সিনেমা হলের গলি

শূন্য থেকে শুরু, শূন্যে গিয়েই শেষ?

শূন্য থেকেই নাকি এই জগত সংসারের উৎপত্তি হয়েছিল। সেই শূন্যের সঙ্গে নিজেকে কেন জড়াতে গেলে শাহরুখ খান, সেটা তিনিই ভালো জানেন। বক্স অফিসকে হিসেবে ধরলে, শাহরুখ খানের শেষ সিনেমাটা ছিল ডিজাস্টার। ক্রিটিকস কিংবা সাধারণ দর্শক, এমনকি শাহরুখ ভক্তরাও নাখোশ ছিলেন তার ওপরে। গত পাঁচ-ছয় বছরে এই অভিনেতা যে দারুণ কোন চমক দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বারবার। তবে এবার যে ‘ধামাকা’টা শাহরুখ নিয়ে আসছেন, সেটা যে সাধারণ কিছু হবে না, এরকমটা আঁচ করা যাচ্ছিল অনেক আগে থেকেই। পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির শাহরুখ যখন তিনফুটি বামনের চরিত্রে অভিনয় করেন, তখন তো নড়েচড়ে বসাই লাগে। আর পরিচালকের চেয়ারে আনন্দ এল রাই, এই নামটা শুনলেও আলাদা একটা আগ্রহ তৈরি হবেই ‘জিরো’ নামের এই সিনেমার প্রতি।

খানসাহেবের ৫৩তম জন্মদিনে ‘জিরো’র ট্রেলার রিলিজ হবে, এই ঘোষণা দেয়া ছিল আগেই। শাহরুখ ভক্ত, কিংবা বলিউডপ্রেমীদের মধ্যে তাই উত্তেজনার পারদটা ছিল দিনের শুরু থেকেই। ঘন্টা-মিনিটের কাঁটা পেরিয়ে বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ইউটিউবে রিলিজ দেয়া হলো তিন মিনিটের ট্রেলার। সত্যি বলতে গেলে, এরকম চটকদার(পজিটিভ অর্থে) ট্রেলার শাহরুখ শেষ চার-পাঁচ বছরে যেসব সিনেমা করেছেন, সেগুলোর কোনটারই ছিল না। এমনকি পুরোপুরি মাসালা টাইপের ফিল্ম দিলওয়ালে বা হ্যাপি নিউ ইয়ারেরও না। 

গল্পের থিমটা তো আগে থেকেই জানা ছিল অনেকের, আর আনন্দ এল রাইয়ের স্টোরিটেলিংটাও দুর্দান্ত। আনন্দ যেসব সিনেমা বানান, সেগুলোকে মোটা দাগে বলা চলে গণমানুষের সিনেমা। গল্পগুলোও হয় একদমই ছা-পোষা, রান্নাঘরের তেল-নুন-আলুর মতো। ‘জিরো’ও তার ব্যতিক্রম নয়, আনন্দের কাজের ছাপটা আছে সব জায়গাতেই। ট্রেলারজুড়ে বামনরূপী শাহরুখের একচ্ছত্র আধিপত্য। সংলাপের পেছনে দারুণভাবে খেটেছে সিনেমার টিম, সেটা ডায়লগগুলোর গভীরতা শুনেই বোঝে হয়ে গেছে। কয়েকটা ডায়লগ শুনে তো হেসে গড়িয়ে পড়ার অবস্থা হয়েছে। ছোট শহরের গল্পের চিরচেনা ছাপটা আছে ট্রেলারে, আনন্দের ট্রেডমার্ক বলা চলে যেটাকে।

শাহরুখ খানের ব্যাপারে একটা কথা বলা হয়। তাকে যদি মঙ্গল গ্রহে নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়, আর সেখানে যদি প্রাণের অস্তিত্ব থাকে, তিনি নাকি ভীনগ্রহবাসীদের সঙ্গেও রোমান্স করা শুরু করবেন! ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে, শাহরুখও তেমনি। জিরো’তে তিনি বামনের চরিত্রে, তাই বলে কি রোমান্স বন্ধ থাকবে? ‘বাউয়া’রূপী শাহরুখও তাই রোমান্সে জড়িয়েছেন, তাও একজন নয়, দুই নায়িকার সঙ্গে! বাউয়া’র মুখেই যেমন আমরা শুনতে পাই, “কারো বরাবর(সমতুল্য) হবার স্বপ্নটা স্রষ্টা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন। আর তার বদলে আমি স্রষ্টার কাছ থেকে পুরো ভারতের স্বপ্ন কেড়ে নিলাম!” 

ট্রেলারে দারুণ স্বতস্ফূর্ত শাহরুখ, আনন্দ এল রাইয়ের সঙ্গে তার জুটিটা দারুণ জমে গেছে বলেই মনে হয়েছে প্রতিটা মূহুর্তে। ট্রেলার দেখে মনেই হয়নি যে দুজনের একসঙ্গে এটাই প্রথম কাজ। জিরো’তে অভিনয় করার কারণ নিয়ে শাহরুখ বলেছিলেন, গল্প শুনেই নাকি পটে গিয়েছিলেন তিনি। অল্পতে পটে যাওয়ার ফলটা ভালো হয় না সবসময়। তবে জিরোর ট্রেলার আশা জাগিয়ে তুলছে, এমন ‘কালারফুল’ প্রেজেন্টেশনের পরে আশায় বুক বাঁধাই যায়!

ক্যাটরিনা কাইফ বরাবরের মতোই গ্ল্যামারাস। তার চরিত্রের গভীরতাটা ট্রেলারে বোঝা যায়নি খুব একটা। আনুশকাকে দেখা গেল মোটর নিউরন ডিজিজে আক্রান্ত এক বিজ্ঞানীর চরিত্রে। হুইলচেয়ারে তাকে দেখেই প্রথমে যেটা মনে হয়েছে, স্টিফেন হকিঙের ফিমেল ভার্সনকে দেখছি না তো? আনুশকার চরিত্রটা নিয়ে একটা শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। দর্শক সিনেমা হলে যাবেন বিনোদন পেতে। থিয়েটারে বসে দর্শক এরকম ডায়লগ ডেলিভারি দেখতে চাইবে কিনা, এটা নিয়ে খানিকটা কনফিউশন তো আছেই। অবশ্যই এটা ক্যারেক্টার ডিমান্ড, কিন্ত দর্শক কানেক্ট করতে না পারলে তো সমস্যা। 

সংলাপ ভালো লাগার মতো ছিল, সেটা আগেই জানিয়েছি। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও কানে লেগে থাকার মতো। সবচেয়ে ভালো যেটা, বামন চরিত্রে শাহরুখকে একবারও আরোপিত মনে হয়নি, কোথাও এটা মাথায় আসেনি যে জিনিসটা অবাস্তব। রেড চিলিজের ভিএফএক্স টিম দারুণ মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন এখানে। পরিচালনায় যত্নের ছাপটা ট্রেলারেও স্পষ্ট। এবার সিনেমার জন্যে অপেক্ষা, শাহরুখ ভক্তরা প্রত্যাশার ডালি মেলে বসতেই পারেন। তবে আনন্দ এল রাই যেভাবে বলেছিলেন, ‘জিরো’ তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো কোটি রূপির ব্যবসা করবে, সেটা আবার একটু বাড়াবাড়িই মনে হচ্ছে।

মানুষ নাকি তার স্বপ্নের চেয়েও বড়, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন কথাটা। জিরো’র গল্পটাও স্বপ্নের চেয়ে বড় হতে চাওয়া একজন বাউয়াকে নিয়ে। সেটার সঙ্গে শাহরুখের স্বপ্নও জড়িয়ে আছে, দীর্ঘ খরা কাটিয়ে দারুণ একটা সিনেমা উপহার দেবেন ভক্তদের, সেই প্রত্যাশাটা নিশ্চয়ই তারও আছে। আছে ভক্তদের স্বপ্নও। বাজে সময় কাটিয়ে সাফল্যের ধারায় ফিরবেন তাদের প্রিয় তারকা, সেটাই তো তারা চান। দেখা যাক, দর্শক এবার জিরো’কে কিভাবে গ্রহণ করেন। বড়দিনের ঠিক আগে, একুশে ডিসেম্বর মুক্তি পাবে সিনেমাটা। বক্স অফিসে জিরো কি ছক্কা হাঁকাবে, নাকি ডাক(জিরো) মেরেই ঘরে ফিরবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন দর্শকদের হাতেই। ট্রেলারের শেষ দৃশ্যে যেভাবে রকেটকে উড়তে দেখা গেছে, জিরো এভাবে উড়তে পারবে তো দর্শকের মনে?

আরও পড়ুন- 

Comments

Tags

Related Articles