জাফর ইকবাল স্যার আপনাকে আমরা তরুণ প্রজন্ম অনেক শ্রদ্ধা করি। সেই শ্রদ্ধা রে‌খেই অাপনা‌কে ক‌য়েকটা কথা। স্যার আপনি প্রশ্ন তুলেছেন কেন তরুণরা পুরো ঢাকাকে অচল করে দিল? কেন জনদুর্ভোগের দিকে তাকালো না। স্যার আপনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। তবে স্যার আমি যদি বলি এই কোটা সংস্কার আন্দোলন আবারও প্রমাণ করলো রাস্তা না বন্ধ করলে, জনদুর্ভোগ তৈরি না করলে আমাদের নীতি নির্ধারকরা কোন কথা শোনে না, কী জবাব দে‌বেন অাপ‌নি?

স্যার আপনাকে জানানোর জন্য বলি অনেকেই মনে করছে কোটা সংস্কার আন্দোলন মানে গত এক সপ্তাহর আন্দোলন। অধিকাংশ গণমিধ্যমের খবর দেখলেও তাই মনে হবে। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। কোটা নিয়ে তারুণ্যের ক্ষোভ বহু বছরের। এরমধ্যে এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে তরুণরা ধারাবাহিকভাবে অান্দোলন শুরু করে।

আপনি কী জানেন স্যার রাজপথে আসার আগে তারা কী কী কর্মসুচি দিয়েছিল? প্রথমে তারা সংবাদ সম্মেলন করেছে, সরকারকে দফায় দফায় সময় দিয়েছে তাও দাবি আদায় না হওয়ায় স্মারকলিপি দিয়েছে, জনপ্রশাসনে গেছে দেখা করতে, কেউ তাদের পাত্তা দেয়নি। দাবি আদায়ে সাইকেল শোভাযাত্রা কর্মসূচি এমনকি সনদ হাতে ঝাড়ু দেয়ার মতো কর্মসূচিও পালন করেছে।

আপনি কী জানেন স্যার আপনার উপর হামলার ঘটনার পরদিনও এই ছেলেমেয়েদের মানববন্ধন কর্মসূচি ছিলো। তারা সেই কর্মসূচি শুরু করেছে আপনার উপর হামলার নিন্দা ও বিচার চেয়ে?

আপনি কী স্যার জানেন এই যে মানববন্ধন বা শান্তিপূর্ন কর্মসূচিগুলোতেও হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ছিল। কিন্তু যেহেতু কোথাও কোন দুর্ভোগ হয়নি তাই তাদের আন্দোলনকে কেউ পাত্তা দেয়নি। বাংলাদেশের বহু গণমাধ্যমে তখন কোটার আন্দোলনের নিউজগুলোও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের কাছে এই কর্মসূচি ছিল মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড আর কোটা সংস্কার আন্দোলনের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি।

আপনি কী জানেন স্যার জনপ্রশাসন সচিবের সাথে অা‌ন্দোলনকারীরা দেখা করতে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের টিয়ার মেরে তাড়িয়ে দেয়। স্যার এই যে দুই মাস ধরে একটা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হলো কোনদিন সরকারের কোন নীতিনির্ধারক তাদের ধারে কাছেও যায়নি। কেউ শোনারও চেষ্টা করেনি তোমরা কী চাও? কেন? এর মধ্যে আন্দোলনকারীরা বারবার নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করেছে তবু তারা বিশৃঙ্খলা করেনি।

স্যার এরপর এলো এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ। প্রধানমন্ত্রী এর আগে একবার চট্টগ্রামে ঘোষণা দিলেন কোটার প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধা তালিকা থেকে পূরণ করা হবে। ছেলেমেয়েরা কিছুটা শান্ত হলো। কিন্তু আমাদের আমলাতন্ত্র জনপ্রশাসন যে গেজেট প্রকাশ করলো তাতে দেখা গেলো উল্টো চিত্র। ছেলেমেয়েরা ক্ষোভে ফেটে পড়লো। একদিন ওরা পূর্ব ঘোষণা দি‌য়ে শাহবাগের রাস্তা অব‌রোধ করলো।

কোটা সংস্কার, আন্দোলন

এরপর? ঢাকার বিভিন্ন ক্যাম্পাসের ছাত্ররা রাস্তায় নামলো। নামলো সারা বাংলার ছাত্ররা। তবে কী আশ্চর্য তখনো সরকারের কোন প্রতিনিধি যায়নি তাদের শান্ত করতে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলন অথচ মাননীয় উপাচার্য বা প্রক্টরের মনে হয়নি তারা ছেলেমেয়েদের শান্ত করবেন।

স্যার, ঢাকা তখন দুর্ভোগের নগরী। মাথা খারাপ অবস্থা পুলিশের। নি‌র্দ‌েশ পালন কর‌তে গি‌য়ে তারা সেই চিরচেনা পদ্ধতিতে বড় ভুলটা করলো। শুরু করলো তারা দেদারসে পিটুনি। আর এরপর পুরোনো ইতিহাস।

একবার মার খেলে সব ভয় কেটে যায়। তাই হলো। মা‌ঠে নাম‌লো সু‌যোগ সন্ধানীরা। রাতভর চললো গুজব। কতোগুলো অমানুষ এরপর গভীর রাতে উপাচার্যের বাড়িতে বর্বর হামলা চালালো। এতো কিছু যখন চললো তখন হুশ হলো নীতিনির্ধারকদের। এই প্রথম শুরু হলো আলোচনার প্রস্তাব। স্যার, আলোচনাতেই হতে পারতো সমাধান। কিন্তু শুরু হলো নানা মন্ত্রীদের নানা মত। আবারও উত্তেজনা। এরপরের ইতিহাস সবার জানা। এলো কোটা বাতিলের ঘোষণা। যারা এতদিন কোটার পক্ষে ছিলেন তারা ভোল পাল্টালেন।

স্যার, বাংলাদেশে আমার মতো করে কোটা সংস্কারের বিষয়টি খুব কম মানুষই ফলো করেছে। স্যার, সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘদিন এ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি জানি কোটা পদ্ধতি নিয়ে ছেলেমেয়দের মধ্যে বছরের পর বছর ক্ষোভ। তাহলে কেন এতদিনেও বিষয়টাতে নজর দেওয়া হলো না। কেন ব্যাংকগুলো হাজার হাজার পদ শূণ্য রাখলো? পুরোনো কথা বাদ দিলাম। গত দুই মাস ধরে এতো বড় আন্দোলন চলছে- সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করলো? স্যার, আপনারা জাতির বিবেক শিক্ষক সমাজ কী করলেন? আপনারা একবারও এই ছেলেমেয়েদের সমস্যা বোঝার চেষ্টা করলেন না কেন?

কোটা সংস্কার, আন্দোলন

স্যার, অাপ‌নি লি‌খে‌ছেন, শহরের এক কোণায় কিছুক্ষণ ট্রাফিক বন্ধ থাকলেই কিছুক্ষণের মাঝে পুরো শহরে তার প্রভাব পড়ে। কাজেই শহরের বড় বড় ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা সবাই যদি নিজেদের এলাকাকে অচল করে রাখে, তার ফল কী ভয়াবহ হবে, সেটা চিন্তা করা যায় না। অামি অাপনার সা‌থে একমত। 

স্যার, অাপ‌নি এসব দু‌র্ভো‌গের কথা ব‌লে দাবি তারুণ্য‌কে প্রশ্ন ক‌রে‌ছেন, অাপ‌নি বি‌সিএস ভাইভায় জান‌তে চাই‌বেন, দা‌বি আদায় করার জন্যে তুমি কী সবাইকে নিয়ে রাস্তাঘাট বন্ধ করে পুরো শহরকে জিম্মি করে ফেলার বিষয়টি সমর্থন করো? স্যার, অাপনা‌কে অা‌মি অাজীবন শ্রদ্ধা কর‌বো। মু‌ক্তিযু‌দ্ধের প্রজ‌ন্মের সব‌চে‌য়ে বড় বন্ধু অাপ‌নি। ত‌বে স্যার অামিও সু‌যোগ থাক‌লে নী‌তি নির্ধারক‌দের একটা প্রশ্ন করতাম। রাস্তা বন্ধ না হ‌লে অাপনা‌দের হুশ হয় না কেন? কেন অাপনারা নি‌জে থে‌কে সমস্যাগু‌লো চি‌হিৃত ক‌রে সমাধা‌নের উদ্যোগ নেন না? কেন সব‌ক্ষে‌ত্রে অা‌ন্দোলন কর‌তে হয়? আমার স্যার খুব এটি জানার ইচ্ছা।

Comments
Spread the love