নারী সে মহীয়সী, অল্পতে যারা সহমর্মিতায় ভুগে করে ফেলে অনাকাঙ্খিত ভুল। সরল বিশ্বাসে আপনজনের উপর আস্থা রেখে মুখোমুখি হয় ভয়ংকর বিপদের, এমনকি পরিবারের চেনামুখগুলোও অনেক সময় হয়ে যায় অচেনা। আগে এই ভুলের মাত্রা বাস্তব জীবনে অপেক্ষাকৃত কম ছিল। কারণ পারিবারিক গাঁথুনি, সন্তানের সাথে মা-বাবার সম্পর্ক, পরিবারের সম্পর্কটা ছিল খুবই মজবুত। কিন্তু আজকের এই আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে যখন ঘরের ভেতরেই হাজারটা ঘর, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের আলাদা আলাদা দুনিয়া তৈরি হচ্ছে, তখন আসলে চাইলেও জীবনকে কতটা নিরাপদ রাখা সম্ভব? কতটা সম্ভব নজরদারি রাখা আপনজনের প্রতি, খেয়াল রাখা সন্তানের প্রতি?

চাইলেও খুব বেশি সম্ভব না। কারণ জীবন আজ মুঠো ফোন ও সাইবারস্পেসে বন্দী। সেখানে আপনার ছেলেমেয়ের পরিচিতি, তাদের স্ট্যাটাস, সার্কেল, লিংক-আপ সম্পর্কে আপনি নিজেও জানেন না। জানেন না যতক্ষণ না পর্যন্ত তার জীবনে ঘটে যায় অনাকাঙ্খিত কোন দূর্ঘটনা, সে পড়ে কোন ভয়ংকর বিপদে।

সাইবার ক্রাইম কি? সাইবার ক্রাইম বলতে বোঝায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটিয়ে সাইবার স্পেসে অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হওয়া। মাধ্যম হিসেবে যেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে কম্পিউটার, ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল ডিভাইস ইত্যাদি। এরমধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অপকর্মগুলো সংঘটিত হয় নারীর প্রতি। অফলাইনে নারীদের উপর সহিংসতার মাত্রা যেমন সবচেয়ে বেশি, অনলাইনেও ঠিক তেমনি সবচেয়ে নাজুক আর যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় মেয়েরা। চলুন এক নজরে দেখে আসি নারীদের উপর চলা প্রধান প্রধান অনলাইনভিত্তিক হ্যারাজমেন্ট, সারবারক্রাইম ও অপরাধগুলোঃ

১। ভাইরাস অ্যাটাকে হ্যাকিং।
২। পরিচয় চুরি ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার
৩। ফেইক আইডি, ফেইক ই-মেইল ব্যবহার করে সুনামহানি ও অপপ্রচার।
৪। সাইবার বুলিং
৫। অন্যায় হুমকি, সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট ও অনলাইন অ্যাবিউজ
৬। একান্ত ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর ছবি ছড়িয়ে দেওয়া
৭। অনলাইন ব্ল্যাকমেইল ও অনৈতিক রূপে অর্থ আদায় মানসিক ভাবে টর্চার ও আত্মহত্যায় প্ররোচনা.

নারীদের সাইবার স্পেসে নিরাপদ থাকার উপায়:

  • সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাক্তিগত ছবি, তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। সোশ্যাল মিডিয়ায় সম্পর্কে জড়াবেন না, কারণ কারো সম্পর্কে দেওয়া তথ্য কতটুকু সত্য নির্ধারণ করা মোটেও সহজ নয়।
  • যাই ঘটুক না কেন নিজের ব্যক্তিগত পাসওয়ার্ড অন্যকে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার থেকে দূরে থাকুন। কারণ একই নেটওয়ার্কের অধীনে থাকা ডিভাইসগুলোর নিয়ন্ত্রণ হ্যাকার চাইলেই নিতে পারে।
  • বিয়ের আগেই হোক কিংবা পরে, সম্পর্ক থাক বা না থাক এমন কোন ছবি কখনোই তোলা বা শেয়ার করা উচিৎ নয় যা কোন তৃতীয় ব্যক্তি দেখলে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। ছবি ১০০ বার ডিলিট করলেও তা রিকভার করার সম্ভাবনা থেকেই যায়, তাই স্পর্শ কাতর ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন।
  • নিজের ব্যবহৃত পুরোনো ফোনও বিক্রয় করা থেকে বিরত থাকুন। বিশেষ করে ফেসবুক বা ইমোতে কোন ধরণের ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদান করবেন না। যদি ইতোমধ্যে শেয়ার করে থাকেন, তবে সম্পূর্ণ কনভারসেশন মুছে দিন। কারণ যদি একজনের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয় তবে অপরজনও বিপদে পড়বেন।
  • কোন লিঙ্কে ক্লিক করার আগে কমপক্ষে দুইবার ভাবুন। কারণ ম্যালওয়্যার লিঙ্কে ক্লিক পরে গেলে আপনার অ্যাকাউন্টের এক্সেস হ্যাকারের কাছে চলে যাবে।
    দোকানে ফোন ঠিক করতে দিলে ঠিক না হওয়া পর্যন্ত পাশে থাকুন।
  • সুপার শপ, হোটেল, বিউটি পার্লার, সহ যে কোন জায়গায় পোশাক পরিবর্তনে সচেতন থাকুন, কারণ ক্যামেরার চোখ ধরা মোটেও সহজ নয়, নিজের অজান্তে হতে পারে আপনার ভিডিও।
  • সাইবার ক্রাইম, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, অনলাইনে ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এই সংক্রান্ত যে কোন ধরণের সমস্যায় দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করুন।
  • অনলাইনে ডলার কেনাবেচা থেকে বিরত থাকুন।
  • অনলাইনে পণ্য কেনাবেচা করার আগে ভালোভাবে যাচাই করে নিন।
  • হুমকি, সাইবার ক্রাইম, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, হ্যারাসমেন্ট যাই হোক না কেন, নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করুন।
  • বাবা –মা’র সাথে সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন জীবনের তুলনায় বাস্তবতা আরও কঠিন। বাস্তববাদী হন, সম্পর্ককে মূল্যায়ন করুন। অভিভাবকরা ছেলে মেয়েদের শাসন করে নয়, বন্ধু হবার চেষ্টা করে তাদের বাস্তবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। যেন তারা বিপথে চলে না যায়।

মনে রাখবেন দিনের শেষে আপনার সম্পর্কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনার। আবেগের বশবর্তী হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের ক্ষতি করবেন না। অনলাইনে সতর্ক থাকুন, সাবধানে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। জীবন হয়ে উঠুক নির্ঝঞ্ঝাট ও আনন্দময়!

-জেনিফার আলম
সভাপতি
ক্রাইম রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ফাউন্ডেশন। 

সাইবারস্পেস, সাইবার ক্রাইম, নারী, অনলাইনে নারী

Comments
Spread the love