সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে গত দু’দিন ধরে যে প্রশ্নটা রীতিমত ভাইরাল হয়ে গেছে, সেটা হচ্ছে জিয়া এতিমখানা কোথায়? জিয়া এতিমখানার ঠিকানা কি?

তা হঠাৎ সবাই জিয়া এতিমখানার খোঁজে ফেসবুক তোলপাড় করছেন কেন? কারণ গত ২৫শে জানুয়ারি একাত্তর টেলিভিশনে প্রচারিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, চলমান জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেগম খালেদা জিয়ার বাঘা বাঘা আইনজীবীরা কেউই সাংবাদিকদের “জিয়া এতিমখানা কোথায়” এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারছেন না! প্রশ্নের সামনে এসে রীতিমত তোতলাচ্ছেন কেউ কেউ, আবার জিয়া এতিমখানার ঠিকানা জিজ্ঞেস করায় প্রবল রেগে যাচ্ছেন বেগম জিয়ার আইনজীবীরা! শুনতে খুবই অদ্ভুত শোনাচ্ছে না?

১৯৯২ সাল। খালেদা জিয়া তখন প্রথমবারের মত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে। সেসময় সারাদেশের এতিমদের সহায়তার জন্য “প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল” নামে একটা বিশেষ ব্যাংক একাউন্ট খোলা হয় সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায়। হিসাব নাম্বার ৫৪১৬। এই একাউন্টের স্বত্বাধিকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন বেগম খালেদা জিয়া। এই তহবিলে ১৯৯৩ সালের জুন মাসে সৌদি আরবের “ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক” এর ডিডি মারফত ১২ লাখ ৫৫ হাজার ডলার অর্থাৎ ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা জমা হয়। অতি আশ্চর্যজনক হলেও সত্য সারাদেশের এতিমদের জন্য আসা এই টাকাটা পরের দুই বছর ব্যাংকে অলস পড়ে ছিল, একটা পয়সাও বন্টন করা হয়নি দেশের কোন এতিমখানায়, একটা পয়সাও পায়নি কোন এতিম!

তাহলে এই টাকাটা কিভাবে কোথায় গেল? চলুন জেনে আসা যাক সেই ঘটনাটাও। ১৯৯৩ সালেই তৎকালীন বেগম খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের ৬, মইনুল রোডের বাসভবনের ঠিকানা ব্যবহার করে খোলা হয় জিয়া এতিমখানা। একাত্তর টেলিভিশনের সাংবাদিকেরা বেগম খালেদা জিয়াকে আদালতে নির্দোষ প্রমাণ করতে আসা খালেদার আইনজীবীদের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলেন স্রেফ এটাই যে, খালেদা জিয়া যে জিয়া এতিমখানাটা তার ব্যক্তিগত বাসভবনের ঠিকানা ব্যবহার করে খুলেছিলেন, সেই জিয়া এতিমখানা আসলে কোথায়?

চলুন একে একে খালেদার আইনজীবীদের উত্তরগুলো শোনা যাক-

১ম আইনজীবী- শুনেছি, কিন্তু ভালো বলতে পারবো না।
২য় আইনজীবী- একচুয়ালি এই বিষয়গুলা আপনারা আমাদের সিনিয়র আইনজীবীদের সাথে কথা বলেন।

৩য় আইনজীবী- এইটার ঠিকানাটা আমি বলতে পারবো না।
৪র্থ আইনজীবী- এইটা (এই প্রশ্নটা) আমাদের লার্নেড সিনিয়র, তিন-চারজনের কাউন্সিলেটের জন্য নির্ধারিত আছে।

৫ম আইনজীবী (বিখ্যাত বা কুখ্যাত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ)- এতিমখানা তো হয়ই নাই! (আবার পড়েন, একেবারে স্পষ্ট করে বলছেন এই অভিজ্ঞ আইনজীবী যে, এতিমখানা তো হয়ই নাই!)
৬ষ্ঠ আইনজীবী (সাবেক স্পীকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার)- (বেশ বিরক্ত হয়ে) ঠিকানাটা খুঁজছেন কেন?

৭ম আইনজীবী (বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান)- ইয়ে মানে, ঠিকানাটা আমার জানা নেই!

কি, খুব অবাক হচ্ছেন? বাস্তবতা হলো, যার কোন অস্তিত্বই নেই, তা কিভাবে আইনজীবিরা জানবেন? এমন প্রায় ১৫ জন ঘাগু আইনজীবীকে জিজ্ঞেস করার পর যখন তারা কেউই তাদের মক্কেল বেগম জিয়ার খোলা জিয়া এতিমখানার ঠিকানা বলতে পারলেন না, তখন শেষপর্যন্ত মাত্র একজন আইনজীবীর কাছে জানা গেল যে বগুড়ায় এই জিয়া এতিমখানার নামে জমি কেনা হয়েছিল। তারপর সেই এতিমখানার জন্য কেনা জমির খোঁজ করতে গিয়ে জানা গেল আরেক বিচিত্রতম ঘটনা।

যাদের জমি কেনা হয়েছে, তারা ক্যামেরার সামনে জানালেন, তারেক জিয়ার লোকজন জোর করে তাদের এই জমি দখল করে নামমাত্র কিছু টাকা বুঝিয়ে দিয়েছে, আর সেই গরীব পরিবারটি জমি হারিয়ে আজ প্রায় ২০ বছর ধরে আছে গভীর দুর্দশায় আর সংকটে। মজার ব্যাপারটা হচ্ছে, বেগম জিয়ার আইনজীবীরা এই জমির স্বপক্ষে যে কাগজপত্র দাখিল করেছেন আদালতে, দেখা যাচ্ছে সেই কাগজপত্রে জমির বায়নায় লেখা আছে যে, এটি জনগন এর জমি! অথচ যার জমি, তিনি বলেছেন, তিনি এ জমি বিক্রি করেন নাই, তবে এটি জোর করে দখল করা হয়েছে।

এদিকে খালেদা জিয়ার মইনুল রোডের বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করে খোলা জিয়া এতিমখানার কথা মনে আছে? সেই এতিমখানার ট্রাস্টিবোর্ডের সদস্য খালেদা ও জিয়াউর রহমানের দুই ছেলে তারেক জিয়া ও আরাফাত রহমান কোকো এবং তাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনেরা। এরপর খালেদা জিয়া দুই মেয়াদে নয় বছর ক্ষমতায় থাকলেও জিয়া এতিমখানা আর কখনোই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু বিদেশ থেকে এতিমদের জন্য আসা টাকা এই ট্রাষ্ট সদস্যদের ব্যক্তিগত ব্যাংক একাউন্টে সুদেআসলে বেড়েছে প্রতিনিয়ত। কতটা নির্লজ্জ এবং নীচু প্রজাতির হলে খালেদা জিয়া এবং তার সন্তান ও আত্মীয়স্বজনেরা এমনকি এতিমদের টাকাটাও ছাড় দেয়নি! অসহায় দুঃস্থ এতিমদের জন্য আসা টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে খাবার জন্য এ কোন নির্লজ্জ মচ্ছব?

আরো অদ্ভুত ব্যাপারটি হচ্ছে ওই একই সময়ে কাতারের আমীর তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমানকেও অর্থ সহায়তা পাঠান। সেই টাকায় বাগেরহাটে মোস্তাফিজুর রহমানের জমিতে এতিমখানা নির্মাণ করা হয়। যেখানে আজো এতিমদের থাকা-খাওয়া ও সহায়তা চালু আছে। অথচ মোস্তাফিজুরের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এতিমদের কল্যাণের জন্য, অসহায় এতিমদের একটু ভালো রাখবার জন্য, একটা সুস্থ ও আনন্দময় জীবন উপহার দেবার আসা অজস্র টাকা নিজেদের একাউন্টে ঢুকিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল কিংবা বিশেষ তহবিল মূলত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা জরুরী প্রয়োজনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করবার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা কিভাবে এতিমদের জন্য ব্যয় হবে, সেটার কোন ধরণের নীতিমালা কখনোই তৈরি করা হয়নি! অর্থাৎ শুরু থেকেই খালেদা জিয়া এই তহবিলের টাকা আত্মসাৎ করার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিংবা তার সন্তান ও চারপাশে ঘিরে থাকা দুর্নীতিবাজদের এই এতিমের টাকা মেরে খাওয়ার পরিকল্পনায় তার সম্মতি ছিল। সেই টাকার সুদে আসলে বেড়েছে, এতিমের টাকায় ফুলেফেঁপে উঠেছে খালেদা-তারেক-কোকোর ব্যাংক একাউন্ট!

জিয়া এতিমখানা নিয়ে একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিবেদন: 

এতিমের টাকা মেরে খাওয়া খালেদা জিয়া

জিয়া এতিমখানার কোন ঠিকানা জানেন না খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা, এতিমখানা খোলা হয়েছিল খালেদা জিয়ার মইনুল রোডের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে! এতিমের টাকা জমা হয়েছে খালেদা জিয়া, তার দুই ছেলে আর আত্মীয়স্বজনের নামে!

Posted by Rahman Raad on Saturday, January 27, 2018

Comments
Spread the love