মদ্যপ ‘খুনি’কে বাঁচাতে আসা লোকগুলো ‘নায়ক’ বা ‘নায়িকা’ হতে পারেন না!

Ad

টিভি বা রুপালি পর্দার নায়করা মেকি নায়ক, নকল হিরো।
সত্যিকারের হিরো সেই মানুষটা, যিনি অন্যের বিপদে অকাতরে এগিয়ে যান। কারণ ‘অন্য’ শব্দটাই তার অভিধানে নেই। সবাই তার আপন।

আামি একটা গল্প জানি। জিয়া ভাই সকাল থেকে রাতভর খেটেখুটে ক্লান্ত। মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়ি ফিরছেন। বিধ্বস্ত শরীরটাকে টানছে বিছানা। কিন্তু তাঁর ‘ভিউ ফাইন্ডারে’ অভ্যস্ত ইগল চোখে ধরা পড়ল, পথের ধারে বিপন্ন এক মানুষ। জিয়া ভাই নিজে তাঁকে নিয়ে গেলেন হাসপাতালে। তার চিকিৎসা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করে গভীর রাতে ফিরলেন বাড়ি।
এ রকম কত গভীর রাত কেটেছে, আমরা জানি না। জিয়া ভাই আমাদের জানাতে দেননি।

যে মানুষটা অচেনা কারও জন্য এত কিছু করতে পারেন, পরিচিত-অর্ধ পরিচিতদের জন্য কত কিছু করেছেন, তার হিসাব নেই। আমার সন্তান, জন্মের পর মায়ের বুকের দুধ পাচ্ছিল না কিছুতেই। শুকিয়ে এই এতটুকুন হয়ে গিয়েছিল। বিপন্ন আমি রাতভর রংপুরের রাস্তায় পাগলের মতো ঘুরেছি। জিয়া ভাই অত দূরে থেকেও প্রতি মুহূর্তে আমার পাশে ছিলেন। আমার সন্তান আজ বেঁচে আছে জিয়া ভাইয়ের কারণে।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর জিয়া ভাই নিজেও হুঁশ হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু জ্ঞান ফিরতে পালিয়ে বাঁচেননি। প্রথমেই খুঁজেছেন তাঁর ক্যামেরাটা। সেটা মুঠোয় পুরে একের পর এক সাটার চেপেছেন। ২১ আগস্টের সবচেয়ে প্রচারিত ছবিগুলো জিয়া ইসলামের তোলা।

কাজের প্রতি এতটা নিষ্ঠ থেকেও মানুষের জন্য এত কিছু করার সময় তিনি কোথায় পান, আমাদের মাথায় ঢোকে না। এ কারণে কোনো বিপদে পড়লে তাঁর দ্বারস্থ হলে বেশির ভাগ সময় পরে আর জিয়া ভাইকে ফোন দিই না। জানি তিনি এ রকম আরও হাজারটা মানুষের সমস্যা নিজের সমস্যা হিসেবে বেছে নিয়েছেন, তাকে কম বিরক্ত করাই ভালো। কিন্তু জিয়া ভাই নিজেই ফোন দেন বারবার, ‘কী হইল মিয়া, এরপর তো কিছু জানালেইন না। সব ঠিকঠাক তো?’

জিয়া ভাই, আমার রংপুরের, আমার পাড়ার বড় ভাই। জিয়া ভাই, আমার মায়ের গর্ভে জন্ম না নেওয়া আমার আপন বড় ভাই। এ রকম কতজন রক্তের ভাই তিনি বানিয়েছেন, যদি দেখতে চান, হাসপাতালের সামনে যাবেন। অজস্র ভিড়। সবাই বলছে, আমার রক্ত নেন। রক্ত লাগবে, আমি দিব।

সবাই তৈরি নিজের জীবনের আয়ুর একটা অংশও জিয়া ভাইকে দিয়ে দিতে। জিয়া ইসলাম, সত্যিকারের নায়ক। তার জন্য ক্যামেরার কারসাজি লাগে না। জিয়া ভাই এত জীবনে যত মানুষের উপকার করেছেন, তাদের একদিনের আয়ু পেলেও আরও ১০০ বছর বাঁচবেন।

আর তার ঘাতক, ‘নায়ক’ কল্যাণ; মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে যিনি জিয়া ইসলামকে মৃত্যুর মুখে পাঠিয়েছেন;
তাকে বাঁচাতে বাংলাদেশের আরও অনেক তারকারা কাল থানায় গিয়ে জোরাজুরি করেছেন। তদবির করেছেন! এও বলেছেন, কল্যাণ এক রাত কী করে হাজতে থাকবে!

আমাদের বিবেক জাগ্রত করার দায়িত্বে থাকা মহান তারকাদের কাতর বিবেক–থানার স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে এই শীতে কল্যাণ থাকবে কী করে!

ওদিকে জিয়া ইসলাম, ক্রমশ অনিশ্চিত উঁচু-নিচু ইসিজি গ্রাফ; তাঁর দুই সন্তানের ‘বাবা কোথায়’-এর অবলা চোখ; বুকের যন্ত্রণাকে বেঁধে স্বামীকে বাঁচিয়ে তোলার কী এক লড়াইয়ে নামা স্ত্রী…এত এত মানুষের কাতর প্রার্থনা-ভালোবাসা-দোয়া সব অগ্রাহ্য করে জিয়া ইসলাম পড়ে আছেন আইসিইউতে। প্রতি মুহূর্তে টুটটুট শব্দ জানান দিচ্ছে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে ব্যবধান কত সামান্য!

টিভির নায়ক চাইলেই হওয়া যায়। সেটা কল্যাণদের মতো চেহারা পেলেই হয়। কিন্তু মানুষের নায়ক হতে যে বিরাট মন দরকার, সেটা সবার থাকে না। একজন মদ্যপ ‘খুনি’কে বাঁচাতে আসা প্রত্যেকেই আর যাই হোক ‘নায়ক’ বা ‘নায়িকা’ হতে পারেন না।

-রাজীব হাসান
সিনিয়র সাব এডিটর, প্রথম আলো

 

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (2 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

Ad