অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

কোন সালে বাস করছি আমরা, ২০১৭ নাকি ১৭২০?

একুশ শতকের বাসিন্দা বলে যারা খুব গর্ববোধ করেন বা নিজেদেরকে ভাগ্যবান বলে মনে করেন, কেমন হবে যদি কেউ আপনাদেরকে এসে বলে যে এটি আসলে ২০১৭ সাল নয়, এবং অনাগত আসন্ন বছরটিও ২০১৮ সাল নয়? কেমন হবে যদি কেউ দাবি করে এখন মূলত ১৭২০ সাল চলছে, আর কদিন পরই আমরা পা দেব ১৭২১-এ?

জানি, গোটা বিষয়টিই শুনতে অতিমাত্রায় হাস্যকর বলে মনে হচ্ছে। অবশ্য সেটিই তো স্বাভাবিক। তবে সত্যি সত্যিই কিন্তু এমন একটি সম্ভাবনা রয়েছে, অন্তত কেউ যদি ফ্যান্টম টাইম হাইপোথিসিসে বিশ্বাসী হন।

ফ্যান্টম টাইম হাইপোথিসিস হলো একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, যার প্রবর্তক জার্মান ইতিহাসবিদ হেরিবার্ট ইলিগ। তার দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে আমরা বর্তমানে যে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে থাকি তার পুরোটাই ভুয়া ও বানোয়াট, এবং মানবজাতি এই মুহূর্তে ২০১৭ সালে নয় বরং ১৭২০ সালে বাস করছে।

এর মানে দাঁড়াচ্ছে, প্রকৃত যে সাল তা থেকে ২৯৭ বছর এগিয়ে রয়েছি আমরা! কীভাবে তা সম্ভব? এরই একটি আপাতদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য কিন্তু একইসাথে সামান্য হলেও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা মেলে ফ্যান্টম টাইম হাইপোথিসিসে।

হেরিবার্ট ইলিগ কর্তৃক সর্বপ্রথম ফ্যান্টম টাইম হাইপোথিসিস কথাগুলি উচ্চারিত হয় ১৯৯১ সালে। তার প্রবর্তিত তত্ত্ব অনুসারে, পোপ সিলভাস্টার টু, পবিত্র রোমান সম্রাট অটো থ্রি, এবং বাইজেন্টাইন সম্রাট কনস্ট্যান্টিন সেভেন একত্র হন একটি নতুন ধারণার জন্ম দিতে। আর সেটি হলো, বিশ্ব ইতিহাসে ২৯৭টি এমন বছর যুক্ত করা, বাস্তবে যাদের কোন অস্তিত্বই ছিল না।

স্বাভাবিকভাবেই ওই ২৯৭টি বছরকে তো আর এমনি এমনিই বর্ষপঞ্জিতে যোগ করে দেয়া যায় না। তাই তৎকালীন এই তিন বিশ্বনেতা মিলে খুব মাথা খাটিয়ে ওই ২৯৭ বছরে কী কী ঘটেছিল, তার মনগড়া কাহিনী তৈরী করেন, এবং সমসাময়িক ও পরবর্তী ইতিহাসবেত্তাদেরকে বাধ্য করেন বিশ্ব ইতিহাস রচনার সময় ওই অতিরিক্ত ২৯৭ বছর ও সেই সময়ে সংগঠিত কাল্পনিক ঘটনাসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করতে। এভাবেই কোন প্রকার টাইম মেশিনে না চড়েই, স্রেফ তিনজন ব্যক্তির মিলিত সিদ্ধান্তে এক লাফে পুরো ২৯৭টি বছর এগিয়ে যায় সমগ্র বিশ্ববাসী।

বাস্তবিকই এমন কোন ঘটনা ঘটেছিল কিনা, তা জানা না গেলেও, ইলিগের দাবিকে একেবারে উড়িয়েও দেয়া যায় না। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, ৬১৪ খৃষ্টাব্দ থেকে ৯১১ খৃষ্টাব্দের মধ্যকার ২৯৭ বছর কাল্পনিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষেও একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বিশ্ব ইতিহাসে ৬১৪ খৃষ্টাব্দের পূর্বে এবং ৯১১ খৃষ্টাব্দের পরে যত ঘটনা ঘটেছে, তার তুলনায় মাঝের ২৯৭ বছরে খুব কম ঘটনাই ঘটেছে। এবং এই সময়ে ঘটা ঘটনাগুলো খুব একটা তাৎপর্যপূর্ণও ছিল না, অর্থাৎ বিশ্ব ইতিহাসের পরবর্তী সময়কালে তারা তেমন বেশি প্রভাব ফেলেনি।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, তা হলো জুলিয়ান ও গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী সময় গণনার পার্থক্য। গাণিতিকভাবেও যদি ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ মাঝের ওই ২৯৭টি বছরের ব্যাখ্যা দাঁড়া করতে চাওয়া হয়, সেক্ষেত্রে বিশেষ সাহায্য করতে পারে জুলিয়ান ও গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির এই বৈসাদৃশ্য।

পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, অন্যান্য ইতিহাসবিদরা হেরিবার্ট ইলিগের এই তত্ত্বকে কীভাবে গ্রহণ করেছিল। বলাই বাহুল্য, মূলধারার ইতিহাসবিদগণ এটিকে খুব একটা আমলে নেননি। আর সেজন্যই অধিকাংশ মানুষই আজও এই তত্ত্ব সম্পর্কে অবগত নন। তবে তাই বলে ইলিগের তত্ত্বকে যে সকলেই নাকচ করে দিয়েছেন, এমনটিও নয়।

১৯৯৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব লিপজিগের অধ্যাপক ড. হ্যানস উলরিখ নিয়েমিজ ‘প্রাক মধ্যযুগের অস্তিত্ব কি আদৌ ছিল?’ শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি দাবি করেন, ‘না, প্রাক মধ্যযুগ বলতে আমরা যে সময়কালের কথা জানি, বাস্তবে তার কোন অস্তিত্ব ছিল না।’ এবং কাকতালীয় ব্যাপার হলো, তার এই ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল যে বিশ্বাস, তা অনেকটাই আমাদের আলোচ্য ফ্যান্টম টাইম হাইপোথিসিসের সাথে মিলে যায়।

তার ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়, ‘প্রাচীনকাল (খৃষ্টাব্দ ১) হতে পুনর্জাগরণ (খৃষ্টাব্দ ১৫০০) এর মধ্যস্থিত সময়কালে ইতিহাসবিদরা আনুমানিক ৩০০ বছর অতিরিক্ত গণনা করেন। অন্য কথায় বলতে গেলে, রোমান সম্রাট অগাস্টাস আসলে ২০০০ বছর আগে নয়, ১৭০০ বছর আগে বেঁচে ছিলেন।’

তাহলে পাঠক এখন নিশ্চয়ই ভাবছেন, আপনিও কি ইলিগ ও নিয়েমিজের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করবেন, নাকি মূলধারার ইতিহাসবিদদের মতই এটিকে নাকচ করে দেবেন? তার আগে আপনার জানা দরকার, মূলধারার ইতিহাসবিদগণ কেন এই তত্ত্বকে স্বীকৃতি দেয়নি।

এর পেছনে প্রধান কারণ হলো, ৬১৪ থেকে ৯১১ খৃষ্টাব্দের মধ্যে কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনাই ঘটেনি, এ দাবি যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে এই সময়কালে গড়ে ওঠা বাইজেন্টিয়াম সাম্রাজ্য ও ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তিকেও অস্বীকার করতে হয়। কিন্তু ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দুইটি অনুষঙ্গ, যাদের প্রভাব আজকের দিনে এসেও বিদ্যমান, তাদেরকে এত সহজে অস্বীকার করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

তাই প্রচলিত গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির সত্যতা প্রতিষ্ঠায় ইতিহাসবিদগণ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন নথিভুক্ত সূর্যগ্রহণের ইতিহাস, আর এশিয়া ও ইউরোপের বাইরেও পৃথিবীর অন্যান্য নানাপ্রান্তে ৬১৪ থেকে ৯১১ খৃষ্টাব্দের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহকে।

কিন্তু এ কথাও অনস্বীকার্য যে ফ্যান্টম টাইম হাইপোথিসিস বেশকিছু চিন্তা উদ্রেককারী প্রশ্নের জন্ম দেয়, যেগুলোর সদুত্তর আজও পাওয়া যায়নি। এবং যতদিন সেগুলোর উত্তর পাওয়া না যাবে, ততদিন অত্যন্ত ক্ষীণভাবে হলেও এই বিতর্কের প্রদীপ জ্বলতেই থাকবে।

(পুনশ্চঃ পাঠক কি খেয়াল করেছেন, গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি মোতাবেক চলতি বছর ২০১৭ আর ফ্যান্টম টাইম হাইপোথিসিস অনুসারে বর্তমান বছর ১৭২০ – সংখ্যা দুইটির মধ্যস্থিত অংকগুলো অভিন্ন! আরও সহজ করে বললে, ২০১৭-এর ২০ আর ১৭ এর জায়গা বদলে দিলেই হয়ে যায় ১৭২০!)

তথ্যসূত্র- ডিসক্লোজ ডটটিভি, ট্রুথকমান্ড ডটকম

 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button