‘তরুণদের জাতির ভবিষ্যত করে রাখবেন না, তাদের জাতির বর্তমান হতে দিন’ – গত দু’বছর ধরে যখনই ঢাকায় গেছি, তখনই নানান অঙ্গনে, বিবিধ অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন আলাপচারিতায় বয়োবৃদ্ধদের প্রতি এ আবেদন জানিয়েছি আমি। ‘যুগে যুগে তরুণেরা জাতির ভবিষ্যত হয়েই থাকে, তারা আর জাতির বর্তমান হয়ে উঠতে পারে না’ – এও বলেছি আমি। প্রবীনদের প্রতি আহবান জানিয়েছি পাদপ্রদীপের তলা থেকে পেছনে সরে গিয়ে তরুণদের জন্য জায়গা করে দিতে। যুক্তি দেখিয়েছি যে, তরুণদের জাতির বর্তমান হতে দিলে বাকীটা তারাই করে নেবে।

তরুণেরা আমার কথায় উদ্দীপ্ত হয়েছেন, আত্মবিশ্বাসী হয়েছেন, সাহস খুঁজে পেয়েছেন এবং সম্ভবত: আমাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেছেন। বহু বার্তা পাঠিয়েছেন তারা, পথ নির্দেশ চেয়েছেন এবং অনুরোধ করেছেন, ‘পাশে থাকুন’। অন্যদিকে আমার মতো প্রবীনেরা খুব মাপ-জোক করে সাধুবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু পাদপ্রদীপের নীচের জায়গা ছাড়েন নি, ঢিলে করেননি কর্তৃত্বের রাশ, বরং আরো জেঁকে বসেছেন সর্বঅর্থেই। লাভ হয়নি তাতে কিছু। গত ক’দিনের ঘটনাতেই তো দেখা যাচ্ছে যে তরুণেরা প্রবীনদের হঠিয়ে দিয়েছে, জায়গা করে নিয়েছে নিজেদের জন্য, এসে গেছে নির্দেশনার আসনে।

আন্দোলন, শিক্ষার্থীদের মুভমেন্ট, নিরাপদ সড়ক, শাজাহান খান

আমাদের ছেলেমেয়েদের কর্মকীর্তি দেখে গলা ছেড়ে বলতে ইচ্ছে করে, ‘তোমাদের প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই’। মনে হয়, পৃথিবী এমনটি আর দেখেনি। স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে তারা পথে নেমেছে, রাস্তা সামলাচ্ছে, যানজট নিয়ন্ত্রণ করছে, শৃঙ্খলা সুনিশ্চিত করছে, আইন মানা হচ্ছে কিনা দেখছে। এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থাও নিচ্ছে। না, আইন তারা নিজের হাতে তুলে নেয় নি, বেআইনটাকেই তারা ঠিক করছে।

অবয়ব পত্রে ছবিগুলো দেখে থ হয়ে যাচ্ছি। রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে সুশৃঙ্খল রিক্সা ও গাড়ীর বহর দেখে ভাবছি, এটা কি আমাদের চিরচেনা ঢাকা শহর? ঢাকার রাস্তায় জরুরী যানবাহনের জন্য আলাদা পথও করা যায়? ঐ তো ছেলেমেয়েরা অসুস্হ মানুষদের রাস্তা পার করাচ্ছে, হাসপাতালের গাড়ীর জন্য জায়গা করে দিচ্ছে, ঢাকার বাইরে গমনেচ্ছু যাত্রীদের যাত্রা সুনিশ্চিত করছে। চোখে জল এসে গিয়েছে যখন দেখেছি যে মা’য়েরা রাস্তায় নেমেছেন তাঁদের সংগ্রামরত সন্তানদের মুখে খাবারের লোকমা তুলে দিতে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা সামিল হয়েছেন তাঁদের প্রাণাধিক ছাত্র- ছাত্রীদের সঙ্গে। মনে হয়েছে, ‘সাবাস বাংলাদেশ, পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়।’

সব কিছু দেখে ও শুনে আমার মনে তিনটে বিষয়ের বড় বেশী পদধ্বণি শুনছি – একটি আশার, একটি হতাশার, একটি আশংকার।

ছাত্র আন্দোলন, কলেজ ছাত্র, শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

আশার আর ভরসার জায়গাটাতো অনেক বড়। এই যে আমাদের সন্তানেরা দেখালো সবকিছুই সম্ভব, অসম্ভব বলে কিছু নেই। ঐ যে কত দায়িত্বের সাথে, কত পরিনত বুদ্ধির সঙ্গে, কত মানবিক বিবেচনার সঙ্গে এরা সবকিছু করছে – এর চেয়ে বড় আশা আর বড় গর্বের বিষয় কি হ’তে পারে? তারা তো শেখালো আমাদের যে নিষ্পাপ মন, সততা ও নিষ্ঠা নিয়ে এগুলো সবই করা যায় – আইন বহাল করা যায়, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত করা যায়, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়। আমরা অন্য সবাই যে তাদের নির্দেশ মেনে সঠিক কাজটি করছি, তাতে ও তো এটাই প্রমানিত হলো যে, আমরা এখনও পুরো নষ্ট হয়ে যাই নি। এখনো আমাদের মাঝে ভালোত্ব আছে, এখনও আমাদের মাঝে শুভবুদ্ধি আছে এবং এখনও সত্য আর নিষ্ঠার কাছে আমরা প্রণত হই – ভরসার জায়গাটুকু এখনও আমরা হারাই নি।

একটি কথা সবিনয়ে বলি। অনেকেই আমাদের সন্তানদের এ সংগ্রামকে কচি-কাঁচার প্রচেষ্টা বা শিশুদের আন্দোলন বলছেন। অনুগ্রহ করে এটা করবেন না। তাদের কাজ দিয়ে তারা প্রমান করেছে যে তাদের দায়িত্ববোধ, নিষ্ঠা, বিচারবুদ্ধি আপনার আমার চেয়ে কম নয়। সুতরাং তাদের কার্যক্রমকে একটি বালখিল্য শিরোনাম দিলে তাদের সংগ্রামকে অপমান করা হয়।

আমার হতাশা? সে তো আমার মতো প্রবীনদেরকেই নিয়ে। এতো ধ্বসে যাওয়া একটা কাঠামো আর মূল্যবোধ নিয়ে আমরা বেঁচে ছিলাম? আমরা প্রবীনেরই কি দিনের পর দিন এটা সৃষ্টি এবং পরিপুষ্ট করি নি? আমাদের সৃষ্ট জঞ্জাল সরাতে কি না পথে নামতে হলো তৃতীয় প্রজন্মের মানুষদের? এ লজ্জা কোথায় রাখি?

সবকিছু ছাপিয়ে আমাকে বড় ভাবায় একটি আশংকার প্রেক্ষিত – যার মাত্রিকতা বহুবিধ। প্রথমত: আমরা অনেক অভিভাবকই আমাদের ছেলেমেয়েদের বলছি, যথেষ্ট হয়েছে। বিদ্যালয়ে ফিরে যাও। তিনটে কথা বলি এ বিষয়ে। এক, ছাত্র-ছাত্রীরা সঙ্গত কারণেই ভাবতে পারে যে যথেষ্ট তখনি হবে যখন কাঙ্খিত পরিবর্তনগুলো আসবে। দুই, এতকাল ধরে আমরা প্রবীনেরা যা করেছি, এবং সেই সঙ্গে আমাদের সন্তানেরা যা দেখিয়েছে সাম্প্রতিকসময়ে, তারপর বোধহয় আমাদের সন্তানেরা ঐ কথা মানবে না। তিন, ধরা যাক, ছাত্র-ছাত্রীরা শ্রেনীকক্ষে ফেরত গেল। তাদের মধ্যে অনেকের মুখই সুপরিচিত হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যানে। সেই সব ছাত্র-ছাত্রীদের বিরুদ্ধে যে কোন ব্যবস্হা গ্রহন করা হবে না তার দায়িত্ব কে নেবে এবং তাদের নিরাপত্তা কি করে নিশ্চিত করা যাবে?

কিন্তু এ সবের চেয়েও তো বড় প্রশ্ন আছে। ছাত্র-ছাত্রীদের এই কর্মযজ্ঞ তো একটি সাংগঠনিক কাঠামোর বিকল্প হতে পারে না। আগামী সপ্তাহে যদি ছেলেমেয়েরা রাস্তা ছেড়ে দেয়, তা’হলে আমরা কি আবার আমাদের পূর্ব ব্যবহারে ফেরত যাবো? রাস্তা আবার অনিরাপদ হবে, বেআইন আবার তার জায়গা খুঁজে নেবে, শকট-যানের সুশৃঙ্খলা আবার ভেঙ্গে পড়বে? তাহলে কি লাভ হবে? এ কদিনের ঘটনাগুলো তো একগুচ্ছ গল্প-গাঁথায় পরিণত হবে। তারপর?

গত কদিনের ঘটনার একটি দুঃখের, কষ্টের ও বেদনার দিক আছে। বেশ ক’টি তরুণ প্রান ঝরে পড়েছে, মাতা-পিতা সন্তানহারা হয়েছেন, বন্ধু বন্ধুকে হারিয়েছে। এর গভীরতা, এর আর্তি, এর হাহাকার হৃদয়ভেদী। কিন্তু এর ধারাবাহিকতায়ই উঠে এসেছে অধিকার, নিরাপত্তা আর সুশাসনের মতো অনেক বড় বিষয়গুলো। তাই দাবীটি শুধু ‘নিরাপদ সড়কের’ নয়, দাবীটি ‘নিরাপদ সমাজের’।

আমাদের দায়িত্ব কিন্তু অনেক বড়। আমরা অবয়বপত্রে নৃশংসতা আর বর্বরতার ছবি ভাগাভাগি করে নিচ্ছি, সেই সব বর্বরতা দেখে শিউরে উঠছি বেদনায় ও কষ্টে, আমাদের ছেলেমেয়েদের কাজের প্রশংসা করছি মুক্তকণ্ঠে। কিন্তু সেটাই তো শেষ কথা নয়। আমাদের ছেলেমেয়েরা যখন ঘরে ফিরে যাবে, তখন শূন্য পথতো আমাদেরই পূরন করতে হবে, তাদের অপূর্ণ কাজতো আমাদেরই শেষ করতে হবে, তাদের স্বপ্নতো আমাদেরই পূর্ণ করতে হবে। ‘নবজাতকের কাছে অঙ্গীকারের মতো’ আমাদের সন্তানদের কাছে এটাই তো আমাদের অঙ্গীকার।

ড. সেলিম জাহান
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের পরিচালক

Comments
Spread the love