বাংলাদেশের উত্তর থেকে দক্ষিণে চলতে থাকলেই হয়তো কিছু অন্যরকম খাবার চোখে পড়বে যা আপনার কাছে একটু অস্বাভাবিক ঠেকলেও ঐ এলাকায় তা প্রচলিত। যেমন, আমার এক বন্ধু ভাপা পিঠার সাথে রান্না মাছ খেতে খুবই পছন্দ করে, এটা নাকি ওদের এলাকায় জনপ্রিয়, কিন্তু অনেক অঞ্চলে এই চর্চা চিন্তাও করা যায় না। যাই হোক, অদ্ভুতুড়ে খাদ্যাভাস কিংবা খাবারের চর্চা গোটা পৃথিবীতে নেহায়েত কম নয়, যা হয়তো খাদ্য রুচির সমন্ধে ভোজন রসিকদের ‘নতুন করে’ ভাবতে সাহায্য করবে।

ফুগু, জাপান

খাবারের ব্যাপারে অবশ্যই প্রাধান্য দেওয়া হয় স্বাদ, পুষ্টি গুণ এবং তা কতটা নিরাপদ। কিন্তু যারা ফুগু খেতে চাইবেন তাদের এটি খেতে হবে জীবন হাতে নিয়ে! কেননা ফুগু তৈরি করা হয় জাপানি পটকা মাছ থেকে যার মধ্যে রয়েছে ৩০টি মানুষ মেরে ফেলার মত বিষ! ব্যয়বহুল এই খাবারটি পরিবেশন করা হয় গ্রিল করে বা খুবই পাতলা শাশিমির মত করে। ফুগু শেফদের নিতে হয় দীর্ঘ সতর্ক প্রশিক্ষণ, কারণ তাদের সামান্য ভুলে মৃত্যু অবধারিত।

মাকড়শা ভাজা, কম্বোডিয়া

লকলকে কালো পা কিলবিল করছে পুরো প্লেট জুড়ে, মুখে দেওয়ার আগে গা গুলিয়ে আসতেই পারে, কিন্তু প্রায় পুরো কম্বোডিয়া জুড়েই রয়েছে টারানটুলা নামের বড় কালো মাকড়শা খাওয়ার রেওয়াজ। ডুবা তেলে কড়া করে ভাজা হয় মাকড়শা গুলি যতক্ষন না বাইরে মচমচে হয়ে উঠছে এবং ভিতরে রসালো। অত্যাচারী খেমারদের সময়ে গ্রামবাসী খাবারের অভাবে বিকল্প কিছু খুঁজতে শুরু করে, মনে করা হয় তখন থেকেই মূলত টারানটুলা খাওয়া শুরু হয়। জনশ্রুতি আছে প্রোটিনের ভরপুর খাবারটি নাকি সৌন্দর্য্য বর্ধনে সাহায্য করে।

প্রেইরি অয়েস্টার্স, কানাডা

নাম শুনে মনে হতে পারে এটি তৈরি করা হয় ঝিনুক থেকে বা এর কিছু একটা উপাদান দ্বারা। কিন্তু মোটেও তা নয়, ডিশটির মূল উপাদান ষাড়ের অণ্ডকোষ! রকি মাউন্টেন অয়েস্টার্স নামেও পরিচিত এটি, পরিবেশন করা হয় ঝোল কিংবা ভেঁজে এবং সাথে থাকে আরো কিছু আনুষঙ্গিক উপাদান।

বালুত, ফিলিপাইন

ডিম সিদ্ধ করে খাওয়াটা হয়তো অতি সাধারণ এক খাবার মনে করা হচ্ছিল ফিলিপাইনে, তাই তারা সেটিকে নিয়ে যেতে চাইল অসাধারণ পর্যায়ে এবং নিয়েও গেল! হাসের ডিম ভ্রনাবস্থায় যাওয়ার পর তারা ডিমটি সিদ্ধ করে, ভ্রুনটি জীবন্ত এবং খোসার ভিতরে থাকা অবস্থাতেই। সাধারণত মরিচ, রসুন, ভিনেগার ও লবন দিয়ে খাওয়া হয় সিদ্ধ করা ডিমটি যারা ভিতরে ভ্রণের পাখা ও ঠোঁট সবই বিদ্যমান। ফিলিপাইনের জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড বালুত।

হাগিস, স্কটল্যান্ড

স্কটল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী খাবারটি প্রায় ১৪০০ বছর পুরনো এবং এটি ভেড়াময়। ডিশটি তৈরি করা হয় ভেড়ার হৃদপিন্ড, যকৃত এবং ফুসফুসের সংমিশ্রণ, পেয়াজ ও মসলা মিশিয়ে ঐতিহ্য অনুযায়ী ভেড়ার পাকস্থলির ভিতর রেখে আঁচে ফুটিয়ে।

পিপড়ার ডিমের স্যুপ, লাওস

মানুষের খাদ্যের তালিকা থেকে যেমন বাদ যায়নি হাসের ভ্রুণও, সেখানে পিঁপড়া তো অতি ক্ষুদ্র ব্যাপার। পৃথিবীর অস্বাভাবিক স্যুপের তালিকায় অন্যতম পিপড়ার ডিমের তৈরি স্যুপ যার মধ্যে রয়েছে এক ধরনের বড় পিপড়ার ডিম, পিপড়ার অপরিপক্ক ভ্রূণ এবং কিছু শিশু পিপড়া যারা স্যুপে এনে দেয় টক স্বাদ।

বশিঙট্যাঙ, কোরিয়া

এখন যে স্যুপটির কথা বলব তার অন্যতম উপাদান কি তা জানার পর হয়ত পিপড়ার ডিমের স্যুপ খাওয়ার ব্যাপারে বেশি ইতিবাচক থাকবেন যদি আপনাকে দেওয়া খাবারের তালিকায় শুধু এই দুটি স্যুপই থাকে। পেয়াজ, এক ঝাক মসলা এবং মূল উপাদান কুকুরের মাংস;স্যুপটি কোরিয়ানদের খাদ্য তালিকায় খুব একটা আজকাল দেখা না গেলেও বয়স্কদের মধ্যে এটি যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং তারা মনে করে গন্ধের চেয়েও বেশি এর স্বাদ।

জীবন্ত অক্টোপাস, দক্ষিণ কোরিয়া

প্রজাতি ভেদে এটি পুরোটা এক মুখে কিংবা টুকরো টুকরো করে খাওয়া হয়। সাধারণত অক্টোপাসগুলো পরিবেশন করা হয় একদম তাজা, জীবন্ত অবস্থায় এবং খানিকটা তিলের তেল বা তিল ছিটিয়ে। জীবন্ত অক্টোপাসের পাগুলো অনেক সময় মানুষের গলায় আটকে গিয়ে মৃত্যুর মুখেও ঠেলে দিতে পারে, দক্ষিণ কোরিয়ার এই উপাদেয় খাবারটি খাওয়া যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং এবং ঝুঁকির বটে।

হাকার্ল, আইসল্যান্ড

গ্রিনল্যান্ড শার্ক, সাধারণ অবস্থায় খেতে বিষাক্ত; কিন্তু যেহেতু খেতেই (!) হবে সেহেতু আইসল্যান্ড অধিবাসীরা তাদের নিজস্ব পদ্ধতি বের করে নিয়েছেন। মাথা ফেলে দিয়ে গ্রিনল্যান্ড শার্ক রাখা হয় একটি খোলা গর্তে, তারপর বালি ও পাথর চাপা দিয়ে রাখা হয় প্রায় দুই-তিন মাস। এরপর গর্ত থেকে তুলে নিয়ে লম্বা ফালি করে কেটে আরো কয়েক মাস শুকিয়ে খাবার উপযোগী করে তোলা হয়। প্রথমবারের মত খেতে চাইলে নাক চেপে ধরে খাওয়ার চেষ্টা করবেন নতুবা খাবার টেবিলে পেট উলটে বমি করে বিব্রত হতে পারেন এবং অন্যদেরকে খাবার রুচি নষ্ট করে দিতে পারেন! 

শতবর্ষী ডিম, চীন

পচা ডিমের গন্ধ কতটা দুর্গন্ধময়? খাওয়া তো দুরের কথা কাছে থাকা দায় হয়ে যায়। কিন্তু প্রাচীন চীনের একটি পদ্ধতি আজ সেখানে তাদের খাবারের টেবিলে উঠে এসেছে। কাদা, ছাই ও লবনে ঢেকে মাসের পর মাস রেখে দেওয়া সাদা ডিমগুলি যখন গাড় সবুজ রঙ ধারণ করে গন্ধময় তখন এটি খাওয়ার জন্যে তৈরি এবং এই ডিমগুলো চীনে পরিচিত শতবর্ষী ডিম নামে।

ভোজনরসিকদের জন্যে যে কোন নতুন খাবার ভীষণ রকমের আকর্ষনীয়। তবে অদ্ভুতুড়ে এই খাবারগুলো আমাদের বাঙালি ভোজন রসিকদের জন্যে খুবই চ্যালেঞ্জিং। পেটে খেলে পিঠে সয়; এগুলো খেয়ে হজম করতে হলে আপনাকে অবশ্যই আগে পেটে সওয়াতে হবে, তারপর পিঠ!

তথ্যসুত্র- রিডার্স ডাইজেস্ট

Comments
Spread the love