খেলা ও ধুলা

লোকাল বাসে চড়ে স্টেডিয়ামে গেলেই নারী ক্রিকেটের উন্নতি হবে?

কয়েকদিন আগে যখন আমাদের নারী ক্রিকেট দল এশিয়া কাপ জয় করে আনলো শক্তিশালী ভারতকে হারিয়ে,আমরা অনেকেই আশায় বুক বেঁধেছিলাম যে এবার হয়তো আমাদের মেয়েদের অবহেলা আর বঞ্চনার দিন শেষ হলো, এবার হয়তো তাদের সুযোগ-সুবিধা, আন্তর্জাতিক ম্যাচের পরিমাণ বাড়বে। প্রত্যেক ক্রিকেটারদের ১০ লাখ টাকা করে পুরষ্কার দেওয়া হয়েছিল, আমরা ভেবেছিলাম যাক আমাদের আশাবাদ সত্যি হচ্ছে তাহলে! কিন্তু গতকাল সংবাদমাধ্যমের তোলা কিছু ছবি আমাদের মনটা আবার ভেঙ্গে দিয়েছে!

আয়ারল্যান্ড সফর ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্রস্তুতি নিতে জাহানারা-শামীমারা এখন চট্টগ্রামে। সেখানেই শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। গত মঙ্গলবার সেই প্রস্তুতি ক্যাম্পে হোটেল থেকে মাঠে যাওয়া-আসার সময় সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরায় ধরা পড়ে এক বিচিত্র দৃশ্য! চট্টগ্রামের জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে অনুশীলনের জন্য এশিয়া কাপ জয়ী নারী ক্রিকেটারদের নেওয়া হয় একটি নিম্নমানের লোকাল বাসে চড়িয়ে। জানা যায় এই লোকাল বাসগুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম শহরে চলাচলকারী ৬ নম্বর রুটের সিটি লোকাল বাস। যেটা একদিনের জন্য ভাড়া নিতে সর্বোচ্চ খরচ হতে পারে ১৫০০ টাকা। যাতে নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, দেখতেও বেশ পুরনো বাসটিতে যাতায়াত খুব একটা স্বস্তি দায়ক হওয়ার কথা নয়। নারী ক্রিকেটারদের জন্য যে হোটেল বুক করা হয়েছে, সেটিও চার তারকা বা পাঁচ তারকা কোন হোটেল নয়, সাধারণ মানের টাওয়ার ইন হোটেল।

শুনতে খুব অদ্ভুত শোনাচ্ছে না? যে নারী দল একটা সময়ে ৬০০ টাকা পেত ঘরোয়া ক্রিকেটে ম্যাচ ফি হিসেবে, অবহেলা-অনাদরের ভেতরেও যারা দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে গেছে, দেশকে এনে দিয়েছে অভাবনীয় এক সাফল্য, সেই নারী দলকে এরপরেও কিভাবে ফকিরের মত লোকাল বাস অফার করার ছোটলোকী মনোভাব দেখায় কর্তৃপক্ষ? অথচ এই মেয়েগুলো এখন এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন। বাংলাদেশ থেকে ফুটবল-ক্রিকেট-হকি সব মিলে নারী বা পুরুষের প্রথম এশিয়া চ্যাম্পিয়ন। ফাইনালে হারিয়েছে ইণ্ডিয়াকে, যারা এশিয়া কাপের সেই ২০০৪ সাল থেকে গত ছয় আসরের প্রতিবারের অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। ভারতের মেয়েদের কাছ থেকে শিরোপা কেড়ে নেওয়া তো দূরে থাক, অন্য কোন দল ইভেন একটা ম্যাচে হারাতেও পারেনি তাদের গত ছয় আসর ধরে!

আর সেই মহাপরাক্রমশালী ভারতীয় দলকে একই টুর্নামেন্টে দুইবার হারিয়েছে এই মেয়েরা! হারিয়েছে পাকিস্তানকে! এর আগের তিন বারের রানার্স আপ শ্রীলংকা ও দুই বারের রানার্স আপ পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে ছয়বারের টানা অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে জিতেছে শিরোপা! হয়েছে এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন! এমন অত্যাশ্চর্য সাফল্যগাঁথা রচনা করার পরেও তারা কি একটা সামান্য গ্রীন লাইন বা এসি বাস পেতে পারে না চলাচলের সময়?

যারা এখনো এর তাৎপর্য বুঝতে পারেননি, তাদের জন্য আরেকটু সহজ করে বলি। এই এশিয়া কাপে অপরাজিত ভারতীয় নারী দল ছিল অনেকটা ২০০০ সালের দিকে অপরাজিত, ভয়ংকর অস্ট্রেলিয়ার মত! আর আমাদের মেয়েরা এখনো শিখছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তারা এখনো নতুন! সেই পরাক্রমশালী ভারতীয় নারী দলকে রীতিমত হেসেখেলে হারিয়েছে আমাদের মেয়েরা প্রথম ম্যাচে, ফাইনালে ভারতের মেয়েদের আপ্রাণ চেস্টার পরেও শ্বাসরুদ্ধকর জয় ছিনিয়ে এনেছে জাহানারা-সালমারা! এরপরেও কি সামান্য মর্যাদা, ন্যুনতম সম্মান ডিজার্ভ করে না আমাদের মেয়েরা? আজকে যদি বাংলাদেশ শিরোপা না জিততো, অন্য কোন দলের বিপক্ষে না জিততো, তবুও তো এক টুর্নামেন্টে স্রেফ ভারতকে ওই ম্যাচটায় রেকর্ড গড়ে হেসেখেলে হারানোটাই একটা অভাবিত বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হত! সেখানে এতো বড় সাফল্যের পরেও এ কেমন ছোটলোকী মনোভাব বিসিবির?

মানছি বাস্তবতার হিসাব ভিন্ন। নারী ক্রিকেট এখনো পুরুষ ক্রিকেটের মতো অর্থ উপার্জনকারী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি। একজন পুরুষ খেলোয়ার, একটি পুরুষ টিম, পুরুষদের একটি টুর্ণামেন্ট যে পরিমান স্পন্সর পায় তার সিকি ভাগও পায়না একজন নারী খেলোয়ার, একটি নারী টিম, নারীদের একটি টুর্ণামেন্ট। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু এই চিত্র পরিবর্তনে সবার আগে উদ্যোগী হয়ে ওঠার কথা ছিল কার? স্পন্সর আনতে, ভালো ফ্যাসিলিটির ব্যবস্থা করবার জন্য দরকার হয় ভালো পারফরম্যান্স, মেয়েরা একেবারে এশিয়া কাপটা জিতে এনে দিল! এরপরেও কেন মেয়েদের লোকাল বাসে চড়ে গরমে ঘামে দুর্বিষহ অবস্থায় চলাচল করতে হবে? বিসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কিভাবে এখনো এতোটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দেন?

আমি নিশ্চিত, যে কর্মকর্তা নারী ক্রিকেটারদের যাতায়াতের দিকটা দেখেন, এতো সাফল্য এতো কিছু এখনো তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে পারেনি। নারী ক্রিকেট টিমের সুযোগ-সুবিধা বাড়লে যে আরো মেয়েরা উৎসাহিত হবে ক্রিকেটের প্রতি, দেশের ক্রীড়া জগতে অন্যান্য নারীরাও উৎসাহিত হবে এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ইতিবাচক একটা পরিবর্তন আসবে, এই সহজ হিসেবটা বোঝার মত ক্ষমতা তার নেই! আর তাই এখনো হোটেল থেকে স্টেডিয়ামে যাতায়াতের মত খুব সাধারণ ব্যাপারটাতেও তিনি সামান্য একটা এসি বাস দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করছেন না, বরং “ধুর মেয়েদের ক্রিকেট, ওদের জন্য লোকাল বাসই যথেষ্ট” টাইপের চিন্তাভাবনায় আছেন। শত হলেও মেয়েরা যে ক্রিকেট খেলবে, সাফল্য বয়ে আনবে, দেশকে গর্বিত করবে, এটাই তো এখনো দেশের সিংহভাগ মানুষ মেনে নিতে পারে না!

তাই যত দ্রুত সম্ভব নারী ক্রিকেটে এই ছোটলোকি চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনতে হবে, পুরুষ ক্রিকেটারদের মত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে এবং অতি দ্রুত নারী ক্রিকেটের জন্য বাৎসরিক ম্যাচ ফিক্সচার নির্দিস্ট করতে হবে, সোজা কথায় ম্যাচ বাড়াতে হবে। ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে আন্তর্জাতিক ম্যাচ-সবখানেই আরো বেশি ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা করতে হবে। একটা দেশের জাতীয় ক্রিকেট দল সস্তার লোকাল বাসে চড়ে চলাফেরা করছে, এটা দেখতেও তো লজ্জা লাগে! আপনাদের লজ্জা লাগে না মাননীয় কর্মকর্তারা?

আপডেট- আমাদের প্রবল প্রতিবাদে অবশেষে টনক নড়েছে কর্তৃপক্ষের! শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা গেছে, আজ সকালেও একই বাসে করে মেয়েদের হোটেল থেকে স্টেডিয়ামে অনুশীলনের জন্য নিয়ে আসা হলেও দুপুর একটার দিকে স্টেডিয়াম থেকে হোটেলে ফিরিয়ে আনা হয় তিনটি বড় মাইক্রোবাসে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিবি’র চট্টগ্রামের ভেন্যু ব্যবস্থাপক ফজলে বারি খান সংবাদমাধ্যম সারাবাংলাকে বলেন, ‘সকালে বাসে করে নিয়ে যাওয়া হলেও পরে নারী ক্রিকেটারদের জন্য আমরা তিনটি মাইক্রোবাস দিয়েছি। তাদের মাইক্রোবাসে করে হোটেলে আনা হয়েছে। হোটেল থেকে মাইক্রোবাসে করেই বিকেলে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close