সিনেমা হলের গলি

সকাল দেখেই পুরোটা দিন বিচার করা যায় না!

শঙ্কা ছিল শুরু থেকেই। যেভাবে একের পর এক রিলিজ ডেট পেছানো হচ্ছিল, তাতে সিনেমা নিয়ে মানুষের আগ্রহ মরে ভূত হয়ে যাওয়ার কথা। হাইপ খানিকটা কমেও গিয়েছিল একটা সময়ে। এই বছরের সবচেয়ে প্রত্যাশিত সিনেমাগুলোর মধ্যে একদম ওপরের দিকে ছিল ২.০ এর নাম, অথচ এই সিনেমাটাই ২০১৮ সালে মুক্তি পাবে কিনা, এমন শঙ্কা জেগেছিল৷ সলো রিলিজের ডেট খুঁজতে আর বড় সিনেমার সাথে ক্ল্যাশ এড়াতে গিয়ে বেশ কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে সিনেমার মুক্তির দিনক্ষণ৷ শেষমেশ অনেক জল ঘোলা করার পরে গতকাল মুক্তি পেলো দক্ষিণ ভারতীয় এই সিনেমাটা। আর মুক্তির পর থেকেই সমালোচক এবং দর্শকদের প্রশংসায় ভাসছে ২.০। বিশেষ করে অক্ষয় কুমারের অভিনয়, শঙ্করের পরিচালনা আর ভিএফএক্সের সুনাম সবার মুখে মুখে।

দিওয়ালিতে মুক্তি পাওয়া বিগ বাজেটের সিনেমা থাগস অফ হিন্দুস্তান যখন বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছিল বাজেভাবে, তখন অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, ‘রোবট’- এর সিক্যুয়েল ২.০ সিনেমাটাকেও প্রায় একই ভাগ্য বরণ করতে হয় কিনা। সিনেমার বাজেটই তো প্রায় ছয়শো কোটি রূপি৷ এই সিনেমাকে শুধু ভারতের বক্স অফিসে হিট ভার্ডিক্ট পেতে হলেই ব্যবসা করতে হবে প্রায় ৭০০ কোটি রূপির, যেটা কিনা মডারেট ভারতীয় সিনেমার বিচারে অলটাইম ব্লকবাস্টারের সমান৷ তার ওপরে গল্পের গাঁথুনি কিংবা নির্মাণে সামান্য এদিক সেদিক হলেই যে ছুরিতে শাণ দিয়ে নেমে পড়বেন সমালোচকেরা, সেটাও জানা ছিল। তার ওপরে টিজার, ট্রেলার বা গান, কোনকিছুই খুব বেশি মনোঃপুত হয়নি দর্শকের৷ আর তাই ভয়টা ছিলই।

২.০, রোবট, চিট্টি, রজনীকান্ত, শঙ্কর, অক্ষয় কুমার, দক্ষিণী সিনেমা

তবে মুক্তির পরপরই সবাই ভূয়সী প্রশংসা করছেন ২.০ এর। সমালোচক থেকে সাধারণ দর্শক, প্রায় সবারই পছন্দ হয়েছে সিনেমাটা৷ শঙ্কর গুণী পরিচালক, ম্যাস অডিয়েন্সের পালসটা তিনি খুব ভালো বোঝেন। দর্শক কি দেখতে চায়, কোন আইটেমটা দর্শককে কিভাবে খাওয়াতে হয়, সেই মুন্সীয়ানার পরিচয় তিনি দিয়েছেন ২.০ তে-ও। গল্পের গাঁথুনি দুর্বল, এটা অনেকেই বলেছেন। কিন্ত রজনীকান্ত আর অক্ষয়ের মতো দুইজন তারকাকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে পেরেছেন শঙ্কর, এটাও বলেছেন সবাই৷ একটা সিনেমায় দুই ইন্ডাস্ট্রির দুই তারকাকে সমান স্ক্রিনটাইম আর চরিত্রের প্রায় একই গুরুত্ব দেয়াটা যেকোন পরিচালকের জন্যেই যথেষ্ট কঠিণ৷ তার ওপরে অক্ষয়কে ভিলেন হিসেবে দর্শকেরা কতটা মেনে নেবে, এটাও একটা চ্যালেঞ্জ ছিল৷ সেই চ্যালেঞ্জটা নিয়ে সেখানে জিতে এসেছেন শঙ্কর।

যে জিনিসটার প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ, সেটা হচ্ছে সিনেমার ভিএফএক্স। বাজেটের একটা বড় অংশ খরচ হয়েছিল ভিএফএক্স টিমের পেছনে। শঙ্কর দাবী করেছিলেন, এই সিনেমার অ্যানিমেশনের কাজ করা হয়েছে হলিউডি স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে। ভিএফএক্স টিমের সদস্যরা এর আগে কাজ করেছিলেন ‘লাইফ অফ পাই’, ‘300’ এর মতো সিনেমায়। ২.০ -তে আক্ষরিক অর্থেই ফাটিয়ে দিয়েছেন তারা৷ মাল্টিপ্লেক্সে বসে যারাই ২.০ দেখেছেন, তারা একবাক্যে স্বীকার করেছেন, ভারতীয় সিনেমায় এযাবতকালে ভিএফএক্সের যতো কাজ হয়েছে, তারমধ্যে এটাই সেরা।

২.০, রোবট, চিট্টি, রজনীকান্ত, শঙ্কর, অক্ষয় কুমার, দক্ষিণী সিনেমা

রমেশ বালা থেকে তরন আদর্শ, কিংবা ফরিদুন শাহরিয়ার, সবাই স্ততিবাক্য পাঠ করেছেন ২.০ দেখার পরে৷ তরন আদর্শ তো নিজের ওয়ান ওয়ার্ড রিভিউতে ২.০ কে ব্লকবাস্টার ঘোষণা করেই দিয়েছেন। সিনেমা হল থেকে বের হওয়া দর্শকেরাও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন, ডক্টর রিচার্ড আর ২.০ এর লড়াইটা পুরোপুরি উপভোগ করার কথা জানিয়েছেন বেশিরভাগ মানুষ৷ রজনীকান্ত তো তার মতোই, অভিয়ের জন্যে বেশি হাততালি পেয়েছেন অক্ষয় কুমার৷ এই সিনেমার পুরো শুটিং হয়েছে থ্রিডি ক্যামেরায়, তাও একটা নয়, দুটো থ্রিডি ক্যামেরায় বন্দী হয়েছেন অভিনেতারা। ভারতে এই প্রথম থ্রিডি ক্যামেরায় কোন সিনেমা পুরো শ্যুট করা হয়েছে৷ ফোর-ডি সাউন্ড সিস্টেম ব্যবিহার করা হয়েছে সিনেমায়, দর্শকের কানে প্রশান্তি দেয়ার জন্যে।

অনেকেই বলেছেন, এটা ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনে দেখার সিনেমা নয়। থ্রিডি গ্রাফিক্স আর ভিএফএক্সের যে প্রযুক্তি এই সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা থিয়েটার বা মাল্টিপ্লেক্সের ভালো স্ক্রিনের সামনে না বসে উপভোগ করা যাবে না পুরোপুরি৷ হলপ্রিন্ট তো দূরের কথা, মোবাইক বা কম্পিউটারের পর্দায় এই সিনেমার ভালো প্রিন্ট দেখলেও নাকি পানসে মনে হবে৷ বলিউড হাঙ্গামার ফরিদুন শাহরিয়ার তো ২.০ কে হিন্দি সিনেমার জন্যেই একটা মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচনা করলেন। সিনেমায় প্রযুক্তি ব্যবহারের নতুন একটা প্যারামিটার সেট করে দিয়েছে শঙ্করের এই সিনেমা, এমনটাই তার অভিমত।

নেগেটিভ রিভিউ যে আসেনি এমনটাও নয়। কামাল আর খান, ওরফে কেআরকে তো এই সিনেমাকেও জিরো স্টার দিয়েছেন, অবশ্য এটা নতুন কিছু নয় তার জন্যে৷ ফিল্ম ক্রিটিক্স অনুপমা চোপড়ারও খুব একটা পছন্দ হয়নি সিনেমাটা, তবুও ভদ্রতা করেই বোধহয় ৩.৫ স্টার তিনি দিয়েছেন ২.০ কে। অবশ্য, সবার সবকিছু ভালো লাগতে হবে এমন কোন নিয়ম নেই। ম্যাস অডিয়েন্সের ভালো লাগলেই প্রযোজকের পকেট ফুলবে৷ ২.০ এর ক্ষেত্রে তেমনটা হবে কিনা, সেটা জানার জন্যে আরও দুয়েকটা দিন অপেক্ষা করতেই হবে।

দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা রজনীকান্ত, সেখানে তার ক্রেজটাই অন্যরকমের। ২.০ মুক্তির আগেও সেই ক্রেজের অনেক নমুনা দেখা গিয়েছিল। সাউথে রজনীর সিনেমা মুক্তি মানেই একটা অঘোষিত উৎসবের আমেজ। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি৷ তবে বক্স অফিস কালেকশন যেটা এসেছে প্রথমদিনে, সেটা ভালো, কিন্ত দারুণ কিছু নয়। হিন্দি ভার্সনে প্রথম দিনে ২.০ এর আয় ২০ কোটি রূপি, তামিলনাড়ু থেকে প্রথম দিনের বক্স অফিস ইনকাম ৩৫ কোটি রূপির মতো৷ রেকর্ড গড়তে পারেনি কোথাও। সবগুলো ভাষা মিলিয়ে প্রথম দিনের আয়টা প্রায় একশো কোটি ছোঁয়ার কথা, তবে সিনেমার বাজেটই যখন ৬০০ কোটি রূপি, তখন ১০০ কোটির অঙ্কটাকেও কম বলেই মনে হয়। দাঙ্গাল বা বাহুবলি-২ এর রেকর্ড ভাঙাটা কঠিণই হবে এই সিনেমার জন্যে৷ ওয়ার্ড অফ মাউথ বেশ ভালো, এটাই আপাতত আশার খবর।

টিজার-ট্রেলার আর গান প্রকাশের পরে যেমন একটা হতাশা ছিল ২.০ নিয়ে, সেটা অনেকটাই মিইয়ে গেছে সিনেমা মুক্তির পরে। এখন তো উল্টো প্রশ্ন উঠে গেছে, দর্শককে বোকা বানানোর জন্যে পরিচালক শঙ্কর ইচ্ছে করেই ট্রেলার-টিজারে খামখেয়ালিপনা করেছেন কিনা! দিনের শুরুটা সবসময় পুরো দিনের চেহারাটা বলে দিতে পারে না, এটা তো পরিস্কার এখন। সমালোচক-দর্শকের মন জয়ের সঙ্গে সঙ্গে বক্স অফিসেও ঝড় তুলছে ২.০, যদিও সেই ঝড়টা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে বোঝা যাচ্ছে না এখনও। তবে অবস্থাদৃষ্টে ৬০০ কোটি বাজেটের এই সিনেমার হিট হওয়াটা এখন সময়ের ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছে৷ 

আরও পড়ুন-

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button