এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডখেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

বিশ্বকাপে প্রভাব খাটাচ্ছেন পুতিন, বিশ্বাস স্বয়ং রাশিয়ানদেরই!

ফুটবল জ্বরে কাঁপছে গোটা বিশ্ব। আর রাশিয়ায় সে মাত্রা আরও কয়েকগুণ বেশি। একে তো তারা এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ, তার উপর আবার সবাইকে অবাক করে দিয়ে, সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে হারিয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেছে তারা। রচনা করেছে এক নতুন ইতিহাস।

রবিবার অবিশ্বাস্য জয়ের পর রাশিয়ার সাধারণ মানুষ সেই যে আনন্দ-উৎসব শুরু করেছিল, তা তারা জারি রেখেছে এখন অব্দি। এবং খুব শীঘ্রই তারা থামবে বলে মনে হয় না। যতদিন টুর্নামেন্টে টিকে থাকছে তাদের দল, ততদিন বাকি সব কিছু ভুলে ফুটবলের নেশাতেই বুঁদ হয়ে থাকবে তারা।

কিন্তু সব রাশিয়ান নাগরিকের মাঝেই কি ছুঁয়ে যেতে পেরেছে ফুটবলের এই উন্মাদনা? মোটেই না। এমনকি তাদের দলের এমন অসাধারণ পারফরম্যান্সের পরের রাশিয়ার বেশ বড় একটি জনসমষ্টি মুখ ফিরিয়ে রেখেছে তাদের ফুটবল দলের উপর থেকে। কিছুতেই নিজ দেশকে সমর্থন করবে না বিশ্বকাপে, এমনই ধনুকভাঙা পণ করেছে যেন তারা!

আর এর পেছনে কারণ কী, জানেন? তাদের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একমাত্র এই ব্যক্তিটির প্রতি ক্রোধ ও আক্রোশের কারণেই রাশিয়ার অগণিত মানুষ এমনকি এই ঐতিহাসিক সময়েও বিরত রয়েছে ফুটবলে নিজ দেশকে সমর্থন করা থেকে।

রাশিয়ার সরকারবিরোধী অনেকেরই ধারণা, চলতি বিশ্বকাপকে ক্রেমলিন ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থে, বহির্বিশ্বে নিজেদের হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার কাজে। এবং এই বিশ্বকাপের ডামাডোলের মাঝেই তারা মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, আর এমন অনেক ফরেইন পলিসি গ্রহণ করতে উদ্যত হচ্ছে যেগুলোর প্রতি সেদেশের অনেকেরই সমর্থন নেই।

‘এটি রাজনীতি। নিছক রাজনীতি। আর কিছুই নয়। এই ফুটবল উন্মাদনা থেকে কারও কোন লাভ হচ্ছে না। একমাত্র পুতিন ছাড়া’- নিজের ফেসবুক পোস্টে এমনটিই লিখেছেন রাশিয়ার সরকারবিরোধী আন্দোলনের সদস্য আলেক্সান্ডার অসোভৎসভ। এবং তিনি আরও একবার অভিযোগ এনেছেন পুতিনের বিরুদ্ধে, যে তিনি নাকি দুর্নীতির মাধ্যমে বিশ্বকাপের আয়োজন-স্বত্তাধিকার ‘কিনে’ নিয়েছেন।

তিনি তার পোস্টে আরও যোগ করেন যে এই মুহূর্তে ফুটবলীয় সাফল্যের কারণে যেসব মানুষ ‘রাশিয়া! রাশিয়া!’ বলে চিৎকার করছে, তাদের সাথে ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ক্রিমিয়া দখল করেছিল কিংবা ২০০৮ সালে জর্জিয়ায় আক্রমণ করেছিল, সেসব কর্মকান্ডের প্রতি সমর্থন জানানো ব্যক্তিদের বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই।

একই রকম মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে রাশিয়ার বিখ্যাত যুদ্ধবিষয়ক প্রতিনিধি আর্কাদি ব্যাবচেঙ্কোর ফেসবুক পোস্টেও।

অনেকে তো আবার এই কথা বলতেও বাকি রাখছেন না যে স্বচ্ছভাবে যদি খেলাটি হতো, তাহলে রাশিয়ার পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না স্পেনকে হারিয়ে দেয়া। উগলভ তসিনিকা নামের একটি অজ্ঞাতপরিচয় টুইটার একাউন্ট থেকে লেখা হয়েছে, ‘রাশিয়ার কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তরণ কোন আনন্দের বিষয় নয়। বরং গোটা ঘটনাটিই সুষ্ঠু তদন্তের দাবি রাখে।’ অর্থাৎ পুতিন নিজস্ব প্রভাব খাটিয়ে রাশিয়াকে জিতিয়ে দিয়েছেন, এমনটিই মূল বক্তব্য তার। আর এমন বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেছেন অনেকেই।

তবে সরকারবিরোধী সকল রাশিয়ানই যে মনের মধ্যে এরকম চরমপন্থী আবেগ লালন করছে, তা কিন্তু নয়। বরং তারা বলছে, নিজ দেশকে বিশ্বকাপে সমর্থন করা দেশপ্রেমেরই অংশ, যাকে কোন ব্যক্তিবিশেষের প্রতি আক্রোশের দরুণ ঢেকে রাখা সঙ্গত নয়।

বিখ্যাত সরকারবিরোধী ইলিয়া ইয়াশিন লিখেছেন, ‘বিশ্বকাপে নিজের দেশকে সমর্থন করা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। এর মানে এই নয় যে আপনি কোন অন্যায়কে সমর্থন করছেন, যার সাথে হয়ত সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের সম্পৃক্ততা রয়েছে। দেশকে ভালোবাসা স্বাভাবিক বিষয়। তার মানে এই নয় যে আপনি আপনার সরকারকে ও প্রেসিডেন্টকেও ভালোবাসেন।’

রাশিয়া, ভ্লাদিমির পুতিন, ২০১৮ বিশ্বকাপ

পুতিন তার প্রভাব খাটিয়ে বিশ্বকাপে রাশিয়াকে বিশ্বকাপে ম্যাচ জেতাচ্ছে, এমন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করে বেড়াচ্ছে যারা, তাদেরকেও এক হাত নিচ্ছেন অনেক সরকারবিরোধী। তেমনই একজন হলেন লিওনিড ভলকভ। তিনি ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলেছেন, ‘এইসব কথাবার্তার কোন ভিত্তি নেই। যারা এগুলো বলছে, তারা সর্বশক্তিমান পুতিনকে এতটাই ভয় পায় যে, বিশ্বাস করে বসে আছে তিনি এমন কিছুকেও কিনে নিতে পারেন, যা আদতে কেনা সম্ভবই নয়।’

সবমিলিয়ে পুতিন আসলেই প্রভাব খাটিয়ে রাশিয়াকে বিশ্বকাপে সফল করছেন কি না, এবং সেজন্য রাশিয়াকে বিশ্বকাপে সমর্থন করা উচিৎ হবে কি না, এ প্রসঙ্গে খোদ রাশিয়াতেই দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে মানুষ। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুতিনকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ট্রল আর মিমগুলো কিন্তু একেবারেই অমূলক নয়।

তথ্যসূত্র- বিবিসি

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close