কথায় আছে, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। কিন্তু কখনো কখনো কারও কারও ক্ষেত্রে এই স্বাস্থ্যই এত ‘ভালো’ হয়ে যায় যে তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখানে বলে রাখা ভালো, আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় এখনো স্বাস্থ্য ভালো বলতে একটু মোটাসোটাদেরই বোঝায়। কিন্তু এমন ভালো স্বাস্থ্যের সাথে প্রকৃত সুস্বাস্থ্যের বিস্তর ফারাক। সুস্বাস্থ্য বলতে খুব মোটাও না, আবার খুব পাতলাও না – আপনার উচ্চতা, বয়স ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক নানা দিকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্বাস্থ্যকেই বোঝায়। আর তাই কারও স্বাস্থ্য যদি একটু বেশিই ভারি হয়ে যায়, তবে ওজন কমানোটা দোষের কিছু তো নয়ই, বরং অতি প্রয়োজনীয়ও বটে।

কিন্তু বিষয়টা হলো, ওজন কমানোর আদর্শ উপায় কেমন হতে পারে তা নিয়ে আমাদের অনেকেরই স্বচ্ছ কোন ধারণা নেই। কেউ মনে করেন না খেয়ে থেকেই বুঝি শরীর কমানো যায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, স্রেফ অধিক শারীরিক পরিশ্রমই পারে ওজন কমাতে। দুইটি ধারণাই ভুল। এবং এ কথাও স্মরণে রাখা অত্যাবশ্যক যে এক রাতের মধ্যেই ওজন কমিয়ে ফেলা অসম্ভব। শুধু এক রাত কেন, আপনাকে যদি কেউ বলে এক সপ্তাহ বা এক মাসেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ওজন কমিয়ে দেবে, বুঝবেন সে নির্ঘাত গুলপট্টি মারছে।

সে যাইহোক, ওজন কমানো কঠোর সাধনার ব্যাপার। এবং এই সাধনা করতে গিয়ে নিজেদের জ্ঞাতেই হোক বা অজ্ঞাতে, আমরা কিছু ভুল পদক্ষেপ নিয়ে থাকি, যার ফলে প্রকৃতপক্ষে আমাদের ওজন কমানো সম্ভবপর হয়ে ওঠে না, কিংবা সাময়িকভাবে ওজন কিছুটা কমানো গেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তো চলুন দেখে আসি এমন কোন পাঁচটি অতি পরিচিত কাজ আমরা ওজন কমানোর লক্ষ্যে করে থাকি, অথচ সেগুলো করা আমাদের একদমই উচিৎ না।

খাদ্যতালিকা থেকে মাত্রাতিরিক্ত ক্যালরি বর্জন-

হ্যাঁ, এ কথায় তিলমাত্র মিথ্যে নেই যে অতিরিক্ত ক্যালরিই আমাদের শরীরে মেদ বৃদ্ধির জন্য প্রধান দায়ী। তাই বেশি ক্যালরি আছে এমন খাবার এড়িয়ে চলার বিকল্প নেই। কিন্তু এই এড়িয়ে চলাটা ততক্ষণ পর্যন্তই ঠিক থাকবে, যতক্ষণ না আপনি বিষয়টিকে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে নিয়ে যাবেন। ক্যালরির পরিমাণ কমাবেন ঠিকই, কিন্তু একেবারে বাদ দিয়ে দেবেন না যেন। কেননা শরীরে ক্যালরির পরিমাণ খুব বেশি কমে গেলে আবার বিপদ। এতে আপনার শরীরের মেটাবলিজম কমে যাবে, এবং তার ফলে আপনার শরীর মেদ ধরে রাখবে। ফলে আম-ছালা দুটোই যাবে। এছাড়া এর ফলে একদিকে যেমন আপনার পেশিশক্তি হ্রাস পাবে, অন্যদিকে আপনি মেটাবলিক সিনড্রোম বা ইনসুলিন রেজিসট্যান্সের মত শারীরিক ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন। তাই খাদ্যতালিকা থেকে ক্যালরি কমিয়ে দেয়ার কথা ভুলেও চিন্তা করবেন না। বরং দিনে নিয়ম করে ১২০০ ক্যালরি খাবার খাবেন, এবং খেয়াল রাখবেন তাতে যেন পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন, ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট উপস্থিত থাকে।

না খেয়ে থাকা-

এই কাজটি ভুলেও করবেন না। আপনি কি ভাবছেন, না খেয়ে থাকলেই আপনার শরীর কমে যাবে? মোটেই না। বরং এতে যা হবে তা হলো, আপনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে যাবেন, কর্মক্ষমতা হারাবেন, আপনার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো ঠিক মত কাজ করা বন্ধ করে দেবে, এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় আপনি বড় কোন রোগেও আক্রান্ত হতে পারেন। এছাড়া না খেয়ে থাকার ফলেও শরীরের মেটাবলিজমে ঘাটতি দেখা দেয়। সুতরাং, না খেয়ে থাকাকে না বলুন। আর হ্যাঁ, খাওয়ার সময় অন্য কোন কাজ করবেন না। পূর্ণ মনোযোগ খাদ্যগ্রহণেই দিন। কেননা এ কথা বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত যে খাওয়ার সময় অন্য কোন কাজে ব্যস্ত থাকলে বেশি খেয়ে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। আর তাতে ওজন কমার বদলে হুড়হুড় করে বেড়ে যাবে।

সকালের নাস্তা না করা-

সকালের নাস্তার ইংরেজি হলো ‘ব্রেকফাস্ট’, অর্থাৎ উপবাস ভঙ্গ। সারা রাত উপবাসের পর আপনি সকালের নাস্তা করেন। তাই এটি দিনের অন্য যেকোন সময়ের খাবারের চেয়ে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সকালের নাস্তা শুধু যে আপনাকে সারা রাত না খাওয়া সংক্রান্ত দুর্বলতা থেকে মুক্তি দেয় তা না, পাশাপাশি আপনার সামনে যে সারাটা দিন পড়ে আছে সেই দিনের প্রতিটি কাজ ঠিকঠাকভাবে করতে পারার মত শক্তিও সরবরাহ করে। মেটাবলিজমের কার্যক্রম ঠিকমত হচ্ছে কিনা, সেটিও নিশ্চিত করে সকালের নাস্তাই। তাই সকালবেলায় অবশ্যই নাস্তা করুন। সকালবেলা খুব বেশি না হোক, পরিমিত পরিমাণে খেয়ে নিলে বাকি সারাদিন পেট ও মনের মধ্যে ক্ষিধে ক্ষিধে ভাবটা থাকবে না, তাই হুট করে কোন এক বেলা অনেক বেশি খেয়ে ফেলার আশংকাও থাকবে না। গবেষকদের মতে, যারা সকালে নাস্তা করেন না, তাদের ওজন সাধারণত সকালে নাস্তা করা ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। তাহলে বুঝতেই পারছেন সকালে নাস্তা করা কতটা দরকারি।

কোন একটি খাবারকে চিরতরে বিদায় বলে দেয়া-

আপনি হয়ত এ কথা প্রায়ই শুনে থাকবেন যে অমুক খাবারটি বেশি খাবেন না। এখানে লক্ষ্য করুন, ‘খাবেন না’ আর ‘বেশি খাবেন না’ কথা দুইটি কিন্তু একদমই আলাদা। কোন একটি খাবার কম খেতে বলা হয়েছে বলে আপনি যদি সেটি খাওয়া একেবারে বাদ দিয়ে দেন, সেটি হবে চরম বোকামি। কোন একটি খাবার যদি আপনার পছন্দনীয় হয় এবং শারীরিক কারণে আপনাকে সেটি কম খেতে বলা হয়, তাহলে যেটা হবে তা হলোঃ আপনি হয়ত সেই খাবারটি খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন, কিন্তু খাবারটির প্রতি আপনার লালসা অক্ষুণ্ন থাকবে। এবং আপনি সেই লালসা চরিতার্থ করবেন অন্য কোন খাবার বেশি বেশি খেয়ে। তাহলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই পছন্দের খাবারটি খান ঠিকই, কিন্তু একটু মেপে মেপে, পরিমিত পরিমাণে।

পর্যাপ্ত পরিমাণে না ঘুমানো-

বলছি না যে সারাদিন ঘুমিয়েই কাটান, ঘুমকেই আপনার প্রেয়সী বানান। কারণ বেশি ঘুমানো তো বিপদজনক, ঘুমে থাকলে আমাদের হিসাব থাকে না। কিন্তু তাই বলে ঘুমকে একেবারে একঘরে করে দেয়াটাও ঠিক না। আপনার যতটুকু প্রয়োজন, সেটুকু ঘুম তো আপনাকে ঘুমাতেই হবে। ঘুমহীনতার সাথে মোটা হয়ে যাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে। গবেষকদের মতে, যারা ঘুমায় কম তাদের ক্ষুধা বেশি, এবং তারা খায়ও অন্যদের তুলনায় বেশি। এছাড়া যারা অনেক রাত পর্যন্ত জাগেন, তাদের মধ্যে একটু বেশি রাতে – এই ধরুন রাত দুটো-তিনটার দিকে – খাওয়াদাওয়ার অভ্যাস আছে। কেননা অনেক রাত অব্দি হয়ত আপনি না ঘুমিয়ে কাজ করছেন বা স্রেফ জাগার জন্য জেগে আছেন, তখন কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক কিছুটা বিশ্রাম চায়। সেই বিশ্রাম যদি সে ঘুমের মাধ্যমে না পায়, তাহলে বিকল্প হিসেবে সে খাবারকে আপন করে নেয়। কিন্তু জেনে রাখবেন, বেশি রাত করে খাবার খাওয়া খুবই ক্ষতিকর।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-