খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

যে উদযাপনে মিশে ছিল রক্তের প্রতিশোধ!

গতকালকে সুইজারল্যান্ড দুই ফরম্যাটে খেলেছে। প্রথম ফরম্যাট ছিল একটু ধীর লয়ে, বল ধরে স্বাভাবিক গতিতে সামনে যাওয়া। এই ফরম্যাটে খেলেছেন সুইসদের নয়জন। দ্বিতীয় ফরম্যাট ছিল বল পায়ে পাওয়া মাত্রই সার্বদের ডিফেন্স ভেঙে চুরমার করে দেয়া। এই ফরম্যাটে খেলেছেন একাই একজন, জাদরান শাকিরি।

বল যতবার শাকিরির পায়ে গেছে, শাকিরিকে পেছনে ফিরতে দেখা যায়নি। শাকিরির শারীরিক ভাষাই ছিল অন্যরকম। শাকিরি ভালো প্লেয়ার, এনার্জেটিক, তবে ততটা না যতটা গতকালকে খেলেছেন। ম্যাচটা সুইজারল্যান্ডের দ্বিতীয়, ডু অর ডাই না। অপনেন্ট টিমও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন গোছের কেউ না। তারপরও শাকিরি গোল করার পর জার্সি খুলে করেছেন উগ্র সেলিব্রেশন। সার্বিয়ান দর্শকদের সামনে গিয়ে করেছেন কোনো একটা ইংগিত।

গতকালকে শাকিরির কী হয়েছিল? কেন করলেন এমনটা?

শাকিরি গতকালকে নিছক ফুটবল খেলেননি, শাকিরির রক্তে জ্বলছিল রক্তপাতের আগুন। ইতিহাস নিয়ে যারা একটু নাড়াচাড়া করেন তারা সার্ব গণহত্যার ইতিহাস জানেন। ইউরোপের ইতিহাসে হিটলারের পরেই সবচেয়ে নির্মম যে গণহত্যা সেটা সার্বরা করেছিল বসনিয়া, কসোভা আর আলবেনিয়ানদের উপর। গনহত্যার শিকার মুসলিমরা, সুতরাং মিডিয়াতে এটা খুব বড় হয়ে কখনোই আসেনি। হাজার হাজার বসনিয়ান, কসোভানদের লাশ পড়েছিল রাস্তায়। ধর্ষিত নারীর সংখ্যা অগুণিত। আজকের যে সিরিয়ান বা রোহিঙ্গা শরণার্থী আমরা দেখছি, শরণার্থী ইতিহাসে তাদের পূর্বপুরুষ এই বসনিয়া বা কসোভিয়ানরা। জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ শরণার্থী পাড়ি দেয় ভীনদেশে। বাস্তুহারা এসব মানুষদের একজন এই জাদরান শাকিরি।

শাকিরি গতকালকে এক পায়ে কসোভার পতাকার ট্যাটু লাগিয়েছেন। মাঠজুড়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। ধারাভাষ্যকারও বেশ কয়েকবার শাকিরির রিফিউজি ইতিহাস বলেছেন সংক্ষেপে। সব মিলিয়ে ম্যাচটা আর সুইস- সার্ব ছিল না। খেলাটা হয়ে গেছে সার্বিয়া বনাম গণহত্যার শিকার মুসলিমদের।

আমি ব্যক্তিগতভাবে রিয়াল মাদ্রিদের পাড় সমর্থক। রিয়াল ফ্যানদের কাছে সবচেয়ে বেশি অপছন্দের একজনের নাম পিকে। এই বার্সা ডিফেন্ডার নানা সময়ে রিয়াল নিয়ে খোঁচা, ঠাট্টা ট্রল করেন বলে রিয়ালের কেউই তাকে দু চক্ষে দেখতে পারে না। আমিও তার ফ্যান না, খোঁচাগুলো আমারও লাগে। তারপরও মনের একটা জায়গায় এই লোকটার প্রতি আমার ভীষন শ্রদ্ধা কাজ করে।

পিকে কাতালুনিয়ার স্বাধীনতার স্বপক্ষে সরব গলায় কথা বলেন। নানা সময়ে স্পেনিশদের থেকে গালমন্দ শুনতে হয় তাকে। শেষবারের উন্মাতাল সময়ে তিনি কাতালুনিয়ার স্বার্থে স্পেনের হয়ে খেলে ছেড়ে দিতেই চেয়েছেন। গণভোটে ভোটারদের ভোট দিতে উৎসাহিত করেছেন।

এর নাম দেশপ্রেম, এর নাম রাজনীতি, এর নাম স্বাধীনতা।

উদাহরণ কেবল ফুটবলে না, ক্রিকেটেও আছে। ফিলিস্তিনের গণহত্যার প্রতিবাদে ইংল্যান্ড- সাউথ আফ্রিকা ম্যাচে নিজের হাতে ফিলিস্তিনের পতাকার আর্মব্যান্ড পরেছিলেন মঈন আলী। আইসিসি আর ইসিবির চাপে পড়ে অবশ্য আর্মব্যান্ড খুলে ফেলতে হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবাদ যা করার করেই ফেলেছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন খেলোয়ারাও রক্ত মাংসের মানুষ। হত্যা, গণহত্যা, রক্ত-স্বাধীনতা খুব ভালোভাবেই তাদেরকে স্পর্শ করে।

খেলার মাঠ ছাড়াও গ্যালারিতেও স্বাধীনতা কথা বলে। বার্সা-এস্পানিয়ল দর্শকরা প্রতিটা ম্যাচের ১৭ মিনিটে স্বাধীনতার স্বপক্ষে আওয়াজ তুলে। ফিলিস্তিনের জন্য ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের ক্লাব দর্শকরা হিউম্যান ফ্ল্যাগ করে। একই কাজ করা হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ায়।

উদাহরণ আমাদের দেশেও আছে। আমাদের রাকিবুল হাসান স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে ব্যাটের মধ্যে “জয় বাংলা” স্টিকার লিখে মাঠে নেমেছেন। এই দুই শব্দে কেবল তার ক্যারিয়ার না, জীবননাশও হতে পারত। তিনি ভাবেননি। কিংবা ভেবেছেন। ভেবেই পথ বাড়িয়েছেন জীবননাশে।

শাকিরির কথায় চলে আসি।

গতকালকে শাকিরি একা মাঠে খেলেননি। তারসাথে খেলেছে সমস্ত কসোভা, আলবেনিয়া আর বসনিয়ার মানুষ। তার পায়ে বল পড়লে আনন্দে চিৎকার করেছে সবাই। বিপরীতে তার প্রতিটা দৌঁড় সেল হয়ে বিঁধেছে সার্বিয়ানদের বুকে। তিনি সেটা বুঝেছেন, অনুভব করেছেন। এজন্যই গুরুত্বহীন ম্যাচে জার্সি খুলে হলুদ কার্ড দেখেছেন। গোল করার পর সুইস দর্শকদের দিকে না গিয়ে দৌঁড় দিয়েছেন সার্বদের দিকে। তার বাবা সার্ব জেল খাটা মানুষ। তিনি যতটা না আনন্দ দিতে চেয়েছেন সুইসদের, তারচেয়ে বেশি বিষ দিতে চেয়েছেন সার্বদের বুকে।

খেলার সাথে রাজনীতি মিশে। খেলা রাজনীতির অংশ, রাজনীতি খেলার কৌশল। রাজনীতির চেয়ে বড় খেলা জগতে কিছুই নেই। ল্যাটিনরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে জড়ায় না। কোনো দেশ কারো উপর জেনোসাইড চালায়নি। কোনো দেশ কারো সীমান্তে গিয়ে গুলি চালায় না। এশিয়া-ইউরোপে গণহত্যা আছে। আমরা গণহত্যার শিকার হয়েছি, আমরা এখনো সীমান্তে পাখির মতো মরি। সুতরাং আমাদের এদিকে খেলার সাথে রাজনীতি অবশ্যই মিশবে।

সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষের শাকিরির বোধটা নেই। আমরা মঈন আলীর মতো মুসলিম নই। এজন্য পাকিস্তান প্রসঙ্গ আসলেই আমরা লজ্জাবতী নববধুর মতো লজ্জায় মুখ আচলচাপা দিতে পছন্দ করি। গণহত্যার কথা তুলতে গেলে মুখ ঘুরিয়ে লজ্জার হাসি দিয়ে বলি “ধুরো, ওসব কথা বলতে হয় নাকি?” পাকিস্তানকে দায় দিলে পাপ হবে, পাপ।

সমস্যা অন্যদিকেও আছে।

ঝালমুড়ির থালা থেকে চা বিড়ির দোকান, মুদি থেকে শপিং মল… প্রতিটা জায়গায় প্রতিটা পাবলিক যে যেভাবে পারে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে যে শব্দ, সেটা ইজারা দিয়ে একেকপক্ষ একেক সময় কিনে নেয়।

সুতরাং আমাদের মধ্যে সত্যিকার জাদরান শাকিরি থাকলেও সে চুপ করে থাকবে। তার মুখ বহু আগে থেকেই বন্ধ করে দেয়া। চুপ থাকলে অন্তত তার শত্রু কেউ হবে না।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close