি সেটা করতে পেরেছেন সফলভাবে। লাঠি বোঝার প্র্যাকটিকাল করানো মানুষদের তাঁর ভালই লাগে এখন। নিজে এসব এর চর্চা অবশ্য করেন না।

তবে “ট্রাডিশান” “চেইন অব কমান্ড” বা “প্রটোকল” শব্দগুলার ভারিক্কি ব্যাপারটা তিনি বেশ ভালোই জানেন। তিনি ভাবেন তার কি? বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ইহকালের মত। একদিন চলে যাবেন। স্মার্ট বেশ তিনি। তাঁর অনুজরাও তাই মনে করে। আড়ালে আবডালে তিনি মোদাব্বের সাহেবকে আতেল বলে হাসি তামাশা করতে পছন্দ করেন। আবুল সাহেবকে অবশ্য তাঁর বেশ “পাগল কিসিমের” মনে হয়। ভেজাইল্যা লোক। যায়ে পায়ে পাড়া দিয়ে কি সুখ পায় সে তিনি বুঝেন না। সাধারণভাবেই তার ঝামেলা ভাল লাগে না। কোথায় কে ঝামেলা করতেছে কেন করতেছে সব খবর রাখা সম্ভব নাকি?

সেদিন ও রাস্তায় দুইটা লোক মারপিট করছিল। খুব বিরক্তমুখে এলাকা পার হয়ে এসেছেন। এবং তার মনে হয়েছে আবুলের মত লোকজন লেখালেখি করে যে এটাও এরকম একজনকে যায়ে অকারণে খোঁচা দেয়ার মত। তুমি কি এটা না করলে ভাল থাকতা না? তাইলে কী দরকার ভাই? যাক। এসব হয়তো আগামীকাল শেষ হয়ে যাবে। এখানে তিনি আর ফিরে আসবেন সামান্যই। স্মৃতি রোমন্থন করবেন। বাবা মা খুশী যে সব কিছু করেও তিনি ঝামেলায় জড়ান নাই। ক্লিনশ্লেট। হয়ত উন্নত বিশ্বের কোথাও জায়গা হয়েই যাবে।

পরেরদিন সকালে আবুল সাহেবকে পাওয়া যায় না। রাতের জোনাকির মত সকালে তিনি মিলিয়ে গেছেন। ছাত্ররা ব্যাপক শোরগোল শুরু করে দিয়েছে। আইন শৃংখলা রক্ষায় লোকজন নেমে এসেছে। সব মিলে ক্যাম্পাস সরগরম। মানুষ মোমবাতি জ্বালানো থেকে শুরু করে মিছিল কিছু বাদ রাখছে না। এগুলো অবশ্য এখানে কোন সমস্যা হলেই হয়।

মোদাব্বের সাহেব বেশ বিরক্ত। একাডেমিক ক্যালেন্ডারটা এভাবে গোল পাকিয়ে গেল একজনের কারণে। কী দরকার ছিল ভাই তোর যা মনে চায় বলে দেয়ার? বিরক্তির রেখাগুলো চোখে মুখে স্পষ্ট হয়ে আছে। বেড়া পার হবার ব্যাপারটা যে দরকারী সে মানুষগুলা তো এখন সেটা বুঝবে না। কী একটা ব্যাপার।

মোখলেস সাহেব মোদাব্বের সাহেবকে চার বছর ধরে দেখে আসছেন। তিনি জানেন মোদাব্বের সাহেব কী ভাবছেন। “সেলফিশ শালা” বলে আস্তে করে তিনি মন্তব্য করেন। তবে হ্যা এই মোমবাতি, মানুষের ফুসে ওঠা দেখতে দেখতে তিনি এত বেশি অভ্যস্ত যে তাঁর মনে আর দাগ পড়েনা খুব একটা। কয়দিন পরে তো এসব মিলিয়ে যাবে। আবুলকে কি পাবে আর? কে জানে?

আবুলকে চিনতেন বলে মোখলেস সাহেব এর অবশ্য একটু মন খারাপ। আবুল সাহেব যা যা ভাবতেন তা তিনিও ভাবতেন। কিন্তু শুধু শুধু ভেজালে যাওয়ার মনোভাবটা তিনি আবুল সাহেব এর সাথে কোনদিন শেয়ার করেন নাই। ব্যাপারটাই স্মার্ট আর naïve মানুষের পার্থক্য বলে তিনি মনে করেন। তবে আবুল সাহেব এর জন্য তাঁর মন খারাপ হয় একটু একটু।

তিনি ভাবেন এই মোদাব্বের এর মত লোকেরা ইন চার্জ রয়ে যাবে সামনে। ১০ বছর পরে আরেকটা আবুল হারায় গেলেও মনে হয় একই সাইকেল এ চলবে সব। এরা বই-ই পড়ে গেছে। বন্ধু বানায় নাই। ক্যাম্পাস এর ব্যাপারগুলাতে যোগ হয় নাই। দীর্ঘশ্বাস ভারী হয় তাঁর। আনমনে হাটতে হাটতে আবুল সাহেব এর হলের রুমের দিকে এগুচ্ছেন তিনি। আবুল সাহেব ইচ্ছা করে কোণার দিকের ঘরে থাকতেন।

জোনাকি দেখতে নাকি ভাল লাগে তাঁর। কী উৎকট রোমান্টিকতা। স্বপ্নের জগতে বাস করা লোকেরা। কোথায় আছে কে জানে? কেউ ধরে নিয়ে গেছে? হয়তো। তাঁদের কি ধরা যাবে? হয়তো, হয়তো না। বিচার হবে? হয়তো, হয়তো না। অবশ্য মোদাব্বের এর মত লোকজন ফ্রন্টলাইনে থাকলে বিচার হবেনা বলেই মোখলেস সাহেব এর বিশ্বাস।

তিনি আবুল সাহেব এর টেবিলে তাকিয়ে দেখেন একটা সাদা খাতায় একটা লাইন লেখা। এগিয়ে যান দেখতে তিনি। আস্তে আস্তে লেখাগুলো তাঁর সামনে পরিষ্কার হয়। সাদা কাগজে লাল কালিতে গোটা গোটা হাতের লেখায় সেখানে লেখা আছে- “ তুমিও সমান পাপী, কারণ তুমি নীরব”।

( বাস্তব ঘটনার সাথে এই ঘটনার মিল আছে। বেশ ভালো করেই আছে। তবে চরিত্র গুলো কাল্পনিক। কারো সাথে মিলে গেলে গোপনে অফেন্ডেড হতে পারেন। সেজন্য ক্ষমাপ্রার্থী। তবে মোখলেস, মোদাব্বের বা আবুলদের কোন পরিষ্কার চেহারা হয় না। এরা যতটা মানুষ তাঁর চেয়ে বেশি সীমারেখার মত সত্ত্বা)

লেখক – আসিফ হাসান জিসান 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button