একটা ব্যক্তিত্ব কতশত মানুষের মাথাব্যথার কারণ, একজোড়া ঠোঁট কত জনের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, একেকটা উক্তি কত লক্ষবার সারা দুনিয়ায় কাঁপন ধরিয়েছে, একটা নাম নিয়ে কত হাজারবার গল্প লেখা হয়েছে, একটা মানুষকে নিয়ে কত কোটিবার সমালোচনা হয়েছে তাঁর অসঙ্গত আচরণের জন্য। সম্ভবত পৃথিবীর সবথেকে আলোচিত মানুষ তিনি। একটা ফুটবলার যাকে নিয়ে কারণে-অকারণে, উঠতে-বসতে, খেতে-ঘুমাতে গিয়েও নিন্দা বা প্রশংসা করি আমি, আপনি, আপনারা, তুমি, তোমরা।

তিনি একজন ফুটবলার যার আচরণ উদ্ধত্যপূর্ণ, তিনি একজন ফুটবলার যার বিশ্বব্যাপী পরিচিতি তাঁর ঠোঁটকাটা স্বভাবের কারণে। তিনি লম্বা একজন মানুষ যিনি কখনো ইংলিশ দলগুলোর বিপক্ষে ভালো খেলতে পারেননি। তিনি এমন একজন যিনি নিজ সতীর্থদের সাথে মারামারি করেন, তিনি এমন একজন যিনি নিজের দলের সর্বেসর্বা ম্যানেজারদের জন্য আতংকের কারণ, ও হ্যাঁ, তিনি মাঝেমাঝে অসাধারণ সব মূহুর্তের জন্ম দেন।

আকর্ণ বিস্তৃত হাসি তাঁর ট্রেডমার্ক। ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি ‍উচ্চতার এই সুইডিশ স্ট্রাইকার পৃথিবীর মানুষের কাছে উপরের বর্ণনার মতোই পরিচিত।

‘আমি সবসময় পত্রিকায় পড়ি মানুষ আমাকে চরম অহংকারী ভাবে, তারা বলে আমি ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করি, আমি একটা খারাপ চরিত্র। হ্যাঁ, আমি ছোট থেকেই এমন। কিন্তু যখনই কেউ আমার সাথে দেখা করে তারা বলে, ‘‘এই ধরণের চরিত্র তোমাকে মানায় না’’। আমি যে জায়গা থেকে উঠে এসেছি সেখানে আপনি কখনোই একজনকে কাছ থেকে না দেখে বলতে পারবেন না তার চরিত্র কিরকম। আমি কখনোই এমনটা করিনি, করব না’’।

তাহলে আসল জ্লাতান কিরকম?

‘আমি সবসময় নিজেকে নিয়ে পরে চিন্তা করি, আমি সবাইকে খুশি করতে চাই। আমি যখনই খেলি আমি জিতি, আমি শেষ ১০ মৌসুমে ৯ বার লিগ শিরোপা জিতেছি। নিশ্চয়ই এটি সমর্থকদের খুশি করেছে। আমি তখনই নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট হই যখন আমি আমার সতীর্থ, ভক্ত এবং সবাইকে সুখী করতে পারি। আমার খুব বড় একটা হৃদয় আছে’’।

‘‘অনেকে আমাকে জিগেস করে, ‘‘এটা কি সত্যি আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন’’? কখনোই না, এটা আসলে একটা ছবি যেটা কিনা কেউ আমার উপর এঁকে দিয়েছে, পুরো ব্যাপারটাই মনগড়া। আমি যাদের সাথে কাজ করেছি তাঁদের মধ্যে যদি কেউ বলে থাকে আমি একটা সমস্যা সেটি কেবল পেপ গার্দিওলা। আসলে পেপ ওরকমই, ও যেটা চাইছে সেটা যদি আপনি দিতে না পারেন তাহলে এরকম ভাবাটাই স্বাভাবিক, আর আমার মনে হয় আমি গার্দিওলার চাওয়া পূরণ করতে পারিনি’’।

নিজের আত্মজীবনী- আই অ্যাম জ্লাতান’এ নিহিত আছে এক গরীব বালকের কথা, ছেলেটি কিভাবে দারিদ্র্যের নির্মম করাঘাতে নিষ্পেষিত হয়েছে, হাজারো সমস্যার মাঝেও যে নিজের সততার সাথে আপস করেনি, কিভাবে ফুটো পয়সাহীন ছেলেটি পরবর্তীতে নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষদের একজনে পরিণত করেছে তা জানতে চাইলে আপনার ‘আই অ্যাম জ্লাতান’ বইটি পড়া অবশ্যকর্তব্য।

ইব্রাহিমোভিচ, ইন্টার মিলান, সুইডেন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, বার্সেলোনা, মালমো

কঠিন হৃদয়ের ক্রোয়েশিয়ান মা, প্রবল পরিশ্রমী বসনিয়ান বাবার সন্তান জ্লাতান বেড়ে উঠেছেন রোসেনগার্ডের মালমোর এক বস্তিতে। আধুনিক সুইডেনের উন্নতির ছোঁয়া সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। ছেলেটির যখন দুই বছর বয়স তখন সে জীবনের কঠিন রূপ দেখল। তার বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। তার থাকার বাড়িটি হয়ে গেল যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে কেউ জড়িয়ে ধরার থেকে গুলি খাওয়ার আশংকাটাই বেশি ছিল।

দারিদ্র্যের নির্দয় আচরণ ছেলেটিকে অল্প বয়সেই ভিন্ন পথ ধরতে বাধ্য করল। ১০ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে যার কিনা বইখাতা ব্যাগে করে স্কুলে গিয়ে সহপাঠীদের সাথে বন্ধুত্বসুলভ ‍দু্ষ্টুমি করার কথা সেই ছেলেটিই বাইক, মিষ্টি, গাড়ি কিংবা সামনে যা পেতো তাই চুরি করতো।

‘‘যখন আমার কিছুর প্রয়োজন হতো আমি বড় বড় দোকানগুলোতে চুরি করতে যেতাম, আমার আবার বাইকের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল’’!

‘‘একদিন আমি একজন পোস্টম্যানের বাইক চুরি করেছিলাম, সেটা ছিল দুর্দান্ত একটা মিলিটারি বাইক। আরেকদিন আমি একটা বাইক চুরি করেছিলাম যেটা দিয়ে ৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর জানতে পারলাম সেটি আমার ফুটবল কোচের, আমি ভেবেছিলাম তিনি আমাকে লাথি মেরে বের করে দিবেন, কিন্তু তিনি এটিকে ভালোভাবেই নিয়েছিলেন এবং শুধু হেসেছিলেন’’।

‘‘যখন আমরা রোসেনগার্ডে ফুটবল খেলতাম তখন মূল কথাই ছিল বলটিকে পার্কে হাঁটতে আসা মানুষজনের পায়ের ফাঁক দিয়ে নিতে হবে, আমরা সবসময় ভিন্ন কিছু করতে চাইতাম। প্রতিটা ট্রিক দেখানোর পর মানুষের অভিব্যক্তি হতো ‘‘ওওওওহহহ’’ কিংবা ‘‘এয়িইইইই’’ এরকম। দেখার ব্যাপার ছিল কে সবচেয়ে জোরে শট নিতে পারে, কার ট্রিক সবথেকে ভালো, কার মুভ সবথেটে পাগলাটে। আমিই সবসময় জিততাম, এটা আমার খুব পছন্দ ছিল’’।

জ্লাতানের স্বপ্নের নায়ক কোনো সুইডিশ ছিলেন না, এমনকি সুইডেন ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ৩য় স্থানে থেকে শেষ করলেও কোনো খেলোয়াড় তাঁর মনে দাগ কাটতে পারেননি। তিনি শুধুমাত্র ব্রাজিলের খেলার অনুসারী ছিলেন। তিনি সবসময় লক্ষ্য করতেন রোনালদো কিংবা রোনালদিহোর মুভগুলো যাতে করে তিনিও ওই মুভ গুলো দিয়ে তাঁর বন্ধুদের ভড়কে দিতে পারেন।

‘‘আমি সুইডেনের খেলা দেখতাম না, আমি কখনোই সুইডেনের খেলা দেখিনি। আমি ব্রাজিলকে ভালোবাসতাম কারণ তাঁরা জাদুকরি কিছু ছিল, তাঁরা সবসময় ভিন্ন কিছু করত। তাঁরা ভিন্নভাবে বলটাকে স্পর্শ করত, মনে হতো এটা যেন হকি মাঠ যেখানে তাঁরা বলটাকে ইচ্ছেমতো টেনে নিয়ে যেতো। এটা সত্যিই জাদুকরি ছিল যা আমি আগে কখনো অনুভব করিনি’’।

স্কুল জ্লাতানের উপযুক্ত জায়গা ছিল না কখনোই। তাঁর সাবেক স্কুলের হেডমিস্ট্রেসের ভাষ্যমতে-

‘‘আমি এখানে ৩৩ বছর ধরে আছি, জ্লাতান খুব সহজেই আমাদের স্কুলের ইতিহাসের সবচেয়ে নিয়মভঙ্গকারী ছাত্রদের তালিকায় শীর্ষে জায়গা পাবে। এ জায়গায় ওর ধারেকাছে কেউ নেই, সে ছিল এক নম্বর পাজি ছেলে, আপনি এটাকে ওয়ান ম্যান শো বলতে পারেন, সে এমন সব কান্ড করত যার পরিণতি হতো ভয়ংকর’’।

‘‘আমি চরমমাত্রায় বেয়াদব ছিলাম, আমি আসলে মানসিক ভাবে অসুস্থ ছিলাম। আমার এক জায়গায় বসে থাকতে খুব কষ্ট হতো। আমার মনে হতো আমার প্যান্টে পিঁপড়া ঢুকে কামড়াচ্ছে তাই আমাকে নড়াচড়া করতেই হতো। আসলে পিঁপড়ার ব্যাপারটা পুরোটাই আমার মস্তিষ্কপ্রসূত কল্পনা, লাফালাফি করার একটা উপায় আমাকে বের করতেই হতো, আর পিঁপড়া ছিল সেটার অজুহাত’’।

উচ্চ মাধ্যমিকে উঠার আগ পর্যন্ত জ্লাতান কখনো কাউকে কলারওয়ালা শার্ট পড়তে দেখেনি, এটা ছিল একটা ভিন্ন জগত। যে জগতে জ্লাতান মানিয়ে নিতে পারেনি।

ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুতেও জ্লাতান সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তিনি সবসময়ই ঝামেলা বাঁধানোর ওস্তাদ ছিলেন। ১৭ বছর বয়সে, জ্লাতান যখন নিজের শহরের ক্লাব মালমোর হয়ে প্র্যাকটিস করছিলেন তখন তাঁর এক সতীর্থের বাবা-মা এসে কোচের কাছে নালিশ করেন যে জ্লাতান তাদের ছেলেকে পিটিয়েছেন, তারা জ্লাতানকে বহিঃস্কার করার দাবি জানায়।

‘‘আমার মতো চরিত্রের জন্য একজন ফুটবলার হিসেবে সাফল্য লাভ করাটা অসম্ভব ছিল আমার অতীতের জন্য। কিন্তু আমিও কঠিন ছিলাম, একবার অনুশীলনে আমি এক সতীর্থকে মাথা দিয়ে ঠুঁকে দিয়েছিলাম, যদি এরকমটা আবার ঘটতে দেয়া হয় আমি আবার কখনো এ কাজটা করব না। কিন্তু আমি তখন একজন মাথা গরম তরুণ ছিলাম’’।

‘‘যাকে মাথা দিয়ে মেরেছিলাম তার বাবা-মা একটা দরখাস্ত লিখে মানুষের কাছ থেকে সই সংগ্রহ করেছিল যাতে আমাকে ক্লাব থেকে বের করে দেয়া হয়। আমি প্রচুর ফালতু কাজ করেছি, আমি অসংখ্য ভুল করেছি, কিন্তু প্রত্যেকটা কাজ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি, আমি এখনো ভুল করি। কেউই নিখুঁত নয়, আমার সামনে অনেক বাঁধার দেয়াল ছিল যেগুলো একটার পর একটা ভেঙ্গে আমি আজকের জ্লাতান হয়েছি’’।

জ্লাতানের ১৮ বছর বয়সের সময় অনেক কিছু বদলে যেতে লাগল। জ্লাতান বুঝতে পারল ফুটবল তাঁর সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিয়ে অপেক্ষা করছে। ফুটবল তাঁর কঠিন রাস্তাটাকে সহজ করে তুলতে পারে।

ইব্রাহিমোভিচ, ইন্টার মিলান, সুইডেন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, বার্সেলোনা, মালমো

জ্লাতানের দুই হাতেই তাঁর শৈশবকালের কঠিন সময়গুলোর কথা ট্যাটু করা আছে। সেগুলো চোখে পড়লে জ্লাতানের মনে পড়ে তিনি নিজের যোগ্যতায় আজকের ইব্রাহিমোভিচ।

‘‘আমি যখন পিছন ফিরে তাকাই তখন নিজেকেই জিগেস করি, ‘‘আমি কি সেই লোক যে কিনা রোসেনগার্ডের এক ঘিঞ্জি বস্তি থেকে উঠে এসে আজ এসিতে বসে আরাম করছি’’? কেইবা ভেবেছিল রোসেনগার্ডের বস্তির ছেলেটা একদিন সুইডেনের নেতা হবে? কে ভেবেছিল রোসেনগার্ডের চুরি করা ছেলেটা একদিন গোলের রেকর্ড ভাঙ্গবে? আমি কখনোই নিজেকে খুব প্রতিভাবান কিছু ভাবিনি’’।

মালমোর জ্লাতানকে আয়াক্স, আর্সেনাল, এএস মোনাকো, ভেরোনা দলে নেবার আগ্রহ প্রকাশ করে। আয়াক্স জ্লাতানকে টেনেছিল। এরপর জুভেন্টাস, ইন্টার মিলান, এসি মিলান, বার্সেলোনা কিংবা প্যারিস সেন্ট জার্মেইন যেখানেই গিয়েছেন সাফল্যের খাতায় নিজের নামটা খোদাই করে নিয়েছেন।

ইব্রাহিমোভিচের ক্যারিয়ারে সবথেকে বড় অবদান দুইজনের। জুভেন্টাসে থাকাকালীন ফ্যাবিও ক্যাপেলো যাকে নিয়ে জ্লাতানের কথা-‘‘তিনি আমাকে আমার লড়াকু মানসিকতা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছেন, আমি যে জ্লাতান সেটি চিনিয়েছিলেন ফ্যাবিওই’’।

আরেকজন হলেন হোসে মরিনহো। তাঁকে নিয়ে জ্লাতানের বক্তব্য-‘‘হোসে আমাকে একটা বিড়াল থেকে সিংহে পরিণত করেছিল, ইন্টারে থাকতে আমার আমিকে বের করে এনেছিল হোসেই’’।

এ দুজন ছাড়াও ইব্রার আলাদা স্তুতিবাক্য বরাদ্দ কার্লো আনচেলোত্তির জন্য।

‘‘কার্লো আমার দেখা সবচেয়ে ভালো মানুষ, সে আমার দ্বিতীয় বাবা’’।

জ্লাতানের স্বপ্ন ছিল বার্সার হয়ে খেলা। ইব্রার স্বপ্ন পূরণ হলেও সেই স্বপ্নের শেষটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। পেপ গার্দিওলার সাথে ব্যক্তিত্বের সংঘাত জ্লাতানের স্পেন ক্যারিয়ারকে হতাশায় মুড়ে দিয়েছিল।

‘‘আমার স্বপ্ন ছিল বার্সেলোনার হয়ে খেলা, কিন্তু এখন আমি ভাবি কিছু কিছু স্বপ্ন স্বপ্ন থাকাই ভালো, সেগুলো কখনো সত্যি হতে নেই। কারণ এটা আমাকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল’’।

‘‘স্পেনে প্রথম কয়েক মাস বেশ ভালোই কাটছিল, কিন্তু গার্দিওলা হঠাৎই আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। আমি এখনও জানিনা কেন পেপ এমনটা করেছিল, হয়তো কখনো জানবো না। আমি পেপের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সে আমার সাথে কথা বলতে চাইত না। সে আমাকে এড়িয়ে চলত, একবার আমি ন্যু ক্যাম্পের একটা রুমে হেঁটে ঢুকলাম, পেপ সেখানে কফি খাচ্ছিল, আমাকে দেখে কফি শেষ না করেই উঠে চলে গেল। আমি ভাবলাম আসলে সমস্যাটা আমি নই, সমস্যাটা ও নিজেই। কিন্তু এই ভাবনার কোনো শব্দ, কোনো উত্তর কিংবা কোনো কিছুই ছিল না’”।

ইব্রার বার্সা ক্যারিয়ারের হতাশা চরমে পৌঁছায় ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচের পর। ‘‘আমি গার্দিওলার দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাচ্ছিলাম। কিন্তু সে আমাকে পাত্তা দেয়নি। আমি রাগে-দুঃখে সামনে থাকা জিনিসপত্র লাথি মেরে আরেক জায়গায় নিয়ে ফেলেছিলাম’’।

‘‘আমার ধারণা ছিল আমি রাগান্বিত হলে পেপ আমার দিকে নজর দিবে, কিন্তু যেই লাউ সেই কদু! পেপ আমার লাথি মারা বক্সটা তুলে নিল, নিজের ব্যাগে ঢুকাল, ধীরে সুস্থে ড্রেসিংরুমে চলে গেল। যেন কিছুই হয়নি’’।

অনেকের ধারণা ছিল লিওনেল মেসি’র বিরোধিতা ইব্রাহিমোভিচকে বার্সা ছাড়তে বাধ্য করেছিল। এ নিয়ে ইব্রার বক্তব্য-

‘‘মিডিয়াকে আমার কাছে সবসময়ই একটা সার্কাস মনে হয়। লিও সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। মানুষ হিসেবে যথেষ্ট বিনয়ী। আমি শুনেছি লোকে পিছনে বলে লিওই আমার বার্সা ছাড়ার কারণ, আমি তাদেরকে বলি আমি সবসময়ই লিওর বাঁম পা টা পেতে চাই, যাতে আমি পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারি’’।

লম্বা ক্যারিয়ারে যেখানেই খেলেছেন ইব্রাহিমোভিচ একজন নায়ক হিসেবেই বিবেচিত হয়েছেন। ক্যারিয়ারে মোট ৫টি দেশে খেলেছেন জ্লাতান। নিজের দেশ সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, স্পেন এবং ফ্রান্স। ফ্রান্স এবং সুইডেনে তাঁর নাম ক্রিয়াপদ হিসেবে অফিসিয়াল ডিকশনারিতে ব্যবহার করা হয়। ফরাসি শব্দ ‘জ্লাতানের’ এসেছে জ্লাতান থেকে, এর অর্থ হল বিধ্বংসী। সুইডেনে সরাসরি তাঁর নাম শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সুইডিশ শব্দটি হল ‘টু জ্লাতান’ যার আক্ষরিক অর্থ কোনো অসাধারণ কাজ করা, এমন কিছু করা যা কোনো সাধারণ মানুষের কম্য নয়। জ্লাতান শুধু একজন ফুটবলার নন, জ্লাতান একটা শব্দ, ব্যক্তিত্বের উদাহরণ, জীবনধারণের হাজারো উপায়ের একটা উপায়।

যখন নিজের খেলার সর্বোচ্চ শিখরে থাকেন তখন তাঁর মাথায় কি চলতে থাকে? ‘‘এটা খুব দ্রুত হয়, আমার মস্তিষ্ক খুব দ্রুত চলে। সামনে কি হতে পারে সেটার দুই বা তিনটা ছবি আমার মাথায় চলে আসে, আমি যেকোনো একটা বেছে নেই, আমি এভাবেই খেলি’’।

এখনো নিজের পুরোনো হিংস্রতা নিয়েই খেলে চলেছেন ইব্রা। হিংস্রতা তাঁর শিরায়-উপশিরায়। ‘‘প্রথম প্রথম রাগ আমাকে নিয়ন্ত্রণ করত, এখন আমি রাগ কে নিয়ন্ত্রণ করি’’।

‘‘আমার মনে আছে আমি শেষ কবে রাগান্বিত হয়েছিলাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সুইডেনের ম্যাচের আগে ব্রিটিশ মিডিয়া আমার কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করছিল এই বলে যে আমি ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে কখনো ভালো খেলিনি। ম্যাচে আমি একটা, ‍দুইটা এরপর তিন নম্বর গোলটাও করি। কিন্তু চার নম্বর গোলটা পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল’’।

ইংলিশ গোলকিপার জো হার্টের ক্লিয়ার করা বল উড়ন্ত অবস্থাতেই লাফিয়ে বাইসাইকেল কিক করলেন ইব্রা। ইংল্যান্ড, সুইডেনের বাকি ২১ খেলোয়াড়, দুই দলের কোচিং স্টাফরা, গ্যালারির সমর্থকরা, টিভিতে ম্যাচ দেখতে থাকা দর্শকরা নিজেদেরকে আবিষ্কার করলেন হতবিহ্বল অবস্থায়, ৩০ গজ দূর থেকে জ্লাতানের নেয়া ওই বাইসাইকেল কিক প্রবল গতিতে ঢুকে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের জালে! ইব্রার ওই গোলকে অনেকে সর্বকালের সেরা গোল বলেও স্বীকৃতি দেন। ব্রিটিশ মিডিয়া সেই মূহুর্তের পর ইব্রার সমালোচনা করতে ভুলে গিয়েছিল। করবেই বা কিভাবে! জ্লাতান তাঁদের অহংবোধে ঝামা ঘষে দিয়েছিলেন যে।

এটাই কি তাঁর ক্যারিয়ার সেরা গোল? ‘‘আমি তাই মনে করি, এটা এরকম একটা গোল যেটা আপনি ইচ্ছে করলেই বারবার করতে পারবেন না। এটা দেখতে ভালো লাগে যে আপনি ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করছেন আর সেটা সফলও হয়েছে’’।

‘‘আমি এভাবেই খেলতে চাই। কেন আমি অন্য সবার মতো হব যেখানে আমার মধ্যে বিশেষ কিছু রয়েছে’’?

‘‘আমার পা দুটো এখন ময়লা হয়ে গেছে। আর কত পরিস্কার থাকবে বলুন তো! অনেক তো হল’’।

এই ময়লা পা দুটোই তো জ্লাতানকে নিয়ে গেছে উচ্চ থেকে উচ্চতর স্থানে। ক্লান্ত পা জোড়াই মালমোর ‘ঘেট্টো’র ছোট্ট ছেলেটিকে বানিয়েছে পৃথিবীর রাজা।

সবাই নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন ইব্রাহিমোভিচের শরীরে অসংখ্য ট্যাটু, তাঁর শরীরের এমন একটা ইঞ্চিও বাকি নেই যেখানে সুঁইয়ের আঁচড় নেই। জানেন সেই ট্যাটু গুলোতে কি লেখা আছে? ট্যাটুগুলোতে প্রায় ১৭ হাজার নাম লেখা আছে! নামগুলো আপনি-আমি কখনো শুনিনি। কারণ নামগুলো সেই মানুষদের যারা দুইবেলা খাওয়ার স্বপ্ন দেখে যায় দিনরাত, কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়, খাবার আর জোটে না।

‘‘পৃথিবীতে প্রায় ৮০৫ মিলিয়ন মানুষ আছে যাদের প্রতিদিন খাবারের নিশ্চয়তা নেই। আমি সেইসব মানুষদের প্রতিনিধি, আমি নিজেকে কখনো ধনী ভাবি না, আমি ভাবি আমিও একদিন রোসেনবার্গের রাস্তায় রাস্তায় খাবারের আশায় ঘুরতাম, চুরি করতাম। আমি এখনো নিজেকে রোসেনবার্গের সেই ছেলেটি মনে করি যার খাবারের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ওই ৮০৫ মিলিয়ন মানুষের নামই আমি লিখতাম, কিন্তু ট্যাটু করা লোকটি বলল আপনার শরীরে এর বেশি লেখা সম্ভব না, তখনই আমার মনে হল আমি আসলে খুবই ছোট আর আমার শরীর টা যথেষ্ট চওড়া নয়। তবুও যতটুকু সম্ভব আমি ততটুকু লিখেছি’’।

যে ক্লাবেই খেলেছেন সেখানেই লিগ জিতে তবেই ফিরেছেন জ্লাতান। আক্ষেপ একটাই, ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফিটাই যে কখনো ছুঁতে পারেনি ইব্রার হাত। তবুও তিনি তৃপ্ত নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে। অবশ্য এখনও সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। ৩৫ বছর বয়সেও যেই ফর্ম আর স্ট্যামিনা ধরে রেখেছেন, কে জানে ইব্রা হয়তো নিজের নামের পাশে একটা না বরং কয়েকটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি লিখে রেখে তবেই অবসর নিবেন!!!

পৃথিবী সূর্যকে আরো বহুবার অতিক্রম করবে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ৪ বছর পর পর বদলাবে, লিভারপুল, মিলান, ইন্টারের সুদিন ফিরবে, লিওনেল মেসি আরো ৫০০ গোল করবেন, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আরো ৫০ টা হ্যাটট্রিক করবেন, নেইমার টানা কয়েকটা ব্যালন ডি অর জিতবেন, কিন্তু একজন জ্লাতান জ্লাতানই থেকে যাবেন। কারণ জ্লাতান কখনো দুবার জন্মায় না। জ্লাতান একজনই, দ্যা ফুটবল ‘গড’ জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-