কোনো মা যদি কর্মজীবী হন এবং দিনের অধিকাংশ সময়েই কাজের সুবাদে বাসার বাইরে থাকেন, তাহলে ওই মায়ের সন্তানেরা নাকি ঠিকমত মানুষ হয় না – আমাদের দেশে প্রচলিত খুবই জনপ্রিয় একটি ধারণা এটি। কোনো কর্মজীবী মায়ের সন্তানেরা একটু বিগড়ে গেলেই তার পেছনে মায়ের কাজ করাকে দায়ী করা হয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে, পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেনি বলেই বিগড়ে গেছে তার সন্তানেরা।

অর্থাৎ ভাবখানা এমন যেন কোনো নারী একবার মা হয়ে গেলে তার আর ব্যক্তিগত কর্মজীবন বলে কিছু থাকতে পারবে না। বাকি সারাজীবন তাকে চারদেয়ালের মাঝে বন্দি থেকে কেবল সন্তান মানুষ করতে হবে!

কেউ যদি মনে করেন শুধু আমাদের দেশের মানুষেরাই এ ধরণের ধারণার বশবর্তী হয়ে থাকে, তাহলে খুবই ভুল করবেন। কারণ এমনকি অনেক পশ্চিমা দেশেও সন্তানদের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে এতদিন কর্মজীবী মা-কেই দোষারোপ করা হয়ে আসছিল। কিন্তু অবশেষে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের এক গবেষণার মাধ্যমে বের হয়ে এলো প্রকৃত বাস্তবতা যে কর্মজীবী মায়েরা সন্তানের সুষ্ঠু বিকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায় নন, বরং মা যদি কর্মজীবী হন তাহলেই তার সন্তানদের জীবনে ভালো কিছু করে দেখাবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্য কর্মজীবী মায়ের দ্বারা পুত্র সন্তানদের চেয়ে কন্যা সন্তানদের প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

যে গবেষণাটির কথা বলছি, ২০১৫ সালেই সেটির প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল, এবং সেখানে বলা হয়েছিল, কোনো কন্যা সন্তানের মা যদি কর্মজীবী হন, তাহলে তার ক্যারিয়ারে সফল হওয়া বা খুব ভালো কিছু করে দেখানোর সম্ভাবনা ওইসব কন্যা সন্তানদের চেয়ে বেশি, যাদের মা গৃহিণী এবং সারাদিন বাসায়ই থাকেন। এবং সম্প্রতি গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা যাচ্ছে, কর্মজীবী মায়েদের সন্তানেরা শুধু যে ক্যারিয়ারেই সফল হয় তা কিন্তু নয়। পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাদের সুখী হওয়ার সম্ভাবনাও অনেকাংশে বেড়ে যায়।

হারভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপিকা ক্যাথলিন ম্যাকগিন বিশ্বাস করেন, গবেষণায় প্রাপ্ত এই তথ্য কর্মজীবী নারীদের জন্য অনেক সহায়ক হবে। কেননা অনেক কর্মজীবী নারীই মা হওয়ার পর সন্তানের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে চাকরী ছেড়ে দেন, নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দেন। আবার যেসব নারীর পক্ষে চাকরী ছাড়া সম্ভব না, তারাও সবসময় এক প্রকার অনুশোচনা ও অপরাধবোধে ভুগতে থাকেন। সন্তানের একটু কিছু হলেই তারা নিজেদের দুষতে শুরু করেন।

ম্যাকগিন বলেন, “মানুষের মনে এখনও এই ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে মা যদি চাকরীজীবী হন, তাহলে তাতে কোনো না কোনোভাবে সন্তানদের ক্ষতি হতে পারে। তাই আমাদের এই গবেষণার ফলাফল খুবই গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে বোঝাতে যে মায়েদের বাসার বাইরে কাজ করা সন্তানদের ওপর কোনো কুপ্রভাব ফেলে না।” তিনি আরও বলেন, “এটি কোনোভাবেই সন্তানদের সুখী মানুষ হিসেবে বড় করার সাথে সম্পর্কিত নয়। যখন নারীরা কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি তাদের অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিৎ। তাদের কাজ করার ফলে সন্তানদের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না, এটি চিন্তা করা উচিৎ নয়। কারণ কর্মজীবী মায়ের জন্যে সন্তানের আসলেই কোনো ক্ষতি হয় না।”

এখন স্বাভাবিকভাবেই পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে কর্মজীবী মায়ের বাসার বাইরে কাজ করা কীভাবে তার কন্যাসন্তানের ক্যারিয়ারের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে, সব কন্যা সন্তানের জীবনেই তার মায়ের একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। মাকে দেখেই একটি কন্যাশিশু বড় হয়, তার চিন্তা-চেতনা, রুচিবোধ, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতিতে মায়ের প্রচ্ছন্ন প্রভাব ও সাদৃশ্য থাকে। তাই কোনো কন্যা শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই এটি দেখে বড় হয় যে তার মা ঘরের কাজ বাদে বাইরের কাজেও সমান পারদর্শী এবং দুইদিকই সমানভাবে সামলাতে পারছেন, তাহলে তার ভেতরও কর্মজীবী নারী হওয়ার মানসিকতা গড়ে উঠবে। তাই কর্মজীবী মায়ের কন্যা সন্তানেরও ভবিষ্যতে কর্মজীবী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

তাছাড়া কর্মজীবী মায়ের কন্যা সন্তান ছোটবেলা থেকেই অনেক কাজ নিজে নিজে করে অভ্যস্ত হয়ে থাকে। তাই সে খুব অল্প বয়স থেকেই আত্মনির্ভরশীলতা লাভ করে। নিজের ভালো মন্দ নিজে বুঝতে পারে, এবং সে অনুযায়ী ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। এই ব্যাপারটি তাকে ভবিষ্যৎ জীবনে অনেক সাহায্য করে। সে নিজে শুধু কর্মজীবীই হয় না, পাশাপাশি নেতৃস্থানীয় পদও গ্রহণ করতে পারে, বেশি চ্যালেঞ্জ নিতে পারে। আর তার ফলে সে কর্মস্থলে অন্যান্য মেয়ে, যাদের মা কর্মজীবী ছিলেন না, তাদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং বেশি বেতন পেয়ে থাকে।

২৯টি দেশের প্রায় এক লক্ষেরও বেশি নারী-পুরুষের উপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, গৃহিণী মায়ের কন্যা সন্তানদের থেকে কর্মজীবী মায়ের কন্যা সন্তানদের চাকরিজীবী হওয়ার সম্ভাবনা ১.২১ গুণ বেশি। অন্যদিকে তাদের নেতৃস্থানীয় পদে কাজ করার সম্ভাবনা ১.২৯ গুণ বেশি, এবং তারা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৪৪ মিনিট অতিরিক্ত কাজ করে থাকে। তাছাড়া তারা বেতনও পেয়ে থাকে বেশি। ২০১২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এ জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে, যাদের মা কর্মজীবী, তারা গৃহিণী মায়ের সন্তানদের থেকে প্রতি বছরে গড়ে ১,৮৮০ মার্কিন ডলার বেশি বেতন পেয়েছেন।

এখন অনেকেই ভাবতে পারেন, কর্মজীবী মায়েরা তো কেবল তাদের কন্যা সন্তানের ক্যারিয়ারেই প্রভাব ফেলছে। পুত্র সন্তানের ক্যারিয়ারে কি কোনো প্রভাবই ফেলে না?

এ কথা অনেকাংশেই সত্য যে মা কর্মজীবী নাকি গৃহিণী তা পুত্র সন্তানদের ক্যারিয়ারে খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। তবে পুত্র সন্তানদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবশ্যই বিশেষ প্রভাব ফেলে থাকে। যেমন কোনো পুত্র সন্তানের মা যদি কর্মজীবী হয়ে থাকেন, তাহলে তাদেরও জীবনসঙ্গিনী হিসেবে কোনো কর্মজীবী নারীকে বেছে নেয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। তাছাড়া তারা তাদের জীবনসঙ্গিনীকে বাসার বাইরের কোনো কাজের সাথে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারেও উৎসাহ প্রদান করেন।

তাদের পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনেও বিশেষ প্রভাব পড়ে। স্বামী স্ত্রী উভয়ই কর্মজীবী হলে যেহেতু ঘরের কাজে দুইজনকেই কমবেশি অবদান রাখতে হয়, তাই কর্মজীবী মায়ের পুত্র সন্তানেরা বেশি ঘরমুখো হন, পরিবারের সাথে বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকেন এবং তারা প্রতি সপ্তাহে পরিবারের সাথে গড়ে ৫০ মিনিট অতিরিক্ত সময় কাটান।

তথ্যসূত্র: হারভার্ড বিজনেস স্কুল

(ছবির জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা- রুমিতা ইসলাম রুমু, মাকসুদা আজীজ, আঁখি ভদ্র)

Comments
Spread the love