বিশ্বকাপ শুরুর আগে সবচেয়ে বেশি আকষর্ণ যেটার প্রতি থাকে সেটা গ্রুপ পর্বের ড্র। ৩২ টি দল ৮ টি গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলে একে অপরের বিপক্ষে। কে কার বিপক্ষে খেলবে সেটি নির্ধারিত হয় গ্রুপ স্টেজের ড্র তে। এরপর শুরু হয় পরিকল্পনার ছক আঁকা। প্রতিপক্ষ দলের প্রতিটি ম্যাচের চুলচেরা বিশ্লেষণ থেকে প্লেয়ারদের এনালাইজেশন। সামনের ৭ মাস ২০১৮ বিশ্বকাপ এ সুযোগ পাওয়া দলগুলোর কোচিং স্টাফদের সময়টা খুব ব্যস্ততার মধ্য দিয়েই যাবে। কারণ সবাই জেনে গেছেন কে কার বিপক্ষে নামছেন লড়াইয়ে।

গতকাল রাতে স্বাগতিক রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে হয়ে গেল গ্রুপ স্টেজ ড্র। প্রতিবার যেটা হয়, গ্রুপ অব ডেথ নিয়ে আগ্রহ থাকে সবার। এবার সেই অর্থে ডেথ গ্রুপ বলে বিবেচিত হচ্ছে না কোনটিই কারণ সব গ্রুপই হয়েছে সবল-দুর্বল মিলিয়েই।

শুরু করা যাক গ্রুপ ‘এ’ দিয়ে। এখানে রয়েছে স্বাগতিক রাশিয়া, লাতিন আমেরিকান পাওয়ার হাউজ উরুগুয়ে, দীর্ঘ ২৭ বছর পর বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া আফ্রিকান জায়ান্ট মিশর, এবং ২০০৬ সালের পর প্রথম বারের মতো বিশ্বকাপ এ সুযোগ পাওয়া মধ্য প্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব। প্রতিটি দলই ভিন্ন মহাদেশের হওয়ায় ভিন্ন ঘরানার ফুটবল দেখার প্রত্যাশা দর্শক করতেই পারেন।

গ্রুপ ‘বি’ র খবর নেয়া যাক। এই গ্রুপটি ধারেভারে বাকি গ্রুপগুলোর থেকে এগিয়ে। কারণ এখানে আছে ইউরো চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল, যাদের অধিনায়ক আবার বিশ্বসেরা ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। রয়েছে শৈল্পিক ফুটবলের কারিগর ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী স্পেন। গত বিশ্বকাপ এর দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে এবার স্পেন বদ্ধ পরিকর। এছাড়া আছে এশিয়ান পরাশক্তি ইরান, যারা টানা ২য় বার নিশ্চিত করেছে বিশ্বকাপ এ খেলা। এই গ্রুপের শেষ দল হল আফ্রিকান দেশ মরক্কো। ১৯৯৮ সালের পর এবারই বিশ্বকাপ এ সুযোগ পেল তারা। দুই ইউরোপিয়ান ফেভারিটের সাথে ইরান-মরক্কো কেমন লড়াই করে সেটি দেখার অপেক্ষা।

গ্রুপ ‘সি’র দিকে নজর দেই। শুরুতেই আছে ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স। গ্রুপের ফেভারিটও ব্লুজরাই। আছে লাতিন আমেরিকান অঞ্চলের দল পেরু। এশিয়ান জায়ান্ট অস্ট্রেলিয়া, এবং আরেক ইউরোপিয়ান দল ডেনমার্ক। র‍্যাংকিঙ এর হিসাবে সবচে কম গড় এই গ্রুপেই। তাই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখতে প্রস্তুত হয়ে যাওয়াই ভালো।

গ্রুপ ‘ডি’ দেখলে একটা বিশাল ফ্যানবেজ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বিশ্বকাপ এ সুযোগ পেয়ে কঠিন গ্রুপে পড়তে হয় কিনা সেটা নিয়ে আতংকিত ছিল আর্জেন্টাইন সমর্থকরা। কিন্তু এবার সহজ গ্রুপই পেয়েছে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। চেনা প্রতিপক্ষ নাইজেরিয়া এবারও রয়েছে তাদের সাথে। আছে ইউরোপের জায়ান্ট কিলার ক্রোয়েশিয়া এবং প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ খেলা আইসল্যান্ড। যারা গত ইউরোতে প্রথমবার সুযোগ পেয়েই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। তাই কাউকেই হালকা ভাবে নেয়া যাচ্ছে না। তবে লিওনেল মেসি থাকতে আর্জেন্টিনার ভয় পাবার কোনো কারণই নেই। বিশ্বকাপ ফুটবল, বিশ্বকাপ ফুটবলের ড্র, বিশ্বকাপে কে কোন গ্রুপে

গ্রুপ ‘ই’ আরেকটি বিরাট ফ্যানবেজের জন্য তৃপ্তির বিষয়। বিশ্বকাপ এর সেরা দল ব্রাজিল যে আছে এই গ্রুপে। নিজেদের অঞ্চলের বাছাইপর্ব থেকে সবার আগে রাশিয়ায় নিজেদের জায়গা বুকিং দেয়া ব্রাজিলের গ্রুপে আছে ইউরোপের সুন্দরী দেশ সুইজারল্যান্ড। আরো আছে স্বাধীন হবার পর এবার প্রথম খেলা সার্বিয়া, এবং গত বিশ্বকাপ এ ইতালি, উরুগুয়ে, ইংল্যান্ডের গ্রুপে থেকেও গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে কোয়ার্টার খেলা কোস্টারিকা। এখান থেকে চোখ সরাবেন না যেন। বিশ্বের সবচে দামি খেলোয়াড় নেইমার কি করেন সেটি জানতে হলে দেখতেই হবে।

গ্রুপ ‘এফ’ এ হবে ভীষণ লড়াই। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জার্মানি নিজেদের মর্যাদা ধরে রাখার লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাচ্ছে ইতালিকে বিদায় করে দেয়া সুইডেনকে। রয়েছে দুরন্ত ফুটবলের জন্য বিখ্যাত উত্তর আমেরিকান দেশ মেক্সিকো, এই গ্রপের শেষ দল আমাদের এশিয়ার জায়ান্ট দক্ষিণ কোরিয়া। জার্মানি বাদে বাকি দলগুলোর শক্তির পার্থক্য তেমন নেই। তাই জমজমাট ফুটবল হবে আশা করাই যায়।

গ্রুপ ‘জি’ দেখে একটি দেশের সংবাদমাধ্যম এর এতক্ষণে হিসেব করে লিখে ফেলার কথা কোন স্টেজে কাকে হারিয়ে তারা বিশ্বকাপ জিততে চলেছে। পাঠক ঠিক ধরেছেন, দেশটি ইংল্যান্ড। প্রতিবারই শুরুর আগেই বিশ্বকাপ জিতে যায় যারা। শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়না। তো এবার জেতার পথে তাদের বাঁধা বিশ্বকাপ এর ফেভারিট এবং এবারের ডার্ক হর্স বেলজিয়াম।

যেখানে বেলজিয়াম কে পাত্তা দেবেনা ইংল্যান্ড সেখানে বাকি দুই দলকে গিলে ফেলার কথা তাদের। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কে পেছনে ফেলে আসা পানামা, ২০১০ এর পর আবারো খেলবে আফ্রিকান মহীরুহ তিউনিসিয়া। এই গ্রুপে ইংল্যান্ডকে কিভাবে বাকিরা ঠেকায় সেটাই আগ্রহের বিষয়।

সর্বশেষ গ্রুপ ‘এইচ’ নিয়েই সবচে কম আগ্রহ ফুটবল বিশ্বে। কারণ নেই কোনো হেভিওয়েট নাম। অথচ যারা আছে তারা নিজেদের দিনে হতে পারে ভয়ংকর। আছে ইউরোপের দেশ পোল্যান্ড, দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া, এশিয়ার জায়ান্ট জাপান, ২০০২ বিশ্বকাপ এ ফ্রান্সকে হারানো আফ্রিকান দেশ সেনেগাল। কোনো দলের উপরই চাপ নেই বিধায় এবারের বিশ্বকাপ এ আকর্ষণীয় ফুটবল উপহার দেবে এই গ্রুপের দলগুলো সেটা অনেকেরই ধারণা।

গ্রুপিং তো শেষ। এবার অপেক্ষা রেফারির বাঁশির। আগামী বছর ১৪ জুন মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে রাশিয়া-সৌদি আরব ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ১ মাস ব্যাপী ফুটবল যজ্ঞের। ততদিন ক্লাব ফুটবল মৌসুম উপভোগ করি আমরা, আর বিশ্বকাপ খেলা ৩২ দেশের কোচিং স্টাফরা ছক কষতে থাকুন কাকে কিভাবে মারপ্যাঁচ এ ফেলে জিতবেন স্বপ্নের বিশ্বকাপ।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-