আপনি-ই সাংবাদিকইনসাইড বাংলাদেশ

সিলেটের জকিগঞ্জে এই ভয়ংকর পরিস্থিতি!

এক ভয়ংকর পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে আমার জন্মস্থান, জকিগঞ্জ। কী যে এক ভয়াবহ সময় পার করছে সিলেটের এই সীমান্তঘেষা শান্তিপ্রিয় এলাকার মানুষজন সেটা বাইরে থেকে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।

উদাহরণ দিই…

ধরুন আপনি সিএনজি বা বাসে করে কোথাও যাচ্ছেন। সিটে বসে আরাম করে দিচ্ছেন ঘুম, অথবা মাথা বের করে হাওয়া খাচ্ছেন কিংবা একমনে ফোন টিপছেন। হুট করেই দেখলেন গাড়ি থেমে গেল। মুহুর্তের মধ্যেই গাড়িতে উঠল অস্ত্রধারী পুলিশ, র্যাব, বিজিবি কিংবা ডিবি পুলিশের দল। আপনি আগন্তুক কেউ হলে ইতোমধ্যে হতভম্ব হয়ে গেছেন। না, আপনার হতভম্ব হওয়া এখনো বাকি। মিনিট তিনেক পরে দেখা গেল আপনার ব্যাগ বা সাইড পকেট থেকে বের হয়েছে কয়েকশ পিস ইয়াবা। পুলিশ আপনাকে ধরে ফেলেছে।

অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? না। এরকম ঘটনা জকিগঞ্জে এখন অহরহ ঘটে। সীমান্ত পার হয়ে প্রতিদিন ঢুকছে কয়েক হাজার বা লাখ পিস ইয়াবা। সেই ইয়াবা সিলেট শহর পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য প্রতিদিন অসংখ্য বাহক যাচ্ছে শহরে। তাদের কেউ হয়তো আপনার পাসে বসেছে। তারপর পুলিশের বিপদ বুঝে সুন্দর করে আপনার অজান্তেই ইয়াবার পাতা ঢুকিয়ে দিয়েছে আপনার ব্যাগে।

আশার কথা হচ্ছে এসব ক্ষেত্রে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি আগে থেকেই বাহকের ব্যাপারে অবগত থাকে। এজন্য এমন ঘটনা ঘটলেও ভুল মানুষকে জেলে পুরার উদাহরণ খুব বেশি নেই। আসল মানুষ তারা ঠিকই বের করতে পারে। তবে সেটাও আনন্দে আহ্লাদিত হবার মতো কোনো ঘটনা না। যে ভদ্রলোক এমন পরিস্থিতির শিকার হন তাকে যথেষ্ট ভোগান্তি পোহাতে হয়। নানান দেন দরবার করে ছাড়া পেলেও সাক্ষী হয়ে হাজিরা দিতে হয় কোর্টে। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। গোবেচারা লোকটাকেও নিজের খরচে করতে হয় কোর্ট কাচারি। কেবল গাড়িতে পাশে বসলেই যে এই ভোগান্তি তা না, ইয়াবাসহ যেখানে যাকে ধরা হচ্ছে ঘটনাচক্রে আশেপাশে থাকা কাউকে না কাউকে হতে হচ্ছে সাক্ষী। আর এসব মামলার সাক্ষী হওয়া আসামীর চেয়েও বেশি ভোগান্তির। কারণ আসামীর পেছনে মানুষ থাকে, টাকা থাকে, অভিজ্ঞতা থাকে। সাক্ষী এই সুবিধাবঞ্চিত।

এতটুকুতে আসলে বোঝানো যাচ্ছে না পরিস্থিতি কত ভয়াবহ। মাসখানেক আগে বাড়িতে ছিলাম। কী এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি!

সারা রাত কিছু মানু্ষ রাস্তা ঘাটে ঘুরঘুর করছে। এলাকার মানুষজনদের একটা বড় অংশের মধ্যে সব সময় চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। এদের কেউ ভারত থেকে ইয়াবা নদী পার করার কাজে স্পেশালিস্ট, কেউ গাড়িতে করে শহরে নেয়ার। মাঝখানে কেউ ডিলার, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ আর্থিক যোগানদাতা, কেউ রাজনৈতিক প্রশয়দাতা। সব মিলিয়ে ইয়াবা সংশ্লিষ্ট মানুষের সংখ্যা সাধারন মানুষের চেয়ে দ্বিগুণ। এরা সদা সর্বদা থাকে উত্তেজনার ভেতর। কখন চালান আসবে, কখন যাবে, কে নিয়ে যাবে, কখন পুলিশ আসল, কাকে ধাওয়া করল, কে ধরা খেল, কে কার মাল ধরিয়ে দিল…. আলোচনা উত্তেজনা চলছেই। মাঝে মধ্যে এদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। ক্ষতির শিকার হতে হয় সবাইকেই।

ছয় মাস আগে বাড়িতে গিয়েছিলাম, তখন ইয়াবা সংশ্লিষ্ট মানুষ ছিল অল্প কিছু। এক বছর আগে আমার এলাকার মানুষ জানতই না ইয়াবা কঠিন, তরল না বায়বীয়। তিন মাসের ব্যবধানে এবার বাড়িতে গিয়ে দেখলাম এলাকায় তারা সংখ্যাগরিষ্ট। তাদের ভয়ে ইয়াবা নিয়ে নেতিবাচক কিছু বলার সাহস কারো বুকে নাই। আমারো ছিল না, তাই চুপ করে ছিলাম। হয়তো আরো চুপ থাকতাম। আজকে দেখলাম যমুনা টিভি রিপোর্ট করেছে আমার উপজেলা নিয়ে, আমার ইউনিয়ন নিয়ে। এমন মানুষজনদের নাম বলছে যাদেরকে আমি চিনি, যারা আমাকে জানে। গর্বে বুক ফুলে ওঠে না?

প্রশ্ন আসতে পারে কীভাবে এই পরিস্থিতি? কেন এরকম হলো? দায় কার?

ইয়াবার চট্টগ্রাম রুটে কড়াকড়ি নেমে এসেছে। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের জন্য দরকার ছিল দ্বিতীয় অথবা বিকল্প আরেকটা ছিদ্র। বহু আগে থেকেই জকিগঞ্জ ফেনসিডিলের রুট হিসেবে জনপ্রিয়। তারা এই ছিদ্র ব্যবহার করল। এলাকার কিছু মানুষজন অল্প দিনে বিত্তবান হওয়ার নেশায় নেমে পড়ল এই লাল ব্যবসায়।

দায় দেবেন কাকে? নির্দিষ্টভাবে কাউকেই দায় দেবার উপায় নেই। নিজের এলাকা, হাতের রেখার মতো সবাইকে চিনি। কে নেই ইয়াবা ব্যবসায়?

ছোট থেকে হাবাগোবা, সর্বমহলে পঁচানো হতো এমন জিনিস ইয়াবার কল্যানে রিকশা ড্রাইভার থেকে আজকে বিল্ডিং তুলছে। অর্ধহাত লম্বা দাড়ি রেখে চিল্লা দেয়া হুজুর আছেন ইয়াবা ব্যবসায়। মসজিদের মাইক ফাটিয়ে দেয়া, বিবি তালাকের তরিকা বাতলে দেয়া, হর শুক্রবার মানুষকে জান্নাত জাহান্নামের টিকেট দেয়া মুফতি সাহেবের পরিবার ইয়াবা ব্যবসায়ী। বাজারে ঢুকার পরপর যে সব দোকানঘর থেকে ওয়াজের শব্দ আসে, যারা জামাতে নামাজ মিস হবার কারণে সারাদিন অনুশোচনায় মাথা ঝাঁকান তারা ইয়াবার ডিলার। এলাকার বিশিষ্ট পীর ইসলামের ঝাণ্ডাবাহী প্রতিনিধি সপ্তাহে দুইদিন গাড়ি চড়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে লম্বা লম্বা করে হায়াত-রুজি আর আমলের বরকতের উপর দোয়া করছেন।

নাম চান? আসেন নাম নিয়ে যান। ভয় পেয়ে আর কী হবে?

না না, লিস্ট এখানেই শেষ না। কোট-টাই পরা শিক্ষক আছেন এই তালিকায়। আছেন জনপ্রতিনিধারাও। কেউ সরাসরি ব্যবসা করছে, কেউ টাকার সাপ্লাই দিচ্ছে, কেউ টাকার বিনিময়ে দিচ্ছে প্রশাসনিক নিরাপত্তা। জ্বি, আপনাদের সবাইকেই আমি চিনি। আমি নাম ধরে ধরে বলতে পারব।

মনে হতে পারে ইয়াবার ব্যবসা যারা করছে সেটা তো তাদের ব্যাপার। তারা নিজের ঝুঁকিতে নিজেরা এই পথে এসেছে। আমি এখানে বলার কে?

হ্যাঁ, আমিও ভাবতাম আমি কে, আমার বলার কী দরকার? তবে এখন মনে হচ্ছে বলার দরকার আছে। কারণ পরোক্ষভাবে আমিও ক্ষতির শিকার হচ্ছি। দেশ জাতির হিসাব বাদই দিলাম। ঐ যে গাড়ির মধ্যে যদি আমার পকেট থেকে এই মাল বের হয় তখন দায় কে নেবে? অসম্ভব ভীতি নিয়ে গাড়িতে চড়তে হয়। বসার আগে সিটের নিচ খুঁজে তারপর শকুনের চোখ করে টানটান হয়ে বসে থাকতে হয় গাড়িতে। কেন, আমার অপরাধ কী?

ইয়াবা চোরাচালান বন্ধের জন্য নদীর জেলেদের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। (প্রসঙ্গত আমাদের এলাকার পাশ দিয়ে যাওয়া কুশিয়ারা নদী ভারতের সাথে সীমান্ত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইয়াবা মূলত কুশিয়ারা পার হয়েই আসে)। এই যে কয়েক শ জেলে পরিবার, এরা যাবে কোথায়? পুনর্বাসন ছাড়া এদেরকে মাঝ নদীতে ফেলে দিয়ে যে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হলো সেটা কি অন্যায় নয়? এলাকার মানুষ নদীর মাছ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মাছের দাম বেড়ে গেছে। এখানে আমিও ক্ষতিগ্রস্থ।

একপক্ষ মাসের ব্যবধানে কোটিপতি হচ্ছে, আরেকপক্ষ জীবিকার অভাবে থাকছে না খেয়ে। কী কঠিন বৈষম্য! সারা জীবন মাছ ধরার কাজ করা মানুষগুলো যাওয়ার জায়গা না পেয়ে শেষে কোথায় আশ্রয় খুঁজবে? খুঁজবে ইয়াবায়। কারণ তারা আর কোনো কাজ জানে না। ফেনসিডিল পরিবহনের জন্য ট্রেইনড হতে হয়, ইয়াবায় সেটার দরকার নেই। পেটের টানে, একটু ভালো থাকার তাগিদে পা বাড়াবে ইয়াবার জগতে। পা বাড়াচ্ছে। প্রতিদিন নিজের চেনা জানা নতুন কেউ না কেউ ইয়াবার জগতে ঢুকে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি কী পরিমাণ খারাপ সেটা কতটা বোঝাতে পারলাম জানি না। আবারো বলছি পরিস্থিতি সত্যিই খারাপ। ইয়াবা সেবক এখনো খুবই কম কিন্তু ইয়াবা ব্যবসা বা পরিবহনের কাজে যে পরিমাণ মানুষ যোগ দিয়েছে তাতে পুরো একটা এলাকা চলে গেছে ঘোরের ভেতর। মানুষজন বুঝতেই পারছে না কিসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তারা। যে টাকা সারা মাসে আয় করতে পারেনি সেটা আসছে একদিনে। থাকুক না কিছু ঝুঁকি, থাকুক না জেলের ভয়। যারা জেলে ঢুকছে তারা ফিরছে আরো বেশি সাহস নিয়ে। বলাই বাহুল্য খুব কম ব্যবসায়ী জেল খাটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। কিন্তু সিস্টেম লসের কারণে বেশিরভাগ সময় জেলে যারা যায় তাদের সবাই বাহক, দুই পয়সার চাকর।

রাঘব বোয়ালদের আশ্রয়ের অভাব হয় না। তারা জায়গা পায় দেড় কিলো টাইটেল বিশিষ্ট মৌলভীর পাঞ্জাবীর চিপায়, তারা আরামেই থাকে কোট-টাই শিক্ষিতের বগলে, তারা সুখে থাকে জনপ্রতিনিধির কোমল হাতের স্পর্শে, তারা নির্বিঘ্নে হাঁটে পুলিশি পাহারায়। এদের টাকায় স্কুলের চেয়ার হয়, মসজিদের মিনার হয়। আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় এরা বসে এসপি সাহেবের পাশের সিটে, তাফসির মাহফিলে তারা থাকে সভাপতির চেয়ারে। ১৬ ই ডিসেম্বরর স্কুলে গিয়ে তারা ছাত্রছাত্রীদের নৈতিকতা নিয়ে বক্তব্য দেয়।

ইয়াবা সমস্যা নিয়ে এটাই আমার প্রথম এবং শেষ লিখা। আমি আশা করি আমার এলাকা এবং দেশটা আবার আগের মতো হয়ে যাবে। যে শান্ত- বিবাদহীন পরিবেশে বড় হয়েছি সেটা আবার দেখতে পাব। টানটান উত্তেজনাময় এই অবস্থা দেখতে আর ভালো লাগে না। যে গতিতে ইয়াবার প্রসার হচ্ছে, জানিনা আর এক বছর পর এলাকায় ইয়াবার বাইরে কজন থাকবে। আজকে এই পোস্ট লিখতে পারছি, এক মাস পর পারব কিনা জানি না। বাড়িতে যাওয়ার আগে এই লেখা ডিলিট করব না তারও নিশ্চয়তা নিজেকে নিজে দিতে পারছি না। এই অস্বস্তিতে কীভাবে বড় হবে আরেকটা প্রজন্ম? এই গণ ঘোর কে কাটাবে? পুরো শরীরের পচন আটকানোর দাওয়াই কী?

জানি না। তবুও আশা করি কোনো দৈববলে সব ঠিক হোক। বেঁচে থাকা হোক সুস্থ, স্বাভাবিক।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close