বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের মহাযজ্ঞ পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বের টিকিট পেয়েছে মাত্র ৩২টি দল। এই ৩২ দল নিয়েই আমাদের ধারাবাহিক, ‘বত্রিশ দল একটি কাপ’। আজ থাকছে কলম্বিয়ার কথা।

‘কলম্বিয়া’ নামটা শুনলেই ড্রাগলর্ড আর মাফিয়াদের কথা চোখে ভাসে, সন্ত্রাস আর মাদকের স্বর্গরাজ্য বলা যায় দেশটাকে। তবে কলম্বিয়ার নাম নিলে এখন ফুটবলের ছবিও ভেসে আসে, জেমস রড্রিগেজ বা রাদামেল ফ্যালকাওদের দেশ তো ফুটবল মানচিত্রে নিজেদের অবস্থানটা উজ্জ্বল করে তুলেছে নতুন শতাব্দী থেকেই। ফিফা ওয়ার্ল্ড র‍্যাঙ্কিং-এ দলটার অবস্থান এখন ১৩ নম্বরে। দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে থেকে চতুর্থ হয়ে সরাসরি রাশিয়ার টিকেট কেটেছে হলুদ জার্সিধারীরা।

ল্যাটিন আমেরিকার বাদবাকী দেশগুলোর মতো ফুটবল জ্বরটা কলম্বিয়াতেও আছে, কিন্ত তিন প্রতিবেশী ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বা উরুগুয়ের মতো সমৃদ্ধ নয়। প্রথম বিশ্বকাপে অংশগ্রহন করেছিল ১৯৬২ সালে। সেবার গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল দলটাকে, হেরেছিল উরুগুয়ে আর যুগোশ্লাভিয়ার কাছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ড্র’টাই কলম্বিয়ার একমাত্র প্রাপ্তি ছিল সেবারের আসরে।

আটাশ বছরের বিরতি দিয়ে কলম্বিয়া আবার বিশ্বকাপে ফিরেছিল ১৯৯০ সালে। চার দলের গ্রুপ থেকে তৃতীয় হয়ে শেষ ষোলতে জায়গা করে নিয়েছিল কলম্বিয়ানরা। তবে দ্বিতীয় রাউন্ডেই ক্যামেরুণ ঝড়ে উড়ে গিয়েছিল তারা। পরের দুই আসরে খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে বিশ্বকাপ থেকে। এরপর আবার একযুগের বিরতি। ২০০২-২০০৬-২০১০ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগই পায়নি কলম্বিয়া। ফিরেছে ২০১৪-তে, যেটা হয়ে আছে কলম্বিয়ার ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ! প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল ফ্যালকাও’য়ের দল। স্বাগতিক ব্রাজিল বাধা হয়ে না দাঁড়ালে সেমিফাইনালটাও হয়তো খেলে ফেলতো তারা।

কলম্বিয়া, বিশ্বকাপ ফুটবল, জেমস রড্রিগেজ, রাদামেল ফ্যালকাও

কলম্বিয়ার ফুটবলের এই দলটাকে বলা হচ্ছে গোল্ডেন টিম। সোনালী প্রজন্ম নামটা বেমানান নয় একটুও। কলম্বিয়ার ফুটবল ইতিহাসে এমন শক্তিশালী দল এর আগে আসেনি কখনও। ২০০১ সালে কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল কলম্বিয়া, সেই দলটাও তো এমন প্রতিভায় ভর্তি ছিল না। আক্রমণভাগে ফ্যালকাও-বাক্কা, মাঝমাঠে রড্রিগেজ-কুয়াদ্রাদো-ব্যারিওস, আর রক্ষণভাগ সামলানোর কাজে আছেন মুরিলো-জাপাতা’র মতো খেলোয়াড়েরা। গোলপোস্টের নীচে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে পুরাতন সৈনিক ডেভিড ওসপিনা তো আছেনই। এই দলটাকে আন্ডারএস্টিমেট করার দুঃসাহস বিশ্বকাপে কেউ দেখাবে বলে মনে হয় না! মার্চেই এই প্রীতি ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও ফ্রান্সকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে কলম্বিয়া। বড় দলগুলোকে নিয়মিত হারানোর শক্তি এই দলটার আছে।

পোর্তো থেকে মোনাকো, সেখান থেকে রিয়াল মাদ্রিদ, আবার রিয়াল থেকে ধারে বায়ার্ন মিউনিখ- গত কয়েক বছরে ইউরোপে খানিকটা যাযাবর জীবনই কাটিয়েছেন জেমস রড্রিগেজ। এবার অবশ্য বায়ার্নে থিতু হতে যাচ্ছেন। কলম্বিয়ায় তাকে ডাকা হয় ‘এল নুয়েতো পিবে’ নামে, বাংলা করলে যেটার অর্থ দাঁড়ায়- নতুন শিশু। তাকে এই নামটা দিয়েছেন কলম্বিয়ার কিংবদন্তী ফুটবলার কার্লোস ভালদেমারা। ভালদেমারাকে কলম্বিয়ানরা ভালোবেসে ডাকতো ‘এল পিবে’ বা শিশু নামে। নিজের খেতাবটা উত্তরসূরীকে দিয়ে গেছেন ভালদেমারা।

কলম্বিয়া, বিশ্বকাপ ফুটবল, জেমস রড্রিগেজ, রাদামেল ফ্যালকাও

কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা তিনি, ২০১৪ বিশ্বকাপে তো ছিলেন ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে! চার বছর আগের সেই আসরে মাঠে নামার সময় জেমসের বয়স ছিল মাত্র বাইশ। এই বয়সেই দলের দশ নম্বর জার্সিটা তুলে দেয়া হয়েছিল তার হাতে, সেটা প্রতিভার প্রতি সম্মান জানিয়েই। তিনিও নিরাশ করেননি একদমই, পাঁচ ম্যাচে ছয় গোল করে জিতে নিয়েছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতার ‘গোল্ডেন বুট’ অ্যাওয়ার্ড। দ্বিতীয় রাউন্ডে উরুগুয়ের বিপক্ষে ডি-বিক্সের বাইরে থেকে দেয়া গোলটা দেখে প্রতিপক্ষের কোচ অস্কার তাবারেজ তো তাকে মেসি আর ম্যারাডোনার সাথেই তুলনা করেছিলেন! দল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় না নিলে তার পায়ের জাদু আরও খানিকটা দেখা যেতো ব্রাজিলে।

এবারও কলম্বিয়ার বিশ্বকাপ স্বপ্নে সবচেয়ে বড় আশার নাম জেমস রড্রিগেজ। ছাব্বিশ বছরের জেমস সেটা জানেন। গত মৌসুমে খানিকটা সময় ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে, তবে দ্রুতই স্বরূপে ফিরেছেন তিনি। চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সেমিফাইনালে সাবেক ক্লাব মাদ্রিদের বিপক্ষে গোল করেছেন, করিয়েছেনও। বুন্দেসালীগায় তেইশ ম্যাচে সাত গোল তার। ফরোয়ার্ড লাইন-আপে থাকা ফ্যালকাও-বাক্কা’রা বলের জোগানের জন্যে ভরসা রাখবেন তার ওপরেই। ফ্রেঞ্চ লীগে খেলা রাদামেল ফ্যালকাওয়ের হাতে থাকছে ক্যাপ্টেনের আর্মব্যান্ড। মোনাকোর হয়ে এই মৌসুমে ৩৫ ম্যাচে ২৪ বার জালে বল পাঠিয়েছেন তিনি। মিডফিল্ডে কার্লোস সানচেজ বা মাতিয়াস উরাইব’রাও আছেন ফর্মে।

কলম্বিয়া, বিশ্বকাপ ফুটবল, জেমস রড্রিগেজ, রাদামেল ফ্যালকাও

খেলোয়াড়দের বাইরে ডাগআউটেও একজন সুপারস্টার আছে কলম্বিয়ার। তার নাম হোসে প্যাকারম্যান। ২০০৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোচের দায়িত্বে থাকা এই ভদ্রলোক দুয়ো কুড়িয়েছিলেন মেসিকে মাঠে না নামিয়ে। ২০১২ সাল থেকেই কলম্বিয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি, ২০১৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার হলুদ বিপ্লবের নেপথ্যে মূল কৃতিত্ব তারই ছিল। নিজের পছন্দের ৪-২-২-২ ফরম্যাশনেই থিতু করে ফেলেছেন কলম্বিয়া দলটাকে, বাছাই পর্বেও এই ফরমেশনেই খেলেছে কলম্বিয়া, ছোট ছোট পাসে উঠে এসেছে আক্রমণে, কাউন্টার এটাক করেছে দুই উইং দিয়ে। ২০১৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার দলটা ছিল তারুণ্যে ভরা, এবার সেই দুর্বার তারুণ্যের মিছিলে যোগ হয়েছে অভিজ্ঞতাও। এই কলম্বিয়া তো ভয়ঙ্কর সুন্দর!

বাছাইপর্ব পেরিয়ে যেতে অবশ্য যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে পেকারম্যানের দলটাকে। শেষ দিনেও নিশ্চিত ছিল না, রাশিয়ার টিকেট পাওয়া যাবে কিনা। শেষ ম্যাচে পেরুর সঙ্গে ড্র করেই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে তারা। এইচ গ্রুপে কলম্বিয়ার সঙ্গী জাপান, পোল্যান্ড, আর সেনেগাল। কোন অঘটন না ঘটলে কলম্বিয়া গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে, এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই ধরে নেয়া যায়। দ্বিতীয় রাউন্ডে তাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে বেলজিয়াম বা ইংল্যান্ডের যে কেউ। তাই কলম্বিয়ার মূল লড়াইটা শেষ ষোলো থেকেই শুরু হবে বলা চলে।

কলম্বিয়া, বিশ্বকাপ ফুটবল, জেমস রড্রিগেজ, রাদামেল ফ্যালকাও

কলম্বিয়ার সাথে রাশিয়ার সময়ের ব্যবধান অনেক। দুই গোলার্ধে দুই দেশের অবস্থান। তবুও কলম্বিয়ার রাস্তাঘাটগুলো মাঝরাতে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে, লোকে দলবেঁধে রেস্টুরেন্ট আর পাবে ভিড় জমাবে নিজের দলের খেলা দেখার জন্যে। খানিকটা সময়ের জন্যে হলেও থেমে যাবে খুনোখুনি, কিংবা গোলাগুলির শব্দ। মুষ্টিবদ্ধ হাত এক হবে কলম্বিয়ার জয়ের প্রার্থনায়; বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলছে নিজেদের দেশ- এই অনুভূতিটাই তো অসাধারণ। রাতের নিঃস্তব্ধতার বুক চিরে শোনা যাবে চিৎকার, আকাশ আলোকিত করবে আতশবাজি। একঘেয়ে জীবনে ফুটবলটাই যে কলম্বিয়ার মানুষের কাছে এক নির্মল বিনোদনের নাম।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-