টেকি দুনিয়ার টুকিটাকি

#10YearChallenge- পাপেট মাস্টারদের নাচের পুতুল হয়ে যাচ্ছেন না তো?

ফেসবুকের নিউজফিড জুড়ে ‘টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ’। নিত্যনতুন ট্রেন্ডি বিষয় প্রতিনিয়ত দেখা যায় ফেসবুকে৷ নির্বাচনের পর কয়েকদিন ধরে “এই মনে করে ভাল্লাগে, ঠ্যালায়, ঘোরতে” লাইনটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে যায় ফেসবুকে৷ সেই রেশ কাটেনি পুরোপুরি। এখন নতুন করে শুরু হয়েছে দশ বছরের চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে সবাই তার পুরানো দশ বছর আগের ছবির সাথে বর্তমান অবস্থার তুলনামূলক চিত্র ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে আপলোড দিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ এই ট্রেন্ড বেশ সাড়া জাগিয়েছে অনলাইনে। সারা বিশ্বেই এই ট্রেন্ডটি জনপ্রিয় হয়ে গেছে এর মধ্যে, সেলিব্রেটি থেকে শুরু করে সাধারণ ফেসবুকার সবাই “টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ” আপলোড দিচ্ছে।

তুলনা করার ব্যাপারটা মানুষের মজ্জাগত। মানুষ প্রতিনিয়তই নিজের অবস্থানকে তুলনা করে যায়, নিজের সাথে, অন্যের সাথে। স্বাভাবিকভাবে পরিবর্তন অতটা ধরা না পড়লেও অনেকদিনের পুরানো ছবির এলবামে চোখ বুলালে আসলে বোঝা যায়, সময় কিভাবে চলে যাচ্ছে। অনেকের কাছে তাই চ্যালেঞ্জটি মজার, দশ বছর আগের ছবি খুঁজে বর্তমানের সাথে তুলনামূলক ছবি দিয়ে তারাও হয়ত বিস্মিত, কতটা পাল্টেছে জীবন।

কিন্তু প্রত্যেকটা প্রযুক্তিগত ট্রেন্ডে আসলে কারা বেশি সুবিধা হাসিল করছে, সেটা একটা ভাবনার বিষয়। আমাদের এমনিতেই তাড়াহুড়ো একটু বেশি। কোনো অ্যাপসেরই টার্ম এন্ড কন্ডিশন না পড়ে আমরা সেসবের সাথে একমত হই। আর কত ধরণের অ্যাপস আমাদের ফোনের কন্টাক্ট, মেসেজ, গ্যালারির সব ছবির একসেস নিয়ে নিচ্ছে তার হিসাব নেই। এমনকি আমাদের ফোন, ল্যাপটপের ক্যামেরার একসেসের অনুমতিও তারা নিয়ে নিচ্ছে। নিজের অজান্তেই আমরা কি বিপুল পরিমাণ তথ্য দিয়ে দিচ্ছি, তা হয়তো খেয়ালই করি না। পাঠাও কিংবা ফেসবুক, আমাজনের মতো জায়ান্টরা আমাদের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে, থার্ড পার্টিকে ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে এসব খবরে আমরা তাই সাময়িকভাবে প্রাইভেসি নিয়ে বিতর্ক করি। কিন্তু, প্রাইভেসি কিভাবে রক্ষা করতে হবে সেই প্রস্তুতি আমাদের কতটুকু?

আপনার গার্লফ্রেন্ডের নামের অক্ষর কি, আপনার চেহারা কোন নায়কের মতো, আপনার ভবিষ্যত গাড়ির মডেল কি, আপনার চরিত্র কেমন- এসব তথ্য জানার জন্য ফেসবুক কিংবা ইমেইল দিয়ে যেসব সাইট, অ্যাপসে প্রবেশ করেন তারাও কিন্তু এসব ফালতু তথ্য দিয়ে আপনার মনোরঞ্জনের বিনিময়ে আপনার তথ্যের একসেস নিয়ে নিচ্ছে। আসলে আপনি নিজেই একসেস দিচ্ছেন৷ প্রযুক্তি প্রতি মুহুর্তে আপনাকে খেয়াল করছে। আপনার হোমপেজে কোন বিজ্ঞাপনগুলো আসে খেয়াল করে দেখেছেন? আমি কিছুদিন আগে ফেসবুকের দেয়া বিজ্ঞাপনে জুতা বিক্রির একটা ওয়েবসাইটে প্রবেশ করি। তারপর থেকে খেয়াল করলাম, আমাকে এখন বিভিন্ন জুতা কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে। বই বিক্রির পেজগুলোতে প্রবেশ করতাম বলে এখন আমাকে দুনিয়ার সব বইয়ের বিজ্ঞাপন গিলানো হচ্ছে। আমার সোশ্যাল মিডিয়ার আচরণকে ট্র‍্যাক করে আমাকে কমার্শিয়ালি ব্যবহার করা হচ্ছে। এইটুকু এড়ানোর কোনো উপায় নেই আপাতত৷

এখন বলি, এই নব্য ভাইরাল হওয়া ট্রেন্ড কিভাবে আপনাকে প্রভাবিত করতে পারে? টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জ এর মাধ্যমে আমরা দশবছর আগের সাথে বর্তমান অবস্থার তুলনামূলক ছবি আপলোড করছি। সাথে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছি। এই তথ্যগুলো ডাটা এনালিস্টরা প্রতিনিয়ত স্টোর করে রাখছে। আমাদের দেয়া ছবির উপর ভিত্তি করে তারা সহজেই দশ বছরের পরিবর্তন ধরতে পারছে। আমাদের কাছে পরিবর্তনটা নিতান্তই ব্যাক্তিগত, কিন্তু তারা এই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে একটা প্যাটার্ন বের করতে পারবেন। তারা বিশ্লেষণ করে দেখবেন, রুচির কতটা পরিবর্তন হলো, লাইফস্টাইল কতটা পাল্টালো।

এই তথ্যগুলো ট্রেন্ডের মাধ্যমে পাওয়া সহজলভ্য। কারণ একেকটা ট্রেন্ডে নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে আমরা ট্রেন্ড ফলো করে নিজেকে প্রকাশ করছি। ফলে একসাথে একই প্যাটার্নের তথ্য খুঁজে পেতে তাদের বেগ পেতে হবে না। বলতেই পারেন, আপনি আমি তো এমনিতেই কত ছবি আপলোড করছি। ঠিক। কিন্তু, কোটি কোটি ব্যবহারকারীর এত বিপুল পরিমাণ ছবি এনালাইসিস করে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা বেশ ঝামেলাপূর্ণ। তার চেয়ে এটা ভাল না, একটা নির্দিষ্ট ট্রেন্ডের মাধ্যমে সবার দশ বছরের পরিবর্তনটা সহজেই ধরে ফেলা? এই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে তাদের লাভ কি? তারা আসলে এই তথ্যকে কাজে লাগাতে পারেন অনেকভাবেই। নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার, নতুন পণ্যের লঞ্চিং, নতুন ক্যাম্পেইন লঞ্চ করা, মার্কেটিং পলিসি তৈরি করা থেকে শুরু করে অনেক কিছুই করতে পারবে তারা৷ তারা বলতে যারা তথ্যগুলো স্টোর করছে তাদের বোঝানো হচ্ছে।

কেট ও’নিল নামক একজন বিশ্লেষক দশ বছরের চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন এই ট্রেন্ডের মাধ্যমে লাভবান হতে পারে ফেসবুক। এর পেছনে শক্ত যুক্তিও আছে। ফেসবুক ইতিমধ্যে তাদের ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তিকে শক্তিশালী করার চেষ্টায় আছে। তারা তাদের এলগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ফেস শনাক্ত করতে পারে। ধরুন, আপনি একটি গ্রুপ ছবি আপলোড দিয়েছেন, সেই ছবিতে যারা আছে তাদের সবাইকে আপনি না চিনলেও ফেসবুক এলগরিদম তাদের শনাক্ত করতে পারবে তাদের ডাটাবেজ ব্যবহার করে। আমার উদাহরণই বলি। বাংলাদেশের গত বছরের একটি আন্দোলনের মিছিলের একটা ছবিতে আমি ছিলাম। যদিও এই ছবিটি সম্পর্কে আমি কিছু জানতাম না। কিন্তু ফেসবুক তাদের ডাটাবেজ থেকে আমার চেহারা শনাক্ত করে ছবিটিতে আমাকে সয়ংক্রিয়ভাবে ট্যাগ দেয়।

যাই হোক, ফেস রিকগনিশন অপশনটি অবশ্য বন্ধ করা যায় সেটিংস থেকে৷ কিন্তু, টেন ইয়ার চ্যালেঞ্জের পরিবর্তনের এই ট্রেন্ড থেকে ফেসবুক চাইলে তাদের এলগরিদমকে আরো শক্তিশালী করতে পারবে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক অ্যামি ওয়েব এই সম্পর্কে বলেছেন, “ফেসবুকে ব্যবহারকারী কোনো ছবি আপলোড করলেই ধরতে পারবে ফেসবুক। এ ধরনের ছবি সংগ্রহ করার ফলে ফেসবুকের মেশিন লার্নিংকে উন্নত করার ভয়ানক এক সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফেসবুক তাদের সিস্টেমকে এমনভাবে উন্নত করতে পারবে, যাতে সামান্যতম পরিবর্তনও তারা ধরতে পারে।”

যদিও ফেসবুক কতৃপক্ষ অস্বীকার করেছে, তাদের দাবি এই ট্রেন্ড তারা শুরু করেনি এবং এ থেকে তারা কোনো সুবিধাও নেবে না। তবে, ফেসবুককে বিশ্বাস করার জো নেই। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে তারা ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, ফেসবুক যদি আমাদের ছবি নিয়ে তাদের ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তির আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সকে দক্ষ করার কাজে ব্যবহার করে, তাহলে সেটা কতটা ক্ষতিকর হবে? আমাদের কি অনেক বেশি আতঙ্কিত হবার প্রয়োজন আছে? ইট ডিপেন্ডস একচুয়ালি। গত বছর নয়াদিল্লির পুলিশ তিন হাজার নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধার করেছে ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এখন ধরুন, কেউ হারিয়েছে অনেকদিন হলো। তার চেহারায় পরিবর্তন আসবে স্বাভাবিক। ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি উন্নত হলে এই পরিবর্তন ধরা যাবে খুব সহজে।

এটা একটা ভাল দিক। তবে অন্যান্য সম্ভাবনাও আছে। যেমন টার্গেটেড বিজ্ঞাপন প্রচার কৌশলের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে এই প্রযুক্তি। বয়সের সাথে সাথে রুচি, পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে টার্গেটেড গ্রুপের জন্য বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব প্রযুক্তিটি। শুধু তাই নয়, গ্রাহকের এসব পরিবর্তনের তথ্য কোনো কোম্পানি পেলে তাদের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়াটাও সহজ হয়ে যায়। ধরুন, আপনার দশ বছরের পরিবর্তন দেখে বোঝা যাচ্ছে আপনি খুব দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছেন। বয়সের ছাপ স্পষ্ট। আর এই তথ্যগুলো কোনো ইন্সুরেন্স কোম্পানি পেলে কেমন হবে? তারা জেনে যাবে আপনাকে ইন্সুরেন্স সার্ভিসের আওতায় আনাটা তাদের জন্য বেশি ঝুঁকির। ফলে তারা হয়ত আপনার প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দেবে নয়ত আপনাকে ইন্সুরেন্স পলিসির বাইরে রাখার চেষ্টা করবে। এটা একটা উদাহরণ মাত্র। যেকোনো কোম্পানিই তাদের সুবিধার্থে আপনার তথ্য আপনার উপরই এপ্লাই করতে পারে।

২০১৬ সালের শেষ দিকে আমাজন কোম্পানি ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে৷ তারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডাটা বিক্রি করে আমেরিকান আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থার কাছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুলিশ যেমন ক্রিমিনালকে ধরতে পারে তেমনি তারা চাইলে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজে এই ডাটা ব্যবহার করতে পারে। ধরুন, আমেরিকায় আজকে ট্রাম্পের বিপক্ষে একটি বিক্ষোভ হলো। এখানে কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স না ঘটলেও এই বিক্ষোভকারীদের চেহারা ডাটাবেজে থাকা চেহারার সাথে মিলিয়ে ঠিকই খুঁজে বের করতে পারবে পুলিশ। পরবর্তীতে বিক্ষোভকারীদের কাউকে যদি তারা হেনস্থা করতে চায়, তাহলে তাদের খুঁজে পাওয়া কি কঠিন হবে আর?

আমরা বলছি না, ট্রেন্ড ফলো করলেই আপনার প্রাইভেসি হুমকির মুখে পড়ে যাবে। কারণ, ইতিমধ্যেই আমরা যথেষ্ট প্রাইভেসি শেয়ার করে ফেলেছি। আমরা শুধু বলছি, আপনার শুধু তথ্য প্রকাশে আরো দায়িত্ববান হওয়া প্রয়োজন। আপনার জানা থাকা দরকার, আপনার দেয়া তথ্য দিয়ে আপনাকেই পুতুল নাচের পুতুল বানানো হতে পারে। আপনি ফেসবুক, আমাজন, পাঠাওর বিরুদ্ধে প্রাইভেসি ভঙ্গ করার অভিযোগ করতেই পারেন৷ তাদেরকে আপনার প্রাইভেসির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বলতেই পারেন। কিন্তু, তারও আগে আপনার নিজেরই আপনার প্রাইভেসির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, আপনাকে স্রোতে ভাসার আগে স্মার্ট হতে হবে আরেকটু বেশি। কারণ, যুগটাই এমন, অনেক পাপেট মাস্টার আপনাকে পুতুল বানানোর অপেক্ষায় ওঁত পেতে আছে…

(wired.com অবলম্বনে)

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button