প্রকৃতি কার না ভালো লাগে? প্রকৃতি নিজেকে উজাড় করে আমাদের দিয়েছে নানা বৈচিত্র্যময় উপহার। পাহার-পর্বত, জলপ্রপাত, সমুদ্র, আরও কত কি? আমিও সেই দলের একজন। ভালো লাগা নয় ঠিক ভালোবাসার কারনে প্রায়ই গুগলে প্রকৃতির রূপ বৈচিত্র্যের রহস্য জানার চেষ্টা করি। তেমনি একদিন একজনের উক্তি পড়লাম। উক্তিটা ছিল জলপ্রপাত নিয়ে। আমি পাহাড় প্রিয় মানুষ। আমাকে কি আর জলপ্রপাত টানে? কিন্তু না উক্তিটি একদম আমার মনটাকে কেড়ে নিলো।

“There is a hidden message in every waterfall. It says, if you are flexible, falling will not hurt you!” –Mehmet Murat ildan

কিন্তু জলপ্রপাতটা আসলে কি? কেনই বা পাহাড় বেয়ে ঝরে পড়ে অজস্র অশ্রু? কি বা পাহাড়ের কষ্ট? খুব সহজভাবে বলতে গেলে, পাহাড় বেয়ে যে জলরাশি নিজের মনমত বয়ে চলে তাকেই জলপ্রপাত কিংবা ঝর্ণা বলা হয়ে থাকে। আর সেই অবিরাম বয়ে চলাই আমাদের ক্লান্ত শরীর ও মনকেজুড়িয়ে দেয়। ঝর্ণার পানির এক পশলা ছোঁয়া প্রশান্তি দিতে পারে আপনার ব্যথিত হৃদয়কে। জলপ্রপাত নিয়ে পড়তে পড়তে একটা সময় আমি প্রেমেই পড়ে গেলাম। আমার জীবনে আমি দুইবার জলপ্রপাত দেখেছি। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর দেখলাম যে বাংলাদেশে বেশ কিছু জলপ্রপাত রয়েছে যেগুলোর ধারে কাছেও আমি এখনো যাইনি। এই জীবনে যদি এগুলো নিজ চোখে না দেখতে পাই তাহলে মরে গিয়েও শান্তি পাবো না। পাহাড় আর সবুজ বুনো জঙ্গলের মাঝে আঁকাবাঁকা পাহাড়ের ভাঁজদিয়ে বয়ে চলে যে ঝর্ণার জল, কখনো কি ভেবে দেখেছেন সেই ঝর্ণার জল আপনার মনকে কতটা ছুঁতে পারবে? যখন কিছু শহুরে মানুষ নিষ্ঠুরতার সঙ্গে অসন্তুষ্টভাবে লড়াই করে চলছে ঠিক তখনই একটি ঝর্ণা  প্রকৃতির বুকে নিজ সুখে প্রবাহিত হচ্ছে। আসলে প্রকৃত সুখ স্বাধীনতাতেই। এটি একমাত্র ঝর্ণা দেখলেই উপলব্ধি করা যাবে। একটি ঝর্ণা কখনো শান্ত থাকতে পারে না, ঠিক সুবোধের মত! যখন ঝরবে তখন বিদ্যুতের গতিতে ঝরবে। দেশ-বিদেশ মিলে এই পৃথিবীতে রয়েছে বহু জলপ্রপাত। কিন্তু আজ আমরা আমাদের দেশের কিছু মনোমুগ্ধকর ঝর্ণার ব্যাপারে জানবো।

হাম হাম ঝর্ণার সম্পর্কে কমবেশি আমরা সবাই জানি। বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলেরগভীরে কুরমা বন বিট এলাকায় অবস্থিত।

হাম হামের পরেই আরেকটি জলপ্রপাত মাধবকুণ্ড যেটি সিলেটেরই মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা নামক উপজেলায় অবস্থিত।

সিলেটে নতুন আবিষ্কারকৃত সবুজে ঘেরা এক জায়গার নাম হচ্ছে সংগ্রামপুঞ্জি। জাফলংয়ের জিরো পয়েন্ট থেকেই দেখা যায় সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা। ঝর্ণার খানিকটা দূর থেকে মেঘালয়ের পাহাড়বেয়ে বয়ে যাওয়ার গর্জন কানে আসবে।

চিটাগাং এর খৈয়াছড়া ঝর্ণা খুবই জনপ্রিয় একটি জলপ্রপাত। মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে এই ঝর্ণার অবস্থান। একে বাংলাদেশের ‘ঝর্ণার রানী’ বলা হয়। এটি ছাড়াও চট্টগ্রামের মিরসরাই এ নাপিত্তাছড়া ঝর্নাও রয়েছে। ঝর্ণাগুলোতে যাওয়ার ঝিরিপথটাকে নাপিত্তাছড়া বলে। এই ট্রেইলে সর্বমোট ৩টি ঝর্ণার দেখা পাবেন। ঝর্ণাগুলোর নাম হলো কুপিকাটাকুম, মিঠাছড়ি এবং বান্দরকুম বা বান্দরিছড়া। ঝর্ণাগুলো দেখতে হলে অনেক জায়গা সাঁতার কেটেই পার হতে হয়। তাই যারা ভালো সাঁতার জানেন শুধুমাত্র তারাই এই ঝর্ণাগুলো দেখতে যাবেন এছাড়া গেলেও সাবধানতা অবলম্বন করবেন।

বাকলাই ঝর্ণাকে দেশের সবচেয়ে উঁচুঝর্ণা বলে দাবী করে ঝর্ণাপ্রেমিরা। এটি বান্দরবানের পাহাড়ের গভীরে বাকলাই গ্রামে অবস্থিত। বান্দরবানের আরেকটি পরিচিত জলপ্রপাত হচ্ছে জাদিপাই ঝর্ণা। জাদিপাই পাড়ায় অবস্থিত বলেই এই ঝর্ণার নামকরণ করা হয়েছে জাদিপাই।

তৈদুছড়া ঝর্ণা বা ‘শিবছড়ি ঝর্ণা’ খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলায় অবস্থিত। এই ঝর্ণা অন্য সব ঝর্ণার থেকে একদমই আলাদা। অন্য সকলঝর্ণার মত এর পানি সরাসরি উপর হতে নিচে পড়ছে না। পাহাড়ের গায়ে সিড়ির মততৈরি হওয়া পাথুরে ধাপগুলো অতিক্রম করে নিচে পড়ছে।

কমলদহ ছোট বড় সব ধরনের ঝর্ণা মিলে যেখানে ১০টি ঝর্ণার ট্রেইল দেখতে পাওয়া যায়। এটি বড়দারোগারহাট হাট অবস্থিত। এটি অনেকের কাছেই এখনো অপরিচিত।

এছাড়াও প্রতিদিনই নতুন নতুন ঝর্ণার আবিষ্কার করছে ভ্রমণ পিপাসুরা। খুঁজে খুঁজে গহীন জঙ্গলের ভেতরের ঝর্নাও তারা ঘুরে আসছে। এটি ঝর্ণা প্রেমীদের অন্যরকম আনন্দ দেয়। ঝর্ণার রূপ বর্ষাকালে সবচাইতে ভয়ংকর হয়। তাছাড়াও ঝর্ণা দেখতে গেলে যে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে সেটি হচ্ছে জোঁক, পিচ্ছিল পাথর, এবং পানির স্রোত। পরিশেষে বলতেই হয় আমরা জীবনে কতো ছোট ছোট ব্যাপারে মন খারাপ করি কিন্তু কখনো ভেবে দেখছেন কীভাবে পাথর নিজেকে কেটে ঝর্ণাকে বয়ে যেতে দিয়েছে। তাহলে কি পাথরেরও মন খারাপ হয়?

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-