একদমই সন্নিকটে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০১৮। এক মাসব্যাপী যে টুর্নামেন্টে ৩২ দল মিলে লড়াই করবে একটি ট্রফি জয়ের লক্ষ্যে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুনের ১৫ তারিখে মস্কোয় বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে কারা? এ নিয়ে কমবেশি চর্চা হচ্ছে সর্বত্রই। নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে বাছ-বিচার করে এবারের আসরের সম্ভাব্য বিজয়ী বেছে নিচ্ছে অনেকেই। একই কাজ করেছে বিবিসিও। তবে তারা হেঁটেছে কিছুটা ভিন্ন পথে। কোন দল সেরা এবং বিশ্বকাপ জয়ের দাবিদার তা বের করেনি তারা। বরং অতীতের টুর্নামেন্টগুলোর ট্রেন্ড, প্যাটার্ন ও স্ট্যাটিসটিক্স পর্যালোচনা করে তারা বের করেছে কোন ৩১ দলের এবারের বিশ্বকাপে জয়ের সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ বাকি থাকছে যে একটি দল, তারাই হবে এবারের বিশ্বকাপের বিজয়ী।

আপনাদের অনেকের কাছেই গোটা বিষয়টিকে ছেলেখেলা মনে হতে পারে। মাঠের খেলা ফুটবলের ফলাফল যদি কাগজ-কলমের হিসাব-নিকাশেই সেরে ফেলা যেত, তবে আর প্রতি ম্যাচে নব্বই মিনিট করে মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দৌড়ে বেড়াতেন কেন খেলোয়াড়েরা! ঠিক তাই। কিন্তু তারপরও বিবিসির এই চমকপ্রদ অ্যানালাইসিসটায় একটিবারের জন্য চোখ বোলাতে তো কোন ক্ষতি নেই।

তাহলে চলুন জেনে আসি বিবিসির বিচারে এবারের বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ী দল হতে গেলে কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে…

# হতে হবে ‘সিডেড’ দল #

‘সিডেড’ বলতে বোঝায় ফুটবল বিশ্বকাপের ড্রয়ে স্বাগতিক দেশকে প্রথম গ্রুপে ফেলে, বাকি সাত গ্রুপের জন্য র‍্যাংকিংয়ের সেরা যে সাতটি দলকে একই পটে রাখা হয়। এবারের বিশ্বকাপের ড্রয়ের ক্ষেত্রে বিচার্য ছিল ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত র‍্যাংকিং। সে অনুযায়ী স্বাগতিক দেশ রাশিয়া আর র‍্যাংকিংয়ের সেরা সাত দল, এই মোট আট দলই হলো ‘সিডেড’ দল।

১৯৯৮ সালে ৩২ দল নিয়ে বিশ্বকাপ খেলা শুরু হওয়ার পর থেকে ‘সিডেড’ যেকোন একটি দলই হয়েছে চূড়ান্ত বিজয়ী। প্রকৃতপক্ষে ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাই ছিল ‘সিডেড’ ব্যতীত কোন দল হিসেবে বিশ্বকাপের সর্বশেষ বিজয়ী। তাই আমরা ধরে নিতেই পারি এবারের বিশ্বকাপেও জয়ী হবে কোন একটি ‘সিডেড’ দলই। সেক্ষেত্রে আমরা এক ধাক্কায় ‘সিডেড’ আটটি দলের বাইরে বাকি ২৪টি দলকে সম্ভাব্য বিজয়ীর হিসাব থেকে বের করে দিতে পারি।

তার মানে এবারের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা থাকছে যে ৮টি দলের জন্য তারা হলোঃ ফ্রান্স, জার্মানী, ব্রাজিল, পর্তুগাল, আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড ও রাশিয়া।

# হওয়া যাবে না আয়োজক দেশ #

গত ৪৪ বছরের বছরের ঐতিহ্য অনুযায়ী এবারও আয়োজক দেশ হিসেবে ‘সিডেড’ দল হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে রাশিয়া। অন্যথায় তাদের যে বর্তমান র‍্যাংকিং (৬৬), তাতে করে কখনোই ‘সিডেড’ হওয়া হতো না তাদের পক্ষে।

তবে ইদানিং আয়োজক দেশ হওয়াও বিশ্বকাপ জয়ের পথে অন্যতম বড় একটি বাধা। বিশ্বকাপের প্রথম ১১টি আসরে, অর্থাৎ ১৯৩০ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে, পাঁচবারই জয়ী হয়েছিল আয়োজক দেশ। কিন্তু তারপর থেকে বিশ্বকাপের নয় আসরে কেবল একবারই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আয়োজক দেশ – ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স।

যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে বিশ্বকাপ জয় সম্ভব বলে কেউ দাবি করেনি, তবে ১৯৯০ সালে ইটালি, ২০০৬ সালে জার্মানি আর ২০১৪ সালে ব্রাজিলও পারেনি হোম এডভান্টেজ কাজে লাগিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের দেশে রেখে দিতে। তাই আমরা এবারের বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ীর তালিকা থেকে বাদ দিতে পারি রাশিয়ার নামও।

তবে যে ৭টি দলের পক্ষে এবার বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা থাকছে তারা হলোঃ ফ্রান্স, জার্মানী, ব্রাজিল, পর্তুগাল, আর্জেন্টিনা, পোল্যান্ড ও বেলজিয়াম।

# থাকতে হবে আঁটসাঁট #

৩২ দলের বিশ্বকাপ যুগে পাঁচ চ্যাম্পিয়ন দলের কেউই তাদের সাত ম্যাচে চার গোলের বেশি হজম করেনি। যে সাতটি দল এখনও বাকি রয়েছে, তাদের মধ্যে বিশ্বকাপ বাছাই-পর্বে পোল্যান্ডই ছিল সবচেয়ে কম আঁটসাঁট দল। ম্যাচপ্রতি গড়ে ১.৪টি করে গোল হজম করেছে তারা।

জার্মানি ও পর্তুগাল হজম করেছে ম্যাচপ্রতি ০.৪টি করে গোল। ফ্রান্স হজম করেছে ০.৬টি, ব্রাজিল ০.৬১টি, আর আর্জেন্টিনা ০.৮৮টি।

তাহলে আমরা পোল্যান্ডকে বাদ দিতে পারি সম্ভাব্য বিজয়ীর তালিকা থেকে। তবে যে ৬টি দলের পক্ষে এবারের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা থাকছে তারা হলোঃ ফ্রান্স, জার্মানী, ব্রাজিল, পর্তুগাল, আর্জেন্টিনা ও বেলজিয়াম।

# হতে হবে ইউরোপের দেশ #

এখন পর্যন্ত মাত্র দুইটি মহাদেশ থেকেই জিতেছে বিশ্বকাপ – ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকা। নিকট অতীতেও ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের মহাদেশের বাইরে গিয়ে বিশ্বকাপ জিতে ফিরতে পারত না। কিন্তু ২০১০ সালে ভেঙেছে সেই অভিশাপ। স্পেন ইউরোপের বাইরে আফ্রিকা মহাদেশ (দক্ষিণ আফ্রিকা) থেকে বিশ্বকাপ জিতেছে, আর ২০১৪ সালে জার্মানি ইউরোপের বাইরে দক্ষিণ আমেরিকা (ব্রাজিল) থেকে বিশ্বকাপ জিতেছে। অথচ ইউরোপে আয়োজিত ১০টি বিশ্বকাপের মধ্যে কেবল একবারই চূড়ান্ত বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে দক্ষিণ আমেরিকার কোন দেশ। ১৯৫৮ সালে সুইডেনে বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল। এই দুই ধরণের পরিসংখ্যান থেকে আমরা সমীকরণ মেলাতেই পারি যে ইউরোপে অনুষ্ঠিতব্য এবারের বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হবে না দক্ষিণ আমেরিকার কোন দল।

তবে দক্ষিণ আমেরিকার দুইটি দল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে বাদ দিয়ে যে ৪টি দলের পক্ষে এবারের বিশ্বকাপে জয়ের সম্ভাবনা থাকে তারা হলোঃ জার্মানী, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও পর্তুগাল।

# দলে থাকতে হবে সেরা গোলরক্ষক #

আপনারা হয়ত ভেবে থাকতে পারেন, গোলস্কোরাররাই বুঝি দলকে বিশ্বকাপ জেতান। কিন্তু ১৯৮২ সালের পর থেকে মাত্র দুইবার বিশ্বকাপজয়ী দলের কোন সদস্যই জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট – ২০০২ সালে ব্রাজিলের রোনাল্ডো, আর ২০১০ সালে স্পেনের ডেভিড ভিয়া।

বিশ্বকাপ জয়ীদের বরং আরও ভালো করে সংজ্ঞায়িত করা যায় গোলরক্ষকদের মাধ্যমে। কেননা গত পাঁচ আসরের মধ্যে চারবারই চূড়ান্ত বিজয়ী দলের গোলরক্ষকই জিতেছেন গোল্ডেন গ্লোভ পুরস্কার।

যে চারটি দল এখনও পড়ে আছে, তাদের মধ্যে থেকে জার্মানীর ম্যানুয়েল নয়্যার, ফ্রান্সের হুগো লরিস কিংবা বেলজিয়ামের থিবো করতয়েসকে এবারের আসরের সম্ভাব্য সেরা গোলরক্ষক হিসেবে কল্পনা করা কঠিন কোন কাজ নয়। কিন্তু তা সত্য নয় পর্তুগালের গোলরক্ষক রুই প্যাট্রিকোর ক্ষেত্রে। এখন অবধি ক্লাব ফুটবল বা আন্তর্জাতিক ফুটবল কোনখানেই খুব অসাধারণ কিছু করে দেখাতে পারেননি তিনি।

তাই আমরা তালিকা থেকে বাদ দিতে পারে পর্তুগালের নামও। তবে যে ৩টি দলের পক্ষে এবারের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা থাকে তারা হলোঃ জার্মানী, বেলজিয়াম ও ফ্রান্স।

# থাকতে হবে অভিজ্ঞতা #

১৯৯৮ সাল থেকেই একটি ট্রেন্ড নজরে আসছে যে বিশ্বকাপজয়ী স্কোয়াডগুলো ক্রমাগত অভিজ্ঞতর হয়ে উঠছে।

১৯৯৮ সালের আসরে ফ্রান্সের স্কোয়াডটির প্রতিটি খেলোয়াড়ের ছিল জাতীয় দলের হয়ে গড়ে ২২.৭৭টি করে ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা। চার বছর আগে বিশ্বকাপ জেতা জার্মানীর প্রতি খেলোয়াড়ের ছিল ৪২.২১টি করে ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা। এর মধ্যকার সময়েও গড়ের ক্রমাগত বৃদ্ধিই লক্ষ্য করা গেছে – ২০০২ সালে ব্রাজিলের ২৮.০৪, ২০০৬ সালে ইটালির ৩২.৯১ আর ২০১০ সালে ৩৮.৩০।

আমাদের বাকি তিনটি দল যখন তাদের বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণা করেছিল, তখন ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের গড় ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ছিল ২৪.৫৬। জার্মানির ছিল ৪৩.২৬। আর বেলজিয়ামের ৪৫.১৩।

তাহলে আমরা এবার সবচেয়ে কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দল হিসেবে বাদ দিতে পারি ফ্রান্সকেও। তবে এবারের বিশ্বকাপে যে দুইটি দলের পক্ষে বিশ্বকাপে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তারা হলোঃ জার্মানী ও বেলজিয়াম।

# হওয়া যাবে না ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন #

বিশ্বকাপ ডিফেন্ড করা খুবই দুরূহ কাজ। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পরপর দুই আসরে ব্রাজিলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে কোন দলই আর সফলভাবে বিশ্বকাপ ডিফেন্ড করতে পারেনি।

এবং আরও মজার ব্যাপার হলো, ১৯৬২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের ১৩টি আসরে মাত্র দুইবারই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা কোয়ার্টার ফাইনালের বৈতরণী পার হতে পেরেছিল – ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনা আর ১৯৯৮ সালে ব্রাজিল। অবশ্য ১৯৭৪ সালের আসরে ব্রাজিল চতুর্থ হয়েছিল বটে, কিন্তু সেবারের বিশ্বকাপ ছিল দুই গ্রুপ পর্বের। গত চার আসরের মধ্যে তিনবারই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিয়েছে।

বিশ্বকাপের গত নয় আসরে, (তিনবার পশ্চিম জার্মানী হিসেবে সহ) জার্মানীর রয়েছে অসাধারণ রেকর্ড – তারা দুইবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তিনবার ফাইনালে পৌঁছেছে, এবং তৃতীয় হয়েছে আরও দুইবার।

কিন্তু রাশিয়ায় আরও একবার তাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে বড় বাধা হলো ইতিহাস।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন, জার্মানীর পক্ষেও এবারের বিশ্বকাপে জেতা সম্ভব নয়। তবে এবারের বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ী দলটি হলো…

বেলজিয়াম!

Comments
Spread the love