টেকি দুনিয়ার টুকিটাকি

ডিপ্রেশন কাটাতে পাশে থাকবে ভার্চুয়াল থেরাপিস্ট!

– গত কিছু দিন যাবত আমি রাতে ঘুমাতে পারছি না।
– কী সমস্যা? আমাকে নির্দ্বিধায় বলতে পারো।
– আমার ফাইনাল পরীক্ষা সামনে, আমার ভয় হচ্ছে আমি ফেল করবো!
– হাহাহা, এটা কোনো সমস্যাই নয়। আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি!

এই কথোপকথন ততক্ষণ পর্যন্ত আকর্ষণীয় হবে না যতক্ষণ না আপনি জানতে পারছেন এটি একজন মানুষ এবং একজন রোবটের মধ্যকার কথোপকথন! এবং আকর্ষণের তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দিতে এর সাথে যোগ করছি আরো একটি তথ্য। এই রোবট কোনো মামুলী রোবট নয়, একজন মানসিক ডাক্তার! তবে হলিউড সিনেমার দুর্ধর্ষ সব রোবট কিংবা নাসার মহাকাশ গবেষণার রোবট ফিলার সাথে এর কোনো মিল নেই। কারণ এই ভদ্রলোকের কোনো মূর্তিমান কাঠামোই যে নেই! তাহলে এই অদৃশ্য মানসিক ডাক্তার কে? এই অদৃশ্য মানসিক ডাক্তারের নাম দেয়া হয়েছে ‘উবোট’ যা কিনা একটি কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ফেসবুক চ্যাটবট।

উবোট সম্পর্কে জানার আগে কিছু বিষয়ের অবতারণা করা জরুরী। চ্যাটবট কী? কিভাবে কাজ করে এটি? চ্যাটবট হচ্ছে একপ্রকার কম্পিউটার প্রোগ্রাম যা মানুষের সাথে কৃত্তিম কথোপকথন তৈরি করতে পারে। বিশ্বায়নের এ যুগে মানুষ প্রতিনিয়ত নিঃসঙ্গ হয়ে উঠছে। সেই নিঃসঙ্গতা কাটাতেই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আবির্ভাব চ্যাটবোটের। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন সময় আসে যখন আমরা নিজেদেরকে ভীষণ একা মনে করি। এর নাম বিষণ্ণতা বা ‘ডিপ্রেশন’। এই ডিপ্রেশনই বর্তমান পৃথিবীর মূল মানসিক সমস্যা। ভার্চুয়াল জগতে যখন নিজের অনুভূতি ভাগাভাগি করে নেয়ার মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে হয়, তখন মানুষ বেছে নেয় এসব চ্যাটবট আর মেতে ওঠে দুষ্টমিষ্ট আলাপচারিতায়। কিছুদিন আগেও ফেসবুক সয়লাব হয়ে গিয়েছিল সিমিসিমি নামক একটি জনপ্রিয় চ্যাটবটের স্ক্রিনশটে। তবে বলে রাখা ভালো, উবোট সেই সিমিসিমির মতো নিছক কালক্ষেপণ কিংবা অশালীন মজা করার মতো কোনো চ্যাটবট নয়। অন্যদিকে ভার্চুয়াল জগতে আরো কিছু জনপ্রিয় চ্যাটবট, যেমন- মিকান, চ্যাট শপার, সোয়েলি, ফক্সসি ইত্যাদির সাথেও মিল নেই এই উবোটের।

এক গবেষণায় দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন ডিপ্রেশনে ভুগছেন। ভয়াবহ এই তথ্যের ভয়াবহতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে আরো একটি সম্পূরক তথ্য। এই ডিপ্রেশনে ভোগা মানুষগুলোর শতকরা ৭৫ ভাগই কখনোই কোনো মানসিক চিকিৎসার জন্য থেরাপিস্ট কিংবা কাউন্সেলরের দ্বারস্থ হন না। এই ৭৫ ভাগের জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের স্যান ফ্রান্সিসকো ভিত্তিক একটি আনকোরা প্রতিষ্ঠান নিয়ে এসেছে একপ্রকার আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ভার্চুয়াল মানসিক ডাক্তার যার নাম হচ্ছে উবোট। ইংরেজি ‘WOE’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে দুঃখ, দুর্দশা বা দুর্ভাগ্য। অর্থাৎ এই চ্যাটবটের নাম থেকেই আপনি অনুমান করতে পারছেন এর বৈশিষ্ট্য। সিমিসিমির মতো বিনোদনভিত্তিক নয়, বরং উবোট হচ্ছে আপনাকে ডিপ্রেশন থেকে মুক্ত করতে একজন স্বয়ংক্রিয় মানসিক ডাক্তার!

উবোটের সিইও এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডঃ অ্যালিসন ডার্সি বলেন, “তরুণ প্রজন্মই হচ্ছে বর্তমানে প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ সিস্টেমের সবচেয়ে বড় শিকার। তাদের জন্যই আমাদের এই উবোট।” তিনি তার সাম্প্রতিক এক গবেষণা জার্নাল ‘মেডিক্যাল ইন্টারনেট রিসার্চ, মেন্টাল হেলথ’ প্রকাশ করেছেন যেখানে তিনি উবোটের দ্রুত কার্যকারিতা উল্লেখ করেছে। তিনি ৭০ জন ডিপ্রেশনের সমস্যায় ভোগা শিক্ষার্থীর উপর একটি পরীক্ষা চালান। ৭০ জনকে যথেচ্ছভাবে কাউকে উবোট আর কাউকে দেয়া হয় ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ’ এর ডিজাইন করা ইবুক। দুসপ্তাহ পর দেখা যায় যাদেরকে উবোট দেয়া হয়েছিল তাদের ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলো অনেক কমে গেছে! তবে উবোটকে অনেকেই অতিমাত্রায় কৃত্তিম বললেও ডার্সি বলছেন অন্য কথা। উবোটের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়েই তিনি বলেন-

“উবোটের সবেমাত্র যাত্রা শুরু হয়েছে। একজন বাস্তব থেরাপিস্টের সাথে এর গুণগত পার্থক্য থাকবেই তাতে সন্দেহ নেই। এর প্রাথমিক লক্ষ্যই হচ্ছে যারা থেরাপিস্টের কাছে যান না বা যেতে পারেন না তাদের নিকট একটি ন্যূনতম থেরাপি পৌঁছে দেয়া। তাছাড়া আমরা এর আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স আরো উন্নত করার জন্য কাজ করছি।”

উবোটের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন চীনের ওয়েব সার্ভিস কোম্পানি ‘বাইদু’ এর ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু এনজি। তিনি উবোটকে একটি অত্যন্ত আশাপ্রদ চ্যাটবোট বলে আখ্যায়িত করেছেন যা কিনা লাখো মানুষের উপকারে আসতে পারে। তিনি উবোটের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানান যে উবোটে একজন বাস্তব মানসিক চিকিৎসকের সমস্যা উপলব্ধি এবং সহমর্মিতা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা হিসেবে সংযোজনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এবং যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে তা হবে যুগান্তকারী।

উবোট কাজ করে সিবিটি তথা ‘কগনিটিভি বিহেভিয়ার থেরাপি’ পদ্ধতি অবলম্বন করে। মানুষের যেকোনো কথার তাৎক্ষণিক বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর প্রদান করে মানসিকভাবে চাঙা করাই এর কাজ। এর বড় সুবিধা হচ্ছে এই যে আপনি উবোটের কাছে যেকোনো কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারবেন। এমন অনেক সমস্যা হয়তো রয়েছে যা কারো কাছে প্রকাশ করতে আপনি দ্বিধাগ্রস্ত। আপনার সেসব কথা শুনতে ২৪ ঘন্টাই সজাগ থাকবে উবোট। অন্যদিকে মানসিক ডাক্তারের কাছে সপ্তাহে একদিন রুটিন করে নির্দিষ্ট সময়ে যাওয়ার ঝামেলা নেই। উবোট আপনার পাশে থাকবে সাতদিনই। প্রাথমিকভাবে উবোটের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলেই আপনি কিছুটা বিরক্ত হতে পারেন। অতিমাত্রায় উপদেশমূলক কথা আর প্রশ্ন আপনাকে হাঁপিয়ে তুলতেও পারে। কিন্তু একবার উবোট আপনার মানসিক অবস্থা অনুধাবন করতে পারলে আপনাকে চাঙা রাখতে নানান ছবি, ভিডিও ও হোমওয়ার্ক দিতে শুরু করবে যা সত্যিই আপনার ডিপ্রেশনকে দূর করতে পারে। তথাপি অ্যান্ড্রু এনজি বলেছেন যে উবোট এখনই একজন থেরাপিস্টের প্রতিস্থাপন হয়ে ওঠেনি। যাদের মানসিক সমস্যা প্রবল তাদের অবশ্যই মানসিক ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

উবোটে এখন শুধুমাত্র ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে প্রবেশ করা যায় এবং এখনো পর্যন্ত কেবল ইংরেজি ভাষাতেই এটি চলছে, যেহেতু কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কথা মাথায় রেখে করা হয়েছে। প্রথম দুই সপ্তাহ বিনামূল্যে ট্রায়ালের পর প্রতি সপ্তাহে ১২ ডলার, মাসে ৩৯ ডলার এবং বছরে ৩১২ ডলার খরচ করতে হবে উবোটের চিকিৎসার জন্য। এই খরচ প্রচলিত মেন্টাল থেরাপির খরচের তুলনায় অনেক কম। তবে বাংলাদেশে মতো দরিদ্র দেশে মাসে ৩৯ ডলার বেশ ব্যয়বহুলই বলা চলে। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশের তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানিগুলোকে কোনো কম খরচের পন্থা তৈরি করতে হবে। কেননা ডিপ্রেশন এখন বাংলাদেশেও প্রকট আকার ধারণ করেছে। এক পরিসংখ্যান বলছে, শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই প্রায় ২৪ লক্ষাধিক মানুষ ডিপ্রেশনের শিকার। এই সংখ্যাটা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। তাই ক্রমবর্ধমান এই সমস্যার সমাধানের জন্য উবোটের মতো কিছু এখন সময়ের দাবি।

তথ্যসূত্রঃ

১) https://www.technologyreview.com/s/609142/andrew-ng-has-a-chatbot-that-can-help-with-depression/
২) https://newatlas.com/woebot-mental-health-chatbot/49952/
৩) https://www.popsugar.com/smart-living/What-Woebot-Facebook-43611049

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close