যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে একটা ‘ফাঁপর’ প্রায়ই এর সমর্থক লোকজনকে খেতে দেখা যায়। এবং এই ফাঁপরে তারা বিভ্রান্ত বোধ করেন। সেটা একটা সিম্পল প্রশ্নের আদলে করা হয়। এই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দেশ স্বাধীনের পর হত্যা খুন ধর্ষণের কোনো মামলা ছিলো কিনা? আরেকটু প্রিসাইসলি যদি যান, যেমন ধরুন কামারুজ্জামানের নামে স্পেসিফিক মামলা ছিলো কিনা? উত্তর আছে। হ্যাঁ, অবশ্যই হয়েছিলো। নলিতা বাড়ির শহীদ বদিউজ্জামানের বড় ভাই হাসানুজ্জামান বাদী হয়ে নালিতাবাড়ি থানায় মামলা দায়ের করেন। এই মামলার ১৮জন আসামীর অন্যতম ছিলেন কামারুজ্জামান। মামলাটির নম্বর -২(৫)৭২। জিআর নং-২৫০(২)৭২।

এটি এখন আমি জানানোয় আপনি হয়তো বলতে পারবেন। কিন্তু বাকিদের ক্ষেত্রে একই জিজ্ঞাসায় আপনি একইরকম বিব্রত ও বিভ্রান্ত বোধ করবেন। দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, কিংবা মুজাহিদ কিংবা নিজামির বিরুদ্ধে কোন থানায় মামলা আপনি বলতে পারবেন না। এবং তখন আপনার বিভ্রান্ত মন এটা বিশ্বাস করতে চাইবে আসলেই হয়তো এই লোকগুলো ষড়যন্ত্রের শিকার। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার। তারা একাত্তরে মাসুম বাচ্চা ছিলো, কোনো অপরাধই করেনি। হতাশ হবেন না, একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলেই উত্তর পেয়ে যাবেন।

প্রথাগত হত্যা মামলায় বা ফৌজদারী আদালতের বিষয় ছিল না একাত্তরের হত্যাযজ্ঞ বা খুন ধর্ষণ লুটপাট, ভিটেমাটি উচ্ছেদের ঘটনাগুলো। স্বাধীনতার পর থানা এবং আদালতগুলো গুছাতেই একটা বড় সময় চলে গেছে। তার মধ্যেও পাকিস্তানীদের রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগীদের গ্রেফতার করা হচ্ছিলো দালাল আইনে, তাদের বিচারও চলছিলো। যেহেতু যুদ্ধাপরাধ ছিলো একটা নতুন বিষয়, এই স্বাধীন দেশের আদালতগুলোর জন্য দেখা যাচ্ছিলো তারা তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, কেউ একই অপরাধে মৃত্যুদন্ড পাচ্ছে তো কেউ কয়েক মাসের কারাদন্ড।

যদিও এক্ষেত্রে এদের অপরাধী সাব্যস্ত করেই বিচার চলছিলো। একাত্তরে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং রাজাকার আলবদর বাহিনীর প্রতিটি সদস্যই ছিলো যুদ্ধাপরাধী। এদের বিরুদ্ধে এক এক করে মামলা দেওয়ার প্রয়োজন ছিলো না কোন। বিচার চলছিল সংগঠনের বিরুদ্ধে এবং এর সদস্য প্রমাণ পাওয়া গেলেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে বলে আমলে নেওয়া হতো। দালাল আইনে ফোকরগুলো ভরতেই ১৯৭৩ সালে করা হলো আন্তর্জাতিক মানের যুদ্ধাপরাধ বিচার বিষয়ক আইন। যেটাকে শুধু পাকিস্তানীদের বিচারের জন্য করা হয়েছিলো বলে বিভ্রান্তির চেষ্টা চলে, কিন্তু সেই আইনে স্পষ্টই উল্লেখ ছিলো সহযোগী বাহিনীগুলোর কথাও।

জামায়াতের শীর্ষ নেতারা এই সহযোগিতার দায়ে কারারুদ্ধ। যারা সরাসরি হত্যাযজ্ঞে অংশ নেয়নি তাদের বিরুদ্ধে আছে কালেকটিভ লায়াবেলিটির দায়। ছাত্র সংঘের সদস্যরা বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করেছে, বাঙালীদের হত্যা করেছে, সে হত্যায় মুজাহিদ নিজামি সরাসরি অংশ না নিলেও তাদের দলীয় দায় রয়েছে। কারণ মুজাহিদ ছিলো তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘের সভাপতি, নিজামী গোটা পাকিস্তানের। তো এভাবেই ব্যাপারটা দেখতে হবে। সাঈদী একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ করেনি। সে নির্বিরোধী চাষী কিংবা সাধারণ মুসল্লী বা ইমাম ছিলো না। সে প্রত্যক্ষ অংশ নিয়েছে লুটপাটে, ধর্ষণে, উৎখাতে, পাকিস্তানীদের দেখিয়ে দিয়েছে কাদের মারতে হবে (যেমন সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমদের বাবা)। তাকে ওই সহযোগিতার দায় নিতেই হবে।

দালাল আইন পঁচাত্তরের পর বাতিল হয়েছিলো। এর আগে সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার পরও জেলে বন্দী ছিলো তারা যাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও উৎখাতের অভিযোগ ছিল। এদের বেশীরভাগই আলবদরের সদস্য। তখনই বলা হয়েছিল এদের অনেক সহযোগী পলাতক এবং এদের গ্রেফতারের পরপর তাদের সাজা ভোগ শুরু হবে। ছাত্র সংঘের শীর্ষ নেতারা খুনীরা বেশীরভাগই পালিয়ে গিয়েছিলো। ফেরার আসামী ছিলো। দালাল আইন বাতিলের পর তারা দেশে ফিরেছে বটে! গাড়িতে জাতীয় পতাকাও ওড়ায়, মন্ত্রীও হয়। কিন্তু তাদের নিয়তি নির্ধারণ করা বিশেষ আইন রয়েই যায়।

একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিটি সদস্য যুদ্ধাপরাধী। ছাত্র সংঘের প্রতিটি সদস্য যুদ্ধাপরাধী। এটাই ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য। আলাদা আলাদা করে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রমাণ দাবি আদালত করতে পারে হয়তো বিচারের স্বচ্ছতার স্বার্থে। সেটায় জনগনের মাথা না ঘামালেও চলবে। বরং তারা সোচ্চার হতে পারে এই যুদ্ধাপরাধী সংগঠনটাকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না কেন তা নিয়ে। কারণ এটা সময়ের দাবি…

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-