বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের মহাযজ্ঞ পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বের টিকিট পেয়েছে মাত্র ৩২টি দল। এই ৩২ দল নিয়েই আমাদের ধারাবাহিক, ‘বত্রিশ দল একটি কাপ’। আজ থাকছে সেনেগালের কথা।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সোনালী ট্রফিটা তখন বিশ্ব প্রদক্ষিণে নেমেছে। আফ্রিকার ‘ছোট্ট’ দেশ সেনেগালে যখন সেটা পৌঁছুলো, আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সেদেশের প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সল। ট্রফিটাকে খুব কাছে থেকে দেখতে দেখতে হুট করেই পাশে দাঁড়ানো সেনেগাল ফুটবল দলের কোচ অ্যালিও সিসেইয়ের দিকে তাকিয়ে স্বগোতক্তি করেছিলেন- “এই ট্রফিটা জিততে কি আমাদের অনেক বেশী সময় লাগবে?”

ম্যাকি সল হয়তো বৈশ্বিক ফুটবলের সামগ্রিক অবস্থাটা ঠিকঠাক জানেন না। স্পেন-ফ্রান্স-জার্মানী বা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মতো দলগুলোকে পেছনে ফেলে সেনেগালের বিশ্বকাপ জেতাটা যে বাড়াবাড়ি রকমের অবিশ্বাস্য স্বপ্ন, সেটা নিয়ে তার ধারণা না থাকতেই পারে। তিনি রাজনীতির ময়দানের মানুষ, ফুটবল মাঠের তো নন। তবে সেনেগাল দলটাই এমন, শিরোপা জিততে না পারলেও, মূহুর্তের মধ্যে পুরো টুর্নামেন্টের হিসাব-নিকাশ উল্টে দিতে পারে যারা। যেমনটা ওরা দিয়েছিল ২০০২ সালে!

জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স তখন বিশ্বের সেরা দল। র‍্যাঙ্কিঙে এক নম্বরে তো বটেই, বিশ্বকাপ আর ইউরো, দুটো ট্রফিই তখন তাদের ঘরে। দলভর্তি তারকা ফুটবলার। জিদান-অরি-থুরাম-ভিয়েরা-ত্রেজেগে-রবার্তো পিরেজ, আর গোলবারের নীভে ফ্যাবিয়ান বার্থেজের বিশ্বস্ত হাত। এমন দাপুটে দলটাকে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটাতেই হারিয়ে দিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল আফ্রিকা থেকে আসা নবাগত একটা দল- সেনেগাল। পাপা বুবা দিওপের সেই গোলটা এখনও চোখে ভাসে ফুটবলপ্রেমীদের। প্যারিস থেকে সিউলে উড়ে যাওয়া হাজার হাজার ফ্রেঞ্চ ভক্তকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল যে গোলটা। ফাবিয়ান বার্থেজ অবিশ্বাসভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন গোল বলটার দিকে!

বিশ্বকাপ ফুটবল, সেনেগাল, সাদিও মানে

সেই একটা হার, ফ্রান্সের বিদায়ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছিল গ্রুপপর্ব থেকেই। ডেনমার্ক আর উরুগুয়ে, গ্রুপের বাকী দুই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই ড্র করেছিল সেনেগাল। রূপকথার তখনও অনেকটা বাকী। দ্বিতীয় রাউন্ডে ইব্রাহিমোভিচ আর হেনরিক লারসনের সুইডেন। সেই দলটাকে গোল্ডেন গোলে হারিয়ে স্বর্ণালী এক আনন্দে ভেসেছিল সেনেগাল, সমর্থকেরা ভালোবেসে লায়ন অব তিরাঙ্গা বলে ডাকে যে দলটাকে। ক্যামেরুনের পরে দ্বিতীয় কোন আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়েছিল সেনেগাল, তাও নিজেদের অভিষেক আসরেই! যে গোল্ডেন গোল সেনেগালকে শেষ আটে তুলেছিল, তুরস্কের বিপক্ষে সেই গোল্ডেন গোলের খাঁড়ায় পড়েই বিদায়ঘন্টা বেজেছিল আফ্রিকান প্রতিনিধিদের। তবুও ওই আসর থেকে প্রাপ্তির পরিমাণটা অনেক বেশীই ছিল সেনেগালের জন্যে।

২০০২ এর পরে ষোল বছর কেটে গেছে। এরমধ্যে তিনটে বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়েছে তিনটে আলাদা মহাদেশে। সেনেগাল কোনবারই মূলপর্বের টিকেট কাটতে পারেনি। এমনকি ২০১০ সালে নিজ মহাদেশে আয়োজিত বিশ্বকাপেও দর্শক হয়েই থাকতে হয়েছে সেনেগালকে। ষোল বছর বাদে আবার বিশ্বকাপে তারা, ট্রফিটা না হোক, আরেকটা অঘটনের স্বপ্ন সেনেগালের মানুষ দেখতেই পারে!

দক্ষিণ আফ্রিকা, বুর্কিনা ফাসো আর কেপ ভার্দের গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সরাসরি রাশিয়ার টিকেট কেটেছে সেনেগাল। এইচ গ্রুপে ওদের প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া, জাপান আর পোল্যান্ড। দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়াটা খুব একটা সহজ হবে না হয়তো, তবে সেনেগাল কোন প্রতিপক্ষকেই ছেড়ে কথা বলবে না- এইই নিশ্চয়তা দেয়াই যায়।

বিশ্বকাপ ফুটবল, সেনেগাল, সাদিও মানে

দলটা যথেষ্ট ব্যালেন্সড। বেশীরভাগ খেলোয়াড়ই ইউরোপিয়ান লীগে খেলেন, ইউরোপিয়ান গতি আর ছন্দের মিশেলটা ওদের খেলায় বোঝা যায় স্পষ্ট। দলটার খেলোয়াড়দের গড় বয়স ছাব্বিশ থেকে সাতাশের মধ্যে, তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার দারুণ এক মিশ্রণ যেন। অনেকদিন ধরেই একসঙ্গে খেলছে সবাই, বোঝাপড়াটাও তাই চমৎকার। ডিফেন্স-মিডফিল্ড বা অ্যাটাক, সব জায়গাতেই প্রতিশ্রুতিশীল প্রতিভা আছে সেনেগালের। ফিফা র‍্যাঙ্কিঙে দলটার অবস্থান এখন তেইশে, আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে সবার আগে!

ছয় ফুট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার এক প্রাচীরকে দিয়েই শুরু করা যাক। নাম তার কালিদু কোলিবেলি। তাকে ডাকা হয় ডিফেন্সিভ টাইটান নামে। ফ্রান্সে জন্ম নেয়া এই ডিফেন্ডার দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছেন পিতৃভূমি সেনেগালকে, খেলছেন ইতালীয়ান ক্লাব নাপোলিতে। শক্তপোক্ত পেটানো শরীর, দুর্দান্ত গতি আর দারুণ স্ট্যামিনা নিয়ে এরই মধ্যে নজর কেড়েছেন বার্সেলোনা আর চেলসির স্কাউটদের। স্বয়ং ডিয়াগো ম্যারাডোনা পর্যন্ত তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন! রক্ষণ সামলাতে তাকে সঙ্গ দেবেন লামিনে গাজামা, ইউসুফ সাবালি আর ক্বারা এমবোজি। প্যাপি দিয়ালোবোজি’র অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে পারবে সেনেগাল।

মাঝমাঠ সামলানোর দায়িত্বটা নিয়েছেন অধিনায়ক শিইকো কাওয়াতে। ওয়েস্টহ্যামের এই মিডফিল্ডার তার দলের সমর্থকদের কাছে খুবই প্রিয় একজন। এভারটনের ইদ্রিসা গানা সাহায্য করবেন তাকে বলের যোগান দিতে। ইংলিশ ক্লাব স্টোক সিটির আরেক মিডফিল্ডার পেপ অলিনে দিয়াকেও দলে রেখেছেন কোচ, রাশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন তিনিও।

বিশ্বকাপ ফুটবল, সেনেগাল, সাদিও মানে

তবে সেনেগালের সবচেয়ে বড় তারকা খেলেন ফরোয়ার্ড লাইনে। সাদিও মানে- নামটা ফুটবল ভক্তদের কাছে খুবই পরিচিত। লিভারপুলের এই ফরোয়ার্ড এই মৌসুমে গোলের সংখ্যায় হয়তো মিশরীয় মোহাম্মেদ সালাহ’র নামের নীচে ঢাকা পড়েছিলেন, কিন্ত পারফরম্যান্স কথা বলেছে তার হয়ে। দারুণ গতিতে ছিটকে ফেলেছেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে, গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে বারবার বল জড়িয়েছেন জালে। মাঝমাঠ থেকে ঠিকঠাক বলের যোগান পেলে বিশ্বের যেকোন ডিফেন্স চুরমার করে দেয়ার সামর্থ্য আছে সাদিও মানে’র, প্রিমিয়ার লীগে সেটা দেখিয়েছেন তিনি। তাকে সঙ্গ দেয়ার জন্যে আক্রমণভাগে আরও আছেন সাকো আর নিয়াঙের মতো ফুটবলারেরা।

সেনেগালের ২০০২ সালের দলটাকে বলা হয় সেদেশের ফুটবল ইতিহাসের সোনালী প্রজন্ম। আফ্রিকান নেশন্স কাপের ফাইনালে উঠেছিল দলটা, টাইব্রেকারে হেরে শিরোপা জেতা হয়নি সেবার। সেবছরের বিশ্বকাপ তো রূপকথা হয়েই আছে। সেই সোনালী প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি কিন্ত এই দলেও আছেন, তবে খেলোয়াড় নয়, কোচ হিসেবে। ২০১৫ সালে সেনেগালের দায়িত্ব নিয়েছিলেন সাবেক ফুটবলার অ্যালিও সিসেই। ২০০২ সালে হাজি দিওফদের সেই গোল্ডেন টিমের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। পুরো দলটাকে কিভাবে এক সূতোয় বাঁধতে হয়, সেটা সিসেই খুব ভালো করে জানেন। খেলোয়াড় হিসেবে নিজের দল নিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়েছিলেন এবার ফুটবল বিশ্বকে তার কোচিঙের জাদু দেখানোর অপেক্ষা কেবল।

বিশ্বকাপ ফুটবল, সেনেগাল, সাদিও মানে

সেনেগালের মিডিয়া কিন্ত তাদের এই দলটাকে নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত। ২০০২ সালের দলটার সেই রেকর্ড ভাঙার সামর্থ্য এই দলের আছে, এমনটাই বিশ্বাস তাদের। সেটা ভাঙতে না পারলেও, অন্তত গ্রুপপর্বের বাধা সেনেগাল ডিঙিয়ে যেতে পারবে, এটা বিশ্বাস করেন সেনেগালের ফুটবল বোঝা প্রত্যেকটা মানুষই। যদিও মাঝমাঠের দুর্বলতা ভোগাতে পারে দলটাকে। ভালো কোন সেট কিক স্পেশালিস্ট নেই পুরো দলে, দুর্বলতা হয়ে দেখা দিতে পারে এই ব্যাপারটাও।

পুরো সেনেগাল এখন ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত। সেনেগালের মানুষও নিত্যনৈমিত্যিক কাজকর্মের ফাঁকে খোঁজ রাখছে ফুটবলের। হুট করেই দেশটাতে টিভি কেনার হার বেড়ে গেছে বহুগুণে। বিশ্বকাপে নিজ দলের খেলা তো মিস দেয়া যাবে না! রাস্তার মোড়ে মোড়ে সিটি কর্পোরেশন আর কর্পোরেট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বসানো হচ্ছে জায়ান্ট স্ক্রীন, যাতে মানুষজন ভীড় করে খেলা দেখতে পারে, মাঠের সেই আবহটা খানিকটা হলেও পাওয়া যায়। সেনেগালের মানুষ তো প্রস্তত উৎসবের জন্যে, সেই উৎসবের উপলক্ষ্যটা সেদেশের ফুটবলারেরা এনে দিতে পারবেন তো?

আরও পড়ুন- 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-