আপনি-ই সাংবাদিকইনসাইড বাংলাদেশ

৩৪ তম বিসিএস- নেপথ্যের না জানা গল্প…

আপনার যারা ৩৪ তম বিসিএসের ক্যাডার, কতোটা জানেন সেই ঘটনাগুলো? ফেসবুক মেমোরি ছয় বছর আগের ৩৪ তম বিসিএসের আজকের ঘটনাটা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ছয় বছর আগে আজকের দিনে লিখেছিলাম- প্রিলিমিনারি থেকেই কোটা রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে পিএসসি। কিন্তু এর পেছনে কত ঘটনা ছিল! কত চাপ!

৩৪ তম বিসিএসের সেসব ঘটনা ভুলি কী করে? ৩৪ তম বিসিএসের প্রিলি হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৪ মে। এরপর ৮ জুলাই প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১২ হাজার ৩৩ জন উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ফল প্রকাশের পর অনেকেই আমাকে ফোন করে অভিযোগ করেন- পরীক্ষা খুব ভালো হলেও চান্স পাননি। আবার কোটা আছে এমন অনেকেই খারাপ পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়েছে। বিস্ময়কর ঘটনা!

লেখক শরীফুল হাসান

পিএসসি নিয়ে সাংবাদিকতায় আগে কখনো এই ধরনের ঘটনা শুনিনি। কাহিনী কী? ৮ জুলাই বিকেলে ফল দেয়ার পর অনুসন্ধান শুরু করলাম। পরদিন ৯ জুলাই সারাদিন খোঁজ করলাম। পিএসসির বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম, ৩৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পর্যায় থেকেই কোটা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। তার মানে কেউ ৬০ পেয়ে টিকেছেন, আবার কেউ ৮০ পেয়েও টিকেননি। কী ভয়ঙ্কর ঘটনা!

পুরো বিষয়টা ব্রেকিং ছিল। আমি যখন পুরো বিষয়টা জেনে সংবাদ প্রকাশের জন্য মন্তব্য চাইলাম, পিএসসির চেয়ারম্যান সদস্যরা ক্ষেপে গেলেন। তারা চাইলেন কোনভাবেই যেন নিউজটা না হয়। সরকারের ভয়ঙ্কর প্রভাবশালী এক পিএসসি সদস্য আমাকে মোটামুটি থ্রেট করলেন। কিন্তু আমি অনড়। পরদিন আমি আমার অনুসন্ধান নিয়ে প্রথম আলোতে নিউজ করলাম ৩৪ তম বিসিএস: শুরুতেই কোটা নির্ধারণ। চাইলে কেউ আজও পড়তে পারেন এই লিঙ্কে ক্লিক করে।

এরপর? চাকুরিপ্রার্থীরা বিষয়টা জানতে পেরে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। পরদিন শাহবাগ বন্ধ। সকাল থেকে উত্তপ্ত গোটা শহর। অবশেষে বিকেল বেলায় পিএসসি ঘোষণা দেয়, ফল পুনর্মূল্যায়ন হবে।

তবে প্রথমবারের মতো প্রিলিমিনারিতে কোটা-পদ্ধতি চালু করায় অনেক মেধাবী বঞ্চিত হন। এ নিয়ে আন্দোলন শুরু হলে ১০ জুলাই ফল পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি। আমি তারপর স্ট্যাটাস দেই- প্রিলিমিনারি থেকেই কোটা রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে পিএসসি। আমার ছোট্ট একটা নিউজে হয়তো হাজারো পরীক্ষার্থীর উপকার হয়েছে, কিন্তু পিএসসির চোখে আমি ভিলেন। পিএসসির মেম্বাররা ফোন করে আমাকে সমানে গালিগালাজ করেছে।

না ক্ষমতাশালীদের এই গালিগালাজ আমার জন্য নতুন নয়। আমার আনন্দ বরং অন্যখানে। ১৩ জুলাই করেছিলাম সেই ঐতিহাসিক নিউজ- মেধা নয়, কোটার প্রাধান্য। পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

এরপর ১৪ জুলাই ফের ফল প্রকাশ করা হলো। এবার উত্তীর্ণ দেখানো হয় ৪৬ হাজার ২৫০ জন। তারমানে কী পরিমান বৈষম্য করা হয়েছিল! আমি জানি ৩৪ তম বিসিএসে যে ২ হাজার ১৫৯ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ পেয়ে আজ চাকুরি করছেন তাদের বেশিরভাগই দ্বিতীয়বারের সুপারিশে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। পিএসসির ভাবনা ছিল, ৩৪ এর পর থেকে প্রিলিতেই কোটা শুরু হবে। কিন্তু আমার এই এক নিউজের কারণে তারা সেটা করতে পারেনি। নয়তো প্রতিটা বিসিএসেই তাই হতো।

আমার ১৫ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা বলছে, অধিকাংশ ঘটনার পর সাংবাদিকদের কথা কেউ মনে রাখে না। এই তো কয়েকদিন আগে ৩৪তম বিসিএসের এক ক্যাডার আমাকে ফেসবুকে আইন কানুন শেখাচ্ছিলেন। কীভাবে সাংবাদিকতা করতে হয় তাও শেখাচ্ছিলেন। মনে মনে হাসলাম। দুই বছর চাকুরি করেই আইন কানুন শেখাচ্ছেন! অথচ এক জীবনে কত প্রভাবশালী সব লোকজনের হুমকি, ফোন এসব উপেক্ষা করে নিউজ করতে হয়েছে। আর সেইসব নিউজে আপনার মতো কেউ না কেউ উপকৃত হয়েছে।

বিসিএস

সরকারি চাকুরি করা যেসব ভাইবোনেরা আমাকে নানা সময় জ্ঞান দেন, তাদের শুধু একটা কথাই বলি- আমার একটা নিউজে একটা বিসিএসের ফল বদলে গিয়েছিল। কয়েক হাজার তরুণ তরুণী নতুন করে বিসিএস ক্যাডার হয়েছিল। এক জীবনে আমার বহু নিউজ বা বহু কাজে এমন অনেকের জীবন বদলেছে।

১৭ বছর ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ, প্রশাসন আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। সচিব, আইজিপি থেকে শুরু করে নানা পর্যায়ের নানা পদের অসংখ্য কর্মকর্তার সঙ্গে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কেউ বলতে পারবে না কাউকে অসম্মান করেছি। একজনও বলতে পারবেন না দেশ মানুষের উপকার ছাড়া ক্ষতি করেছি। আমি খুব বড় গলায় বলতে পারি সারাজীবন দেশকে, মানুষকে দিয়েছি। একটা পয়সাও কোনোদিন হারাম আয় করিনি। কোনোদিন কোনো হুমকি বা ভয়ে থেমে যাইনি।

সেদিন পিএসসি চেয়েছিল ৩৪ তম বিসিএসের নিউজটা আমি না করি। আমি কিন্তু থামিনি। কারণ আমি থামলে বহু মানুষ ক্ষতিতে পড়তো। প্রথম থেকেই কোটা চালুর ভয়াবহ একটা কালচার তৈরি হতো। জেনে বুঝে আমি সেটা করিনি।

পিএসসির যে সদস্য সেদিন আমাকে সবচেয়ে বেশি হুমকি দিয়েছিলেন, বলেছিলাম আমি দেশের সর্বনাশ করছি, তিনি আজও ক্ষমতাশালী। আমি কিন্তু পরে তার আরও অনেক দুর্নীতির খবর জেনেছিলাম। যাই হোক, আমি আমার সারাজীবনে কখনো নৈতিকতার কাছে হারিনি। যতদিন বাঁচবো, হারতেও চাই না। বরং মানুষ হিসেবে বাঁচতে চাই। মানুষের পাশে থাকার জন্য বাঁচতে চাই। আর মরার আগে মরতে চাই না। যেদিন মরবো, সেদিনও মানুষ হয়েই মরতে চাই। ৩৪ তম বিসিএসের সবাইকে শুভেচ্ছা।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button