‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’- জীবনানন্দের এই মহান উক্তির সাথে মিলিয়ে এটাও বলা যায় যে- ‘সকলেই লেখক নয়, কেউ কেউ লেখক’। কবি হোক বা লেখক- লেখার তাড়না সব মানুষের ভিতরেই কম বেশি থাকে। সেটা নিজেকে প্রকাশ করার জন্য হোক, নিজের মনের অব্যক্ত কথা গুলো কাউকে বলার জন্য হোক কিংবা কোন বিষয়ে নিজের সুচিন্তিত মতামত প্রকাশের জন্য হোক। যদিও সবাই শেষ পর্যন্ত লেখক হয়ে ওঠেনা, অধিকাংশ কেবল নিজের জন্যই লিখে রাখেন নিজের কথামালা। আর একারণেই ‘ডায়েরী লেখা’র ব্যাপারটা বেশ পুরনো। হাল আমলে ফেসবুক এসে এই লেখার কাজটা আরো সহজ করে দিয়েছে আমাদের জন্য। তবে ডায়েরী-ব্লগ বা ফেসবুকের বাইরেও নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখার মধ্যে নিশ্চয়ই একটা নেশা আছে!

সেই নেশা থেকেই হোক বা অন্য যেকোন কারণেই হোক, যারাই মোটামুটি লিখতে পারেন, চেষ্টা করেন অথবা নিদেনপক্ষে স্বপ্ন দেখেন নিজের বই প্রকাশ করার। বাঙালি লেখকরাও এর ব্যতিক্রম নয়। তাছাড়া বাংলার আলো-বাতাসে নিশ্চয়ই কোন বিশেষ উপাদান আছে! একারণেই সম্ভবত এদেশের প্রতিটা মানুষই তরুণ বয়সে কিছু সময়ের জন্য হলেও ‘কবি’ হয়ে যান! শখের লেখক বা কবিদের কথা থাকুক, যারা আসলেই লেখালেখিকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেন এবং জীবিকা উপার্জনের জন্য না হলেও (যদিও সেটা প্রায় অসম্ভব!) অন্তত নিয়মিত লিখতে চান- তাদের জন্য পথটা কেমন?

এই অধম নিজেকে এখনো লেখক বলে দাবী করেনা, তবে উপরে উল্লেখিত কারণে সেও চেষ্টা করে দেখেছিল নিজের লেখা, নিজের নাম- ছাপার অক্ষরে দেখা যায় কিনা! সেই উদ্দেশ্যে একটি প্রকাশনীতে গিয়েছিল সে নিজের একখানা বই প্রকাশ করা যায় কিনা সেই খোঁজ নিতে। সে ভেবেছিল তার পাণ্ডুলিপি জমা দিতে হবে, চুলচেরা যাচাই-বিশ্লেষণ-বিচারের পর প্রকাশক জানাবেন বইটি ছাপানো যাবে নাকি যাবেনা। কিন্তু প্রকাশনীর ব্যক্তিটি সেদিকে গেলেন না। বললেন ২০ হাজার লাগবে! মানে ২০ হাজার টাকা দিলে এই প্রকাশনী থেকে আমার বইটি বের হবে। আমি ভিতরে কী লিখেছি সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়।

শুনলাম পরিচিত একজন বই বের করছেন এবারের মেলায়। সরাসরি জিজ্ঞেস করতে তো লজ্জা করে, তাই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- ‘বই কীভাবে প্রকাশ করছেন? পরিচিত ছিল বুঝি?’ নবাগত সাহিত্যিক মহাশয় জানালেন, তাকে পনের হাজার টাকা দিতে হয়েছে।

তো এসব ঘটনার অবতারণা করলাম নতুন লেখকদের বই প্রকাশের অবস্থাটা বুঝানোর জন্য। আপনি যদি বই প্রকাশ করতে চান তাহলে হয় আপনাকে অর্ধেক টাকা প্রকাশনীকে দিতে হবে (পনের থেকে বিশ হাজার) অথবা দুই তৃতীয়াংশ বই নিজের কিনে নিতে হবে অথবা কোন প্রকাশনীর কর্ণধার-নাসিকাধারদের সাথে ভালো চেনাজানা থাকতে হবে। না হলে আপনার জন্য ফেসবুকই ভরসা!

বইমেলা, লেখক সমাচার

তবে এখানে কিন্তু প্রকাশকদের মোটেও দোষ দেয়া যায়না। প্রকাশকরা দানছত্র খুলে বসেনি, তারা ব্যবসা করতে এসেছে। আপনি একদম নতুন লেখক, কেউ আপনাকে চেনে না সেভাবে- সেই আপনি ফেসবুকে প্রাপ্ত লাইকের উপর ভরসা করে বই বের করলেন, তারপর বই বিক্রি না হলে সেই ঝুঁকি প্রকাশক একা নেবে কেন? কাজেই ব্যবসায়ীক স্বার্থেই তাকে এই পথে এগোতে হয়। কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।

যেহেতু বই প্রকাশের ব্যাপারটা বিবেচিত হয় ব্যবসায়ীক দৃষ্টিকোণ থেকে, সেহেতু টাকা খরচ করে অনেক অলেখকও বই প্রকাশ করে ফেলতে পারছে সহজেই। মান নিয়ন্ত্রণের কোন ব্যবস্থা এখানে নেই। অন্যদিকে বিশ্বের বড় বড় সব প্রকাশনী গুলোতে নিজস্ব ‘সম্পাদক পর্ষদ’ রয়েছেন, যারা প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপি গুলো যাচাই বাছাই করে দেখেন- এই লেখা ‘বই’ হিসেবে প্রকাশের যোগ্য কিনা। একারণে বিশ্বের অনেক বিখ্যাত লেখকের প্রথম বইও অনেক প্রকাশনী থেকে ফিরে এসেছে। কিন্তু আমাদের এখানে এরকম কোন ব্যাপার নেই। ফলে অনেক আজেবাজে জিনিসও যেমন ঢুকে যাচ্ছে, আবার অনেক ভালো লেখকও নানা কারণে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারছেন না।

প্রকাশনা সংস্থা গুলো, যারা দেশের ‘বিখ্যাত’দের বই প্রকাশ করে, অর্থাৎ ভালো ব্যবসা করতে পারে, তাদের এগিয়ে আসতে হবে। ব্যবসায়িক লাভের একটা অংশ দিয়ে তরুণ লেখকদের সুযোগ করে দিতে হবে। প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপি গুলো থেকে যাচাই-বাছাই করে ভালো লেখা গুলো প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এটা যদি করা হয়, তাহলে প্রতি বছরই আমরা দু-একজন ভালো মানের লেখক পেয়ে যাব।

‘যষ্মিন দেশে যদাচার’। তাই যারা বই প্রকাশ করতে চান তারা এভাবেই করেন। কিন্তু যেহেতু এই নবাগতদের মধ্যে লেখক-অলেখক, কবি-অকবি সকলেই আছেন- কাজেই সকলকেই এক ধরণের মশকরার বিষয়বস্তু হতে হয়। ধরে নিলাম একজন নতুন লেখক, ধরুন আমি। আমি লিখতে জানিনা, লেখার আগামাথা ঠিক নেই, আমি কবিতা ছন্দ-মাত্রা কিছুই জানিনা- কোন একটা পঙক্তিকে কেন স্বরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত বলা হয়- সে সম্পর্কেও কোন ধারণা নেই আমার। কিন্তু আমার খুব শখ আমি বই প্রকাশ করব। এবং নিজের গাটের পয়সা খরচ করে বা পরিচিত লোকজন ধরাধরি করে বই প্রকাশ করেই ফেললাম। তাতে সমস্যাটা কী? সিস্টেমের গাফেলতির কারণে আমার মত গন্ডমূর্খ বই বের করতে পারলো, এতে আমার দোষ কোথায়? আমি তো আপনাকে দিব্যি দেইনি যে আমার বই কিনতেই হবে। আর যেহেতু আমাকে এখানে ‘ইনভেস্ট’ করতে হয়েছে তাই আমি অবশ্যই এখানে ‘বিজ্ঞাপন’ ও করব। আপনি বই প্রকাশ করেননি, একারণে আমাকে ট্রল করছেন কেন?

যারা গাটের পয়সা খরচ করে বই বের করছে, ধরে নিচ্ছি এরা যদি অলেখকও হয়, তাও তো লেখালেখিই করছে। ১৫/২০ টাকা দিয়ে সে অনেক কিছুই করতে পারতো, সেটা না করে সে বই লিখছে, সাহিত্য চর্চা করছে (হচ্ছে কী হচ্ছেনা সেটা অন্য আলোচনা)- এটা তো খুব ভালো ব্যাপার।

তবে এটাও সত্যি বই প্রকাশের আগে আমাকেও কিছু বিষয়ের দিকে অবশ্যই নজর দিতে হবে। কারণ সকলেই লেখক নয়, কেউ কেউ লেখক! সেগুলো নিয়ে গল্প হবে পরের পর্বে। আপাতত বইমেলা উপভোগ করুন, নতুন লেখকদের বই নেড়েচেড়ে দেখুন এবং ভালো লাগলে কিনে ফেলুন!

Comments
Spread the love