আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলা বা লেখার সময় দুই লক্ষ মা-বোনের নির্যাতিত হবার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এটি মারাত্মক ভুল একটি তথ্য। কিন্তু কীভাবে এর প্রচলন হলো? সরকার এই পরিসংখ্যানটি কেনো শুদ্ধ করেনি আজ পর্যন্ত? সরাসরি এই তথ্যটি ভুল বলা যায়, কারণ যুদ্ধের পর প্রায় চার লাখ নির্যাতিতার গর্ভপাত করা হয়েছিল। আর বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলে আরও লক্ষাধিক ধর্ষিতা নির্যাতিত হয়ে মারা গেছেন। তাহলে নির্যাতিতা নারীর সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের হয়েছে প্রায় দুই লাখ। আসলে সরকারিভাবে মুক্তিযুদ্ধের ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি ছিলো থানা ভিত্তিক নিখোঁজ নারীর সংখ্যা অনুমান করে। দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড-এ  ড. জিওফ্রে ডেভিস লিখেছেন, “হানাদার দখলদারিত্বের সময়কালে প্রতিটি থানায় প্রতিদিন গড়ে দু’জন করে মেয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। থানার সংখ্যা ৪৮০টি এবং দখলদারিত্ব স্থায়ী হয়েছে ২৭০ দিন। ৪৮০ কে ২৭০ ও ২ দিয়ে গুণ করে পাওয়া গেছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ জন। অন্যান্য কারণে মেয়েরা নিখোঁজ হয়েছেন ধরে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বোর্ড সংখ্যাটাকে রাউন্ড ফিগারে এনেছেন দুই লাখে! এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের এইটাই অফিশিয়াল ধর্ষিতার সংখ্যা।” তবে এর পরপরই ডক্টর ডেভিস বলেছেন, এই হিসাবটি তার মতে ত্রুটিপূর্ণ।

‘দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড’ ড. জিওফ্রে ডেভিসের ডায়েরি। মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ট্রেলিয়ার এই চিকিৎসক বাংলাদেশে আসেন। দেশ স্বাধীন হবার একদম পরপরই তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছিলো বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুরোধে ১৯৭২ সালে। ধর্ষিত বীরাঙ্গনাদের চিকিৎসা এবং গর্ভপাতের জন্য। তিনি আমাদের দেশে তখন ৩ লাখ ৬০ হাজার পোয়াতির সন্ধান পাওয়ার কথা বলেছেন। শেষ পর্যন্ত ডা. জিওফ্রে ডেভিস দেশজুড়ে তার চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতায় এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় চালানো নমুনা জরিপের মাধ্যমে পরিসংখ্যান তৈরি করে জানান, ৪ থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজার নারী মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাছাড়া পাকিস্তানের নথিপত্রে বাংলাদেশে ব্যাপক হারে ধর্ষণের ব্যাপারটি অস্বীকার এবং পাকিস্তানীরা কিভাবে ধর্ষণ প্রক্রিয়াকে হালাল করেছিলো এসব প্রসঙ্গে ডঃ ডেভিসের একটা সাক্ষাতকার পরবর্তীতে ডঃ মুনতাসির মামুনের স্যারের ‘বীরাঙ্গনা ১৯৭২’ বইতে গুরুত্বের সাথে উঠে আসে।

সারা পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধশিশু সম্পর্কে যে গবেষণা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো সুসান ব্রাউনমিলার অ্যান্থনির গবেষণা নিবন্ধগুলো। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয় তার সাড়া জাগানো গ্রন্থ ‘অ্যাগেইনস্ট আওয়ার উইল: ম্যান, উইম্যান অ্যান্ড রেপ’। গবেষক সুসান ব্রাউনমিলার ধর্ষণের সংখ্যাকে প্রায় চার লাখ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘‘During the nine-month terror, terminated by the two week armed intervention of India, a possible three million people lost their lives, ten millions fled across the border to India and 200,000, 300,000 or possible 400,000 women (three sets of statistics have been variously quoted) were raped. Eighty percent of the raped women were Moslems, reflecting the population of Bangladesh, but Hindu and Christian women were not exempt.’’ [Against Our Will : Men, Women and Rape; Susan Brownmiller; Page 81]

আবার, ডা. এম.এ. হাসান তার ‘একাত্তরের নারী নির্যাতন:ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়’ গ্রন্থে উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে ধর্ষিতের সংখ্যা দুই থেকে চার লাখের কথা বলা হয়েছে। তার নিজের জরিপের উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘‘১৯৯১-২০০২ সাল পর্যন্ত দেশের ৪২ জেলার ২৫টি থানায় পরিচালিত আমাদের গবেষণায় গৃহীত অসংখ্য সাক্ষাতকারের মধ্য থেকে নির্বাচিত ২৬৭ ব্যক্তির সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, একাত্তরে দু’লাখ দু’হাজার জন নারী ধর্ষিত হয়েছে ওই সব স্থানে।… সারা দেশে ধর্ষিত ও নির্যাতিত নারীর সংখ্যা সাড়ে চার লাখের ওপরে’’ [‘একাত্তরের নারী নির্যাতন:ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়’, ডা. এম এ হাসান; প্রসঙ্গ ১৯৭১:মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, পৃষ্ঠা ৩]

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সুজান ব্রাউনমিলারের গ্রন্থ Against Our Will: Men, Women and Rape এ তিনি লিখেছিলেন, একাত্তরের ধর্ষণ নিছক সৌন্দর্যবোধে প্রলুব্ধ হওয়া কোন ঘটনা ছিলনা আদতে; আট বছরের বালিকা থেকে শুরু করে পঁচাত্তর বছরের নানী-দাদীর বয়সী বৃদ্ধাও স্বীকার হয়েছিল এই লোলুপতার। পাকসেনারা ঘটনাস্থলেই তাদের পৈচাশিকতা দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি ; প্রতি একশ জনের মধ্যে অন্তত দশ জনকে তাদের ক্যাম্প বা ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হতো সৈন্যদের জন্য। রাতে চলতো আরেক দফা নারকীয়তা। কেউ কেউ হয়ত আশিবারেও বেশী সংখ্যক ধর্ষিত হয়েছে! এই পাশবিক নির্যাতনে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, আর কতজনকে মেরে ফেলা হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা হয়ত কল্পনাও করা যাবে না । (Brownmiller, p. 83)

আবার অন্য একটি বইয়ে লেখা হয়েছে, নির্যাতিতারা যখন পাঁচ-ছয় মাসের অন্ত:সত্ত্বা হতো তখন তাদেরকে মুক্তি দিয়ে উপহাস করা হতো, ”যখন আমার পুত্র ভূমিষ্ট হবে, তুমি তাকে অবশ্যই আমার কাছে নিয়ে আসবে” । (Daktar: Diplomat in Bangladesh by Dr. Viggo Olsen).

১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমে পাকস্তানি বাহিনী কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনা প্রচারিত হয়েছে, যদিও মোটের তুলনায় প্রতিবেদনের সংখ্যা খুবই নগণ্য তবুও এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করছি। আমাদের দেশের যেসব মানুষেরা মানতে নারাজ, যারা দাবী করে যে পাকিদের হাতে আমাদের ৫-৬ লক্ষ মা-বোন নির্যাতিত হতে পারে না, তাদের জন্য নিচের প্রতিবেদন গুলো কিছু চিন্তা-ভাবনার খোরাক জোগাবে-

১। ‘রাজাকাররা তাদের কর্মকাণ্ড এখন হত্যা ও চাঁদাবাজিতেই আটকে রাখেনি, এখন তারা বেশ্যালয়ও খুলেছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তারা একটি শিবির খুলেছে যেখানে অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েদের আটকে রাখা হয়েছে, রাতে পাকবাহিনীর অফিসারদের সরবরাহ করা হয় তাদের। এছাড়াও প্রতিদিনই অনেক মেয়ে অপহরণ করছে তারা নিজেদের জন্যও, এদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি’(সানডে টাইমসঃ ২০ জুন ১৯৭১)

২। ‘ওরা আমার বাবা মা কে মেরে ফেলে, দুজনকেই বন্দুকের বাট দিয়ে পেটাতে পেটাতে মেরেছে। এরপর মেঝেতে আমাকে চিৎ করে শুইয়ে তিনজন মিলে ধর্ষণ করেছে।’ এমনটা বলেছে পেত্রাপোলের উদ্বাস্তু শিবিরের এক ষোড়শী। একই প্রতিবেদনের ভাষ্য, ‘ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণভয়ে পালাতে থাকা পরিবারগুলোর মেয়েদেরও হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এরপর বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে পাকবাহিনীর কাছে। অবশ্য পরিবারগুলো মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ছুটিয়ে নিয়েছে অনেককে। যারা পারেনি, তাদের ঠাই হয়েছে রাজাকারদের খোলা বেশ্যালয়ে।’(টাইমসঃ ২১ জুন ১৯৭১)

৩। ‘আগুনে পোড়া গ্রামকে পেছনে ফেলে দুই কিশোরী মেয়ে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পালাচ্ছিলেন চন্দ্র মন্ডল। কাদামাটির ভেতর দিয়ে। একটু পর সৈন্যদের হাতে ধরা পড়লেন। অসহায় চোখে তাকে দেখতে হলো তার মেয়েদের ধর্ষনের দৃশ্য। বারবার, বারবার, বারবার।’ (২ আগস্ট ১৯৭১, নিউজউইক)

৪। ‘১১ এপ্রিল সৈন্যরা আমাদের গ্রামে এল। একদল এসে আমাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেল কী যেন দেখাতে। ফিরে এসে দেখি আমার বোন নেই। আমার প্রতিবেশীর মেয়ে এবং এক হিন্দুর মেয়েও একইরকম নিখোজ। মে মাসের মাঝামাঝি আমার বোন আর প্রতিবেশিকে ওরা ছেড়ে দিল। কিন্তু হিন্দু মেয়েটার খোঁজ পাওয়া গেল না। ফিরে আসা দুজনই গর্ভবতী, বাচ্চা হবে। ওদের দিয়ে কাপড় ধোঁয়ানো হতো এরপর প্রতিদিন দু-তিনবার করে সৈন্যদের সঙ্গে শুতে হতো।’(নিউইয়র্ক টাইমসঃ ১১ অক্টোবর ’৭১)

৫। ‘সম্প্রতি পাকবাহিনী ডেমোরা গ্রাম চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে, ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সব নারীকে ধর্ষন করে এবং ১২ বছরের ওপর সব পুরুষকেই গুলি করে মারে।’ (নিউজউইকঃ ১৫ নভেম্বর ’৭১)

এবার কয়েকটি বইয়ের লেখার দিকে নজর দেবো-

১। ১৯৭১ হানাদার বাহিনী তাদের দোস্ত রাজাকার ও দালালদের প্রতক্ষ্য সহযোগীতায় আট মাসে রক্ষনশীল হিসাবে বাংলাদেশে ৪ লক্ষেরও বেশি নারী ধর্ষন ও নির্যাতন করেছিল. বিশ্বের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি। ছয় বছর ব্যাপী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ‘গোটা ইউরোপে’ নাৎসি ও ফ্যাস্টিট বাহিনী সম্মিলিতভাবে এত বেশি নারীকে ধর্ষন, নির্যাতন করেনি’ (The Rape of 71: The Dark Phase of History -Dr. M A Hassan)

২। স্বাধীনতার সাত দিনের মধ্যে পাকসেনা কর্তৃক অপহরিত প্রায় তিনশত মেয়েদের ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়। ২৬শে ডিসেম্বর, মুক্তি বাহিনী এবং যৌথ বাহিনীর সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এবং ঢাকার আশেপাশের অন্যান্য ছোট শহরগুলো থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় প্রায় ৫৫ জন অস্বাভাবিক অসুস্থ এবং অর্ধ-মৃত মেয়েদের উদ্ধার করে রেড ক্রস। (Genocide in Bangladesh (1972) by Kalayan Chaudhury, Orient Longman, pp 157-158)

৩। পাহাড়তলী, চট্রগ্রামের শহীদ আকবর আলী’র পুত্র রাউফুল হোসেইন সুজা ফয়জ লেকে’র হত্যাযজ্ঞ এলাকায় তার পিতার লাশ খুঁজতে যান। তারা সেখানে প্রায় ১০,০০০ বাঙালির লাশ দেখতে পান যার বেশীর ভাগই নির্মমভাবে জবাই করা । তারা প্রায় ৮৪ জন অন্ত:স্বত্তা রমনীর মৃতদেহ আবিষ্কার করেছিলেন যাদের উদর ছিন্নভিন্ন ছিল। এই রকম নির্মমতার প্রতিচ্ছবি ছিল প্রায় সারা বাংলাদেশে। (The Rape of 71: The Dark Phase of History -Dr. M A Hassan)

পাকিস্তানি সেনাদের অস্থায়ী অবস্থানকে গোনায় নেওয়া হয়নি। মানে তারা একটা গ্রাম বা অঞ্চলে হামলা করল এবং গণহারে ধর্ষণ চালাল। পুরোপুরি ধংস হয়নি কিন্তু আক্রমণের শিকার এরকম গ্রামের সংখ্যা বাংলাদেশের তিনভাগের এক ভাগ। সুবাদেই ধর্ষণের সংখ্যাও ছিল অগণিত, যদিও সবক্ষেত্রেই গর্ভধারণ অনিবার্য ছিল না। এছাড়া রাজাকার ও পাকিস্তানের দালালরা উদ্বাস্তুদের ওপর হামলা চালিয়ে প্রচুর মেয়ে অপহরণ করেছিল। দেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়ার পথে এ হামলা এবং ধরষনের শিকার হতে হয়েছে তাদের। এ ব্যাপারে অনেক তথ্য প্রমান রয়েছে। এরপর তারা ভারতে গিয়ে আর দেশে ফেরেনি। অনুমান করা হয় ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল এক কোটি বাঙালি, আর তাদের মধ্যে ১৫ লাখ ছিলেন নারী। আর তাদের মধ্যে দেশীয় রাজাকার দারা ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে কতজনের তার কোন হিসাব জানা যায়নি। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধে আক্ষরিক অর্থে নির্যাতিত নারীদের সংখ্যা আসলে ছয় লক্ষের কাছাকাছি কোন একটা সংখ্যা ছিল।

(ছবি কৃতজ্ঞতা-genocidebangladesh.org)


*

এগিয়ে চলোর এই ১০০% কটন, ১৬০ জিএসএমের প্রোডাক্ট পেতে কল করুন এই নাম্বারে- 01670493495 অথবা অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করে ফেসেবুকে ম্যাসেজ করুন।

Comments
Spread the love